বাংলাদেশে ভূমিকম্প ঝুঁকি : আমাদের করণীয়

ভূমিকম্পন-প্রবণ বলয়ের মধ্যে বাংলাদেশ অবস্থান করছে। ১৯৩৫ সালে জিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার মাধ্যমে সিসমিক জোনিং ম্যাপ প্রণয়ন করা হয় এবং ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ অনুরূপ আরও একটি মানচিত্র তৈরী করে। যার মাধ্যমে গোটা বাংলাদেশকে ভূমিকম্পের ঝুঁকি হিসাবে তিনটি অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়।

তিনটি অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হলো সিলেট-ময়মনসিংহের বৃহদাংশ এবং চট্টগ্রাম বিভাগের বেশকিছু এলাকা। এরপর কিছুটা কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মধ্যে আছে ঢাকা, দিনাজপুর, বগুড়া, পাবনা প্রভৃতি জেলা তবে দেশের দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলে ভূমিকম্পের ঝুঁকি অনেকাংশে কম।

বর্তমানে যে ভূ-খন্ডে বাংলাদেশ অবস্থান করছে সেই ভূ-ভাগে অষ্টাদশ শতাব্দীতে দুইবার এবং ১৯১৮ সালে একবার খুবই বড় মাপের ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। শংকার বিষয় হলো, বহু বছর বিরতির পর ১৯৬০ সাল পরবর্তী এদেশে ভূমিকম্পের প্রবণতা বাড়তে শুরু করেছে। ঘন ঘন মৃদু ভূমিকম্প দেখা যাচ্ছে।

একবিংশ শতাব্দীতে এসে তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘন ঘন মৃদু ভূকম্পন মানেই ভয়াবহ ভূমিকম্পের পূর্বাভাস বহন করে। সাম্প্রতিক অতীতে বাংলাদেশে ছোট থেকে মাঝারি মাত্রার বেশকিছু ভূমিকম্প বড় মাত্রার কোন দুর্ঘটনা এবং ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই সংঘতিত হয়েছে।

এগুলোর কারণে দেশের জনগণের মাঝে সামান্য সচেতনতা বৃদ্ধি পেলেও তা যথেষ্ট নয়। বন্যা এবং প্রলয়ংকারী ঝড় সম্পর্কে বাংলাদেশীরা সম্যকভাবে অবগত থাকায় এ জাতীয় দুর্যোগ মোকাবেলা করার জন্য জনগণ এবং সরকারি মহলে বাস্তবমুখী পদপে এবং উদ্যোগ দেখতে পাওয়া যায়।

অন্যদিকে প্রায় এক শতাব্দীকাল এই ভূখন্ড অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশ বড় মানের ভূমিকম্পন থেকে রক্ষা পেয়ে আসার কারণে ভূমিকম্প স্মৃতি তথা ভূমিকম্প ভীতি সাধারণ মানুষ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তেমন আছে বলে মনে হয় না।

তাই নিকট ভবিষ্যৎ-এ যদি কোন বড় মাপের ভুমিকম্প বাংলাদেশের ভেতর বা কাছাকাছি কোন স্থানে ঘটে তাহলে বিপদের মাত্রা সীমাহীন হওয়ার ঝুঁকিই বেশি। দেশের মধ্যাঞ্চলে ভূতাত্ত্বিক চ্যুতিগুলো ক্রমেই সক্রিয় হয়ে উঠছে বলে জানিয়েছেন ভূতাত্ত্বিকরা।

তাদের আশংকা, ঘন ঘন মৃদু ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প আগামী ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যেই বাংলাদেশে শক্তিশালী ভূমিকম্পের আভাস দিচ্ছে। ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞের মতে ভূমিকম্প ফিরে আসে। বেঙ্গল আর্থকোয়েক নামে পরিচিত ১৮৮৫ সালে রিখটার স্কেলে সাত মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছিল ধলেশ্বরী চ্যুতির কারণে।

একই কারণে ১৩০ বছর পর আবারও এ অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকম্প হতে পারে। এ আশঙ্কা ৯৫ ভাগ। ১৭৬২ সালে বেঙ্গল আরাকান ভূমিকম্পের প্রত্যাবর্তনের সময় ২৫০ বছর অর্থাৎ ২০১২ সাল। এই পরিস্থিতিতে সতর্কমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যাবশ্যকীয়।

ভূমিকম্প প্রবণতা চিহ্নিত করা গেলেও তা কখন কোথায় কি মাত্রায় আঘাত হানবে সে রকম পূর্বাভাস দেয়া কঠিন। সে কারণে এই দুর্যোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা এবং সহনীয় বসবাস পদ্ধতি আওতাধীন করে নেওয়াই শ্রেয়। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরের ভবনাদি মধ্যম মাত্রার ভূমিকম্প সহনযোগ্য নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞগণ।

এইরূপ ক্ষেত্রে ভূমিকম্পের দুর্যোগ এসে পড়লে জীবন ও সম্পদের বিপুল ক্ষতির সমূহ আশংকা। সবকিছু মিলিয়ে মনে হয় যে, বাংলাদেশে অদূর ভবিষ্যতে ভূমিকম্প হতে পারে তা মেনে নিয়ে সম্মুখে এগিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দুর্যোগ মোকাবেলার ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভবন ডিজাইন ও নির্মাণ ক্ষেত্রে নিয়ম-নীতি অনুসরণে উদ্যোগী হওয়া উচিত। প্রশ্ন উঠতে পারে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (১৯৯৩) কি যথেষ্ট? ডিজাইনের ক্ষেত্রে কি এই কোড ব্যবহার করা হয়?

ভবন নির্মাণের সময় ডিজাইন অনুসরণ করা হয় কতটা? বিশেষজ্ঞরা বলছেন বাংলাদেশ, ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড একটি সুলিখিত দলিল হলেও ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হওয়ার পর গত দশ বছরে এর ভেতর প্রয়োজনীয় পরিবর্তনগুলো সংযোজিত না হওয়ায় এর গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত নয়।

জানা যায়, এই কোড লেখার কাজে যে সমস্ত বিদেশী কোডের সাহায্য নেয়া হয়েছিল সেগুলো কোন কোন ক্ষেত্রে গত দশকে একাধিকবার পরিবর্তিত হয়েছে। সাম্প্রতিককালে বিদেশী কোডসমূহে ভূমিকম্প সংক্রান্ত নীতিমালা ঢেলে সাজানো হয়েছে এবং নমনীয় স্ট্রাকচারাল ডিজাইনের নতুন নতুন পন্থার দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

মূল কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের ভূমিকম্প কোডের সংস্কার জরুরিভাবে প্রয়োজন। যতদিন এই পরিবর্তন না আসবে ততদিন বর্তমানে কোড এবং অপরাপর সর্বজনগৃহীত কোড অনুসরণ করা যেতে পারে। একথা অনস্বীকার্য যে, বর্তমানে ডিজাইনের ক্ষেত্র দেশীয় কোড আংশিকভাবে ব্যবহার হলেও অনেক ক্ষেত্রেই নির্মাণকালীন সময়ে মান নিয়ন্ত্রণ ও ডিজাইন অনুযায়ী কাজ করা ক্ষেত্রে শৈথিল্য দেখতে পাওয়া যায়।

কোড উন্নয়নের পাশাপাশি দেশীয় প্রকৌশলী, স্থপতি, নির্মার্তা, পরিকল্পনাবিদ এবং নীতি-নির্ধারকদের ভূমিকম্প ঝুঁকি ও ডিজাইন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এবং ভূমিকম্প নিরোধক ভবনসমূহের বাহ্যিক আকার হতে হবে ভাল এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ভবনের বিভিন্ন স্ট্রাকচারাল অংশের ভূমিকম্পজনিত চাপ সহ্য করার জন্য পর্যাপ্ত শক্তি থাকতে হবে। একদিকে ভূমিকম্প নিরোধক ভবনের মৌলিক কাঠিন্য থাকবে যাতে তা অতি সহজে সামান্য চাপে বাঁকানো যাবে না বা ভবনটি সহজে হেলে পড়বে না।

অন্যদিকে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের সময় ভবনটি নমনীয়ভাবে আচরণ করবে। স্বভাবতই এ জাতীয় ভবন ডিজাইন ও নির্মাণের ব্যায়ভার প্রচলিতভাবে নির্মিত ভবনের তুলনায় কিছু বেশি পড়বে। ভূমিকম্পকালীন সময়ে অমূল্য জীবন রক্ষার প্রস্তুতি হিসাবে এই অতিরিক্ত ব্যয়ভার সহনীয় এবং প্রয়োজনীয় বলেই মনে হয়।

0
Your rating: None