যৌথ নেতৃত্ব নাকি নেত্রী নির্ভরতা? - বিভুরঞ্জন সরকার

৩১ জুলাই শুক্রবার মন্ত্রিসভায় নতুন ছয় জন সদস্য অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। একজন পূর্ণমন্ত্রী, পাঁচ জন প্রতিমন্ত্রী। মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ ও পুনর্গঠন নিয়ে মাসখানেক ধরেই জল্পনা-কল্পনা চলছিল। সম্ভাব্য কারা মন্ত্রী হতে পারেন তাদের নামও পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। যদিও এসব পূর্ব অনুমান বেশিরভাগই সঠিক হয়নি। ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনের পর ৬ জানুয়ারি ৩২ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নিয়ে গঠিত হয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভা। ২৪ জানুয়ারি শপথ নেন আরও ছয় জন প্রতিমন্ত্রী। সর্বশেষ ৩১ জুলাই ছয়জন অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা ৪৪ জন হওয়ার কথা থাকলেও এরমধ্যেই কিছুটা নাটকীয়তার পর একজন বাদ পড়েছেন।

মন্ত্রিসভার বাদ যাওয়া সদস্য হলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ। ফলে বর্তমানে মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৩। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, মন্ত্রিসভায় আরও কয়েকজন অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। এটা সবাই জানেন যে সরকারের কাজে গতিশীলতা আনার জন্যই সাধারণত মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ এবং পুনর্গঠন করা হয়ে থাকে। কিন্তু সর্বশেষ অন্তর্ভুক্তি ও দপ্তর পুনর্বণ্টনের মধ্য দিয়ে সরকারের কাজে কতটা গতিশীলতা আসবে সে ব্যাপারে রাজনৈতিক পর‌্যবেক্ষকদের মধ্যে যেমন সংশয় আছে তেমনি সাধারণ মানুষও রয়েছে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে। কারণ বর্তমান মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্যের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে অনেকেরই তেমন ধারণা নেই। গত সাত মাসে মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যের আন্তরিকতা অনেকের কাছে স্পষ্ট হলেও এদের মধ্যে কয়জন শেষ পর‌্যন্ত সফল মন্ত্রী হিসেবে পরিচিতি পাবেন, সেটা বলার মতো সময় এখনো আসেনি।

এটা ঠিক যে শেখ হাসিনা মন্ত্রিসভা গঠন করে চমক দেখিয়েছেন। এই চমকের মন্ত্রিসভা মহাজোটের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কতটুকু সক্ষম হবে, তা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সাত মাসে মন্ত্রীদের পারফরমেন্স নিয়ে মানুষের মন থেকে সব সংশয় দূর হয়েছে তা নয়। বর্তমান সরকারের এই স্বল্প সময়ে মন্ত্রীদের কাজকর্ম মানুষের মনে কতটুকু ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পেরেছে_ সেটা একটি বড় প্রশ্ন হয়েই আছে। মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের পর বহুল প্রচারিত একটি জাতীয় দৈনিকে অনলাইনের জরিপের যে ফল প্রকাশিত হয়েছে সেটা সরকারের জন্য কিছুটা সতর্ক সংকেত বৈকি! পত্রিকাটির পক্ষ থেকে পাঠকদের কাছে প্রশ্ন করা হয়েছিল, মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ সরকারের কাজে গতি আনবে বলে মনে করেন কি? হ্যাঁ জবাব দিয়েছেন মাত্র ৩০.৪৭ শতাংশ পাঠক এবং না জবাব দিয়েছেন ৬৬.৭০ শতাংশ। (প্রথম আলো, ৩ আগস্ট ২০০৯)। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ পাঠক মনে করেন মন্ত্রিসভার সর্বশেষ সম্প্রসারণেও সরকারের কাজে গতি আনবে না। অন্যদিকে আরেকটি বাংলা দৈনিকে অনলাইন জরিপে প্রশ্ন করা হয়েছিল : মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণে সরকারের ব্যর্থতার প্রতিফলন ঘটেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। আপনি কি তার সঙ্গে একমত? এই প্রশ্নের হ্যাঁ জবাব দিয়েছেন ৭০.৪২ শতাংশ পাঠক এবং না মাত্র ২৭.১০ শতাংশ। (যুগান্তর, ৩ আগস্ট ২০০৯)। অর্থাৎ বিএনপি নেতার বক্তব্যের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন অধিকাংশ পাঠক_ যাদের অধিকাংশ নিশ্চয়ই ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিএনপিকে ভোট দেয়নি। মানুষের মনোভাবে যে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে সেটা লক্ষণীয়।

সরকার এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, এমনকি কোন কোন রাজনৈতিক পর‌্যবেক্ষকও হয়তো দুটি দৈনিক পত্রিকার এই অনলাইন জরিপের ফল থেকে বিচলিত হওয়ার কোন উপাদান খুঁজে পাবেন না। কোন একটা ইস্যুতে হয়তো মানুষ সরকারকে সমর্থন করবে, আবার কোনো ইস্যুতে বিরোধিতা। এটা কোন অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। সেজন্য সরকার এবং তার সমর্থকদের পক্ষ থেকে হয়তো এখনও উচ্চস্বরেই বলা হবে, সরকার যা করছে ঠিক করছে, সরকার ঠিক পথেই চলছে। ঘাবড়াও মাত! বিচলিত হওয়ার মতো কিছু হয়তো এখনো ঘটেনি, তবে চোখ কান খোলা রেখে সতর্কতার সঙ্গে পথ চলা যে খুবই দরকার_ এটা জোর দিয়েই বলা যায়। এটা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই যে, মানুষ অনেক আশা নিয়ে আওয়ামী লীগ এবং তার সহযোগীদের অর্থাৎ মহাজোটকে ভোট দিয়েছে। বিএনপি যদিও বলছে যে বিশেষ ব্যবস্থায় মহাজোটকে জেতানো হয়েছে কিন্তু বাস্তবে সেটা কেউ বিশ্বাস করে না। বিএনপি-জামায়াত জোটের পাঁচ বছরের দুঃশাসন এবং তাদের ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার জন্য ভূয়া ভোটার তালিকা তৈরিসহ নানামুখী উগ্র অপতৎপরতার পরিণতিতে দেশে জরুরি অবস্থা জারি হওয়ায় মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আওয়ামী লীগকে বিপুলভাবে ভোট দিয়েছে পরিবর্তনের প্রত্যাশা থেকে। মানুষ আশা করেছে, এবার আওয়ামী লীগ পুরনো ধারায় দেশ শাসন করবে না। সত্যি সত্যি দিন বদলের পক্ষে থাকবে, কাজ করবে_ যে অঙ্গীকার তারা নির্বাচনের আগে করেছে। দলীয়করণ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, লুটপাট, দখলদারির দুষ্টচক্র থেকে দেশবাসী মুক্তি পাবে। দেশের মানুষকে বঞ্চিত করে ক্ষমতাসীনরা নিজেদের ভাগ্য বদলের জন্য মরিয়া হয়ে উঠবে না। সরকার পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হবে।

কিন্তু মানুষ বাস্তবে যা দেখছে তাতে খুব বেশি খুশি হতে পারছে বলে মনে হয় না। কিছু কিছু ঘটনা মানুষের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা ও আবাসনের জন্য যে আইন করা হয়েছে তার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সোহেল তাজের পদত্যাগের ঘটনা নিয়ে যে রহস্যময়তার সৃষ্টি করা হয়েছে, সেটাও শেষ বিচারে সরকারকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারে। সোহেল তাজ বিদেশে বসে সংবাদ মাধ্যমের কাছে বলেছেন, 'বাংলাদেশের কোনো কিছুরই পরিবর্তন হবে না, খেলা একই আছে, খেলোয়াড় বদলেছে মাত্র।' সোহেল তাজের ব্যাপারে সরকারিভাবে কোন বক্তব্য দেওয়া হয়নি। তিনি কেন পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন সে সম্পর্কে নানা ধরনের কথা শোনা যাচ্ছে। প্রকৃত ঘটনা জানানো না হলে এ নিয়ে গসিপ চলতেই থাকবে। প্রথমে শোনা গিয়েছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে নাকি তার বনিবনা হচ্ছে না। এখন শোনা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা এবং শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের সঙ্গে বিবাদের জের ধরেই নাকি সোহেল তাজ পদত্যাগ করেছেন। সোহেল তাজের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মনোভাব ইতিবাচক বলেই মনে হয়। তারপরও সোহেল তাজ কেন বললেন যে, 'আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে মন্ত্রিত্ব করার লোক আমি নই।' সোহেলের বক্তব্যকে একজন অতি আবেগপ্রবণ অথবা 'গরম মাথা'র মানুষের উক্তি বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। সংসদ উপনেতা ও আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেত্রী সাজেদা চৌধুরী সোহেল তাজকে 'বাচ্চা মানুষ' বলে উল্লেখ করে যথার্থ কাজ করেছেন কি? সোহেলের বয়স প্রায় ৪০ বছর। এর কাছাকাছি বয়সের অনেকেই দেশে-বিদেশে রাজনীতিতে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। এমন কি সোহেল তাজের বাবা তাজউদ্দীন আহমেদ, মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব যখন পালন করেছিলেন তখন তার বয়স ছিল ৪৪ বছর। বিল ক্লিনটন, বারাক ওবামা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন সোহেল তাজের কাছাকাছি বয়সেই। বাংলাদেশে একজন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফরহাদ পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন মাত্র ৩৫ বছর বয়সে। সে বিবেচনায় সোহেল তাজ মোটেও 'বাচ্চা' নয়।

সোহেল তাজের পদত্যাগের প্রসঙ্গে অনেকেই স্মরণ করছেন তার বাবা তাজউদ্দীন আহমদের বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভা থেকে বিদায়ের ঘটনাটি। তাজউদ্দীন আহমেদ ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘদিনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সহকর্মী। মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তাজউদ্দীন আহমেদ যে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিলেন তা সবারই জানা। কিন্তু স্বাধীনতা লাভের পর এই দুই নেতার মধ্যে সৃষ্ট দূরত্বের পরিণতি বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য মোটেও ভাল হয়নি। তাজউদ্দীন আহমেদ মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছিলেন নাকি তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছিল সে প্রশ্নেরও মীমাংসা হয়নি। সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতার স্বার্থেই সোহেল তাজের পদত্যাগ-রহস্য উন্মোচিত হওয়া উচিত। তাজউদ্দীন আহমেদ এবং সোহেল তাজের বিষয়টিকে নিশ্চয়ই এক পাল্লায় মাপা যাবে না। তবে সোহেল তাজের ঘটনাকে একেবারে তাৎপর‌্যহীন বলে মনে করাও ঠিক হবে না। রাজনীতিতে ছোটবড় সব ঘটনারই কিছু না কিছু অভিঘাত থাকে। সোহেল তাজের পদত্যাগের আসল কারণ সবার কাছে স্পষ্ট নয় বলে কেউ কেউ মনে করছেন যে দায়িত্ব গ্রহণের পাঁচ মাসের মাথায় পদত্যাগ করে সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে তিনি ঠিক কাজ করেননি। তার উচিত ছিল আরো অপেক্ষা করে পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে আনার জন্য আরো সচেষ্ট হওয়া। তিনি অল্পতেই হাল ছেড়ে দিয়ে এক ধরনের পলায়নপর মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন।। কিন্তু দিন যত যাবে মানুষের ভাবনা সেক্ষেত্রে ততই পরিবর্তন আসবে। বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসনামল থেকে বর্তমান সময়ের গুণগত পরিবর্তন যদি মানুষের কাছে দৃশ্যমান না হয় তাহলে সোহেল তাজের প্রতি সমর্থন বা সহানুভূতির পাল্লা ভারি হলেও হতে পারে।

দুই.

মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের আগের দিন অর্থাৎ ৩০ জুলাই আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাম-লী, সভাপতিম-লী এবং সম্পাদকম-লীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। ২৪ জুলাই কাউন্সিল অধিবেশনে এই নেতৃত্ব নির্বাচনের কথা থাকলেও তা হয়নি। আওয়ামী লীগের এই নেতৃত্ব নিয়ে দলের মধ্যেই শুধু নয়, দলের বাইরেও রাজনীতি সচেতন সব মহলে দারুণ আগ্রহ ও কৌতূহল ছিল। বলা হয়েছে, কাউন্সিলরদের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নাম চূড়ান্ত করেছেন সভানেত্রী শেখ হাসিনা। ঘোষণার আগে তিনি এনিয়ে দলের নতুন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও বিশ্বস্ত আরো দু'একজনের সঙ্গে কথা বলেছেন। সম্মেলনের পর কাউন্সিলররা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে গিয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কিছু মতামত জানিয়েছেন। এই কনসালটেশন বা আলাপ-আলোচনাকে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বলে উল্লেখ করেছেন। তবে কনসালটেশনের গণতন্ত্রে মানুষ কতটা খুশি হয়েছে সেটা একটা বড় প্রশ্ন। বিষয়টি নিয়ে নানাজন নানাভাবে মূল্যায়ন-বিশ্লেষণ করছেন।

দীর্ঘ সাত বছর পর সম্মেলন করে আওয়ামী লীগ যতটা চাঙ্গা হয়েছে, কমিটি ঘোষণার পর দলের সব পর‌্যায়ের নেতাকর্মীরা ততটা উৎফুল্ল আছে কি-না বলা মুশকিল। আওয়ামী লীগের একজন পরম হিতাকাঙ্ক্ষী বলে পরিচিত লন্ডন প্রবাসী প্রবীণ সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর লেখা পড়ে জানা যায়, নতুন কমিটি ঘোষণার পর দলের নানা স্তরের নেতাকর্মীরা নাকি বিভিন্নভাবে তার কাছে তাদের মনের হতাশা ও অসন্তোষ ব্যক্ত করেছেন (ইত্তেফাক, ২ আগস্ট ২০০৯)। এট খুব আশার কথা নয়। নেতাকর্মীদের হতাশা ও অসন্তোষের সুযোগ নিতে পারে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। সরকারকে বিপাকে ফেলার জন্য ষড়যন্ত্র যে চলছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সরকারের পেছনে যখন রাজনৈতিক শক্তির সংহত সমর্থন বেশি প্রয়োজন তখনই আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব থেকে প্রভাবশালী ও প্রবীণ কয়েকজন নেতাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এদেরকে আওয়ামী লীগের স্তম্ভ বলেই ধারা করা হতো। এরা হলেন আমির হোসেন আমু, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এবং আবদুল জলিল। প্রেসিডিয়াম থেকে প্রমোশন দিয়ে তাদের উপদেষ্টাম-লীতে ঠাঁই দিয়ে বাস্তবে তাদের অকার‌্যকর করে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও গত সম্মেলনে দায়িত্ব পাওয়া সাতজন সাংগঠনিক সম্পাদকই এবার পদ হারিয়েছেন। নেতৃত্ব-কাঠামো থেকে ছিটকে পড়েছেন গত কমিটির যুগ্ম সম্পাদক মুকুল বোসও। এদের অনেকেই ছিলেন তুখোড় ছাত্রনেতা। সম্পাদকম-লী থেকেও দু'একজন বাদ পড়েছেন। যারা বাদ পড়েছেন তাদের ব্যাপারে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের নাকি প্রবল আপত্তি ছিল। বাদ পড়াদের প্রায় সবাই জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর 'সংস্কারপন্থি' হয়েছিলেন। অভিযোগ হচ্ছে, এরা দুঃসময়ে দলকে দুর্বল করার ষড়যন্ত্রের অংশীদার হয়েছিলেন। শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার প্রক্রিয়ায় উৎসাহ জুগিয়েছেন, কাজেই আওয়ামী লীগে তাদের ঠাঁই হতে পারে না। শেখ হাসিনা কাউন্সিলের বক্তৃতায় 'ক্ষমা'র কথা বললেও কাউন্সিলরা নাকি ক্ষমার বিরুদ্ধে। সেজন্যই নাকি শেখ হাসিনা কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।

তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতামত উপেক্ষা করে নেতৃত্ব নির্বাচন করলে দলের গতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। আশা করা হচ্ছে, তৃণমূল নেতাদের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে আওয়ামী লীগের যে নতুন নেতৃত্ব বাছাই করা হয়েছে তারা দলকে এবং দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে নতুন ইতিহাস তৈরি করবেন। রাজনৈতিক পর‌্যবেক্ষক-বিশ্লেষকরা কিন্তু আওয়ামী লীগের নতুন কমিটিতে যেসব নতুন মুখ আনা হয়েছে তা দেখে খুব আশ্বস্ত হতে পারছেন না। নবীন-প্রবীণের সংমিশ্রণে নেতৃত্ব পুনর্গঠনে কারও আপত্তি জানানোর কিছু নেই। প্রবীণের অভিজ্ঞতা ও নবীনের উদ্যমই যে কোনো রাজনৈতিক দলের বড় সম্পদ। কিন্তু প্রবীণ হিসেবে এবার যারা আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়ামে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন তাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা সম্পর্কে অন্যরা তো দূরের কথা, দলের সব নেতাকর্মী কি খুব বেশি কিছু জানেন? নতুন যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাদের আনুগত্য নিয়ে হয়তো প্রশ্ন নেই কিন্তু রাজনীতিতে তাদের অবদান ও ভূমিকা কতটুকু উজ্জ্বল সে প্রশ্ন অনেকের মনেই আছে। যারা তাদের যোগ্যতাবলে এতদিন জেলা কমিটির সভাপতিও হতে পারেননি, তারাই এসে গেলেন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের শীর্ষে। এই ধরনের উল্লম্ফনের ফলে দলের মধ্যে যৌথ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার চেয়ে নেত্রীর ওপর নির্ভরতার মাত্রা আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে শেখ হাসিনার ওপর চাপ পড়বে। এটা সময়ের চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দেখা দিতে পারে। নেতৃত্ব নির্বাচনটা আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও সাধারণ মানুষ এ নিয়ে নিস্পৃহ থাকতে পারে না এ কারণেই যে এই দলের রাজনীতি জনজীবনকে নানাভাবে প্রভাবিত করে থাকে। সে জন্যই আওয়ামী লীগের নিজস্ব বিষয়েও মানুষের এত আগ্রহ-কৌতূহল। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যাদের বসানো হলো তারা দলীয় নেত্রীকে কতটুকু ঝুঁকিমুক্ত করতে পারেন_ সেটাই এখন মানুষের দেখার বিষয়।

Comments

SalimC's picture

গণতন্ত্রের জন্য আবারও বিপদ !!!

গণতন্ত্রের জন্য বিপদ সংকেত?
ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতা, গণতন্ত্রের জন্য বিপদ সংকেত
যে কোন গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, জনমতের গতি-প্রকৃতি বিচার করে পলিসি নির্ধারণ করা। দ্বিতীয়তঃ একটি গণতান্ত্রিক সরকার কখনও সরকার ও জনগণের মধ্যকার সেতুবন্ধন রচনার ‘ফোর্থ এস্টেট' বা গণমাধ্যমের মূল্যায়নকে সরকারি পলিসিতে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। কিন্তু বিগত নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়ে সরকার গঠন করার সুবাদে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কার্যত নির্বাচিত স্বৈরাচারের ভূমিকা গ্রহণেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। এক অর্থে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর মরহুম পিতার চেয়েও ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে ও প্রতিপক্ষ দমনে নিষ্ঠুর এবং কঠোর। মরহুম শেখ মুজিবের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মানস-প্রকৃতি এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে মানবিকতার সম্পর্ক রক্ষার সামন্তবাদী উদারনৈতিকতা তাঁর কাছে প্রতিপক্ষের জন্যও নিরাপত্তার আশ্রয় তৈরি করে রেখেছিল। কিন্তু প্রথমতঃ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মূলত একজন নারী। আর সে হিসেবে তাঁর স্বাভাবিক কিছু সীমাবদ্ধতাও হয়তো রয়েছে। দলীয় রাজনীতির বৃত্তের বাইরে এসে প্রতিপক্ষীয় রাজনীতিকদের সাথে সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে এটা হয়তো বাধা। দ্বিতীয়তঃ শেখ হাসিনা পঁচাত্তরে তার পারিবারিক বিপর্যয় ও ট্রাজেডিকে রাজনৈতিকভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি গোটা বিষয়কেই তার পিতা ও পরিবারের ওপর শত্রুপক্ষের প্রতিশোধ বলে মনে করেন। তৃতীয়তঃ রাজনৈতিক বাস্তবতার বদলে পঁচাত্তরের ঘটনার মূল্যায়নে ব্যক্তিগত আবেগ ও দলীয় চেতনাকে প্রাধান্য দেয়ার ফলে আওয়ামী লীগের পক্ষে অতীত থেকে শিক্ষা নেবার মানসিকতাও গড়ে ওঠেনি। পঁচাত্তরের অনিবার্যতায় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পাপের কোন আত্ম সমালোচনা তারা করতে পারেনি। বাকশাল গঠন করে বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্রের বদলে একদলীয় ফ্যাসিবাদী সরকার গঠনের বিচ্যুতিকে আওয়ামী লীগ তাদের রাজনৈতিক এক্সপেরিমেন্ট বলে মনে করে এবং এ জন্য তারা কখনও জনগণের কাছে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চায়নি। এটা না করেই আওয়ামী লীগ পঞ্চম সংশোধনীর বহুদলীয় গণতন্ত্রের বেনিফিসিয়ারি হিসেবে দু'বার করে শাসন ক্ষমতায়। যে আওয়ামী লীগের হাতে সংসদীয় গণতন্ত্রের একদা কবর রচিত হয়েছিল, তাদের দাবীতেই কিন্তু ১৯৯১'তে বিএনপি সংবিধান সংশোধন করে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু করে। যদিও প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির সবক'টি সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিয়েছে এবং দু'টি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও তারা জোটগত ও দলগতভাবে প্রার্থিতা দিয়ে প্রতিদ্বনিদ্বতাও করেছে।
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের স্থপতি আঞ্চলিক পর্যায়ে এবং জাতীয়ভাবে রাজনৈতিক বিভক্তি ও রক্তক্ষরণের ক্ষত মুছে একটি নতুন ইতিহাস নির্মাণের প্রত্যাশায় মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক বিরোধীদের যেমন ‘সাধারণ ক্ষমা' ঘোষণা করেন, তেমনি তালিকাভুক্ত ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীকেও মুক্তি দেন। ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার সিমলা চুক্তির চেতনার আলোকেই এটা হয়েছে। এ চেতনাটা ছিল অতীতের তিক্ততা ভুলে একটি শান্তিময় ভবিষ্যতের ভিত্তি রচনায় উপমহাদেশে সখ্য রচনার ব্রত। পরবর্তীকালে ভারত-পাকিস্তান সিমলা চুক্তির প্রসঙ্গ ও চেতনা উল্লেখ করায় বাংলাদেশও প্রকারান্তরে ঐ চুক্তির অংশীদার হয়েছে। ক্ষমা করে দেয়া বা অব্যাহতি দেয়াও বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ। বিচারপ্রার্থী পক্ষ যদি রাজনৈতিক ও মানবিক বিবেচনায় বিচার দাবী প্রত্যাহার করে নেয়, তাহলে সেই একই বিষয়ে নতুন করে বিচার প্রক্রিয়া চলতে পারে না। এটা আইনের নীতিবোধ ও নীতিশাস্ত্রের পরিপন্থী। এখন আওয়ামী লীগ সরকার ‘যুদ্ধাপরাধী'র যে বিচার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে, তার পেছনে কোন বিচারিক যুক্তি ও আইন শাস্ত্রের নীতিবোধের সমর্থন নেই। এর পেছনে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার তাড়না ছাড়া আর কোন কার্যকারণ খুঁজেও পাওয়া যাবে না। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার পিতা যে ইস্যুর নিত্তি করে গেছেন, তাকে পুনরুজ্জীবিত করে তার পিতার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সদিচ্ছারও অবমাননা করছেন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অন্ধত্বে যেসব প্রেসার গ্রুপ আওয়ামী লীগকে প্ররোচিত করছে, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তাদের কোন অবদানও নেই। বরং এই বিদেশী এজেন্টরা নানা প্রেসার গ্রুপ তৈরি করে আওয়ামী লীগের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাবার সুযোগ নিচ্ছে। ১৯৭৫ সালে আওয়ামী লীগের মূলধারার বাইরের যেসব প্রেসার গ্রুপ একদলীয় বাকশাল গঠনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্ররোচনা দিয়েছে, তারা কিন্তু বিপর্যয়ের দায় বহন করেনি এবং দুর্দিনে আওয়ামী লীগের পাশে এসেও দাঁড়ায়নি। এবারেও যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে জাতিকে বিভক্ত ও দেশের স্থিতি বিনষ্ট করার ব্যাপারে সরকারকে বিপথগামী করছে তারা আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ হিসাব-নিকাশের সময়ও পাশে থাকবে না। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দেয়ালের এপিঠের আলো দেখতে পাচ্ছে। অপর পাশের অন্ধকার তাদের দৃষ্টিসীমার বাইরেই রয়ে গেছে। এ কারণেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে আরও দূরদৃষ্টির অধিকারী হতে হবে।
সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারিক কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। বিচার প্রক্রিয়া শুরুর আগেই প্রতিপক্ষীয় রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা ও তথ্য সন্ত্রাসের ওপর ভিত্তি করে তারা যুদ্ধাপরাধী কারা এবং তাদের সংখ্যা কত, তাও নির্ধারণ করে ফেলেছে। একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে মানুষ এমন নৈতিক অধঃপতন আশা করে না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিচারের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের মানদন্ড রক্ষার আহবান জানানো হয়েছে। জাতিসংঘসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় দেশসমূহ ও মানবাধিকার সংগঠন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার আশংকা করেই আন্তর্জাতিক বিচারিক মানদন্ড রক্ষার তাকিদ দিয়েছেন। সরকারের আচরণভঙ্গি ও কার্যক্রমে তারা এটা রক্ষা করতে ইচ্ছুক অথবা সক্ষম, তা কিন্তু বোঝা যাচ্ছে না। সরকার যে বিচারের স্বীকৃত মানদন্ড নিয়ে সন্দেহমুক্ত নয়, সেটা প্রতিফলিত হয়েছে আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে। ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে আইনমন্ত্রী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার গ্রহণযোগ্য করতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সহায়তা চেয়েছেন।
অথচ যুদ্ধাপরাধ ইস্যু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যু। যাদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে, তারা বাংলাদেশের নাগরিক এবং শীর্ষ রাজনীতিক। জনগণের ম্যান্ডেট পেয়ে তারা অনেকেই সংসদ সদস্য ও নির্বাচিত সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৭১ সালে এদের কারো বিরুদ্ধে যদি যুদ্ধাপরাধের কোন অভিযোগ থাকতো, তবে সংশ্লিষ্ট থানায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা থাকতো। যুদ্ধাপরাধের কার্যত শিকার যারা হয়েছেন, তারাও সামাজিক ও আইনগত ব্যবস্থা নিতেন। সত্যিকার কোন যুদ্ধাপরাধীর পক্ষে সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের স্বস্তিতে থাকার কথা নয়। আওয়ামী লীগ যাদের সাথে যুগপৎ আন্দোলন করে বিগত দু'দশক ধরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই করেছে, যাদেরকে সাথে নিয়ে কেয়ারটেকার সরকারের আন্দোলন করেছে এবং সরকার গঠনে যে দলের সংসদীয় সমর্থনের জন্য তারা ধর্ণা দিয়েছে, তাদের ওপর কুপিত হয়ে যুদ্ধাপরাধীর এলজাম লাগিয়ে তাদের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে চাইছে কেন? তারা হয়তো মীমাংসিত বিষয়কে রাজনীতির ইস্যু বানিয়ে ‘দিন বদলের' পরিবর্তে রাজনৈতিক দৃশ্যপটই বদলে দিতে চায়।
এদিকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে দেশের ললাটে সেক্যুলারিজমের পরিত্যক্ত তক্মা এঁটে দিয়ে ভারতের ইচ্ছাপূরণের দায়িত্ব হাতে নিয়েছে। তবে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে অতীতেও আওয়ামী লীগ দেশকে ওলট পালট করে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে চেয়ে নিজেরাই বিপর্যয়ের মুখে পতিত হয়েছিল। অভ্যন্তরীণভাবে বিরোধী দল নির্মূল করে ক্ষমতা নিরাপদ ও নিরঙ্কুশ করা এবং পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে দেশকে ভারতের আশ্রিত বানানোর এই নীলনক্শার কাছে আওয়ামী লীগ চূড়ান্তভাবেই আত্মসমর্পণ করেছে কিনা, এখন সেটা দেখার বিষয়। সংসদীয় ব্যবস্থায় সরকারের কার্যকালের মেয়াদ হচ্ছে পাঁচ বছর। অথচ তারা ২০২১ সাল পর্যন্ত ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ভিশন-২০২১ ঘোষণা করেছে। সাংবিধানিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক এবং শিক্ষা-সংস্কৃতি-ইতিহাস বদলের যে বিশাল কাজ পাঁচ বছরের সরকার হাতে নিয়েছে, পাঁচ বছর পর আর একটি ভিন্ন মত ও ধারার সরকার যদি ক্ষমতায় এসে তা ওলট-পালট করে দিতে না পারে, সে লক্ষ্যেই আওয়ামী লীগ কী ২০২১ সাল পর্যন্ত কর্মসূচি নিয়েছে? এর অর্থ হচ্ছে, আগামীতে যে প্রক্রিয়ায়ই জাতীয় নির্বাচন হোক না কেন, নির্বাচনী বিজয়ের ধারা তারা ডিজিটাল কারচুপির মাধ্যমে ধরে রাখবে। এজন্যই আওয়ামী লীগে কেয়ার টেকার সরকারের প্রয়োজন নেই বলে আগাম ঘোষণা দিয়েছে। আগামী নির্বাচন তারা-তাদের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনের অধীনেই অনুষ্ঠিত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। অথচ আওয়ামী লীগই ১৯৯৬তে বিএনপি'কে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মেনে নিয়ে নির্বাচন করতে চায়নি। ভারতসহ অধিকাংশ সংসদীয় গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক সরকারের অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার অধীনেই নির্বাচন হয়ে থাকে। তবে সেখানে একদিকে নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিকভাবে এতটা কলুষিত ও মতলববাজ নয়।
দ্বিতীয়তঃ নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক ও নৈতিকভাবে বেশ শক্তিশালী রয়েছে। তৃতীয়তঃ যারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকা পালন করে, তারা নির্বাচনকে প্রভাবিত করার জন্য প্রশাসন বা নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করে না। অন্যদিকে বিরোধী দলও নির্বাচনী পরাজয়কে না মেনে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টির কোন কর্মসূচি দেয় না। সুতরাং রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন এবং সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সুখকর রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে না ওঠা পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের জন্য বিশেষ করে নির্বাচন অনুষ্ঠানকালে রাজনৈতিক সরকারের ওপর আস্থা গড়ে না ওঠা পর্যন্ত কেয়ারটেকার ব্যবস্থার কোন বিকল্প নেই। আওয়ামী লীগ জানে যে, আর একটি নির্বাচনের সময় কেয়ারটেকার সরকারের ভূমিকায় তাদের বিজয়ের সুযোগ না-ও মিলতে পারে।
সবার মনে আছে, ক্ষমতা থেকে বিদায় নেবার আগে ২০০১ সালে শেখ হাসিনা তাঁর নিজের জন্য ও বোন শেখ রেহানার জন্য আজীবন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাসহ গণভবন এবং ধানমন্ডির একটি সরকারি বাড়ি লিখে নিয়েছিলেন। তবে চারদলীয় জোট সরকার তা বাতিল করে। এবারে ক্ষমতায় আসার ৬ মাসের মধ্যেই ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু'র পরিবার-পরিজনের জন্য আজীবন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা আইন পাস করা হয়েছে। ফলে তারা যখন ক্ষমতার বাইরে থাকবেন, তখনও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শক্রমেই শেখ হাসিনা পুত্র-পৌত্রাদিসহ বংশানুক্রমে গণভবনের আজীবন বাসিন্দা হতে পারবেন। আইন করে এটা সংবিধানের অংশ করলে আর একটি সাংবিধানিক সংশোধনী ছাড়া তা বাতিলও করা সম্ভব হবে না। অর্থাৎ শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত গণ-ভবনের বাসিন্দাই হচ্ছেন। এই লক্ষ্যেই রাষ্ট্রের কোটি টাকা খরচ করে গণভবন সংস্কার করা হচ্ছে।
বিরোধী দল ও জনমতের সমন্বয় করে দেশ শাসনের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির তোয়াক্কা না করা আওয়ামী লীগের মজ্জাগত বৈশিষ্ট্য। অন্যদিকে স্বাধীন মিডিয়া এবং আওয়ামী লীগ সহাবস্থান করতে পারে না। ‘রাইট টু ইনফরমেশন' -আইন পাস হওয়া সত্ত্বেও সরকারের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক আচরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মানদন্ড নির্ধারণে গণমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠ ভূমিকা মূল্যায়নের রেওয়াজ গড়ে ওঠেনি। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদী কালচার রক্ষার প্রয়োজনেই মুক্ত ও স্বাধীন মিডিয়ার ভূমিকা মেনে নিতে পারে না। গরম তেলে পানির ফোটা পড়লে যেমন ছ্যাঁৎ করে ওঠে, মিডিয়ার সমালোচনায়ও ক্ষমতাসীন মহল প্রতিক্রিয়ায় কুঁকড়ে ওঠেন। দিন যতো যাবে, সরকারের শাসন-শৈলীতে ক্ষমতার উৎকট-প্রতিফলন যতো ঘটতে থাকবে, মিডিয়া যতো বেশি মাত্রায় সরকারের কর্মকান্ডের ব্যাপারে ওয়াচ ডগ-এর ভূমিকা পালন করতে থাকবে, সরকারের অস্থিরতা-অসহিষ্ণুতা ততো বাড়বে। মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ অথবা বশীভূত করার তৎপরতাও বাড়বে। ১/১১-উত্তর বিগত ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর থেকে জাতীয় মিডিয়ার ভূমিকায় লক্ষনীয় গুণগত পরিবর্তন ঘটেছে। আওয়ামী ঘরানার মিডিয়াও এখন আর স্তাবকতা ও রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির অন্ধত্বে বন্দী থাকতে চায় না। তারা বিশাল বিনিয়োগ রক্ষার জন্যই পাঠক গ্রহণযোগ্যতায় উত্তীর্ণ হতে সাংবাদিকতার পেশাদারিত্ব রক্ষায় কিছুটা হলেও উদ্যোগী হয়েছে। এটা প্রধানমন্ত্রীকে হয়তো অস্বস্তিতে ফেলে দেবে।
এদিকে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক ও স্বাধীন করা সত্ত্বেও বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অনুগামী রাখার পুরনো কৌশল এস্তেমাল করা শুরু হয়েছে। হাইকোর্ট-সুপ্রীমকোর্টকে সরকার তার বিশ্বস্তদের দিয়ে সাজাতে শুরু করেছে। জুডিশিয়াল সার্ভিস বিভাগের দুই বিচারপতিকে সরকার প্রধান বিচারপতির অনুমোদন বা পরামর্শ ছাড়াই নির্বাহী আদেশে যেভাবে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে বরখাস্ত করেছেন, তাতে কট্টর স্বৈরশাসকরাও লজ্জিত না হয়ে পারেন না। বরখাস্তকৃত ঐ দুই বিচারক আদালতের দ্বারস্থ হতে যাচ্ছেন। জনগণ যাঁদের কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করবেন, তারাই যদি সরকারের ক্ষমতার উন্মত্ত বিড়ম্বনার শিকার হন, তাহলে ভবিষ্যতে বিচারকদের টিকে থাকতে সরকারের গোপন ইশারা মানা ছাড়া কোন উপায় থাকবে না। বিগত কেয়ারটেকার সরকারের সময় ফখরুদ্দীন-মইন উদ্দীন যুগলের ব্রিফ ছাড়া যেমন বিচারকার্য হয়নি, এবারও নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের আমলে বিচার বিভাগের ওপর যদি তার চেয়েও কঠোরভাবে ‘‘লালঘোড়া দাবড়ানো'র দৃশ্য দেখা যায়, তাহলে দিনবদলের তাৎপর্য কোথায়? জুডিশিয়াল এসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, যাঁরা জেলা জজের পদমর্যাদায় আসীন, তাঁদেরকে বাড়ির দারোয়ান-চাকরের মতো বিদায় করে দেয়া যায় না। তাছাড়া বিচারকরা সরকারের নির্বাহী আদেশের অনুগামী নন। আইনজীবী হয়েও বর্তমান আইনমন্ত্রী যদি তা জানেন এবং না মানেন, তাহলে বলতে হয়, তাঁর শিক্ষা ও মননে কোথাও বিচ্যুতি আছে। হয়তো দু'জন বিচারককে বরখাস্ত করে সরকার তামাম বিচার বিভাগকে একটা মেসেজ দিতে চাইছে। ‘বঙ্গবন্ধু হত্যা' মামলার বিচারসহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার যে রাজনৈতিক কৌশল আওয়ামী লীগ সরকার নিয়েছে, তাতে করে বিচার বিভাগের ওপর (নিম্নস্তর থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত) সরকার তার তাঁবেদারী প্রতিষ্ঠা করতে চায়। প্রধান বিচারপতির কক্ষে যারা পদাঘাত করতে পারেন, যারা আদালত অঙ্গনকে রাজনৈতিক নৈরাজ্যের অভয়ারণ্য বানাতে পারেন, সেসব আইনজীবীর নেতৃত্ব থেকে যাঁকে আইন মন্ত্রিত্বে সমাসীন করা হয়েছে, তার কাছে হয়তো বিচারকরা এর চেয়ে ভালো কোন আচরণ আশাও করতে পারেন না। এই আইনমন্ত্রী ৫/৬ মাস সময় অতিক্রান্ত হবার পরও সেনাঘাতক ও বিডিআর বিদ্রোহীদের কোন্ আইনে বিচার হবে, তা নির্ধারণ করতে পারেননি। এ নিয়ে তিনি এক এক সময় এক এক কথা বলেছেন। এখন বলছেন : বিচারটা কোন্ আইনে হবে, তা জানতে সরকার সুপ্রীমকোর্টের মতামত জানতে রেফারেন্সে পাঠাবে। বর্তমান সরকারের একটা প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, তারা রাজনৈতিক বিতর্কিত ও জটিল বিষয়কে আদালতের ঘাড়ে চাপিয়ে চাতুর্যের পরিচয় দিচ্ছে। এমনকি স্বাধীনতার ঘোষকের ইস্যুতেও সরকার সর্বোচ্চ আদালতকে ব্যবহার করেছে। আদালত কখনও ইতিহাস নির্মাণ বা সংশোধন করে না। ইতিহাসের নিয়ামক শক্তি জনগণ এবং জনগণের স্বীকৃতি-সাক্ষ্যই ইতিহাসের নির্ণায়ক। এ ব্যাপারে সরকার আদালতের আশ্রয় নিয়ে তাদের নৈতিক দুর্বলতা এবং ঐতিহাসিক তথ্য-সূত্রের দুর্বলতাই উন্মোচন করেছে। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের ক্ষেত্রেও সরকার হাইকোর্টের একটি অপ্রাসঙ্গিক রায়ের ওপর নির্ভর করতে চায়। অথচ ‘মুজিব হত্যার' বিচার এড়াতে যে ইনডেমনিটি দেয়া হয়েছিল এবং যা কার্যত সংবিধানের অংশ ছিল, তাকে তারা নির্বাহী আদেশ এবং আইনী অপব্যাখ্যায় উপড়ে ফেলে দিয়েছে। আইন ও সংবিধানের সুবিধাবাদী ব্যাখ্যায় আওয়ামী লীগের মুস্কিল আছান হলেও বিচার বিভাগের চরিত্র, ঐতিহ্য ও ইমেজ ধ্বংসের এই বিকারের বিরুদ্ধে বিচারকদেরই প্রতিরোধ গড়ে তোলা উচিত। অবৈধ রাজনৈতিক মাতৃত্বের দায় বিচার বিভাগ কেন নেবে?
আইনমন্ত্রীর কথায়ই ফিরে আসছি। আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছেন, যুদ্ধাপরাধ সম্পর্কিত তথ্য-প্রমাণ ও দলিলপত্র চাওয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে। এ বিচার নিয়ে যেন দেশে-বিদেশে কোন প্রশ্ন না ওঠে সেদিকে তারা সজাগ রয়েছেন। বিভিন্ন দেশে গণহত্যা নিয়ে যে সব সংস্থা কাজ করছে, তাদের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। ‘গণহত্যা, সত্য ও ন্যায়বিচার' শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আইনমন্ত্রী এ কথা বলেছেন। যুদ্ধাপরাধের বিচারে বাদী হচ্ছেন সরকার। আর এ সেমিনারের আয়োজক হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। আইনমন্ত্রী স্বীকার করেছেন, ৩৮ বছর আগের অপরাধের বিচার স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করতে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ ও দলিল-দস্তাবেজ তাদের কাছে নেই। তাদের কাছে তথ্য-প্রমাণ থাকলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তিনি টেনে আনছেন কেন? তথ্য-প্রমাণ, দলিল-দস্তাবেজ তৈরির ক্ষেত্রে কী তাহলে তারা আন্তর্জাতিক জালিয়াত চক্রকে ব্যবহার করতে চায়? স্বাধীনতার পর প্রমাণিত ও তালিকাভুক্ত ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বাইরে বাংলাদেশের কাউকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতার পর সাড়ে তিন বছরের শাসনকালে আওয়ামী লীগ যে তথ্য-প্রমাণ-দলিল সংগ্রহ করতে পারেনি, ৩৮ বছর পর সেটাই ক্ষমতার দাপটে, আন্তর্জাতিক কলাবরেটরদের উদ্যোগে তৈরি করতে পারবে? যারা সশস্ত্র যুদ্ধের প্রক্রিয়ায় কোন সামরিক প্রশিক্ষণ বা অস্ত্রবহন করেনি, তাদের বিরুদ্ধে ‘গণহত্যার' অভিযোগ আসে কিভাবে?
‘নিরংকুশ ক্ষমতা নিরংকুশ দুর্নীতির জন্ম দেয়',- রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এই ধ্রুপদী সত্য নিয়ে কোন সন্দেহ না থাকলেও যুগে যুগে দেশে দেশে ক্ষমতাসীনরা নির্বোধ শিশুদের মতোই খেলাচ্ছলে আগুনে যেমন হাত দিয়ে হাত পোড়ে, ক্ষমতাসীনরাও ক্ষমতার নিরংকুশ এক্সপেরিমেন্ট করে একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আসছেন। কিন্তু ক্ষমতার নির্বোধ খেলোয়াড়রা এরপরও সতর্ক হননি। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেবার কুশিক্ষা যাদের রক্তে- রন্ধ্রে ঘুণ পোকার মতো বাসা বেঁধেছে, তাদের কাছে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, গণতান্ত্রিক ও নাগরিক সংস্কৃতি আশা করা বৃথা। সরকার নির্বাচিত হলেই তা গণতান্ত্রিক হয় না এবং নির্বাচিত সরকারও যে গণতন্ত্রের মুখোশ পরে ফ্যাসিস্ট হতে পারে, সে ইতিহাস বাংলাদেশেই তৈরি হয়েছে। আর ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতেই পারে। বিশেষ করে পঁচাত্তরের সংসদীয় ক্যু, একদলীয় ফ্যাসিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠা এবং এক ব্যক্তির হাতে সাংবিধানিকভাবে সকল ক্ষমতা ন্যস্ত করার ফলে জনগণের যে বিষাক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তাতে করে আওয়ামী লীগ ও মরহুম শেখ মুজিবের রাজনৈতিক এবং পারিবারিক উত্তরাধিকারীত্বের দায় বহনকারী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতিতে যদি মূলের দিকে প্রত্যাবর্তনের আলামত দেখা যায়, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। আরবীতে বহুল প্রচলিত একটা প্রবাদ আছে : ‘সবকিছুই শেষ পর্যন্ত মূলের দিকে প্রত্যাবর্তন করে।' আওয়ামী লীগও পুরনো ফ্যাসিবাদী ধারায় ফিরে যেতে শুরু করেছে। বিগত সাত মাসের ঘটনাপ্রবাহ শাসক দল-আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চার যে নমুনা তুলে ধরেছে এবং সরকার পরিচালনায় সংসদীয় প্রধানমন্ত্রীর বদলে প্রেসিডেন্সিয়াল সরকার ব্যবস্থার নিরংকুশ দাঁতাল হিংস্রতার যে নজীর স্থাপিত হয়েছে, তাতে সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য আবারও বিপদ তৈরির আশংকা দেখা দিয়েছে।