সুখহীন নিশিদিন - দ্বিজেন শর্মা

বরিশাল থেকে ঢাকা ফিরছি। আরিচার খেয়া পেরিয়ে বাসটি মহাসড়কে ওঠার মুখে পাশের মেয়েটির আচমকা চিৎকার শুনে সামনে তাকিয়ে আরেকটি বাসের মুখ দেখি, তারপর প্রচন্ড শব্দ ও ঝাঁকি। না, কেউ মারাত্মক আহত হয়নি, কাচের ভাঙা টুকরার আঘাত ও শক, চালক যথাসময়ে বাসটি থামিয়ে ফেলেছিল, কিন্তু তাকে আর দেখা গেল না।

দরজাটা আটকে গিয়েছিল, আশপাশের লোকজন হাতুড় পিটিয়ে সেটা ভেঙে আমাদের উদ্ধার করল। এক ভুঁইফোঁড় সাহায্যকারীর উদয় ঘটল, তিনি কোম্পানির কেউ নন জানান, তবে তকলিফ লাঘবের আশ্বাস দেন ও ছোটাছুটি শুরু করেন। আমি দাঁড়িয়ে অ্যাম্বুলেন্স ও রিলিফ-বাসের অপেক্ষা করি। কিন্তু কিছুই আসে না। অল্পক্ষণের মধ্যেই বোধোদয় ঘটে যে সবই আমার উৎকল্পনা ও দীর্ঘ বিদেশবাসের জের। ওই মুশকিল-আসান আমাদের কোম্পানির লাইনের বাসে ওঠাতে চান, তাতে বেজায় ভিড়, আমাদের একটু কষ্ট করতে সবিনয় অনুরোধ করেন। তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে একটি খালি লোকাল বাসে উঠি। আরেকটি দুর্ঘটনার কথা মনে পড়ে। সেটা পাকিস্তানের গোড়ার দিকের আমার বালককালের ঘটনা। সিলেটের জুড়ি রেলস্টেশন থেকে ফুলতলা চা বাগানে চলেছি মায়ের সঙ্গে এক লਆড়মার্কা বাসে। একটু ঝিমুনি এসেছিল, হঠাৎ একটি শব্দ, তারপর কিছু মনে নেই। জ্ঞান ফিরলে দেখি ধান ক্ষেতের কাদায় পড়ে আছি, পাশে মা বসা, কপালে কাটা দাগ ও রক্ত। সেখানেও একজন মুশকিল-আসান আসেন। তিনি আমাদের একটি ওষুধের দোকানে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন, বেশকিছু ট্যাবলেট ও মলমের সঙ্গে কয়েক প্যাকেট গ্লুকোজ কিনে দিয়েছিলেন এবং সেই সঙ্গে ট্রেনের প্রথম শ্রেণীর টিকিট। আর এখন, এই মুঠোফোনের যুগে? বড় অসময়ে হঠাৎ মনে পড়ে অন্নদাশংকরের ছড়া−‘তেলের শিশি ভাঙলো বলে খোকার ’পরে রাগ করো।’ বেচারা ড্রাইভার ও বাস কোম্পানির মুন্ডুপাত করছি, আর আমাদের বুড়ো-খোকারা যে দেশ নামের জনযানটি চালাতে গিয়ে কত দুর্ঘটনা ঘটালেন ত্রিশ বছর ধরে, তার বেলা?

দুই.
সিদ্ধেশ্বরী থেকে উত্তরা যাব। বাড়ির সামনের সড়কে নিদারুণ ভিড়। হেঁটে হেঁটে মৌচাক পৌঁছাই এবং একটি সিএনজি পাকড়াও করি। একটু এগোতেই সেটিও যানজটে আটকে যায়। কতক্ষণ, হতে পারে ২০ মিনিট বা আধঘণ্টা, সবই অনড়। হঠাৎ দুই দরজায় দুই যুবকের উদয় ঘটে। তারা ড্রাইভারকে হুমকি দেয়, আমার পকেট হাতড়ে মুঠোফোন খোঁজে এবং না পেয়ে হতাশ হয়। ‘আঙ্কেল, বুঝতেই তো পারছেন’ বলে একজন, ‘দিয়ে দেন, পকেটে পিস্তল আছে।’ এই আমার প্রথম ঘটনা, যদিও শুনেছি অনেক। ‘দিচ্ছি, কিন্তু ড্রাইভারকে ভাড়াটা দেবেন তো।’ আমি একটা বাতাবরণ খুঁজি। মনে পড়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের জনৈক অধ্যাপক কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে বেরিয়ে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়লে কীভাবে শিক্ষা ও নৈতিকতার দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে রেহাই পেয়ে যান। আমি এমন কিছু করতে ভরসা পাই না। ওরা আরও রেগে যেতে পারে। অগত্যা মানিব্যাগ খুলে সব টাকাই ওদের হাতে তুলে দিই। তারা ড্রাইভারের ফোকরে ১০০ টাকার একটা নোট চালান করে দিয়ে আমাকে বলে, ‘আঙ্কেল, কিছু মাইন্ড করলেন না তো?’ ‘আরে না না, মাইন্ড করিনি।’ ঝটিতি ওরা উধাও হয়। খুব কষ্ট পাই না, তবে পথচলায় একটা অযৌক্তিক ভয়, চলনাতঙ্ক আমার ওপর ভর করে। ভাবি, কী এমন দোষ করেছে ছেলেটা! সমাজের স্িথতিসাম্য দুর্বল হয়ে গেলে কেন্দ্রাতিগ বলের প্রকোপ বাড়ে, তাতে ওজনদাররাই টালমাটাল কাঁপে। আর এই হালকা ছেলেগুলো তো ছিটকে পড়বেই।

তিন.
চৈত্রের ভরদুপুরের দাবদাহে শাহবাগের সামনের চৌরাস্তা পাড়ি দিতে গিয়ে কেবলই নাজেহাল হই। তিন-তিনটি বাস ট্রাফিক লাইটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, কনডাক্টর লোক ডাকে, লোক ওঠায়, কথা শোনে না। লালবাতি সবুজ হয়, তারা নড়ে না কিংবা নড়লেও আরেকটি বাস এসে দাঁড়ায়। এই চলে অনেকক্ষণ। কোনো ট্রাফিক-পুলিশ নজরে পড়ে না। ভাবি, একটু গাছের ছায়া থাকলেও হতো, আর তখনই দেখি ডানপাশের আইল্যান্ডে একটি বাগানবিলাস, এক বছর আগের সৌন্দর্যায়নের তলানি। হ্যাঁ ঈশ্বর! বিলাস বটে। নিদেনপক্ষে সাদামাটা একটা বটগাছ হলেও বাঁচোয়া ছিল। আমাদের ফুটপাতে গাছের আকাল, আছে কিছু, মিড-আইল্যান্ড। মাজেজাটা কী−জিজ্ঞেস করেছিলাম এক রিকশাচালককে। সাফ জবাব−গাড়িগুলির গা জুড়াতে। হবে হয়তো। আধুনিক শহর নির্মাণ আমরা শিখেছি উন্নত পশ্চিম থেকে, শহরকে বাসযোগ্য করার বিদ্যাটি শিখিনি কেন? ওইসব দেশে গরমের দিনে লোকে রোদ পোহায়, তবু বৃক্ষ আছে ফুটপাতে, বেশিই আছে। শুধু ছায়া নয়, বৃক্ষ বায়ুশোধক, শব্দরোধক, নয়নশোভন, ক্লান্তিহর। কাছেই তো ছিল প্রাউডলকের রমনাগ্রিন, হেয়ার রোডের পাদাউকবীথি, মিন্টো রোডের পেল্টোফরাম-জারুল। এগুলো নজরে পড়ে না কেন? মেহগিনি আর সোনাঝুরিতে পার্কগুলো সয়লাব। একদিন শোনা গেল, সোনাঝুরি স্বাস্েথ্যর পক্ষে খারাপ, কাটা শুরু হয়ে গেল। একই বদনাম জুটল ইউক্যালিপ্টাসের কপালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক চত্বর, যেখানে বুদ্ধিজীবীদের বাস, সেখানেও বিনাবাক্যে ঘটল ইউক্যালিপ্টাস নিধন। অ্যালার্জি ও অধিক পানিশোষণের দোষ কি নেই অন্য কোনো গাছের? সপ্তপর্ণী পবিত্র ছাতিম কেন ডেভিলস ট্রি? শাসক সাহেবদের না-পছন্দ বলেই। তা সত্ত্বেও তারা ছাতিম নিধনে লেগে যাননি। সোনাঝুরি ও ইউক্যালিপ্টাসের ব্যাপক চাষ জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের পক্ষে ক্ষতিকর। তবু বৈচিত্র্যের জন্য, সৌন্দর্যের জন্য দু-চারটি লাগানো যায় বৈকি। এতে কোনো ক্ষতি নেই। ইউক্যালিপ্টাস তো ঔষধিবৃক্ষও। গত বছর কলকাতা গিয়ে দেখলাম, সেখানে ফুটপাত খুঁড়ে লাগানো হয়েছে গাছ, তাতে আছে অঢেল বট আর ছাতিম, ঘিঞ্জি শরহটিতে নামছে নিবিড় শ্যামলিমার স্বস্তি, সৌন্দর্যায়নের জন্য আমরা যে অর্থ ব্যয় বা অপব্যয় করেছি, তার অর্ধেক দিয়েই হয়তো ভরে দেওয়া যেত শহরের সব খালি ফুটপাত, তাতে বড় উপকার হতো আমাদের মতো পায়ে-হাঁটা মানুষের।

দ্বিজেন শর্মা: লেখক ও নিসর্গবিদ।