ঢাকা ইতিমধ্যেই এক মেগাসিটি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তবে বিকাশ লাভ করেনি সঠিকভাবে। পরিকল্পিত নগরায়নের কথা আলোচিত হচ্ছে সেই ১৯৭৩-৭৪ সাল থেকে। এর পূর্বেও এ বিষয়ে এদেশে আমাদের নগর পরিকল্পকগণ অনেক আলোচনা করেছেন। মতামত গ্রহণও হয়েছে সরকারি পর্যায়ে।
বিগত ২২ সেপ্টেম্বর রাজউক ভবনে অনুষ্ঠিত বিশেষ সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে পত্র-পত্রিকায় যেসব খবর বেরিয়েছে তারমধ্যে এই প্রকল্প সম্পর্কে একটা ধারণা আমার হয়েছে। যদিও পত্রিকার রিপোর্টের ভিত্তিতে কোন ধারণাই সুস্পষ্ট হয় না।
তথাপি ‘গণশুনানি’ এবং ‘জনগণের মতামত’ গ্রহণের পর প্রস্তাবিত ‘ম্যাপ’ চূড়ান্ত করা হবে বিধায় মতামত প্রকাশের জন্যই এই আলোচনার উদ্যোগ। বলা হয়েছে আগামী ১০০ বছরের চাহিদা ও সম্ভাবনাকে সামনে রেখে এই খসড়া ম্যাপ প্রস্তুত করা হয়েছে।
তাতে ঢাকা মহানগরী নারায়ণগঞ্জ থেকে কালিয়াকৈর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ওদিকে কেরানীগঞ্জ থেকে টঙ্গী-গাজীপুর পর্যন্ত হবে উত্তর-দক্ষিণের বিস্তার। গাজীপুরের শ্রীপুর এমনকি তা ছড়িয়ে ময়মনসিংহের ভালুকা পর্যন্ত ঢাকা বিস্তার লাভ করেছে।
এর মধ্যে গাজীপুর জেলার ভাওয়াল গড়ের বিশাল বনভূমিও শহরের বিস্তার কার্যক্রমে আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। যেখানে নয়নাভিরাম বনভূমি ছিল, বনভূমি আঁকড়ে ছিল শ্যামল শস্য মাঠগুলো, একটু দূরেই ছিল নিচু ভমির বিল, খাল ইত্যাদি।
অনেক প্রাকৃতিক সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে, ভূ-প্রকৃতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। পরিবর্তন চলছেই। অবৈধভাবেও গ্রাস হচ্ছে অনেক বন, নদী, সরকারি জমি, পুরাতন পুকুর ও দীঘি। ইতিমধ্যে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটেছে ঢাকার অভ্যন্তরসহ আশপাশের সব এলাকায়।
এই বিপর্যয় থেকে ঢাকার কেরানীগঞ্জ, ডিএনডি এলাকা, ডেমরা, পূর্বাচল, রামপুরা, বাড্ডা, মিরপুর, হাজারীবাগ এবং আশুলিয়া-সাভার রেহাই পায়নি। টঙ্গী, গাজীপুর এবং কাশিমপুর-কালিয়াকৈর এখন মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের শিকার।
আগামীদিনের ঢাকা নগরী পরিবেশ সংরক্ষণ বা পরিবেশ উন্নয়নকে কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করে গড়ে উঠবে, এমন পরিকল্পনার কথাই আমাদের ভাবতে হবে। খসড়া পরিকল্পনা মতে যে ম্যাপ রচনা করা হয়েছে, সেই ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানের অধীনে নগরীর এরিয়া ধরা হয়েছে ১৫২৮ বর্গকিলোমিটার।
তা হলে বর্ধিত এলাকা কতটুকু হবে তা এখনই বলা যাবে না। বর্তমানে শহরে পরিণত এলাকা এই আয়তন থেকে বাদ দিলে যা হবে, তাই হচ্ছে বর্ধিত এলাকা। পত্রিকান্তরে বলাও হয়েছে যে, পরিকল্পিত এই নগরীতে প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো ছাড়াও সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত থাকবে কৃষি এলাকা, বন্যা প্লাবিত এলাকা, সংরক্ষিত জলাধার, খেলার মাঠ ইত্যাদি।
উন্নত হবে পরিবেশ এবং রাজধানীর ভূমি ব্যবহারের সাথে জড়িত থাকবে একটি আধুনিক ও সুদূর পরাহত পরিকল্পনা। পরিকল্পিত কৃষি এলাকা নগরীর অন্তর্ভুক্ত থাকবে জেনে খুবই ভালো লাগছে। এজন্য ভালো লাগছে যে, উল্লেখিত এলাকাসমূহের অন্তর্গত সকল কৃষি ভূমি অনাদিকাল থেকে দেশের শ্রেষ্ঠ কৃষি ভূমির অন্যতম ছিলো।
প্রায় সকল ভূমিই ছিলো দো’ফসলি, পরবর্তীতে এসব ভমি পরিণত হয় তে’ফসলি ভূমিতে। যেসব জমিতে ফসল হয়, সেগুলো ধান, পাট, গম, রবি শস্য (যথা সরিষা, মসুর, মুগ, খেসারী, পেঁয়াজ, রসুন, আলু, শাক-সবজি, মরিচ প্রভৃতি) উৎপাদনের জন্য খুবই উপযোগী।
সংরক্ষণ করতে পারলে সে উপযোগিতা অব্যাহত থাকবে। বরং সে উপযোগিতা আরো বাড়ানো সম্ভব। অতএব এই উপযোগিতা ধরে রাখতে হবে এবং কাজে লাগাতে হবে। একই সময় এসব ভূমির বর্তমান মূল্য আকাশ চুম্বি। যে ব্যক্তি এক চিলতে জমি বিক্রি করতে পারে, তার মূল্য অত্যন্ত উচ্চ।
সেই জমিটুকু থেকে যে ফসলাদি পাবে, বিক্রি করলে কাঁচা পয়সার হিসেবে অনেক বেশি হবে। এখানেই সরকারের বা রাজউক-এর ভূমিকা। এই মূল্যবান জমিগুলো যেভাবেই হোক রক্ষা করতে হবে। এই কর্মসূচিতে কৃষি জমি উন্নয়ন বার্তা সংরক্ষণ অন্তর্ভুক্ত করে থাকলে খুবই ভালো হয়।
আর তা না থেকে থাকলে সকল কৃষি জমিই সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইন পাশেরও প্রয়োজন আছে। কোন অবস্থাতেই যেনো কৃষি ভূমি ধ্বংস করা না হয়। উন্নতমানের একখন্ড কৃষি ভূমি অমূল্য সম্পদ। টাকার হিসেবে এই মূল্য কেবল বাড়ছেই।
তাই এসব জমি কোন মূল্যের বিনিময়েই নগর গড়ার (অর্থাৎ বাড়িঘর নির্মাণের) কাজে লাগানো সঠিক হবে না। খুবই বড় ভুল হবে। এই সেদিনও আমি গাজীপুর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন একটি গ্রামে আমার কিছু আপনজনদের বলেছি, বাড়িঘর নির্মাণ করে এই উন্নতমানের জমি যেন বিনষ্ট করা না হয়।
বাড়িঘর নির্মাণ করলে জমির মূল্য সঠিকভাবে পাওয়া যাবে না, যেটা অনাগত দিনগুলোতে ফসল (ধান, পাট, গম, রবিশস্য) থেকে পাওয়া যাবে। তা ছাড়া গৃহ নির্মাণের জন্য ফসলি জমি ব্যতিরেকে অন্যান্য ভমি ব্যবহার করা যায়। এখন একটি পরিবার যেখানে একবিঘা জমির ওপর বাড়ি করেছে।
ঐ পরিবারে পাঁচটি ভাই, দুইটি বোন থেকে থাকলে, সকলে ঐ একবিঘার ওপরই বাড়িঘর নির্মাণ করতে পারবে। আমার আপনজন যারা কথাটা বুঝতে পেরেছেন। তারা সে চেষ্টা করবেন কথাও দিয়েছেন। কিন্তু এ কথাও তারা কেউ কেউ বলেছেন আসলে আগামীতে এই জমি থাকবে না।
অতো ভাবনা-চিন্তা করার সময় আবার অনেকের নেই। অধিকাংশই চায় কাঁচা পয়সা, নগদ পয়সা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আধুনিক ঢাকা গড়ার নামে, মহানগরী বিস্তৃত করার মাধ্যমে আমরা উন্নতমানের ফসলি জমিগুলো কাঁচামূল্যে ঢেকে ফেলছি হয়তো। বিষয়টি গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে।
যে ভূমিতে ফসল হবে না বা আর হবার যোগ্য নেই, যে ভূমি কোনদিনই ফসলি জমি ছিলো না, যে ভূমি আধাপাকা ঘরদোর নির্মাণ করে ঢেকে রাখা হয়েছে, সেগুলো গৃহায়নের জন্য বা শিল্প কারখানা গড়ে তোলার জন্য কাজে লাগানো যায়।
তা ছাড়া আমাদের ভূমি সম্পদ বা আবাদি জমির যে পরিমাণ, তাতে ঢাকা শহরের বর্তমান বিস্তৃতির আশপাশে, যথা- কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, টঙ্গী, কালিয়াকৈর, সাভার এসব এলাকার হাজার হাজার একর জমির বর্তমান পরিচয় কিন্তু অত্যন্ত উর্বর ফসলি জমি।
এই জমিগুলো ফসলের জন্য বাঁচিয়ে রেখে বাকী জমি নগরায়ন শিল্প কারখানা, খেলার মাঠ প্রভৃতি নির্মাণের জন্য ব্যবহার করা উচিত। সামনে এসে যায় মিরপুর, মাদারটেক, বাড্ডা, রামপুরা, ডেমরা, কাঁচপুর এলাকার কিছু কিছু অনুন্নত ভূমির চিত্র (নগরায়ন প্রক্রিয়ায় যেগুলো এখন অনুন্নত)।
এসব ভূমি উন্নত করে অবশ্যই পরিকল্পিত গৃহায়ণে কাজে লাগানো প্রয়োজন। হাজারীবাগের টেনারী শিল্প কারখানাগুলো সিঙ্গাইর এলাকায় স্থানান্তরের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এগুলো যতোদ্রত সরিয়ে নেয়া যায় ততোই মঙ্গল।
ভালোভাবে যাচাই করে দেখলে দেখা যাবে, এখনো বৃহত্তর ঢাকায় হাজার হাজার একর জমি গৃহায়ণে কাজে লাগাবার উপযুক্ত অথচ অপরিকল্পিত বস্তিতে পরিণত করে রাখা হয়েছে। অতএব প্রস্তাবিত ‘ড্যাপ’ পরিকল্পনার বিষয়ে আরো অনেক ভাবনা-চিন্তার প্রয়োজন রয়েছে।
নগরায়ন নিয়ে যখন কথা হচ্ছে, তখন মনে রাখতে হবে যে সারাদেশে গৃহায়ণ ও শিল্প-কারখানা গড়া, স্কুল-কলেজ, খেলার মাঠ, পার্ক, বিনোদন কেন্দ্র ইত্যাদি নির্মাণের জন্য গোটা দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা ও ভূমি ব্যবহারের জন্য একটি নীতি প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। আমাদের ভূমি-স্বল্পতার কারণেই এটা প্রয়োজন।
নীতিতে এটা থাকা চাই যে, কোন অবস্থাতেই যেনো আমরা ফসলি জমিকে বাড়ি-ঘর নির্মাণ বা অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণে অবিবেচকের মতো ব্যবহার না করি। এরই অন্য রূপ হবে জাতীয় গৃহায়ণ তথা নগরায়ন নীতি। ঢাকা নগরীর পরিসর বৃদ্ধি নিশ্চয়ই একটি জাতীয় নগরায়ন নীতির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা যায়।
যেসব কারলে ঢাকা নগরীর সম্প্রসারণ জরুরি, যথা জনবিস্ফোরণ, বাসস্থান সঙ্কট, যানজট, পরিবেশ বিপর্যয়-এসবের প্রকটতা দিনদিন বাড়বেই। দেশের ফসলি জমি কিন্তু বাড়বে না। ফসলি জমি সুরক্ষা করাও অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ঢাকা মহানগরী সপ্রসারিত করার জন্য উল্লেখিত এলাকাসমূহের যে ভূমি সম্পদ আওতায় পড়বে, সে ভূমি সম্পদ দেশের সেরা ফসলি জমির মধ্যেই বিশেষ মূল্যবান। তার অধিকাংশই তেফসলি এবং বন্যা মুক্ত। সামান্য কিছু স্থান বন্যার কবলে পড়ে, সেসব স্থান বন্যামুক্ত রাখা সম্ভবও।
বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালুনদী, শীতলক্ষ্যা এবং ধলেশ্বরী নদীর জলস্রোত সচল সঠিক রাখতে পারলে এসব যায়গা বন্যামুক্ত রাখার কঠিন ব্যাপার নয়। ঢাকা নগরীকে বন্যামুক্ত রাখা জন্যও একই ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হবে।
তবে ঢাকা নগরীর পুরাতন খালগুলোকে আশু সংস্কার ও অবৈধ দখলমুক্ত করতে হবে।
আমার মনে হয়, ঢাকা নগরীর বিস্তার উত্তর দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব থেকে উত্তর পশ্চিমে বাড়াবার যে পরিকল্পনার কথা ’ড্যাপ’-এর সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে, তাতে ফসলি জমি সুরক্ষার কাজটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে, একথাও মনে রাখতে হবে যে, ঢাকাকে যতোই বড় করা হবে ততোই বড় হবে।
জনস্রোত ঢাকার দিকে ততোই বাড়বে। ঢাকার দিকে জনস্রোত হ্রাস করতে হলে তাই বর্তমানে যেসব এলাকা নিয়ে ঢাকা নগরী গড়ে উঠেছে, তার সুসম ও সুপরিকল্পিত উন্নয়ন করতে হবে। সেসব এলাকার নাগরিক সুবিধাসমূহ নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকার আশপাশে যেসব শহর রয়েছে, যথা মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, মুন্সিগঞ্জ, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ- এসব শহরকে সুপরিকল্পিত রূপে গড়ে তুললে ও ঢাকার অভ্যন্তর থেকে কিছু কিছু সরকারি দপ্তর এসব জেলাশহরে স্থানান্তর করা হলে, মূল ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ অনেকটা কমে যাবে।
এসব জেলাশহরেও পানি নিষ্কাশন, পয়ঃনিষ্কাশন, যানজট, অপরিকল্পিত গৃহায়ন ইত্যাদি সমস্যা প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। তবে বার বার একটি কথাই ওঠে আসে যে, সারাদেশের গৃহায়ন ব্যবস্থা অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও সুসমন্বিতভাবো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
সকল প্রচেষ্টার মধ্যে এ ব্যবস্থাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে যে, কোনরূপেই যেনো ফসলি জমি নগরায়ন তথা গৃহায়নের শিকার না হয়। দেশের শিল্পায়ন, গৃহায়ন ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণে বিষয়টিকে সবার ওপরে স্থান দিতে হবে। জমির স্বল্পতার কারণে সারাদেশের জমি ব্যবহারে একটা সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা অবশ্যই কাজ করবে।
(লেখক: বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ)
