‘কেন এমন হয়? যখনই নারীর অধিকারের প্রশ্ন আসে, তখনই ধর্ম কিংবা সংস্কৃতির নানা অজুহাত টেনে আনা হয় তা ঠেকানোর জন্য। তখনই ধর্ম আর সংস্কৃতির নানা বিধান হয়ে ওঠে অলঙ্ঘনীয়। কেন?’ এ প্রশ্নটি ছিল আর্জেন্টিনার ক্যাথলিক পরিবারের এক তরুণীর। অন্য এক সময় একই প্রশ্ন ছিল একজন সুদানি খ্রিষ্টান নারীর। আমি নিশ্চিত যে বাংলাদেশের অসংখ্য মুসলিম, হিন্দু বা বৌদ্ধ নারীর মনেও একই প্রশ্ন আছে।
নারীকে থামানোর জন্য ধর্ম টেনে আনায় সব সময় ধর্মবাদী রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন হয় না, ধর্মের প্রতি পূর্ণ অনুগত হওয়ারও প্রয়োজন হয় না। এর বাইরেও অনেক পুরুষ আছেন, ঘরে ঘরে, রাস্তায়, কর্মস্থানে−তাদেরও এই একটি প্রশ্নে ধর্ম টেনে আনতে খুব আগ্রহী দেখা যায়। নিজের জীবনে, পোশাকে, খাদ্যাভ্যাসে, আচার-আচরণে যে ধর্ম বা সংস্কৃতির কোনো প্রাসঙ্গিকতা যাদের কাছে নেই, সেই ধর্ম বা সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে তাদের মুখেই নারীর পোশাক, জীবন, পেশা নিয়ে প্রশ্ন তোলার নজিরও কম নেই।
নারী ও সম্পত্তির প্রশ্ন এলে ধর্মকর্মের সঙ্গে যোগাযোগ থাকুক ন্রাথাকুক, অধিকাংশ পুরুষের যুক্তি এক জায়গায় মিলে যায়। সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারসুত্রে নারী সমানাধিকার দেওয়া হলে যে আপাতদৃষ্টে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সে পুরুষ। প্রধানত ভাই। আর যদি ভাই না থাকে তাহলে চাচা, জেঠা ও তাঁদের ছেলেরা; বর্তমান মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী ভাই না থাকলে বাবা মারা গেলে তাঁর সম্পত্তির বড় অংশ মেয়ের বদলে চাচা-জেঠার পরিবারের পুরুষেরাই পায়। সম্পত্তির সমানাধিকার আইন হতে যাচ্ছে মনে করে যাঁরা চরম আতঙ্কের সঙ্গে বিচলিত হচ্ছেন, তাঁরা কি সবাই এই ভাই ও চাচা-জেঠা? মনে তো হয় না। এই বড় বড় সমাবেশে অনেকেই ছিলেন, যাঁদেরও নিজেদের মেয়ে আছে। তাঁদের কন্যাসন্তান যদি সম্পত্তিতে পুত্রের সমানাধিকার পায়, তাহলে তাঁদের সমস্যা কী? কন্যার প্রতি কি তাঁদের ভালোবাসা কম? কিংবা এসব সমাবেশে এমন অনেক মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক দেখা যায়, যাঁদের নিজেদেরই তেমন কোনো সম্পত্তিই নেই। তাহলে কী হারানোর ভয়ে তাঁরা আতঙ্কিত? নারীর প্রশ্নে তাঁদের বরাবর এত ভীতি কেন? কেন তাঁদের অস্িথরতা? নাকি বিত্তবান কতিপয় নেতা বা আরও ক্ষমতাশালী কোনো গোষ্ঠীর রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি হিসেবেই তাঁরা ব্যবহূত হচ্ছেন?
মুসলিম পারিবারিক আইনে সম্পত্তিতে পুরুষের তুলনায় নারীর অর্ধেক ভাগ। এর পেছনে প্রধান যুক্তি ছিল যেহেতু পুরুষ নারীর ভরণপোষণের পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করবে, সেহেতু নারীর অর্ধেক ভাগই ন্যায্য। যে অনুমিতির ওপর নারীর অর্ধেক ভাগ প্রাপ্তিকে যথার্থ বলে মনে করা হয়েছিল, সে অনুমিতি যদি আর কার্যকর না থাকে, তাহলে ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও সিদ্ধান্ত পাল্টানোর জন্য পরবর্তীকালের আলেম-উলামারা দায়িত্ব নেবেন না কেন? নিয়েছেন অনেক দেশেই। ইরাক,্রতিউনিসিয়া, মরਆো তার অন্যতম উদাহরণ। সেখানে সম্পত্তির ওপর নারীর সমানাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। হিন্দুধর্মে বিধান ছিল বিবাহকালে নারী পাবে এককালীন সম্পদ বা অর্থ, আর কিছু নয়। পুত্ররাই পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে। এখন ভারতে নারী-পুরুষ সমানাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এ দেশে হিন্দু-বৌদ্ধ সংখ্যালঘু পরিবারে মেয়েরা এখনো সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত। এখানেও ধর্মেরই দোহাই।
আগের অনেক অনুমিতিই আর এখন কার্যকর নেই। অনেক কিছু পাল্টে গেছে, পাল্টে যাচ্ছে। বাংলাদেশে পুরুষ নারীর ভরণপোষণ করছে, এ রকম পরিবারের অনুপাত দ্রুত কমে আসছে। গরিব পরিবারগুলোর মধ্যে এখন শতকরা ২৫ ভাগই নারীপ্রধান পরিবার। মধ্যবিত্ত পবিরারে পেশাজীবী নারীর অনুপাত দ্রুত বাড়ছে। উচ্চবিত্ত পারিবারেও তা-ই। নারীই ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করছে, এ রকম অনেক উদাহরণও দেওয়া যাবে।
যুক্তি দেওয়া হয়, নারী বাবার সম্পত্তিতে ভাগ পায়, স্বামীর ঘরেও আবার পায়। তাহলে সব মিলিয়ে তো বেশিই হচ্ছে। না, হয় না। আর বাবার সম্পত্তির বৃহৎ অংশ পাওয়ার পর পুরুষ কি তবে স্ত্রীর সম্পত্তির দিকে কোনো নজর দিচ্ছে না? অনেকের ক্ষেত্রে বরং সেটাই প্রধান মনোযোগ, এমনকি অধিকাংশ নারীর ক্ষুদ্রঋণও এখন পুরুষেরই নিয়ন্ত্রণে। সাধারণ চিত্র হচ্ছে, বাবা ও স্বামী কারও সম্পত্তির ওপরই নারী প্রকৃতপক্ষে অধিকার কায়েম করতে পারে না। এটি প্রচলিত আইনের জন্য, তারপর অনুশাসন ও প্রথার জন্য, সর্বোপরি নারীর সামগ্রিক নিরাপত্তাহীনতার জন্য। সম্পত্তিতে নারীর অধিকার সম্পর্কিত প্রচলিত ধারণায় ধরেই নেওয়া হয়, প্রথমত সব ‘বালেগ’ নারীই বিবাহিত, দ্বিতীয়ত সবারই বিয়ে টিকছে, তৃতীয়ত এই সম্পত্তির যতটুকু আইনগত তার পুরোটাই নারী পাচ্ছে। সব রকম গবেষণা, পর্যবেক্ষণ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলছে, এই তিনটির কোনোটিই ঠিক নয়। অবিবাহিত বা তালাকপ্রাপ্ত বা বিধবা নারী এসব বিবেচনায় একেবারেই প্রান্তিক।
বিবাহিত মেয়েরা বাবার ঘর থেকে যতটুকু সম্পত্তি পায়, তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কাগজে-কলমেই থাকে। নারীর তো নিজের ঘরই এখনো ঠিক হয়নি। বাবার ঘর আর স্বামীর ঘর−এই দুইয়ের মধ্যে টানাপোড়েনেই অধিকাংশের জীবন কাটে। স্বামীর চাপ থাকে বাবার কাছ থেকে প্রাপ্য সম্পত্তি নিয়ে আসার, ভাইদের অনুনয় বা চাপ থাকে সে সম্পত্তি না নেওয়ার। নারীর জন্য, বাবার সম্পত্তি একেবারে নিয়ে এলে তার শেকড় উপড়ে যায়। ফিরে যাওয়ার, মাঝেমধ্যে বেড়াতে যাওয়ার, আদর-যত্ন বা গুরুত্ব পাওয়ার উপায়টুকুও আর অবশিষ্ট থাকে না।
স্বামীর সম্পত্তির ওপর স্ত্রীর অধিকার খুবই নগণ্য, কিন্তু ততটুকুও যতটা তত্ত্বগত, বাস্তব ততটা নয়। গ্রাম-শহর সব জায়গাতেই বাস্তব চিত্রে এ নিয়ে অনেক কষ্ট, কান্না, নির্মমতা আর বঞ্চনার কাহিনী আছে। গবেষণায় দেখা যায়, গ্রামের কৃষক-পরিবারের কৃষিসম্পত্তি-সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ, বীজ রক্ষা, শ্রম-ব্যবস্থাপনা, ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ, পশুপালন, হাঁস-মুরগি পালন, আর তার সঙ্গে আয়-উপার্জন ও ব্যয়সাশ্রয়ী কাজ এবং গার্হস্থ্য কাজ−সবকিছু মিলিয়ে নারীর শ্রমঘণ্টা পুরুষের চেয়ে বেশি। কিন্তু এই সম্পত্তির ওপর তার অধিকারের কোনো নিশ্চয়তা নেই। স্বামীর সংসার করা সম্ভব হলে মালিকানাস্বত্ব না হলেও ভোগদখলি থাকে, কিন্তু তা সম্ভব না হলে মুহুর্তে বীজতলা, গরু-হাঁস-মুরগি-গাছ-বাগান-ফসল, জমিজিরাত, ঘরবাড়ি সবই পর হয়ে যায়। আর যদি বাবার বাড়ি নিজের ছোট ভাগটুকু তখন আর না থাকে, সেই নারীর দাঁড়ানোর আর কোনো জায়গা থাকে না। সমাজ কেবল তখন মুখোমুখি থাকে তার ত্রুটি ধরতে, তার জীবন আরও অতিষ্ঠ করে তুলতে। আর সংসার যদি টেকেও, তার নামে স্বামী সম্পত্তি লিখে না দিলে স্বামীর অবর্তমানে তার ভাগ খুবই নগণ্য। তখন পুত্রের করুণার ওপর তাকে বেঁচে থাকতে হয়। আর পুত্র যদি প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে জগৎ শুন্য।
এ রকম কথা আমরা প্রায়ই শুনে থাকি, ছেলেসন্তানেরাই বয়সকালে বাবা-মায়ের দায়িত্ব নেয়, আর তাই সম্পত্তির ওপরও তার অধিকার বেশি। কিন্তু এই ছবি এখন অনেকের জন্যই কষ্টকল্পনা। গ্রামে-শহরে বৃদ্ধ বাবা-মাকে দেখার দায়িত্ব পুত্ররা নিচ্ছে না, এ রকম অনেক ঘটনাই আছে; আবার মেয়েরাই সেই দায়িত্ব নিচ্ছে, সে রকমও আরও বেশি বেশি দেখা যাচ্ছে। গ্রাম-শহরের, ধনী-গরিবের দুটো দৃষ্টান্ত দিই।
মেয়েটি বোবা। আমার নানার বাড়ির গ্রামে গেলে ওর সঙ্গে দেখা হয়। বোবার ভাষায় নিজের আনন্দ, দুঃখ-বেদনা বোঝাতে চেষ্টা করে। ওর ছোট একটি শোলা আর ছনের ঘর, অন্যের জমিতে। ওই ঘরে ও আর ওর মা থাকে। মা অসুস্থ। মাকে ও-ই দেখাশোনা করে। খাওয়া জোগাড়ের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে। বাবার সামান্য একটু জমি ছিল, একমাত্র ভাই তার প্রায় পুরোটাই পেয়েছে। ভাইয়ের বক্তব্য, বোনের অংশ তার বিয়েতে যৌতুক দেওয়ার কাজে লেগেছে। সেই বিয়ে টেকেনি। বোন ফেরত এসেছে, ভাই তাকে গ্রহণ করেনি। গ্রহণ করেনি মাকেও। তার যুক্তি, তার নিজের সংসারই সে চালাতে পারে না; মা-বোনকে সে কীভাবে খাওয়াবে!
অতএব কোনো দিকের সম্পত্তিই যারা পায়নি এবং যাদের আয়-উপার্জনের পথও খুব কম, সেই দুই প্রজন্েনর নারী এখন একটা কুঁড়েঘরে থাকে। বোবা মেয়ে এদিক-সেদিক কাজ করে মাকে কোনোভাবে বাঁচিয়ে রেখেছে। মায়ের ‘বাতাস লাগা’ অসুখের চিকিৎসার জন্য হুজুরকেও ধরে কখনো। মাঝেমধ্যে এই বোবা মেয়ে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। কথা নয়, অবোধ্য বীভৎস আওয়াজ্রবের হয় সদা হাসিখুশি মেয়ের মুখ থেকে। গ্রামের মানুষ বোঝে। তার সন্তানকে সে আনতে পারেনি। বাবার ঘর প্রচলিত আইন আর অনুশাসনের জোরে সন্তানকে রেখে দিয়েছে। এই শিশুসন্তানের কথা মনে হলেই হয়তো মেয়েটির অসম্ভব পরিশ্রমক্ষমতা, অভাব-কষ্টের মধ্যেও টিকে থাকা হাসিমুখ সব ভেঙে পড়ে।
ঢাকা শহরে আমাদের পাড়াতেই দালানকোঠার এক পরিবারে মাকে নিয়ে ভাইদের মধ্যে টানাটানির কথা শুনেছি বেশ কিছুদিন আগেই। ভাইদের কেউ মাকে রাখতে চায় না−রীতিমতো হিসাব-নিকাশ হয়, কে কত খরচ করেছে মার জন্য তা নিয়ে। তার থাকা-খাওয়া সবই ক্যালকুলেটরে হিসাবের বিষয়। হতভাগী এই মা আরও অনেক মায়ের মতোই এখনো বেঁচে আছেন। আরও হতভাগী এই কারণে যে, তাঁর কোনো কন্যাসন্তান নেই।
ঘরে যেমন, বাইরেও তেমন এক কঠিন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে জীবন পার হয়−বাংলাদেশে এমন মেয়ের সংখ্যাই অধিক। কিন্তু ‘পার হওয়ার’ মানে যে কী, সেটাও তো পরিষ্ককার নয়। সিমি, রিমি বা রাহের্লারহতো অবস্থা হতে পারে, এমন কিশোরী-তরুণীর সংখ্যা অগণিত। কিন্তু যারা তা অতিক্রম করে, তাদের জীবনেও প্রতিনিয়তই ঝুঁকি। রাস্তায় চলাফেরার সময় বখাটে বা মাস্তান ছেলেদের হয়রানি, নির্যাতন বা হামলার শিকার হয়নি, এমন মেয়ে খুঁজে পাওয়া কঠিন। ইদানীং আমার বর্তমান ও প্রাক্তন ছাত্রীদের মুখে নতুন আরেক উৎপাতের কথা প্রায়ই শুনি। রাস্তাঘাটে কিছু লোকজন তাদের সামনে এসে দাঁড়ায় এবং ভয় দেখায়, বোরকা না পরে ঘর থেকে বের হতে নিষেধ করে। অশ্লীল কথাও বলে। পথের এই দুই চেহারার পুরুষই নারীকে ঘরে ঠেলে দিতে উদ্যোগী। বোরকা পরেও যে খুব নিস্তার পাওয়া যায় তা নয়, আমার বোরকা-পরা ছাত্রীদের কাছ থেকেই তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানি।
নিপীড়ন আর বৈষম্যের এক জালের মধ্যে বাংলাদেশের মানুষ বাস করে। এ জাল অনেক কঠিন নারীর জন্য। সরকার যেভাবে খন্ডিত তথাকথিত নারী উন্নয়ন নীতি প্রণয়ন করেছে, ধর্মীয় নেতারা তার সংশোধনের যেসব প্রস্তাব দিয়েছেন, আর তার ওপর ভর করে সরকার যেভাবে অগ্রসর হচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে তারা যৌথভাবে বৈষম্য আর নিপীড়নের এই জাল শক্ত করার ভুমিকাই নিয়েছেন। সরকার গঠিত পুরুষদের কমিটি নারীর অবস্থান চিহ্নিত করেছে পুরুষের চেয়ে নিকৃষ্ট হিসেবে। যে নারীর শরীর থেকে এই পুরুষদের জন্ন, তাকে নিকৃষ্ট স্থানে স্থাপন করলে নিজেদের অবস্থান কী দাঁড়ায়? আর তাঁরা জোর দিয়ে বলেছেন নারীকে সমানাধিকার না দিয়ে ন্যায্য অধিকার দিতে। যদি ন্যায্য অধিকারই দিতে হয় তাহলে সব রকম বিশ্লেষণে, শ্রম, ভুমিকা আর অবদান বিবেচনায়, নারীর জন্য নিশ্চিত করতে হবে অধিকতর ভাগ। তাতে কি তাঁরা রাজি হবেন?
আনু মুহাম্মদ: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।