বাংলাদেশ ডুববে না, ডোবাবেও না - আনিসুল হক

বেশ একটা ধাক্কা খেলাম আমরা। ওই রাতে কী কারণে জেগে থেকে খাটে বসে টেলিভিশন দেখছিলাম। হঠাৎ খাটটা নড়ে উঠল। ব্যাপার কী? ভুমিকম্প নাকি! একটু পরে আরেকবার নড়ল। খাটের নিচে চোর বসে আছে ভেবে ভয়ে ভয়ে অনুসন্ধান চালালাম। না, চোর নেই। কোথাও পানি নড়ছে কি না দেখতে গেলাম। তেমন কোনো প্রমাণ পেলাম না। চ্যানেল আইয়ের পর্দার নিচে লেখা উঠল: ঢাকায় ভুমিকম্প। একটু পরে: ঢাকাসহ সারা দেশে ভুমিকম্প।

ছোটবেলায়, সত্তরের দশকের শুরুতে, রংপুরে বড়সড় ভুমিকম্প হয়েছিল। দোতলা যে সরকারি কোয়ার্টারে থাকতাম, সেখান থেকে দৌড়ে নামতে হতো। আরও আরও মানুষের পায়ের আওয়াজে, নাকি ভুমিকম্পের কাঁপুনিতে, বেশ একটা গুরুগুরু আওয়াজ হতো। খুব ভয় লাগত। এবার যে ভয় পাইনি, সে জন্যে মনে মনে নিজেকেই ধন্যবাদ দিলাম। পরের দিন অনেকের কাছে শুনলাম, তাঁরা ঘরবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছিলেন, সাধারণত নাকি একটা কম্পনের পর আরেকটা কাঁপুনি আসে।

বাংলাদেশে বড় একটা ভুমিকম্প হতে পারে−এই পূর্বাভাস বিদেশি বিশেষজ্ঞরা আগেই দিয়েছেন। মনে করা হয়, বাংলাদেশের তিন বড় নদী−পদ্মা, মেঘনা, যমুনা যে সোজা দক্ষিণে না গিয়ে দেশের মধ্যভাগে এক জায়গায় মিলিত হলো, তার কারণ আসলে ভুমিকম্প। আরও মনে করা হয়, এই দেশে ভুমিকম্প হলে সরাসরি মারা যাবে যত মানুষ, তার চেয়েও বেশি মারা যাবে এটা সামলাতে না পারার কারণে: গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়ার প্রতিক্রিয়ায়, উদ্ধারকাজ সুষ্ঠুভাবে করতে না পারার কারণে। মূল ঢাকা শহরের মাটি খুবই ভালো। আর ভালো নকশা করা বহুতল ভবনগুলো মাঝারি ভুমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হবে−এমন আশঙ্কা নেই। নিজেরা নকশা বদলে বানানো ভবন, ভুল নকশা দিয়ে বানানো ভবন, নিজেরাই বেশি বুঝি, মিস্ত্রি দিয়ে বানিয়ে নিচ্ছি ধরনের ভবন, নকশার প্রয়োগে ভুল হওয়া ভবন, ঠিকাদার-প্রকৌশলীদের ব্যাপক ফাঁকির শিকার ভবন−এই ধরনের ভবনের ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে এবং এই ধরনের স্থাপনাই আসলে বেশি। যেসব ভবন শুধুই ইটের তৈরি, আরসিসির কাঠামোর ওপরে তৈরি না, সেগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। আর ভবনের নিচতলায় গাড়ি রাখার জন্যে জায়গা ছাড়তে গিয়ে যে ভবনগুলো ন্যাড়া স্তম্ভের ওপরে খাড়া হয়ে আছে, সেসবও ঝুঁকিপূর্ণ। ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর পরামর্শ হলো, ওই নিচতলার চারদিকে দেয়াল বানিয়ে দেওয়া। আমার নিজের যে ভবনে থাকি, তারও এই সমস্যা। আর জলাভুমি ভরাট করে যাঁরা ভবন বানিয়েছেন, ঠিকমতো পাইলিং না করলে ভুমিকম্প লাগবে না, ঢাকার বেশ কয়েকটা হেলে পড়া ভবনের মতো ওগুলো এমনিতেই হেলে পড়বে।

আমাদের একটা জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি আছে। আশা করি, তারা শিগগিরই বসবে, এবং ভুমিকম্প নিয়ে আমাদের মনে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, তা দুর করতে আমাদের উদ্দেশে কিছু বলবে।

২.
আমাদের জলে কুমির ডাঙায় বাঘ। আমাদের বাতাসে সিসা, ধুলিকণা, কার্বন মনোক্সাইড, গন্ধক। আমাদের পানিতে আর্সেনিক আর নানা জীবাণু। আমাদের ফলে ফল পাকানোর বিষ। আমাদের মাছে, দুধে, ফলে ফরমালিন। আর আমাদের শাকসবজি, ফলমূল, চালডালে রাসায়নিক ওষুধ। বেগুনের পোকা মারার জন্যে বেগুনে প্রতিনিয়ত বিষ ছিটানো হচ্ছে, সেই বিষসমেত বেগুন চলে আসছে বাজারে, সেই বিষ আমরা খাচ্ছি। চাল, ডাল, শসা, গাজর−যা-ই মুখে দিই না কেন, বিষ ঢুকছে আমাদের পেটে। এই বিষ শুধু আমাদের পেটে যাচ্ছে, তা-ই নয়; এই বিষ মারছে ক্ষেতের উপকারী পোকামাকড়, জীবাণু। এই বিষ যাচ্ছে জলাশয়ে, নদীতে। মাছ মরে যাচ্ছে। বিষাক্ত পোকামাকড় খেয়ে মারা যাচ্ছে পাখি। আবার পাখিরা রোজ ক্ষতিকর পোকামাকড় খায় অনেক পরিমাণে। পাখি কমে যাওয়ায় সেদিক থেকে ঝুঁকি বাড়ছে। সাজ্জাদ হোসেন মাহমুদ রিয়াদ প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায় পাঁচ পর্বে এই বালাইনাশকের বালাই নিয়ে লিখেছেন বিস্তারিত প্রতিবেদন। তাঁরা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছেন। এখন নীতিনির্ধারকদের চোখ খুলতে পারতে হবে। জৈব বালাইনাশক ও বিকল্প বালাইনাশকের ব্যবহার বাড়ানোর জন্যে দরকার এ সংক্রান্ত নীতিমালার বদল। এই সরকারই সেটা করতে পারে।

৩.
বাংলাদেশ ডুবে যাবে−এই প্রচারণা জোরেশোরে উঠেছে। লন্ডন থেকে ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকার সাংবাদিক জোহান হারি ছুটে এসেছেন এই দেশে, ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়ে শেষতক এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে ১৯৭১ সালে রক্তসাগরে যে দেশের জন্ন, ২০৭১ সালে জলসাগরে নিমজ্জিত হয়ে সেই দেশ মৃত্যুবরণ করবে। অন্যদিকে প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠাতেই খবর বেরিয়েছে, দেশে নতুন নতুন চর জাগছে, সমুদ্র উপকুলে আমাদের জমি বাড়ছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেচ ও পানি বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এইচ খান স্পষ্টই জানিয়ে দিয়েছেন: না, বাংলাদেশ তলিয়ে যাবে না।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন একটা প্রবল বাস্তবতা। আর এ জন্যে দায়ী শিল্পোন্নত বিশ্ব। তাদের উষ্ণায়ন বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে, ভারত ও চীনকেও সেই অঙ্গীকারে শামিল হতে হবে। আর অন্যের পাপের দায় আমরা বহন করতে পারব না, আমাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কাজেই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বন্ধে আমাদের সোচ্চারও হতে হবে আন্তর্জাতিক পরিসরে।

তা সত্ত্বেও, আমাদের আশা ও ধারণা, বাংলাদেশ তলিয়ে যাবে না; বরং বাংলাদেশের আয়তন দিন দিন বাড়বে।

তাহলে বাংলাদেশ ডুবে যাবে−এই আওয়াজটা এত জোরেশোরে উঠল কেন? সম্প্রতি নাসা থেকে এ সংক্রান্ত একটা পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এ সবই করা হয় বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বন্ধে জাতিসমূহকে সতর্ক ও সক্রিয় করে তোলার জন্যে। কিন্তু সব সময়ই বলির পাঁঠা বানানো হয় বাংলাদেশকে। সমুদ্রপৃষ্ঠ যদি উঁচু হয়, তাহলে শুধু বাংলাদেশ একা ডুববে, আর পৃথিবীর কোথাও কারও কোনো ক্ষতি হবে না, তা তো হয় না। বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ যদি ডুবে যায়, কলকাতা বন্দর জেগে থাকবে? পৃথিবীর বহু বড় শহর আছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে যাদের অবস্থান; সমুদ্রের পানি উঁচু হলে সেই সব শহরের কী হবে?

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে গেলে লোনা পানি কেবল বাংলাদেশের নদীতে ঢুকবে, আর কোনো নদীতে ঢুকবে না−সেটা তো কোনো যুক্তির কথা নয়।

বাংলাদেশ ডুবে যাবে−এই প্রচারণায় আমাদের হাওয়া দেওয়া উচিত নয়। আমরা চাই এই দেশে-বিদেশি বিনিয়োগ হোক। যে দেশ ১০০ বছর পর পুরোটা আর ৩০ বছর পর অনেকটাই ডুবে যাবে (এরই মধ্যে ডুবে গেছেও, জোহান হারির প্রতিবেদন থেকে আমরা জানতে পারি, মুন্সিগঞ্জ পর্যন্ত লোনা পানি এসে গেছে, ঢাকায় ঢুকল বলে), সেই দেশে কেন বিদেশিরা বিনিয়োগ করবে। তার চেয়ে সিধুলাই প্রকল্প, যেটাতে বলা হচ্ছে, দেশটা যখন ডুবেই যাবে, তখন নৌকায় ভাসমান কম্পিউটার শেখানোর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাই তো বুদ্ধিমানের কাজ, সেই সব প্রকল্পে অর্থ দান করবেন বিল গেট্সরা। আমরা যদি চাই দেশে-বিদেশি বিনিয়োগ হোক, তাহলে বাংলাদেশ ডুবে যাবে না−এই আওয়াজের সঙ্গেই আমাদের থাকতে হবে।

বাংলাদেশ একটা বিরাট বদ্বীপ, এটা গড়ে উঠেছে পলি জমে জমে; হিমালয়ের পানি যতই এই দেশে আসবে, ততই এই দেশ বড় হবে।

আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।
ই-মেইল: anisulhoquem@yahoo.com

4
Your rating: None Average: 4 (2 votes)