প্রায় প্রতিবছর চাকরি নিয়ে দেশের বাইরে যান বেশ কিছুসংখ্যক বাংলাদেশী। এদের অধিকাংশ শ্রমিক অথবা ছোটো মাপের চাকুরে। কেউ কেউ বৈধভাবে যান, কেউ কেউ অবৈধভাবে। কিছু শিক্ষিত ব্যক্তিও কিছু সময়ের জন্য পেশাগত কারণে কিংবা পড়াশোনার প্রয়োজনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করেন। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, শ্রমিক হিসেবে মোট সংখ্যার অধিকাংশ বাংলাদেশী মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত। এর মাঝে কুয়েত অন্যতম। এশিয়ার মালয়েশিয়ায়ও অসংখ্য বাংলাদেশী শ্রমিক রয়েছে।
বাংলাদেশী শ্রমিক কিংবা শিক্ষিত জনগোষ্ঠী যারাই কর্মরত আছেন, তারা আমাদের অর্থনীতিতে একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করছেন। তারা তাদের উপার্জনের একটি অংশ দেশে পাঠাচ্ছেন। কিন্তু প্রবাসে অবস্থানকালে ছোট-বড় যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন তারা, সেসব বিষয়ে সেসব দেশের বাংলাদেশী দূতাবাস কি ভূমিকা রাখছেন? কতটুকু পরামর্শ ও সহযোগিতা পাচ্ছেন তারা বাংলাদেশী দূতাবাসের কাছ থেকে?
সম্প্রতি কুয়েতে যে ঘটনা ঘটে গেল, তা পত্রিকান্তরে প্রকাশিত হয়েছে। রেডিও-টেলিভিশনেও খবর প্রচারিত হয়েছে। আমরা মর্মাহত হয়েছি। একজন পত্রলেখক একটি প্রধানতম ইংরেজি দৈনিকে সম্প্রতি লিখেছেন: ‘এটা আমাদের কূটনৈতিক ব্যর্থতা। কুয়েত থেকে বাংলাদেশী শ্রমিকদের উপর কুয়েতী পুলিশের অত্যাচার আন্তর্জাতিক আইন বহির্ভূত। এ বিষয়ে স্থানীয় বাংলাদেশী দূতাবাসের অনেক কিছু করার থাকে। কিন্তু আমাদের দূতাবাসের ভূমিকা কী এক অজানা কারণে মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়। ফলে আমাদের শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হয়’।
খবরে প্রকাশ ৩ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী কুয়েত গেছেন বিষয়টি কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা করার উদ্দেশ্যে। আমাদের প্রশ্ন, পরিস্থিতি ঘোলাটে হওয়ার আগেই স্থানীয় বাংলাদেশী দূতাবাস থেকে পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতো। হয়তো কিছুটা গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু তা বিলম্বিত পদক্ষেপ। দেশের এই সংকট মুহূর্তে জনাব ইফতেখারকে দ্রুত কুয়েতে যেতে হলো। এর অনেক আগেই সমস্যাটি নিয়ে আলাপ-আলোচনা হতে পারতো কুয়েত কর্তৃপক্ষের সাথে স্থানীয় বাংলাদেশী দূতাবাস পর্যায়ে।
প্রসঙ্গত একটি ব্যক্তিগত স্মৃতি মনে পড়ছে। আশির দশকে সরকারি পর্যায়ে অধ্যাপনার চাকরি নিয়ে আমি ও আমার কয়েকজন সহপাঠীকে উত্তর আফ্রিকার তেলসমৃদ্ধ দেশ লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপলীতে যেতে হয়েছিল। প্রায় ৩০ বছর আগের ঘটনা। আমাদের প্রথমে শহর থেকে দূরে একটি হোস্টেলে থাকতে দেয়া হয়। ভাষা ছিল প্রধানতম প্রতিবন্ধক। তারপর খাদ্য ও সংস্কৃতি ছিল আরেক প্রধান অন্তরায়।
আমাদের সাথে কিছু ভারতীয় এবং পাকিস্তানী অধ্যাপকরাও ছিলেন। পরদিন সকাল না হতেই ভারতীয় দূতাবাস থেকে ওদের ফার্স্ট সেক্রেটারী এসে হাজির। পাকিস্তান দূতাবাস এবং আমাদের দূতাবাস থেকে তখন পর্যন্ত কেউ আসেনি। অথচ যদ্দূর জানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি তালিকা পাঠানো হয় বাংলাদেশের দূতাবাসে।
দু’তিনদিন পরে ফার্স্ট সেক্রেটারী এসেছিলেন ব্যক্তিগতভাবে আমার খোঁজ-খবর নিতে কারণ আমার এক কাজিন তখন মন্ত্রণালয়ে একটি সম্মানজনক পদে অবস্থান করছেন। আমার মায়ের অনুরোধে তিনি টেলিফোন করে দিয়েছিলেন, আমার যাবতীয় তথ্য জানিয়ে। পরে ফার্স্ট সেক্রেটারী তার বাসায় নিয়ে যেতে চাইলেন আমাকে। কিন্তু আমার বন্ধুদের ছেড়ে একাকী যেতে আমি রাজি হলাম না। পরবর্তী বাস্তবতা ভিন্ন। যেহেতু ঢাকায় থাকতে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র থাকাকালীন সময়ে আমরা কয়েকজন বন্ধু রাজনীতি নয়, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে নাটক নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। নাট্যগোষ্ঠী করেছি, নাট্য আন্দোলন করেছি। সেই সুবাদে ত্রিপলীর বাংলাদেশ দূতাবাসের জাতীয় অনুষ্ঠানগুলো সংগঠিত ও সুচারুরূপে সম্পাদন করার জন্য আমাদের কয়েকজনের ডাক পড়তো। আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করতাম খুব আন্তরিকভাবে। দেশ থেকে বহুদূরে, আমাদের মন দেশের জন্য হাহাকার করে উঠতো। দূতাবাসের অনুষ্ঠান শুধু নয়, প্রবাসীদের সংগঠিত করে বাইরেও আমরা নাটক ও গানের অনুষ্ঠান আয়োজন করতাম। তখন খুব কাছে থেকে দূতাবাস কর্তৃপক্ষ এবং কর্মচারীদের সাথে মেশার ও উপলব্ধি করার সুযোগ হয়। আমাদের মনে হয়েছে, এরা নিজেকে একটি ভিন্ন জগতের বাসিন্দা ভাবতে ভালবাসতেন। বাংলাদেশী শ্রমিকরা কোনো কাজে গেলে অকারণে তাদের বিব্রত করতো দূতাবাসের কর্মচারীরা। ব্যবহারও ছিল রূঢ়। যেহেতু রাষ্ট্রদূত কিংবা ফার্স্ট সেক্রেটারীদের সাথে আমাদের সঙ্গতকারণে ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল, অনেক সময় বাংলাদেশের এইসব সাধারণ মানুষ আমাদের কাছে তাদের সুখ-দুঃখের কথা ব্যক্ত করতো।
রাষ্ট্রদূত কিংবা কর্মকর্তারা অধিকাংশ সময় নিজেদের তৈরি করা এবং রহস্যময় গণ্ডির ভেতর অবস্থান করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। কিন্তু ভারতীয় কিংবা পাকিস্তানী দূতাবাসকর্মীদের দেখেছি, তারা দেশের জন্য, দেশকে পরিচিত করার জন্য সকাল-সন্ধ্যা পরিশ্রম করছে। তারা সে দেশের ভাষাও দ্রুত শিখে নিতেন। আমাদের দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত কিংবা কর্মকর্তারা তা করতেন না। ফলে সেসব দেশের সাথে ভালো ও সুদৃঢ় যোগাযোগ বা ‘নেটওয়ার্কিং’ গড়ে উঠতো না। বাণিজ্যের অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশী পণ্যের প্রসারের জন্য প্রবাসের দূতাবাসগুলো কোনো যোগ্য ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হতো। আমাদের দূতাবাস মনে করতো এটা তাদের কাজ নয়। তারা যে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করছে, একটা মহান দায়িত্ব তাদের রয়েছে, এ ধরনের দেশপ্রেম তাদের মাঝে লক্ষ্য করিনি। বাংলাদেশ সরকার নিয়োগ দেয়ার আগে এরকম কোনো ট্রেনিং বা ওরিয়েন্টেশন দেননি। ১৯৭১-এ বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর জনগোষ্ঠীর এক বিশাল অংশ বাইরের দেশগুলোতে যাওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু আমাদের দূতাবাসগুলোতে যারা কর্মরত আছেন তাদের অন্তর্মুখী আত্মকেন্দ্রিকতার জন্য দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হওয়ার পরিবর্তে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষুণœ হচ্ছে। আজ পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টাকে শেষ মুহূর্তে ঘটনা যখন সংকটে পরিণত হয়েছে, তখন ছুটে যেতে হচ্ছে; যে কূটনৈতিক কার্যক্রম কুয়েতে বাংলাদেশী রাষ্ট্রদূত অনায়াসে পারতেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের অনুরোধ যোগ্য, শিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান ব্যক্তিদের এই গুরুদায়িত্বে অধিষ্ঠিত করা হোক। তা না হলে এরকম অনেক কূটনৈতিক ব্যর্থতা আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করবে; দেশে এবং বহির্বিশ্বে।
[লেখক: শিক্ষাবিদ এবং কথা-সাহিত্যিক]
