নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে অংশত পৃথককারী বর্তমান সেনা-সমর্থিত সরকারের প্রতিনিধি এ এফ হাসান আরিফ একটি তালিকা হাতে প্রধান বিচারপতি এম এম রুহুল আমিনের খাস কামরায় প্রবেশ করতে যাচ্ছেন। দিনটি ১৬ অক্টোবরে স্িথর রয়েছে। এদিন কি তাঁর হাতে ব্রিফকেস থাকবে? কিংবা লাল ফিতায় বন্দী ফাইল? কিংবা খালি হাত, আস্তিনের নিচে লুকানো থাকবে এক ডজন কি দুই ডজন নামের একটি তালিকা? এক-এগারোপূর্ব ধারায় প্রতিটি পৃষ্ঠায় মুদ্রিত থাকবে ‘গোপনীয়’ কিংবা ‘অতি গোপনীয়’ কথাটি? এবং এই তালিকাভুক্তরা যদি বিচারপতি হিসেবে একবার শপথ নিতে পারেন, এরপর যদি তাঁদের কারও বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগও ওঠে, তাহলে তাঁদের অপসারণ দুরে থাক, কোনো প্রকার প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে প্রায় এক কষ্টকল্পনা।
অরুন্ধতী রায়ের কথামালা ধার করে বলি, শপথের পরে এঁরাই হবেন ঐশ্বরিক ক্ষমতাসম্পন্ন; ধরে নিতে হবে শিষ্টাচার, নৈতিকতা, স্বচ্ছতা, চারিত্রিক সরলতা ও সততা তাঁদের ডিএনএর মধ্যেই প্রোথিত। আদালত অবমাননা সম্পর্কে আমাদের উচ্চ আদালতের অবস্থানগত প্রবণতা বিবেচনায় নিয়ে বলা যায়, তাঁদের বিরুদ্ধে তখন কোনো অভিযোগ উঠলে তা প্রকাশ করাও হবে দুঃসাধ্য। কারণ প্রচলিত আইনে বা বিচারবিভাগীয় ঘোষণায় সত্য এখনো কোনো ঢাল নয়। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো কিছু প্রমাণ করতে হলে তার তদন্ত দরকার। আর যখনই আপনি তদন্ত চাইবেন, তখন আপনাকে ঘটনার বিবরণ দিতে হবে। আর যখনই তা প্রকাশ করবেন, তখন আপনি জনগণের সামনে আদালত ও বিচারককে হেয় প্রতিপন্ন করার দায়ে অভিযুক্ত হতে পারেন। সুতরাং বাস্তবতা হলো, তদন্ত ছাড়া কিছুই প্রমাণ করা যায় না। আর প্রমাণ ছাড়া কিছুরই তদন্ত হয় না।
ঘর পোড়া গরু হিসেবে আমরা সর্বাগ্রে আইন উপদেষ্টার পকেটের তালিকাটা জানতে চাই। তাঁরা জনগণের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে গিয়ে জনগণকে অন্ধকারে রাখতে পারেন না। এ প্রসঙ্গে অদক্ষ ও স্রেফ দলীয় আনুগত্যে নিয়োগপ্রাপ্তদের বঙ্গভবনে চা পানের এন্তেজামের কী হলো তার জবাবও আমরা পেতে চাই। কারণ অভিযুক্ত ব্যক্তিদের রেখে নতুন নিয়োগ নিশ্চিত করার মানেই হলো আগের অনাচারকে বৈধতার সনদ দেওয়া। বিতর্কিতদের নিরাপদে স্বপদে বহাল রাখলে তাঁদের চেয়ে অধিকতর যোগ্য ও নিষ্ঠাবানেরা বিচারক হতে আগ্রহী হবেন না। এর আগে সাবেক প্রধান বিচারপতি মো. রুহুল আমিন জনগণকে যা জানালেন তার মানে দাঁড়ায়, ২০ বছর ধরে প্রলয়নাচ চলবে।
প্রধান বিচারপতি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান। তিনি তাঁর ঘোষণা মতে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। এখন সেই ব্যর্থতা ও অক্ষমতার ধারাবাহিকতা চলছে। ডিসেম্বরে একটা নতুন নির্বাচন হলেও তার নড়চড় ঘটবে না। তবে ওই প্রলয়নাচন বন্ধ না করা হলে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। আমাদের বিচারাঙ্গনের যাঁরা সভা-সেমিনারে বক্তব্য দেন, তাঁদের কিন্তু কেউ বিচারপতি হতে আগ্রহী নন।
সংবিধান লিখেছে, বিচারপতি হতে ১০ বছরের ওকালতির অভিজ্ঞতা লাগবে। জোট সরকার একজনকে বিচারপতি করতে ওই অঙ্ক পূরণে পুরো নিয়োগ-প্রক্রিয়াটি মাস তিনেক পিছিয়ে দিয়েছিল। যদি মেধার দোহাই দেওয়া হয়, তাহলে এ দেশের সমবয়সী সমমেধাসম্পন্নরা কী দোষ করল? তাঁদের কারও জন্য একই অপেক্ষা করা হবে? এ ধরনের বাধা দুর করতে হবে। এবং সে জন্য অপসারণই একমাত্র বিকল্প নয়।
ভারত বিচারপতি অপসারণে অভিশংসন-প্রথা থেকে বেরিয়ে আমাদের কাউন্সিল-ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে। ২৮ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল সোলি সোরাবজির সঙ্গে তাঁর বাসভবনে আলোচনাকালে বললাম, রাজনীতিকেরা আস্থাভাজন নন, তাই আপনারাও এখন কাউন্সিলে ঝুঁকছেন। কিন্তু বিচারপতিরা যদি নিজেদের বিষয়ে অসংবেদনশীল হন, তখন কী হবে? আমাদের অভিজ্ঞতা ভালো নয়।
৩১ বছরের মধ্যে আমাদের কাউন্সিল একটিবারও একান্ত নিজ গরজে বৈঠকে বসতে পারেননি। এমনকি সংবিধানমতে ‘স্বীয় কার্যপদ্ধতি’ও নির্দিষ্ট করেছেন বলে জানা যায় না। এতে বোঝা যায়, আমাদের বিচারপতিদের সীমাবদ্ধতা কত বেশি। প্রলয়নাচনের মধ্যে এটা আরও ঝুঁকিপূর্ণ। ২০০৪ সালের এপ্রিলে পাঞ্জাবের প্রধান বিচারপতি যে ঝুঁকি নিয়েছিলেন, সেটা আমাদের কোনো প্রধান বিচারপতির নিতে বাধা কোথায়? একটি বিতর্কিত ক্লাবের সদস্য হওয়ার কারণে কতিপয় বিচারপতিকে শোকজ করা হয়। প্রতিবাদে ২৫ জন বিচারপতি গণছুটিতে যান। কিন্তু প্রধান বিচারপতিই সঠিক ছিলেন। এ ধরনের কোনো পদক্ষেপে এখানে গণ-উল্লম্ফন কল্পনা করা চলে। সেই পাঞ্জাবে গত আগস্টে চাঞ্চল্যকর ঘুষ কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়েছে। পত্রপত্রিকার খবর হচ্ছে, অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল সঞ্জীব বানসাল তাঁর মুন্সিকে দিয়ে কড়কড়ে ১৫ লাখ রুপির বান্ডিল পাঠিয়েছিলেন হাইকোর্টের নারী বিচারপতি নির্মল যাদবের বাড়িতে। মুন্সি তা ভুল করে পৌঁছে দেন বিচারপতি নির্মলজিৎ কাউরের বাড়িতে। কাউর একই সঙ্গে পুলিশ এবং পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে খবর দেন। যা লক্ষণীয় তা হলো, ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হাইকোর্টের দুই প্রধান বিচারপতির সমন্বয়ে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। ওই ঘটনা ছিল একজন আইনজীবী, একজন বিচারপতি ও একজন ব্যবসায়ীর আঁতাতের ফল।
আমাদের সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে কোনো প্রধান বিচারপতি হাইকোর্ট বা আপিল বিভাগের কোনো বিচারপতির বিষয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করেননি। অবশ্য বিরল ক্ষেত্রে অনেক হাইকোর্ট-বিচারক তাঁদের আচরণ বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচারিক সিদ্ধান্তের জন্য আপিল বিভাগ দ্বারা সময়ে সময়ে সমালোচিত হয়েছেন।
বিচারপতি ফয়েজীর সনদ জালিয়াতির বিষয়ে খবর প্রকাশের পর উল্টো মিডিয়ার বিচার শুরু হয়। আর পাঞ্জাবের প্রধান বিচারপতি তিরাত সিং ঠাকুর ওই বিচারপতি নির্মলকে ছুটিতে যেতে বলেন। তিনি ছুটিতে যান। এভাবে আমরা দেখি অভিশংসিত না করেও ‘অভিযুক্তকে’ বিচার প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা সম্ভব। আমাদের পরিবেশটা কেমন? ঢাকার জেলা জজ ইশতিয়াক হোসেন খুনের আসামিকে বেআইনিভাবে জামিন দিয়ে আলোচিত। তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত করেছেন সুপ্রিম কোর্ট। খুলনায় জেলা জজ থাকাকালে তাঁর ক্ষমতার অপব্যবহারের দলিল অবশ্য আমাদের হাতেও আছে। তিনি এখন সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ারের বিরুদ্ধে রিট করেছেন। এটা এক নজিরবিহীন ঘটনা। অবাক বিষয়, বিচারপতি মীর্জা হোসেন হায়দার ও বিচারপতি মামনুন রহমানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ তাঁর রিটের পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের ওপর রুলও জারি করেছেন।
মানবজমিন-এর ক্যাসেট কেলেঙ্কারির মামলার ১৪২ পৃষ্ঠার রায় থেকে দেখা যাচ্ছে, ২০০০ সালে জনতা টাওয়ার মামলায় দন্ড হ্রাসের প্রশ্নে জেনারেল এরশাদের সঙ্গে ‘অশোভন’ সংলাপে জড়ান বিচারপতি লতিফুর রহমান। সাবেক আইন উপদেষ্টা বিচারপতি ফজলুল হকের একটি নতুন টেপের সন্ধান পেলাম। জানলাম, বাপ কা বেটা। আইন উপদেষ্টা হওয়ার আগে হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি হিসেবে তিনি কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয়-সংক্রান্ত একটি তদন্ত কমিটিতে ছিলেন। টেপ থেকে দেখা যাচ্ছে, তাঁর ছেলে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ারম্যান ড. হামিদা বানু শোভার কাছে দুই কোটি টাকার ঘুষ চাইছেন। বিচারপতি ফজলুল হক তা জানতেন। তিনি ড. হামিদাকে টাকা নিয়ে আসতে বলেছিলেন তাঁর পুরোনো কর্মস্থল সুপ্রিম কোর্ট ভবনের একটি কক্ষে। তো এসব ঘটনাকে প্রবাদতুল্য প্রকান্ড বরফখন্ডের ভাসমান ক্ষুদ্রাংশ হিসেবে দেখাই কি যৌক্তিক নয়?
ইতিহাসে প্রথম সুপ্রিম জুডিশিয়াল কমিশনের বৈঠক বসছে। আমরা এ রকম একটি কমিশন চেয়েছিলাম। আমরা তাকে স্বাগতও জানাই। কিন্তু সন্দেহ-সংশয় থাকছেই। ব্যক্তি বাছাইয়ে যত বেশি গোপনীয়তা বজায় রাখা হবে তত সন্দেহ বাড়বে। অদক্ষ বিচারক, বিশেষ করে যাঁরা সাবেক প্রধান বিচারপতি চিহ্নিত প্রলয়-পুঙ্গব, তাঁদের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে নতুন বিচারপতি নিয়োগ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ দুনিয়াব্যাপী প্রমাণ করা কঠিন। চন্ডীগড়ের ওই মুনশির বোকামিতে ধর্মের ঢোল আপনি বেজে উঠেছে। যদি অদক্ষতার কথাই ধরি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাও ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। হাইকোর্ট বিভাগের একটি বেঞ্চ ড. কামাল হোসেনের সমালোচনা করে বললেন, তাঁর কথায় মনে হয়, আমরা যেন টাকা নিয়ে জামিন দিচ্ছি। অনেক সময় কিন্তু টাকার প্রশ্ন তুচ্ছ। একজন মার্কিনি বিচারকের কথায়, ‘মানুষ অর্থের চেয়ে প্রায়শ আনুগত্য প্রদর্শন ও উচ্চাশা বাস্তবায়নের মাধ্যমেও ঘুষ নেয়।’ অনুসৃত আইনি-প্রক্রিয়াটা যদি স্বচ্ছ ও স্বীকৃত না হয় তাহলে তো সর্বনাশই ডেকে আনা হয়। তাই এর জবাবদিহিতা থাকতে হবে। ভারতের লোকসভায় বিল উঠেছে। বিচারপতিদের একমাত্র শাস্তি কেবল অপসারণ হতে পারে না। এ জন্য উপযুক্ত পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে হবে।
সেনা-সমর্থিত এই সরকারের আমলে বিচার বিভাগ শেষপর্যন্ত নিকৃষ্টতম ভিকটিম হিসেবে চিহ্নিত হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। বঙ্গভবনে চা-পানের দাওয়াতের মধ্যে একটা বালখিল্যতা ছিল। শুনেছি, ২০ বিচারপতির তালিকা হয়েছিল। এর মধ্যে প্রথম ধাপে তিনজনের সঙ্গে কথা বলেন রাষ্ট্রপতি। বিচারপতি এস কে সিনহা, বিচারপতি আতাউর রহমান খান, বিচারপতি বদরুল হক। শেষোক্তজন দুই মাস পরেই অবসরে যেতেন। তাই তিনি বিনা বাক্যব্যয়ে ইস্তফা দিলেন। একটি চিঠিতে বঙ্গভবন লিখেছে, ‘আপনি আপনার সিদ্ধান্ত জানানোর কথা এখনো জানালেন না।’ জবাবে একজন বিচারপতি রাষ্ট্রপতিকে লিখেছেন, ‘সংবিধানে আপনার এবং আমার কর্তব্য লেখা আছে।’ ওই প্রক্রিয়ার ইতি এখানেই। শুনতে পাই, সেই থেকে বঙ্গভবনে এই দুই বিচারপতির নেমন্তন্ন বন্ধ। কিন্তু এই করে কি প্রলয়-নাচন ঠেকানো চলে?
রাষ্ট্রপতি একজনকে ডেকে নিয়ে তো বললেই হবে না, অমুক স্থানে আপনার বাড়ি আছে। কিংবা আপনি ৬০ হাজার ডলার হুন্ডি করেছেন। এত বড় গুরুতর অভিযোগের প্রমাণ থাকতে হবে। প্রাথমিক মসলা দিন। বাড়ির ঠিকানা দিন। এই তদন্তে মিডিয়ার যেকোনো কর্মী সোৎসাহে এগিয়ে আসবেন। অসত্য, অর্ধসত্য, অতিরঞ্জন কারও উপকারে আসে না। ইদানীং বিচারপতিদের বিরুদ্ধে দুঃখজনকভাবে পোস্টারিং ও লিফলেট হচ্ছে। এসব কাদের কাজ হতে পারে তা নিয়ে জল্পনা প্রচুর। যাঁরাই এটা করুন, তাঁরা হয় বিভ্রান্ত, না হয় বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দুশমন। রাষ্ট্রের শেষ ভরসাস্থল সুপ্রিম কোর্টের শুদ্ধিকরণ বা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের পথ এটা নয়। সদর দরজা দিয়ে পরিচ্ছন্ন হাতে আসুন। পানি ঘোলা হলে প্রলয়-পুঙ্গবরা নিন্দার পরিবর্তে উল্টো সহানুভুতি কুড়াতে পারেন। সে আলামতও দেখছি; তবে সুপ্রিম কোর্ট তাঁর চারপাশের উদ্বেগজনক ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে উদাসীন থাকতে পারেন না। বিচারপতিদের অনেকের ব্যাপারে এমনসব পরীক্ষিত অভিযোগ রয়েছে, যা তাঁদের অপসারণের জন্য যথেষ্ট না হতে পারে কিন্তু সেসব অভিযোগ নিঃসন্দেহে তাঁদের পদমর্যাদার সঙ্গে শোভন নয়। মানবজমিন মামলার রায়ের আলোকে আচরণ বিধিমালায় সংশোধনী আনতে হবে। ওই রায়ে বর্ণিত বিচারকদের জন্য পালনীয় ৫০ দফা কি সবাই মানছেন? সুপ্রিম কোর্ট নেতৃত্ব এসবের বাস্তবায়নে নিরন্তর নিস্পৃহ থাকলে তা বুমেরাং হতে বাধ্য।
এ ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট বারের বিরাট ভুমিকা আছে। রাজনৈতিক দলের লেজুড় সন্দেহে বারের নেতৃত্বের প্রতি এই লেখকের আস্থা প্রায় শুন্যের কোঠায়। তবু বলছি, ১৬ অক্টোবরের বৈঠকে ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের উপস্িথতি প্রতিনিধিত্বশীল হওয়া অবশ্যক। এ জন্য তিনি একটি বৈঠক ডেকে বারের অবস্থান নির্ধারণ করতে পারেন। বারের পূর্ববর্তী প্রস্তাবগুলো অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। ১০ বিচারপতির পুনর্নিয়োগের প্রশ্ন ঝুলিয়ে রাখা হবে? জোট সরকারের শেষ ব্যাচের পুরো ১৯ জনের বিরুদ্ধে বারের কঠোর অবস্থান অভিজ্ঞতার আলোকে পুনর্মুল্যায়িত হওয়া উচিত। বারের উচিত নয় পেশাদারির সঙ্গে আপস করা।
আইন উপদেষ্টার ভুমিকা সম্পর্কে খুব সতর্কতা কাম্য। তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল থাকাকালে তাঁরই অর্ধডজন ডেপুটিকে বিচারপতি করা হয়। এঁরা বিএনপিদলীয়। সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল কনিষ্ঠতম আইন কর্মকর্তা। এ রকম দুই কনিষ্ঠকে বিচারপতি বানিয়ে খালেদার সরকার খারাপ রেকর্ড গড়ে। কে কার জুনিয়রকে জজ বানাতে পারেন তা নিয়ে একটা তারকাযুদ্ধ আছে বলে কখনো মনে হয়।
বিচারাঙ্গনে বিচারপতি হতে ধরাধরির নিনাদের শব্দ শুনি। সেনা-সমর্থিত সরকারি প্রতিনিধির তালিকায় ধরাধরির ছাপ থাকবে বলে ধরে নিচ্ছি। দেশে এবারে যে ‘ধর ধর ছাড় ছাড়’ হলো তা-ই শেষ নয়। আর ওই ধরাধরির সংস্কৃতির সঙ্গে কিন্তু ধর ধর ছাড় ছাড়-এর একটা কুটুম্বিতা থাকে। এটাও অপ্রিয় সত্য যে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এমনকি অপেক্ষাকৃত যেসব তরুণ মেধাবী আইনজীবী আছেন, তাঁরা ধরাধরি থেকে দুরে থাকেন। স্বনামধন্য আইনজীবীদের বিচারপতি হতে আগ্রহী দেখি না। তাই দেখে-শুনে মনে হয়, বিচারপতি নিয়োগে একটা উন্নুক্ত পরীক্ষা পদ্ধতির প্রবর্তন অধিকতর সুফল দিতে পারে। আইন কর্মকর্তা নিয়োগেও তা-ই হওয়া উচিত।
যাঁরা পরীক্ষায় বসতে দ্বিধান্বিত হবেন, একটু লজ্জিত হবেন, তাঁরা সান্ত্বনা পেতে পারেন যে প্রায় সহস্রাব্দের প্রথা ভেঙে আমরা যাঁদের কাছ থেকে আইন ও জজিয়তি শিখেছি, তাঁরা এখন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে বিচারপতি নিয়োগ শুরু করেছেন। আমি ব্রিটেনের কথা বলছি।
আমাদের জুডিশিয়াল কমিশন বৈঠকে বসলে এখন জুডিশিয়াল কাউন্সিলেরও একপ্রকার বৈঠকে বসা হবে। কারণ প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন তিন কাউন্সিলর পদাধিকার বলে কমিশনের প্রথম তিন শীর্ষ কমিশনার। তাই বলছি, এই বৈঠক থেকে সুপ্রিম কোর্টের প্রলয়-পুঙ্গবদের বিষয়ে একটি উপকমিটি গঠনের চিন্তা করা যেতে পারে। মামলাজট নিশ্চয় অসহনীয়। কিন্তু তা দেখিয়ে তড়িঘড়ি বিচারক নিয়োগ অভিপ্রেত নয়। জ্যেষ্ঠ আইনজ্ঞদের অনেকে দীর্ঘকাল ধরে পূর্ণাঙ্গ রায় না লেখা, রায় লিখতে দুই-আড়াই বছর সময় নেওয়া, জটিল মামলার শুনানি গ্রহণে অসামর্থ্যতা, স্বার্থের সংঘাত এড়িয়ে না চলা ইত্যাদি বিষয়ে প্রায়ই আক্ষেপ করেন। এসব খতিয়ে দেখে সে অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতার বিদ্যমান তালিকায় একটা পরিবর্তন আনা যেতে পারে। কেবল চাকরিতে যোগদানের তারিখ মতে জ্যেষ্ঠতার ক্রম বজায় রাখার রেওয়াজ অকার্যকর হয়ে গেছে। এটা কঠোরভাবে বজায় রাখার অর্থ হচ্ছে আত্মমর্যাদাসম্পন্নদের বলা, আপনাদের জন্য বিচারপতির পদ গ্রহণ হারাম।
আদালতে জুডিশিয়াল কমিশনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ হলো। তিন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত একটি বৃহত্তর বেঞ্চ বিভক্ত রায়ও দিলেন। জ্যেষ্ঠ বিচারপতি পুরো অধ্যাদেশকে বেআইনি ও এখতিয়ারবহির্ভুত বলে নাকচ করে দিয়েছেন। আমরা তাঁর সঙ্গে একমত হতে পারিনি। আবার অপর দুই বিচারপতির মূল সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হয়েও পুরোপুরি একমত হতে পারিনি। কারণ, তাঁরা যথার্থই অধ্যাদেশটিকে বৈধতা দিয়েছেন। কমিশনের সুপারিশ উপেক্ষা করা-সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির ভেটো ক্ষমতা খর্ব করেছেন। কিন্তু প্রাথমিক তালিকা প্রসবের ক্ষমতা আইন মন্ত্রণালয়ে রাখার বিধানটি যে সুপ্রিম কোর্টের স্বাধীনতা ও মর্যাদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, সেদিকে তাঁরা নজর দেননি।
এখন সুপ্রিম কোর্ট বারই পারে রাজনীতিকদের সামনে এ বিষয়ে একটি ক্রটিমুক্ত খসড়া হাজির করতে। কারণ অধ্যাদেশটিকে তো আইনে পরিণত করতে হবে। আওয়ামী সমর্থিত বার নেতৃত্ব একটি উত্তম নজির তৈরির সুযোগ হাতছাড়া করবেন?
নতুন বিচারক নিয়োগে উপযুক্ত প্রক্রিয়া নির্ধারণে বারের অগ্রণী ভুমিকা কাম্য। এটি বারের জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা। তারা ব্যর্থ হলে নাগরিকসমাজকে অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে। ভারতে তা-ই ঘটছে। অরুন্ধতী রায় দীর্ঘ, চমৎকার নিবন্ধ লিখেছেন। তিনি সাবেক প্রধান বিচারপতিদের ধরাছোঁয়ার ঊর্ধ্বে থাকা নিয়েও বেশ উচ্চকিত। আমাদের এখানে যাঁরা তাঁর মতোই আগন্তুক, সুপ্রিম কোর্ট বাঁচাতে তাঁদের এখনই জেগে উঠতে হবে। বাঁচাও সুপ্রিম কোর্ট।
