জাতির উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা গত সোমবার যে ভাষণটি দিলেন তাতে দেশের ৫০ ভাগ নাগরিক নারী জাতির প্রসঙ্গটি ছিল পুরোপুরি উপেক্ষিত। প্রধান উপদেষ্টা যেন ভাষণটি দিলেন পুরুষ আধিপত্যে ভারাক্রান্ত রাজনৈতিক দলগুলো এবং ধর্মের নামে নারীর মৌলিক অধিকার হরণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশে।
নারীর অধিকারকে এড়িয়ে, উপেক্ষা করে, উহ্য রেখে বা জোড়াতালি দিয়ে সমঝোতার মোড়কে ‘অবরুদ্ধ’ রেখে প্রধান উপদেষ্টা মূলত নারীর ইস্যুকে ‘রাজনীতিকরণ’ করলেন। ‘নারী উন্নয়ন নীতি’ নিয়ে রাষ্ট্রের মূলনীতি ‘নারীর সমঅধিকার’ বিষয়টি যাঁরা চ্যালেঞ্জ করার ধৃষ্টতা দেখালেন, তাঁদের এড়িয়ে গিয়ে তথাকথিত ‘নিশ্চুপ নীতি’ গ্রহণ রাষ্ট্রীয় উচ্চপর্যায়ের একটি ‘রাজনীতির খেলা’ বললে অত্যুক্তি হবে না।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়মতো পদক্ষেপে ক্ষমতায় থেকে দুর্নীতি করার অনেক অপরাধ চিহ্নিত হয়েছে। রাজনৈতিক বিভিন্ন দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন ও বিচার চলছে। নারী সমাজের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় নীতির বরখেলাপ করাও বড় দুর্নীতি এবং অপরাধ। সংবিধানের মূলনীতি ‘তছরুপ’ করে এরশাদ সরকার ‘রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম’ ‘স্থাপিত’ করেছিলেন। এই অপরাধের বিরুদ্ধে বিএনপি, আওয়ামী লীগ, অন্যান্য রাজনৈতিক দল গণতান্ত্রিক নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ও ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বরং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনা নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে তথাকথিত ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। ‘৫০ ভাগ’ নারী উন্নয়নের নাগরিক এবং তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত ‘৫০ ভাগ পুরুষ’ নাগরিকের উন্নয়ন ব্যাহত করার দুর্নীতি ঘটেছে নারীর প্রতি সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিবাচক ‘মূল্যবোধ’ নষ্ট করার রাজনৈতিক স্বার্থে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নারী উন্নয়ন তথা সমাজ উন্নয়নের এত বড় ক্ষতি ও দুর্নীতি বুঝেও নিশ্চুপ থাকছে এবং মৌলবাদী রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে সমঝোতা করে চলেছে। সরকার কেন এ ধরনের দুমুখো নীতি ও পদক্ষেপ নিচ্ছে ?
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ‘নারী উন্নয়ন নীতি ইস্যুতে রাজনৈতিক দুর্নীতি ও ধর্মের নামে রাজনীতি বন্ধ করতে হবে’−এমন একটি শর্ত প্রধান উপদেষ্টা দেবেন সেই আশা ছিল নারী সমাজের। দেখা গেল ‘রাজনীতিকরণ’ নিয়ে বহু সমালোচনা করলেও প্রধান উপদেষ্টা নারীর প্রগতি নিয়ে গৃহীত সকল রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ নিয়ে রাজনীতিকরণের বিরুদ্ধে কোনো বক্তব্য দেননি।
সমস্যা এখানেই। কারণ, প্রধান উপদেষ্টার যেসব পরামর্শদাতা রয়েছেন তাঁদের অধিকাংশই চিন্তাভাবনায় পুরুষতান্ত্রিক, গৎবাঁধা, রক্ষণশীল এবং শতকরা ৯৯ ভাগই পুরুষ। নির্বাচন এবং রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ বিষয়টি যে জাতির ৫০ শতাংশ নারীর উন্নয়ন, প্রগতি শুধু নয়, মৌলিক সমঅধিকার, মানবাধিকারের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত, সেটা কি প্রধান উপদেষ্টা ভুলে গেলেন, নাকি এড়িয়ে গেলেন? ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি’ ঘোষণা দিয়ে (০৮.০৩.০৮) মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অভিনন্দন পেয়েছিলেন। তাঁর ঘোষণার বিরুদ্ধে দেশের রক্ষণশীল ধর্মান্ধ গোষ্ঠী ও ধর্মান্ধ রাজনৈতিক দলগুলো সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালাল ‘জরুরি আইন’ ভঙ্গ করে। নারী সমাজ এবং প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ব্যক্তিবর্গ প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণার সমর্থনে এবং বিরুদ্ধবাদীদের সন্ত্রাসী ও রক্ষণশীল মূল্যবোধের বিরুদ্ধে অবরুদ্ধ ঘরোয়া সভা করেছেন, বক্তব্য দিয়েছেন, প্রবন্ধ লিখেছেন।
অথচ প্রধান উপদেষ্টা এবং তাঁর উপদেষ্টামন্ডলী এ বিষয়ে বিরুদ্ধবাদীদের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে তাদের তুষ্ট করার নীতি নিয়েছেন। সমাজের বিবেকবান নাগরিক হিসেবে আমরা সরকারের এই নেতিবাচক ও রক্ষণশীল নীতি ও অবস্থানের বিরোধিতা করে প্রতিবাদ জানিয়েছি।
প্রধান উপদেষ্টার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণের পর আমি সমগ্র বিবেকবান প্রগতিশীল জনগণের পক্ষে দুটি প্রস্তাব রাখছি:
১. সকল রাজনৈতিক দলকে শর্ত দিতে হবে রাষ্ট্রের ঘোষিত নারী অধিকার সম্পর্কিত আইনসমূহ বাস্তবায়নে তারা ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবে।
২. নারী সমাজের উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা একটি বিশেষ ভাষণ দিয়ে জাতীয় ও নারী সমাজের প্রগতির বিষয়ে স্িথতিশীল রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সহায়তা করবেন।
[ড. মালেকা বেগম: নারী নেত্রী, গবেষক]
