শব্দের কোলাহলে ডুবে যাচ্ছে ঢাকা

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। আমি আর সাংবাদিক আবুল মোমেন গেছি জেনেভায়। সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাসে ছিলেন আবদুল মান্নান। পরবর্তীকালে নির্বাচন কমিশনে অতিরিক্ত সচিবও হয়েছিলেন। জোট ক্ষমতায় আসার পর বোধহয় চাকরিচ্যুত হন। খুবই মাইডিয়ার ভদ্রলোক।

গাড়িতে করে আমাদের জেনেভার বাইরে ঘুরিয়ে-টুরিয়ে রাতে নিয়ে চললেন তার বাসায়। খাওয়াবেন। প্রবাসে প্রায় প্রতি বাঙালি এই নিয়মটি পালনে কসুর করেন না। তার এলাকায় আসার পর তিনি যথেষ্ট সতর্ক হয়ে উঠলেন। আমাদেরও জানালেন যেন শব্দ খানিকটা কম হয়।

এখানকার পৌরসভা নিয়ম করে দিয়েছে রাতে ওয়াশিং মেশিন চালানো যাবে না, জোরে টিভি চালানো যাবে না। অর্থাৎ এমন কিছু করা যাবে না যাতে কারও নিদ্রা বা বিশ্রামের ব্যাঘাত হয়। আরেকবার সুইডেনের অনুজপ্রতিম বন্ধু দেলোয়ার নিয়ে গেছেন অসলো। শনিবার অসলোর প্রাণকেন্দ্রে, শপিং সেন্টারে গেছি।

লোকজনের ভিড় যথেষ্ট। ম্যাকডোনাল্ডসে বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছি। হঠাৎ মনে হল, কোন শব্দ নেই। ঢাকায় এটি অসম্ভব। মনে মনে বিস্মিত হয়েছিলাম। বিদেশে তো বটেই, আশপাশের অনেক দেশই এখন নৈঃশব্দের প্রতি গুরুত্ব দেয়। কারণ কোলাহলের বিপরীতে নৈঃশব্দই সভ্যতার মাপকাঠি।

হ্যাঁ, মেট্রোপলিটনে দিনে ভিড় থাকে, কোলাহলও থাকে কিন্তু তা সহনীয় মাত্রায়। আমাদের এখানেই শুধু সহনীয়-অসহনীয়ের মধ্যে তফাৎ হ্রাস পেয়েছে। গত একমাস ধরে এক সমস্যায় ভুগছি। টেলিফোনে কথা শুনি না, শুনলেও একেক শব্দ একেক রকম শোনা যায়। যেমন টেলিফোনে কেউ নাম বলছে মিজান, আমি শুনছি নিজাম। অনেক সময় মনে হয়, যার সঙ্গে কথা বলছি তিনি আস্তে কথা বলছেন (অবশ্য সেটিই ভদ্রতা)।

টেলিভিশন সেটের সামনে বসলেও ভলিউম বাড়াতে হয়। একদিন খোলা রাস্তায় মুঠোফোন কানে নিয়ে কিছুই শুনতে পেলাম না। গাড়ির কাচ বন্ধ করে একদিন এফএম রেডিও চালিয়ে, টেলিফোনে কথা বলে দেখলাম, না, মোটামুটি ঠিকই শুনছি। এ থেকে দুটি উপসংহারে পৌঁছেছি।

ঢাকা শহরের প্রচণ্ড কোলাহল/শব্দ কানের ওপর অভিঘাত হানছে, শ্রবণ শক্তি কমে যাচ্ছে এবং অনেকের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি। তাদের অনুযোগও আমার মতো। আসলে ঢাকা শহর প্রতিদিনই শব্দের কোলাহলে ডুবে যাচ্ছে।

এই শব্দের কোলাহলে দিন-রাতের কোন ফারাক নেই। যেটি অন্য দেশের মানুষ ভাবতেও পারবে না। দু-একটি ব্যক্তিগত উদাহরণ দেই। আমি থাকতাম তখন মগবাজারে, ইস্পাহানী কলোনিতে। সীমানা দেয়ালের ওপাশে আদ-দ্বীন নামে একটি হাসপাতালের নির্মাণ কাজ চলছিল।

২৪ ঘণ্টা তারা কাজ করেছে। দু’বছর আমরা অনেকে রাত জেগে কাটিয়েছি। অভিযোগ করে কোন ফল হয়নি। এরপর এসেছি ধানমণ্ডি। দেখি, বাসার উল্টোদিকে ডেভেলপার ফ্ল্যাট নির্মাণ করছে এবং রাতেও কাজ চলছে। অর্থাৎ এখনও প্রায় জেগে কাটাচ্ছি।

সকাল থেকে বিকাল ঢাকা শহরের রাস্তায় চলাফেরার অভিজ্ঞতা সবার আছে। এখন আবার নতুন উপদ্রব। তারস্বরে সাইরেন-হর্ন বাজিয়ে প্রায় প্রত্যেক রাস্তায় অ্যাম্বুলেন্স চলছে। অন্যান্য হর্নের কথা বাদই দিলাম। এরপর আছে মাইকের আওয়াজ। আজান দেয়া থেকে শুরু করে যত্রতত্র মাইকের ব্যবহার। শ্রবণ শুধু নয়, মস্তিষ্কই বিকল হয়ে যাওয়ার জোগাড়।

আমরা অনেকেই জানি না ২০০৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর শব্দ দূষণ রোধে সরকার শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা জারি করেছে। এই বিধিতে শব্দের সর্বোচ্চ মান মাত্রা নির্দিষ্ট করা আছে। শুধু তাই নয়, ‘নীরব এলাকায় চলাচলকালে যানবাহনে কোন প্রকার হর্ন বাজানো যাইবে না।’

১১নং বিধিতে আছে- ‘আবাসিক এলাকার শেষ সীমানা হইতে ৫০০ মিটারের মধ্যে উক্ত এলাকায় নির্মাণ কাজের ক্ষেত্র ইট বা পাথর ভাঙার মেশিন ব্যবহার করা যাইবে না এবং সন্ধ্যা ৭টা হইতে সকাল ৭টা পর্যন্ত মিকচার মেশিনসহ নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত অন্যান্য যন্ত্র বা যন্ত্রপাতি চালানো যাইবে না।’

বিধি অনুযায়ী নীরব এলাকায় দিনে শব্দের মান মাত্রা ৫০ ডেসিবেল এবং রাতে ৪০ ডেসিবেলের বেশি হবে না। আবাসিক এলাকায় ৫৫ ও ৪৫ ডেসিবেলের বেশি হবে না। মিশ্র এলাকায় এই মান মাত্রা ৬০ ও ৫০। বাণিজ্যিক এলাকায় ৭০ ও ৬০ ডেসিবেল। আপনাদের কি মনে হয় ঢাকা শহরে কেউ তা মানছে?

এসব বিধি ভাঙলে ১ থেকে ৬ মাস কারাদণ্ড ও ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ঢাকা শহর এখন শুধু শব্দ নয় বর্জ্য দূষণেও আক্রান্ত। আগে প্রকাশিত কয়েকটি লেখায় তা উলেখ করেছি। এখানে তার পুনরুক্তি করলাম না। বিপ্রদাশ বড়ুয়া তার এক কলামে আরেক ধরনের দূষণের কথা লিখেছেন, সেটি হচ্ছে ‘দৃষ্টি দূষণ’।

প্রতিটি শহরে বৃক্ষের সবুজ শহরের সৌন্দর্য বাড়ায়। জিয়াউর রহমান ঢাকা শহরে যে গাছ কাটা অভিযান শুরু করেছিলেন তা এখনও মহাযোগে চলছে। পত্রিকায় দেখলাম গত সপ্তাহে গুলশানে ৫০টির বেশি বৃক্ষ নিধন করার হুকুম হয়েছে। এই গাছগুলোর বয়স প্রায় দু’দশক।

বিপ্রদাশ লিখেছেন- ‘একটি ৫০ বছরের গাছ যে অক্সিজেন তৈরি করে তার পরিমাণ ৭.৫০ লাখ টাকা, জীবজন্তুর জন্য আমিষ সরবরাহ করে ৬০ হাজার টাকার, মাটির ক্ষয়রোধ ও উর্বরতা বৃদ্ধির ত্যাগের মূল্য ৭.৫০ লাখ টাকা, জলের আবর্তনচক্রের আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের মূল্য ৯ লাখ টাকা, আবহাওয়া দূষণের নিয়ন্ত্রণের মূল্য ১৫ লাখ টাকা, পাখি ও পোকামাকড় ইত্যাদির আশ্রয় হিসাবের মূল্য ৭.৫০ লাখ টাকা।

মোট ৪৭ লাখ ১০ হাজার টাকা।’ তাহলে হিসাব করে দেখুন গুলশানে ৫০টি বৃক্ষ নিধন বাবদ কত টাকা ক্ষতি হচ্ছে। বৃক্ষ নিধনের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে জল নিঃসারণ ব্যবস্থার উন্নয়ন। প্রশ্ন হচ্ছে, জল কোন দিক দিয়ে নিঃসরণ হবে তার কোন পরিকল্পনা কি ওয়াসার নেই? থাকলে ওই জায়গায় বৃক্ষ রোপণে বাধা দেয়া হয়নি কেন?

একই প্রশ্ন করতে পারি শব্দ দূষণের ব্যাপারে। আইন আছে, সব আছে, প্রয়োগ করলেই শব্দ দূষণ কমানো যেতে পারে। কিন্তু সরকার আইন প্রয়োগে কোন ইচ্ছাই দেখায়নি। যাক, দৃষ্টি দূষণের কথা বলছিলাম। যে ক’টি সবুজ বৃক্ষ আছে তাদের ঢেকে সিটি কর্পোরেশন ঢাউস ঢাউস বিজ্ঞাপন লাগাচ্ছে যেন তা বৃক্ষ থেকে দৃষ্টিনন্দন। এটি হচ্ছে দৃষ্টি দূষণ।

এই বর্জ্য দূষণ, শব্দ দূষণ, দৃষ্টি দূষণ, বায়ু দূষণ রোধে কোন ব্যবস্থাই নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। অথচ এতে আমাদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে, আয়ু হ্রাস পাচ্ছে। আর আমরাও এর কোন প্রতিকার দাবি করছি না। আসলে নাগরিকরা কত অসহায়, এটি বাংলাদেশে বসবাস না করলে বোঝার উপায় নেই।

কয়েক মাস আগে বিশ্বের ২১৫টি শহরের ওপর জরিপ চালানো হয়। উদ্দেশ্য, পৃথিবীর নোংরা শহরগুলোর অবস্থান নির্ণয় করা। মাপকাঠি ছিল বায়ু দূষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পয়ঃনিষ্কাশন, শব্দ দূষণ প্রভৃতি। বাংলাদেশ এতে প্রথম স্থান অধিকার করতে না পারলেও দ্বিতীয় স্থানে আছে।

পৃথিবীর নোংরাতম শহর নির্বাচিত হয়েছে আজারবাইজানের বাকু। দ্বিতীয় আমাদের এই ঢাকা। আমাদের দেশটি দেখা যাচ্ছে দুর্নীতিতে হয় প্রথম আর দূষণে দ্বিতীয়। এর সঙ্গেও কিন্তু একটা সম্পর্ক আছে। যেসব কারণে ঢাকা দূষণে আক্রান্ত তার অন্যতম কারণ সরকারি প্রশ্রয়।

আইন থাকলেও তা প্রয়োগ না করা। এটিও এক ধরনের দুর্নীতি। আর যেদেশে প্রেসিডেন্টের স্ত্রী খালের অংশ ইজারা পান সেদেশে দুর্নীতির আর কি সংজ্ঞা প্রয়োজন? আইন অনুযায়ী খাল, বিল, জলাধার ভরাট করা যাবে না।

অনেক প্রতিষ্ঠান রাজধানী ঢাকা শহরের ৪০০ বছরপূর্তি নিয়ে মেতে উঠেছে। ঢাকা শহর সম্পর্কিত কিছু সেমিনার প্রদর্শনী করে কী লাভ যদি ঢাকা আর বাসযোগ্য না থাকে। ৪০০ বছর পালনের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কীভাবে ঢাকাকে বাসযোগ্য করে তোলা যায় তার উপাদানগুলো উদ্ভাবন করা।

ব্যাপক জনমত গড়ে তোলা, যাতে আমরা কর্তৃপক্ষকে বলতে পারি, এটি আমাদের শহর, এটি বাসযোগ্য করার দায়িত্ব সরকারের এবং এ জন্য আমরা কর দিচ্ছি। এটি অধিকার। ঢাকাবাসীই যদি নিজেদের অধিকার পূরণ করতে না চায় তাহলে কেউ এসে তাদের অধিকার বলবৎ করবে সে আশা বৃথা।

মুনতাসীর মামুন

0
Your rating: None

Comments

bdidol's picture

all about yellow

all about yellow journalism..

from where it copy n paste?

JackobRaihan's picture

To LION

Thanks for louding-up the truth!!

--Jackob Raihan

Neramatha's picture

political polution

Sorry zia never cut the tree it is your wrong idea.His motto was forestation for green revulation and it was followed by Khaleda zia.Please dont lie.I think you are fundamentalist leager. Remember who try to destroyd tree of OSMANI uddyan it was ediot lady Sk.Hasina.from Italy