মুক্তিযোদ্ধাদের আমরা কতভাবে অপমান করেছি ॥ সৈয়দ বদরুল আহ্সান

আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা বারবার আমাদের হাতে আমাদের সংকীর্ণতার কারণে অপমানিত হয়েছেন। হয়তো আমরা বছরের বিশেষ বিশেষ দিনে সেই পুরোনো কথাটাই বলে থাকি−মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তান। অবশ্যই তাঁরা আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাঁদের ত্যাগের বিনিময়ে আজ আমরা স্বাধীন বাংলাদেশে বাস করছি। আজ যে দেশে-বিদেশে মাথা উঁচু করে নিজেকে বাঙালি বলে পরিচয় দিয়ে থাকি, তা কেবল বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকার এবং আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের কারণেই। এর সঙ্গে রয়েছে ৩০ লাখ মানুষের আত্মাহুতি এবং দুই লাখ নির্যাতিত মা-বোনের আত্মত্যাগ! যখন বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান ও বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের দেহাবশেষ স্বাধীনতা অর্জনের এতগুলো বছর পর আমরা দেশের মাটিতে ফিরিয়ে নিয়ে আসি এবং দেশেই আবার সমাহিত করি, তখন আবারও প্রমাণ করি, এই মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের কত প্রিয়।

অথচ একবার ভেবে দেখুন, এই স্বাধীন বাংলাদেশেই মুক্তিযোদ্ধারা কী একটা কঠিন অবস্থায় সব সময় বাস করছেন! ১৯৭২ সালে যেসব মুক্তিযোদ্ধা সরকারের কাছ থেকে একটি থাকার ঘর পেয়েছিলেন, তাঁদের কাছ থেকে আজ ওই ঘরগুলোও চলে যাচ্ছে। এমনও জায়গা আছে বাংলাদেশে, যেখানে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা তাঁর পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ভিক্ষা করে বেড়ান, যেহেতু কোনো দিন কোনো সরকার তাঁর কল্যাণের কথা ভাবেনি। একবার এও পত্রিকায় পড়েছিলাম যে একজন মুক্তিযোদ্ধা কুকুরচালিত ভ্যানগাড়িতে করে মানুষ আনা-নেওয়া করেন এবং এই করে জীবিকা উপার্জন করেন। এমন অনেক গল্প আপনি শুনতে পাবেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা দেশকে শত্রুমুক্ত করার পর একটি ছোট্ট হোটেলে ছোট্ট চাকরি করেন। অনেক মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন, যাঁরা কিছুই করেন না, যেহেতু তাঁদের কিছু করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। এ তো গেল একটি চিত্র। একটু অতীতের দিকে তাকালেই স্নরণ করতে পারবেন যে ১৯৭২ সালের গোড়ার দিকে কত ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারও উদ্ভব হয়েছিল। যাঁরা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এ দেশে এবং এই ঢাকা শহরে ছিলেন, তাঁরা ষোলই ডিসেম্বরের পরই মুক্তিযোদ্ধা সেজে গেলেন। তাঁদের হাতে নকল মুক্তিযোদ্ধা সনদপত্র এসে গেল এবং সেটা সম্বল করে তাঁরা বেশ কিছুসংখ্যক বাড়িঘর দখল করেন এবং বাড়ির প্রকৃত মালিকদের বিতাড়িত করেন। আজ এসব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার বেশির ভাগই সমাজে ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং যাঁরা সত্যিকার অর্থে গ্রামে-গঞ্জে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছেন, তাঁরাই জীবন-সংগ্রামে ব্যস্ত রয়েছেন। তাঁদের দেশ কী দিয়েছে? কেন দেয়নি?

এসব প্রশ্ন আজ আমাদের আবার এ কারণে করতে হচ্ছে, যেহেতু অতি সম্প্রতি একজন মুক্তিযোদ্ধাকে একটি বাংলাদেশবিরোধী চক্র অপমান করেছে। ১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল, তখন তো আমরা বিন্দুমাত্র কল্পনা করিনি যে একদিন তাঁদেরই অর্জন করা দেশে তাঁরা লাঞ্ছিত হবেন। আজ নাকি জামায়াতের লোকজনও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজেদের আত্মপ্রকাশ করার খায়েশ পোষণ করে। একটু ভেবে দেখুন, কী একটা অদ্ভুত পরিস্িথতি! যে দল এতগুলো বাঙালি নিধনে পাকিস্তানকে মুক্তিযুদ্ধের সময় সহায়তা করল, সেই দলের ভেতরে নাকি আজকাল মুক্তিযোদ্ধা খুঁজে পাওয়া যায়। অবাক ব্যাপার নয় কি? এখন আমাদের অবস্থা এমন, যেন মনে হয়, কোনো দিন আমরা এও শুনতে পাব যে খোদ পাকিস্তান রাষ্ট্র আসলে ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা লাভের পক্ষে ছিল। যে দেশদ্রোহীরা দেশের সার্বভৌমত্বও রক্ষা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন এবং উপরাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রীও বনে যান, সেই দেশেই নতুন কিছু হওয়ার বাকি রইল কী? লক্ষ করুন যে ওই তথাকথিত জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা পরিষদের সভায় যেখানে একজন মুক্তিযোদ্ধার গায়ে হাত তোলা হয়, সে সভায় উপস্িথত ছিলেন আমাদেরই অতি পরিচিত একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি। তিনি সেখানে কেন গেলেন এবং পুরো অনুষ্ঠানে কেন উপস্িথত থাকলেন, সেটা একটা মুখ্য প্রশ্ন। আবার এই সাবেক প্রধান বিচারপতির মতো কয়েকজন পরিচিত সাংবাদিকও ওই একই রকম কাজ করে বসলেন। যখন অনুষ্ঠান আয়োজকেরা একজন একজন করে সেক্টর কমান্ডারস ফোরামকে গালাগাল করতে শুরু করলেন, তখন তো ওই সব গণ্যমান্য ব্যক্তির অনুষ্ঠান থেকে প্রতিবাদ করে বেরিয়ে আসা দরকার ছিল। সেটা অবশ্য তাঁরা করেননি। এতেই আবার প্রমাণিত হয়, বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধারা কতভাবে কত কঠিন অবস্থা অতিবাহিত করছেন। যে রাজাকার ষোলই ডিসেম্বরে প্রাণরক্ষার জন্য তাঁর আত্মীয়দের বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়িয়েছেন, সেই রাজাকারকে আজ দেখবেন সরকারি কর্মকর্তা সেজে উচ্চ আসনে বসে রয়েছেন। কুখ্যাত রাজাকাররা জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে মন্ত্রী হয়েছেন এবং আমাদের সবাইকে জ্ঞানদান করার চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছেন।

আর মুক্তিযোদ্ধারা? তাঁরা একের পর এক প্রাণ দিয়েছেন তাঁদেরই মুক্ত মাতৃভুমিতে। আমাদের সবারই মনে আছে, ১৯৭৫ সালের নভেম্বর-পরবর্তী সময়ে কী নিদারুণ পরিবেশে মুক্তিযোদ্ধারা জীবন হারিয়েছেন। খালেদ মোশাররফের মতো বীর বাঙালিকে প্রাণ হারাতে হয় তথাকথিত সিপাহি-জনতা বিপ্লবের প্রথম প্রহরে। তাঁর সঙ্গে শহীদ হন কর্নেল হুদা ও মেজর হায়দার। যে জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চে জাতিকে প্রেরণা জুগিয়েছিলেন, সেই জিয়াই তাঁর ক্ষমতা পাওয়ার ও রক্ষা করার উদ্দেশ্যে অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছেন। পরবর্তীকালে কর্নেল তাহের ফাঁসির মধ্য দিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। জেনারেল মঞ্জুরকে হত্যা করে তাঁর লাশ পথের পাশে ফেলে রাখা হয়। কর্নেল শাফায়াত জামিলকে বঙ্গভবনের দেয়াল টপকে এসে নিজেকে রক্ষা করতে হয়। মোট কথা, এই স্বাধীন দেশে যাঁরা স্বাধীনতাযুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শন করেছিলেন, তাঁরাই করুণ অবস্থায় জীবনদান করে গেলেন। এর চেয়ে বড় লজ্জা কী হতে পারে? বোধ করি আমরাই পৃথিবীতে ওই বিরল জাতি, যে স্বাধীনতা লাভের কয়েক বছরের মাথায় তার মুক্তিসংগ্রামের নেতৃত্ব এবং তার সাহসী মুক্তিযোদ্ধাদের হারিয়ে সমগ্র দেশটাকে ওই পাকিস্তানের দোসর এবং পাকিস্তান মনোভাবাপন্ন কুচক্রী মহলের হাতে তুলে দেয়। টিਆা খানের শান্তি কমিটির সদস্য বাংলাদেশের মন্ত্রী হয়েছেন। পূর্ব পাকিস্তান রেডক্রসের প্রধান বাংলাদেশের উপরাষ্ট্রপতি হয়েছেন। যে বাঙালিরা ১৯৭১ সালের পরও পাকিস্তানের কুটনীতিক হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করেছেন, তাঁরাই আবার বাংলাদেশে উচ্চস্থান দখল করে নিয়েছেন।

অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধারা দ্বিধাদ্বন্দ্বে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। সরকারের পর সরকার জাতিকে বারবার জানিয়ে দিল যে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত ফিরিস্তি তৈরি করা হবে। এ কথাটাই তো আমাদের ইতিহাসকে অপমানিত করে। মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা হবে কেন? ১৯৭১ সালে তো সমগ্র বাঙালিই মুক্তিযোদ্ধা ছিল। সাড়ে সাত কোটি মানুষ যুদ্ধ করেছে−কেউ রণাঙ্গনে, কেউ উৎসাহ আর প্রেরণা জুগিয়ে। তার পরও কি ফিরিস্তির কথা বলব? হ্যাঁ, ফিরিস্তি অবশ্যই তৈরি করতে হবে এবং সেই ফিরিস্তিতে ওই সব ব্যক্তির নাম থাকবে, যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর হয়ে বাঙালি হত্যা করেছে এবং হত্যা করতে সাহায্য করেছে। সারা বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু ও বিস্তারিত জরিপ চালালেই সব রাজাকারের নাম পাওয়া যাবে এবং জাতিকে তখন জানানো যাবে ওই সব দালাল কী অপরাধ ১৯৭১ সালে করেছিল এবং বর্তমানে তারা কোথায় অবস্থান করছে।

মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন ও অবদানকে কেন্দ্র করে অনেক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। কখনো কখনো আবার হাস্যকর ঘটনাও লক্ষ করা গেছে। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে বিএনপি সরকারের একজন মন্ত্রী একবার আওয়ামী লীগকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে বসলেন। তিনি আওয়ামী লীগকে উচ্চকন্ঠে বললেন, ‘হিসাব করে দেখুন, আপনাদের দলে কজন মুক্তিযোদ্ধা আছেন এবং আমাদের দলে কজন মুক্তিযোদ্ধা আছেন।’ ভাবখানা এমন যেন মুক্তিযোদ্ধারা হচ্ছেন একধরনের পণ্য, যা আবার ভাগাভাগি করা যায়। আজকাল প্রায়ই লক্ষ করে থাকবেন, অনেক বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা সেই মহান যুদ্ধের ভেতর দিয়ে যে মূল্যবোধ গড়ে উঠেছিল, সেই মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার কাজে লেগে পড়েছেন। সেটা অত্যন্ত ভালো কথা। কিন্তু এসব ব্যক্তির মধ্যে যখন কেউ জেনারেল জিয়া, আবার কেউ জেনারেল এরশাদের সরকারে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন, তখন কেন এ কথাগুলো বলেননি? মন্ত্রিসভায় রাজাকারের পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাও কাজ করেছেন। তখন এসব মুক্তিযোদ্ধা কেন সরকারপ্রধানকে জানিয়ে দেননি যে তাঁরা দেশের সেই পুরোনো শত্রুদের সঙ্গে এক সরকারে এবং এক টেবিলে বসতে রাজি নন? একজন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধার কেন এক রাজাকার মন্ত্রীর অধীনে চাকরি করতে নৈতিকভাবে কোনো সমস্যা হয় না? কেন এ দেশে একটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করে মুক্তিযোদ্ধাদের আবার অপমান করা হয়? দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধি রক্ষণাবেক্ষণের কোনো প্রয়াস নেই। মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবার, তাঁদের সন্তানেরা কী অবস্থায় আছে, তারা আদৌ তাদের ভবিষ্যতের ওপর আস্থা রাখতে পারছে কি না−এ জাতীয় বিষয়গুলো কে দেখবে? বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারও তো মুক্তিযুদ্ধের কথা বহুবার বলেছে এবং বলে থাকে। কই, তার কোনো সদস্য তো আজ পর্যন্ত তথাকথিত জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা পরিষদের সমালোচনা করেনি?

গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার জন্য আমরা সবাই আজ সংগ্রাম করে চলেছি। কিন্তু যদি সে গণতন্ত্রে জামায়াতের অংশগ্রহণের বিষয়টি থাকে, তাহলে তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুনরুদ্ধার করা হলো না। যদি বিদেশিরা আমাদের এই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকে মডারেট মুসলিম রাষ্ট্র আখ্যা দেয় এবং তাতেই আমরা পুলকিত হয়ে যাই, তখনই আমাদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ পুনরায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়। সেই বিদেশিদের আমরা ওই সব চাতুর্যে লিপ্ত হওয়ার সুযোগ করে দেব কেন? আজ এই পর্যন্ত। আরও কথা, আরও ব্যথা আছে। সেগুলো নিয়ে না হয় আরেক দিন কথা হবে।

সৈয়দ বদরুল আহ্সান: সাংবাদিক।

Comments

koko's picture

Ami apnar shathe ek mot kintu

চারদলীয় জোটের নেতা-কর্মীরা মনে করছেন,সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক দুনর্ীতির মামলায় কারানস্নরীণ ,রাজনীতির দৃশ্যপট থেকে বিদায়,
ওদিকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নির্বাচিত করে "ওরা বলেছে এবং দোহাই দিয়েছেন সরকার গঠনের পর আমি প্রধানমন্ত্রী হব।
প্রিয় দেশের মানুষ আমি আপনাদের দোয়া চাই"।................................ চারদলীয় ঐক্যজোটের ভারপ্রাপ্ত শীর্ষ নেতা ,,,,,,,,মুজাহিদ...