পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) কর্তৃক প্রস্তুতকৃত এবং বিতরন করা প্রতিদিনের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সামারি শিটের দিকে তাকালে দেখা যায়, গ্যাসস্বল্পতার কারণে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রেখে বা আংশিক ক্ষমতায় চালিয়ে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো পূর্ণ ক্ষমতায় চালানো হচ্ছে। সাম্প্রতিককালে এ ব্যবস্থায়ই বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। কিন্তু উল্টোটা কখনো করা হয় না। এতে একদিকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড তথা সরকারি অর্থে সার্বক্ষনিক ও পূর্ণ মাত্রায় চালানোর পরিকল্পনা নিয়ে স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্লান্ট সক্ষমতা কমছে, অন্যদিকে বেসরকারি উদ্যোগে স্থাপিত ইউনিটগুলোর প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর শতভাগের দিকে এগোচ্ছে। গত বছরের ১ এপ্রিলের সামারি শিটটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ওই দিন রাউজান স্টিম ২ঢ২১০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট গ্যাসস্বল্পতার কারণে বন্ধ ছিল এবং রাউজানের একটি ইউনিট, ঘোড়াশালের সব ইউনিট, সিদ্ধিরগঞ্জের ইউনিট, আরপিসিএল, ময়মনসিংহের পাঁচটি ইউনিট গ্যাসস্বল্পতার কারণে উৎপাদনক্ষমতার চেয়ে কম ক্ষমতায় চালানো হয়েছে। এতে আমরা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।
প্রথমত, প্লান্টগুলোর যে উৎপাদন সক্ষমতা তার চেয়ে কম উৎপাদন করায় ও সেভাবে চালানোর ফলে সরকারি কেন্দ্রগুলোর দক্ষতা কমে যাচ্ছে এবং প্রতি ইউনিটের উৎপাদনমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, পূর্ণ ক্ষমতায় চালালে যে অতিরিক্ত ইউনিট উৎপাদিত হতো, তা বিক্রি করে সরকার লাভবান হতো। তৃতীয়ত, সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুতের মূল্য অপেক্ষা আইপিপি থেকে বেশি মূল্যে বিদ্যুৎ ক্রয় করে তা আবার কম মূল্যে বিক্রি করে বিউবো আরেক দফা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে দৈনিক আমাদের কত টাকা লোকসান হচ্ছে? জিডিপিতে এর কী প্রভাব পড়ছে? ব্যক্তিমালিকানায় আরও বিদ্যুৎ (রেন্টাল ও আইপিপি) স্থাপিত হতে যাচ্ছে। এগুলো চালাতে গ্যাস কোম্পানিগুলোকে চুক্তি মোতাবেক গ্যাস সরবরাহ করতে হবে। তখন হয়তো বিউবো ও আরইবির জন্য গ্যাস বরাদ্দ আরও কমে যাওয়ায় সরকারি কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা আরও কমবে, ঠিক এখন যেমনটি হচ্ছে। আমরা কি তাহলে আরেকধাপ লোকসানের দিকে এগোচ্ছি?
পত্রিকায় পড়েছি, বিগত চার দলীয় জোট সরকারের আমলে প্রভাব খাটিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের আওতায় বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে প্রচুর বৈদ্যুতিক পোল স্থাপন করা হয়েছে। শুধু পোল দাঁড় করালেই তো চলবে না, উৎপাদনস্বল্পতার কারণে গ্রাহকরা বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। পোলগুলো নীরব-নিথর দাঁড়িয়ে থেকে দুর্নীতির সাক্ষী দিয়ে যাচ্ছে। পোল, তার ও পিটিংস ক্রয়ের এই বিনিয়োগ ফেরত আসছে না। কিন্তু গরিব জনগণকে আসলসহ সুদের কিস্তি ঠিকই সময়মতো পরিশোধ করতে হচ্ছে। ব্যক্তিমালিকানায় যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে, সেগুলো চালাতে গিয়ে গ্যাসস্বল্পতার কারণে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পরিণতি কি পোলের মতোই হবে? কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ক্রয়কৃত খুচরা যন্ত্রাংশগুলোরইবা কী হবে? হয়তোবা মরিচা পড়ে ওগুলো একদিন নিলামযোগ্য হবে। কিন্তু ঋণের বোঝা জনগণকেই বহন করতে হবে।
স্থাপনযোগ্য গ্যাসভিত্তিক রেন্টাল বা আইপিপি কেন্দ্রগুলো চালু করতে যে পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করতে হবে, সরকারি কেন্দ্রগুলোতে যদি সমপরিমাণে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আমরা আমাদের মূল লক্ষ্য উৎপাদন বাড়ানো বা লোডশেডিং কমানো হাসিল করতে পারছি না। সমস্যাগুলো সংশ্রিষ্টদের জানা, সমাধান কী, তাও অনেকে জানেন। কিন্তু সময়ের চাকায় আমরা আটকে পড়েছি। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না নেওয়ার কারণে বা তথ্য বিভ্রাটের কারণে বর্তমানকালের কিছু সিদ্ধান্তে আমরা উপকৃত হতে পারছি না।
বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানোর ফলে বিউবো/আরইবি দৈনিক প্রচুর পরিমাণে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এক হিসাবে দেখা গেছে, ১ এপ্রিল ২০০৮ তারিখে কম ক্ষমতায় চালানো বা একেবারে না চালানোর ফলে বিউবো ওই দিন এক কোটি ৬১ লাখ ৪৭ হাজার ২৫০ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারেনি। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের বিউবো অর্থ পরিদপ্তরের একটি হিসাব থেকে দেখা যায়, ওই দুই মাসে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে ১৭২ কোটি আট লাখ ৫৬ হাজার ১২১ ইউনিট বিদ্যুৎ ৫৮১ কোটি ৪৭ লাখ ৮৪ হাজার টাকায় ক্রয় করা হয়েছে, অর্থাৎ প্রতি ইউনিটের ক্রয়মূল্য পড়েছে ৩ দশমিক ৩৭৯ টাকা। বিউবোর ২০০৬-০৭ অর্থবছরে বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদনব্যয় ১ দশমিক ০৮ টাকা। ৭ দশমিক ০৩ শতাংশ ক্ষতিসহ সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি ব্যয় ১ দশমিক ১৫৬ টাকা। সে মোতাবেক গ্যাসের অভাবে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রেখে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর ফলে বছরে সরকারের ২.২২৩ ঢ ১৬১৪৭২৫০ ঢ ৩৬৫=এক হাজার ৩১০ কোটি ১৭ লাখ ৯৭ হাজার ৯১৩ টাকা লোকসান হয়, যা দ্বারা বছরে প্রায় ২০০ মেগাওয়াটের একটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা সম্ভব। অবচয় বিবেচনায় আনলে লোকসানের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। ইউনিটগুলো বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করা ছাড়াও অর্থনীতিতে এর বহুবিধ প্রভাব আছে। সমতা রক্ষার্থে একই পাইপলাইনে অবস্িথত সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বর্তমান ক্ষমতার আনুপাতিক উৎপাদন ক্ষমতায় সমান প্লান্ট সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করার ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
বিদ্যুৎ খাতে বিড়ম্বনা বেড়ে বর্তমানে পাহাড় সমান হয়েছে। এর একটাই সমাধান, তা হলো−অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি না করা, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া।
আতহার উদ্দিন তালুকদার: প্রকৌশলী।
