টিপাইমুখ দর্শন ভুল সময়ে - আনু মুহাম্মদ

সম্প্রতি টিপাইমুখ প্রকল্পের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের মধ্যে জনমত গড়ে উঠেছে। এই উৎকণ্ঠার অন্যতম কারণ, ভারত এ প্রকল্প সম্পর্কে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম কথা বলেছে। ভারত কখনও বলেছে বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। কখনও বলেছে, এ প্রকল্পের মাধ্যমে কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। ইন্টারনেটে আমরা এ সম্পর্কে যেসব তথ্য পাই তাতেও স্পষ্ট নয়, এ প্রকল্পের আওতায় ভারত আসলে কী করছে।

বহুল আলোচিত এমন একটি প্রকল্প পরিদর্শনের জন্য বাংলাদেশের সংসদীয় প্রতিনিধি দল কেন এই সময়টা বেছে নিল, এটাই এক বড় প্রশ্ন। মণিপুর রাজ্যের এই অঞ্চলে এখন আবহাওয়া দুর্যোগপূর্ণ থাকবে, এটা তো অস্বাভাবিক কিছু নয়। সফরের সময় বাংলাদেশের সংসদীয় প্রতিনিধি দলকে ভারত সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। এটি ইতিবাচক। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ভারত যদি বাংলাদেশের জনগণের মতামত উপক্ষো করে টিপাইমুখ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায় সেক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশের সংসদীয় প্রতিনিধি দলের এই ভারত সফরকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাজে লাগাতে পারে। তারা তখন আন্তর্জাতিক মহলে বলার সুযোগ পাবে, তারা বাংলাদেশের সংসদীয় প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই এ প্রকল্প বাস্তবায়িত করছে। এছাড়া লক্ষণীয় হল, বাংলাদেশের সংসদীয় প্রতিনিধি দল এমন বিশেষজ্ঞ নিয়ে যায়নি যারা বিষয়টি যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারেন।

সংসদীয় প্রতিনিধি দল দেশে ফিরে বলেছে, ভারত বাংলাদেশেকে এ বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করবে। আবার তারা ফেরার পর এ বিষয়ে তাদের মতামত জানাচ্ছেন, ভারত সেখানে ক্ষতিকর কিছু করছে না। বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত পাওয়ার আগেই সংসদীয় প্রতিনিধি দলের সদস্যরা ভারতের কথায় আশ্বস্ত হচ্ছেন। লক্ষণীয় হল, সংসদীয় প্রতিনিধি দলের নেতা এই সফর শেষে যা বলছেন, সফরে যাওয়ার আগেও তিনি এ ধরনের কথা বলতেন।

আন্তর্জাতিক আইন/প্রথা/সমঝোতা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক নদীর ওপর কোন প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে ভাটির দেশের সম্পূর্ণ সম্মতি নিতে হয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করতে হয়। কিন্তু ভারত বাংলাদেশকে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও বিশ্লেষণ সরবরাহ করেনি। এমনকি এ প্রকল্পের বিষয়ে বাংলাদেশের সম্মতিও নেয়নি। এ প্রকল্প বস্তবায়নের পর বাংলাদেশে কী ধরনের পরিবেশগত প্রভাব পড়বে, এ নিয়েও কোন যৌথ সমীক্ষা হয়নি।

বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার সম্প্রতি এ প্রকল্প সম্পর্কিত আলোচনার সময় যে মন্তব্য করেছেন, এতে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। তিনি বাংলাদেশের প্রাপ্য ও ন্যায্য অবস্থানকে অস্বীকার করেছেন, আন্তর্জাতিক বিধিবিধানকে অবজ্ঞা করছেন, বাংলাদেশের জনমত ও বিশ্লেষণ সম্পর্কে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন।

এ প্রকল্পের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকাও স্পষ্ট নয়। ইতিমধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রী বিভিন্ন রকম বক্তব্য দিয়েছেন। কোন মন্ত্রী বলেছেন, এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের ক্ষতি হবে না। কোন মন্ত্রী বলেছেন, এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের ক্ষতি হবে। আবার কোন মন্ত্রী বলেছেন, এ প্রকল্প বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। কোন মন্ত্রী বলেছেন, এ প্রকল্প বিষয়ে তথ্য জোগাড় করা হচ্ছে। ফুলের তলে ব্যারাজ নির্মিত হলে বাংলাদেশের নদী ও পানিপ্রবাহে যে বিপর্যয় সৃষ্টি হবে, এতে বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য ও হাওর অঞ্চলের বিশেষ প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হবে। সেজন্য এ প্রকল্পকে হালকাভাবে দেখার কোন সুযোগ নেই। এর সঙ্গে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িত। বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পরিবেশগত সমীক্ষা সম্পন্ন করে এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করা উচিত।

উল্লেখ্য, ভারতেও স্থানীয় জনগণ এ প্রকল্পের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন আন্দোলন করে আসছে। ভারতীয় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে প্রকল্প সম্পর্কিত তাদের বিশ্লেষণও বিবেচনা করতে হবে। ভারত বলে থাকে, এ প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি হলে প্রথমে তারাই এর শিকার হবে। এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, মণিপুরের যে এলাকায় এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, সেখানে এমনিতেই জনবসতি কম। আবার এই স্বল্পসংখ্যক জনবসিত তারা ইচ্ছা করলে বিকল্প কোথাও পুনর্বাসন করতে পারে। যেহেতু সিলেট এবং এর আশপাশের বেশিরভাগই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, সেজন্য টিপাইমুখ প্রকল্প বাস্তবায়নের পর যে কোন বিপর্যয় হলে বাংলাদেশে এর ক্ষতিকর প্রভাব হবে মারাÍক।

সবচেয়ে বড় কথা, সারাবিশ্বেই দেখা গেছে, ড্যাম বা ব্যারাজ নির্মাণের ফলে তাৎক্ষণিক লাভ কিছু হলেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির পরিমাণই হয় অত্যধিক। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করা যায়। এ প্রকল্প বস্তবায়নের পর বাংলাদেশে কী ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, ভারত এ অভিজ্ঞতাও মনে রাখবে, এটাই প্রত্যাশিত।

আনু মুহাম্মদ : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

5
Your rating: None Average: 5 (1 vote)

Comments

SalimC's picture

টিপাইমুখে প্রমোদ ভ্রমণও ভেস্তে গেল |

টিপাইমুখে প্রমোদ ভ্রমণও ভেস্তে গেল
-ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
শেষ পর্যন্ত টিপাইমুখে সরকারি দলের প্রমোদ ভ্রমণের পরিকল্পনাও ভেস্তে গেছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার দোহাই দিয়ে ভারত সরকার মহাজোটের সংসদীয় প্রতিনিধি দলকে টিপাইমুখে নামতেও দেয়নি। তারা হোটেলে বসে ভোজনাদি সেরে ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে ফেরত এসেছেন। কেউ কেউ হয়তো সপিং-টপিং করেছেন। আসতে বিলম্ব হয়েছে। ইতোপূর্বে এদের কারও ব্যক্তিগতভাবে ভারত সফরের অভিজ্ঞতা আছে কিনা, আমার জানা নেই। তবে বাংলাদেশ থেকে ভারত সফরকারীদের কাস্টমস্ ও ইমিগ্রেশনে যে পরিমাণ দুর্ভোগ সহ্য করতে হয়, ধারণা করি, সংসদীয় প্রতিনিধি দলের এই যাত্রায় সে দুর্ভোগ পোহাতে হয়নি। তারা অন্তত এইটুকু সান্ত্বনা নিয়ে ফিরতে পেরেছেন যে, ভারত যাত্রায় তারা অমানবিক ও অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হননি। এছাড়া বাকি ফলাফল শূন্য।
আমাদের মত দু'চারজন দুর্মুখ প্রথম থেকেই বলে আসছিলাম যে, এই সফরের কোন প্রয়োজন নেই। এই সফরে গিয়ে টিপাইমুখ বাঁধ হলে বাংলাদেশের কি ক্ষতি হবে তা বোঝা যাবে না। সফর যদি করতেই হয় তবে তা করতে হবে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে। সেইজন্য যৌথ নদী কমিশন রয়েছে। যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক ডেকে এ বিষয়ে আলাপ আলোচনা করা যেত। ভারত কখনই সে পথে অগ্রসর হয়নি। সরকারের তরফ থেকেও ঐ দাবি উত্থাপন না করে কেবল সংসদীয় দলের সফরের সাফাই গাওয়া হচ্ছিল। যেন সংসদীয় দল সফরে গেলেই টিপাইমুখ বাঁধের ফলে বাংলাদেশের যে ক্ষতি হবে সে ক্ষতি হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। যেন কোন হুজুরের পানি পড়া। ফুঁ দিলেই ব্যথা নাশ।
সরকারের মন্ত্রিসভায় ভারতের তাঁবেদার সাফাইবাজ মন্ত্রীর কোন অভাব নেই। ভারতীয় দালাল হওয়ার জন্য তাদের মধ্যে সে যে কী নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা। ভাবতেও গা শিউরে ওঠে। সার্বিকভাবে গোটা সরকার এক নির্লজ্জ তাঁবেদারে পরিণত হয়েছে। ভারত টিপাইমুখে বাঁধ দিলে বাংলাদেশের বৃহত্তর সিলেট ময়মনসিংহ অঞ্চলে যে ভয়াবহ বিপর্যয়ের সৃষ্টি হবে সেটা বোঝার জন্য কারও এখন আর বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই। পদ্মা নদীর উজানে ফারাক্কায় বাঁধ দিয়ে ভারত বাংলাদেশের গোটা উত্তরাঞ্চলকে মরুভূমিতে পরিণত করেছে। এক সময়কার প্রমত্তা পদ্মা এখন কেবল ধু ধু বালুচর। ভারত অসংগতভাবে পানি প্রত্যাহার করে নেয়ায় পদ্মার প্রবাহ আর নেই। গোটা পদ্মাই এখন বালিতে ভরাট হয়ে গেছে। প্রবল স্রোত নেই বলে উজান থেকে আসা বালি সরিয়ে নিতে পারছে না পদ্মার পানি। ফলে পদ্মা এখন মৃতপ্রায়। আবার ভারত অসময়ে বিপুল পরিমাণ পানি ছেড়ে দেয়ায় বন্যাই হয়ে দাঁড়িয়েছে পদ্মার নিয়তি। সে পানি দু'কূল ছাপিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে দু'পাশের ঘর-বাড়ি, জমিজমা, বসতভিটা। ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে ভারত বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রায় চার কোটি মানুষের জীবন বিপন্ন করে তুলেছে। একই সঙ্গে কেড়ে নিয়েছে জীবিকাও। পদ্মার পানির ওপর নির্ভরশীল ছিল হাজার হাজার জেলে পরিবার। পদ্মার পানির ওপর নির্ভরশীল ছিল পণ্য পরিবহনের সাথে সংশ্লিষ্ট হাজার হাজার পরিবার। পদ্মার পানির ওপর নির্ভরশীল ছিল লাখ লাখ হেক্টর জমির চাষাবাদ। পদ্মার পানির ওপর নির্ভরশীল ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ প্রাণবৈচিত্র্য। এখন তার সবই গেছে। জীবন নেই। জীবিকা নেই। কৃষি নেই। পরিবহন বাণিজ্য নেই। প্রাণবৈচিত্র্যও বিপন্ন। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষকে এ ধরনের বাঁধের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করেছে। তারা বুঝতে পেরেছেন এরকম এক একটি বাঁধ বাংলাদেশের জন্য কি ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ফলে প্রতিটি মানুষই এরকম আর একটি বাঁধের বিরুদ্ধে সোচ্চার।
১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই ভারতের সঙ্গে তিরিশ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টনের এক চুক্তি স্বাক্ষর করেন। সে চুক্তি একতরফা এবং সম্পূর্ণরূপে ভারতের ইচ্ছাধীন। ঐ চুক্তিতে কোন গ্যারান্টি ক্লজ নেই। ভারত যদি চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে তাহলে তৃতীয় পক্ষের কাছে যাওয়ার কোন বিধান নেই। ফলে চুক্তি মানা না মানা ভারতের ইচ্ছাধীন করে দেয়া হয়েছে। অথচ আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী এসব নদীর প্রবাহের ওপর সকল রাষ্ট্রের অধিকার সমান। সেও ১৯৯৬ সালে সম্পাদিত ঐ চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে কখনও পানি পায়নি। এমনকি বিগত মওসুমেও ভারত চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রাপ্য পানি থেকে ৮২ হাজার কিউসেক পানি কম দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার কোন প্রতিবাদ জানায়নি। বরং তাঁবেদার মন্ত্রীরা বলেছে ফারাক্কায় যদি পানিই না থাকে তাহলে ভারত কোথা থেকে পানি দেবে। ভারতও বলেছে ফারাক্কায় পানি ছিল না। পানি ছিল কি ছিল না সেটা দেখার জন্য সরকারের ‘সংসদীয় প্রতিনিধি' দল কেন সেখানে গিয়ে হাজির হল না? কেন বিশেষজ্ঞ পাঠিয়ে পানির পরিমাপ করা হল না? সরকার প্রধান নিজেও মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকলেন। আর সরকারের তাঁবেদার মন্ত্রীরা ভারতের হয়ে সাফাই গাইতে থাকলেন। ভারত যতোটা বলে বাংলাদেশে মন্ত্রিসভার ভারতীয় পরিষদেরা বলে তার চেয়ে শতগুণ। কী দুর্ভাগ্য এ দেশের। নিজের দেশের ও জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আধিপত্যবাদীদের জয়গান করতে লজ্জা কিংবা কুণ্ঠাবোধ কোন কিছুরই ধার ধারেনি আমাদের মন্ত্রিসভার সদস্যরা।
সরকার যদি মনে করে থাকে যে, জনগণকে তারা ভারতের সাফাইমূলক বক্তব্য গিলিয়ে ফেলবেন তাহলে বড় ভুল করেছেন। টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের জন্য ভারত যখন আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহবান করেছে, যখন বিভিন্ন কোম্পানী দিয়ে জরিপ কাজ পরিচালনা করেছে তখন আন্তর্জাতিক নদী বরাকের ভাটির দেশ বাংলাদেশের কি ক্ষতি হবে বা বাংলাদেশের ওপর প্রভাব কি হবে? সেটা বিবেচনায় নেয়নি। ভারত টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে। এই বাঁধের বিরুদ্ধে ভারতীয় রাজ্য মনিপুর মিজরামে তীব্র প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকার। বরাকের টিপাইমুখ ও টুইভাই এলাকা উপজাতীয় অধ্যুষিত। জনবসতি বিরল যারা বসবাস করে তারা অতি দরিদ্র। তাদের শেষ পর্যন্ত নানা প্রলোভন দেখিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে অর্থবিত্ত, বাড়িঘরের লোভ দেখিয়ে এলাকা ত্যাগে সম্মত করিয়েছে। বাংলাদেশের জনগণকে তেমন উচ্ছিষ্টের লোভ দেখাতেও কার্পণ্য করেনি ভারত। ভারত বলেছে টিপাইমুখে যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে তার কিছু অংশ বাংলাদেশকে দেয়া হবে। আর সেটা নিয়ে বাংলাদেশের মন্ত্রীদের সেকি ফালাফালি। কি মজা! ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করব। বাংলাদেশে বিদ্যুতের ঘাটতি মিটে যাবে। অতএব দ্রুত ভারত নির্মাণ করুক টিপাইমুখ বাঁধ। এমন বেহায়াপনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল ঘটনা।
সরকারের মন্ত্রীরা যখন এমন মেরুদন্ডহীন কেঁচোর মত ভারতীয় তাঁবেদারিতে ব্যস্ত তখন জনগণ কিন্তু এই বাঁধের বিরুদ্ধে ঠিকই রুখে দাঁড়িয়েছে। সিলেট থেকে প্রতিবাদ প্রতিরোধের সূচনা। সেখানে মানুষ এই বাঁধ নির্মাণ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেছে। অবস্থান ধর্মঘট করেছে। সভা সমাবেশ মিটিং মিছিল করেছে। সাধারণ মানুষ সেখানে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, যুদ্ধাপরাধ স্বাধীনতার পক্ষ বিপক্ষ যুক্তি প্রভৃতি ভেদ রেখা দু'পায়ে মারিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ প্রতিরোধে শরীক হয়েছে। জীবন জীবিকা যেখানে সংকটাপন্ন, অস্তিত্ব যেখানে বিলুপ্ত প্রায়, সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা মাতৃভূমি যখন মরুভূমি হওয়ার উপক্রম, ফসল যেখানে বিপন্ন, মাছ যেখানে আক্রার আশংকা, প্রাণবৈচিত্র্য যেখানে ধ্বংসোন্মুখ সেখানে অর্ধযুগেরও বেশি সময় ধরে টেনে আনা ভেদ রেখাগুলো মুহূর্তেই মুছে গেছে রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে। সরকার হয়তো ভেবেছিল জনগণ যেহেতু তাদের ভোট দিয়েছে সুতরাং তারা রাতকে দিন বললেই জনগণও আনন্দে বগল বাজাতে বাজাতে বলবে আহা এখন কি চমৎকার দিন। কিন্তু জনগণ তা বলেনি। এমনকি জনগণের সেন্টিমেন্টের পাশাপাশি থাকার জন্য সরকারের অর্থমন্ত্রী সিলেটের লোক আবুল মাল আব্দুল মুহিত পর্যন্ত বলতে বাধ্য হয়েছেন যে, ভারত টিপাইমুখে বাঁধ দিলে বাংলাদেশের ভয়াবহ ক্ষতি সাধিত হবে। তাই যদি হয় তাহলে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠুন। বলুন, টিপাইমুখে বাঁধ দেয়া চলবে না। সদ্য দফতর পরিবর্তিত পানিমন্ত্রী রমেশ সেনের মত (লোকটা যে কে?) বলবেন না, ভারত আগে টিপাইমুখ বাঁধ দিক তারপর দেখা যাক বাংলাদেশের কি ক্ষতি হয়। যদি ক্ষতি হয় তখন প্রতিবাদ করা যাবে। এরকম পাচাটা লোক সম্পর্কে আর বেশি কিছু লিখতে রুচিতে কুলায় না।
টিপাইমুখ বাঁধের পরিণতিতে বাংলাদেশের সর্বব্যাপী যে ক্ষতি সাধিত হবে সেটা আড়াল করার জন্য সরকার টিপাইমুখে সংসদীয় প্রতিনিধিদল পাঠাবার এক বাহানা করে। তা নিয়েও সরকারের তরফ থেকে নাটক কম করা হয়নি। বিরোধী দলের কাছে প্রতিনিধি চাওয়া হয়েছিল। বিরোধী দল এই সংসদীয় প্রতিনিধি দল পাঠানোকে অর্থহীন ঘোষণা করলেও শেষ পর্যন্ত বিশেষজ্ঞদের নাম প্রস্তাব করে পাঠিয়েছিল। সরকার তাদের একজনকেও প্রতিনিধি দলে অন্তর্ভুক্ত করেনি। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব যেখানে বিপন্ন সেখানেই নিম্ন রুচি বেদনাদায়ক। বিশেষজ্ঞরা বলছিলেন টিপাইমুখ বাঁধ এলাকায় সংসদীয় দল পাঠানো তাদের প্রমোদভ্রমণ ছাড়া আর কোনভাবেই ফলদায়ক হবে না। কিন্তু ঢাক-ঢোল পিটিয়ে সেই প্রমোদভ্রমণে তাদের সংসদ সদস্যদের সেখানে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সরকার তাদের সরেজমিনে টিপাইমুখ দেখা হয়নি। নৌবিহারের বদলে হোটেলেই প্রমোদভ্রমণ সমাপ্ত করতে হয়েছে। ভারতীয় হেলিকপ্টার ১০ সদস্যের ঐ দল নিয়ে টিপাইমুখ এলাকায় চক্কর দিয়ে ফিরে এসেছে। সংসদীয় দলকে টিপাইমুখে নামতে পর্যন্ত দেয়নি। নির্ধারিত ফ্লাইটে ঐ দলের চার সদস্য ঢাকায় ফিরেছেন। দলনেতা আব্দুর রাজ্জাকসহ বাকিরা প্রমোদভ্রমণ সাঙ্গ করতে দিল্লিতে ঘুরতে গেছেন। বলিহারী টিপাইমুখ পরিদর্শন। পর্বত শেষ পর্যন্ত মুষিক প্রসব করতে পারেনি।
তাহলে এই বাঁধের কাজ কি এগিয়েই যাবে? এর বিরুদ্ধে আমরা কি সরকারের মতই নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থেকে আবোল-তাবোল বলতে থাকব। নাকি বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে সকলে মিলে একযোগে রুখে দাঁড়াব? রুখে আমাদের দাঁড়াতেই হবে। তা না হলে আমরা হারাব জীবন জীবিকা। আমরা হারাব সুরমা কুশিয়ারা। পদ্মার মত বালুচরে পরিণত হবে মেঘনা নদীও। হারাব ফসল। হারাব মাছ। হারাব শস্যের জমি। সুতরাং সর্বব্যাপী ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে আমাদের সামিল হতে হবে।