৭১ এর অন্তঘাত - অমি রহমান পিয়াল

জুলাইর মাঝামাঝি কোনো এক সন্ধ্যা। ১৯৭১। কলকাতার সিআইটি রোডের একটি বহুতল ভবনের সাততলা। এখানেই থাকেন মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ। মন্ত্রীসভার বাকিরা দিল্লীতে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জরুরী তলবে গেছেন। মোশতাক যাননি। দাওয়াত পাননি নাকি রাজধানী রক্ষার ভার তার হাতে- স্পষ্ট নয়।

কলকাতাজুড়ে নানা গুজব ভাসছে। এর ভয়ঙ্করতমটি হচ্ছে পাকিস্তানীদের হাতে বন্দী শেখ মুজিবকে ফাঁসি দেওয়ার সব বন্দোবস্ত পাকা। ভারতের সাধ্য নাই সেটা ঠেকানো। এখন একটাই উপায় আপোষে যাওয়া। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির বিনিময়ে স্বাধীনতার দাবি ছাড়তে হবে। যদিও এইনিয়ে ইতিমধ্যেই শিলিগুড়িতে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে যা বলার বলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ। কিন্তু অনিশ্চিত সেই সময়কালে গুজবটা আরো ছানাপোনা জন্ম দিচ্ছে। এই গুজবের জনক হিসেবে যাকে সন্দেহ করা হয়, তার সঙ্গেই দেখা করতে গেছেন আওয়ামী লীগ নেতা নুরুল ইসলাম এবং জেনারেল ওসমানীর পিআরও নজরুল ইসলাম।

তার ঘরে সোফায় বসতেই খন্দকার মোশতাক কিছু না বলে হু হু কান্না জুড়ে দিলেন। অতিথিরা বিব্রত। মোশতাক ডুকরে কেঁদেই চলেছেন। খানিকপর নুরুল ইসলাম জিজ্ঞেস করলেন- মোশতাক ভাই কি হয়েছে? এতে কান্নার দমক আরো বাড়লো। প্রশ্নটা আবারও করা হলো। এবার কান্নার স্কেল চড়িয়ে মোশতাক বললেন- আমি বেচে থাকবো আর আমার নেতা শেখ মুজিব বেচে থাকবেন না-এটা আমি মেনে নিতে পারি না। এটা আমি ভাবতে পারি না নুরু। আমরা বেচে থাকবো দুনিয়ায় আর মুজিব আমাদের চোখের সামনে থেকে সরে যাবেন দুনিয়া ছেড়ে। না না। এরপর পুরো বাংলা সিনেমার স্টাইলে চিৎকার করে বললেন- না, না। এটা কিছুতেই হতে দিতে পারি না আমরা।

এরপর যা বললেন, তার সার সংক্ষেপ হচ্ছে ইন্দিরা গান্ধী যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়েছিলেন। তাকে প্রেসিডেন্ট নিক্সন সরাসরি বলে দিয়েছেন পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুজিবের প্রাণরক্ষা দুটো এক সঙ্গে সম্ভব নয়। যদি মুজিবের অনুসারীরা তাদের নেতার প্রাণরক্ষা করতে চান, তাহলে পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে থেকেই আপোষরফার চেষ্টা করতে হবে। ইন্দিরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার মুজিবনগর সরকারের নেতৃবৃন্দের হাতেই ছেড়ে দিয়েছেন। এবং মোশতাকের অভিমত একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেরই ক্ষমতা আছে বঙ্গবন্ধুকে সহিসালামতে ফিরিয়ে নিয়ে আসার। সেক্ষেত্রে তাদের শর্তে রাজী হওয়াই উচিত। কারণ বঙ্গবন্ধুই যদি না থাকে, তাহলে কিসের স্বাধীনতা!

মোশতাক যা বলেছেন, অর্থাৎ ইন্দিরা-নিক্সনের কথাবার্তা এবং ইন্দিরা-মুজিবনগরের নেতৃবৃন্দের আলাপ, তার সত্যতা কতটুকু এ নিয়ে পরে বিস্তারিত আলাপ হবে। তবে ঘটনাটার উল্লেখ এ জন্যই যে এর কিছুদিনের মধ্যেই দিল্লীতে তার পররাষ্ট্র সচিব মাহবুব আলম চাষী যুক্তরাষ্ট্রের দুতাবাসে যোগাযোগ করেন। সেখানে মূলত মোশতাকের যুক্তরাষ্ট্র সফরের ইচ্ছা এবং তার ভিসার ব্যাপারেই আলোচনা হয়। এবং মাসের শেষ দিকে কুমিল্লারই আরেক সাংসদ জহিরুল কাইয়ুম কলকাতা দুতাবাসে যোগাযোগ করেন মোশতাকের প্রতিনিধি হিসেবে। এবং আলোচনায় ইঙ্গিত দেওয়া হয় মুজিবের মুক্তির বিনিময়ে প্রয়োজনে স্বাধীনতার প্রশ্নে আপোষ করতে রাজী মুজিবনগর সরকার। সাদাচোখে দেখলে এখানে তীব্র মুজিবপ্রেম বেয়ে বেয়ে পড়ছে মনে হলেও বাস্তবে তা ছিলো না মোটেও। এর আড়ালে ঘনাচ্ছিলো ভয়াবহ এক চক্রান্ত এবং মোশতাক তার কর্মকাণ্ড ও তৎপরতাকে জাস্টিফায়েড করার জন্য এসব অজুহাত ব্যবহার করছিলেন মাত্র।

২.
আওয়ামী লীগের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই দলীয় কোন্দল ছিলো সীমাহীন। একমাত্র শেখ মুজিবের ব্যক্তিত্বের কারণেই যা খুব নোংরামী রূপ ধারণ করতে পারেনি। যুদ্ধকালে তার অনুপস্থিতিতে সেটাই প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছিলো। একদিকে ছিলো চরমপন্থী তরুণ তুর্কীরা। শেখ ফজলুল হক মনির নেতৃত্বে এরা দাবী করছিলেন মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব তাদের হাতেই দিয়ে গেছেন বঙ্গবন্ধু। তাজউদ্দিন স্রেফ উড়ে এসে জুড়ে বসা লোক। ৮ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি যখন বেতার ভাষণ দিলেন এবং সেটা যখন বারবার আকাশবাণীতে প্রচার করা হচ্ছিলো, তখন ক্ষুব্ধ মনি দিল্লীতে বার্তা পাঠিয়ে তা বন্ধ করার অনুরোধ জানান।

মূলত, তাজউদ্দিনের মতো লিবারেল ঘরানার নেতৃত্বই কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকে সঠিকভাবে সংগঠিত ও পরিচালনা করতে পেরেছেন। এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দলীয় নীতিমালা প্রণয়নের ব্যাপারে তার উপর যথেষ্টই আস্থা রাখতেন মুজিব। মোশতাক ও তার মতো চরম ডানপন্থীরা স্বভাবতই মেনে নিতে পারেননি তাজউদ্দিনের নেতৃত্ব। মুক্তিযুদধের গোটা সময়টাই তাই তার কেটেছে তাজউদ্দিনকে উৎখাত করতে। এজন্য শেখ মনিকে নানাভাবে উস্কানীও দিয়েছেন তিনি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আপোষ যখন ভেস্তে গেলো তখনও হাল ছাড়েননি মোশতাক। আবদুর রব সেরনিয়াবাতের নেতৃত্বে ৪০জন এমপির সাক্ষর করা আবেদন পত্র দাখিল করিয়েছেন তাজউদ্দিনকে অযোগ্য ঘোষণা করে।

মোশতাকের ইগোতে লাগার যথেষ্ট কারণ ছিলো বৈকি। আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন তিনি। শেখ মুজিব অন্তরীণ থাকার সময় যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দলের সঙ্গে মতভেদ ঘটেছে একবারই। ১৯৫৫ সালের ২১-২৩ অক্টোবর সদরঘাটের রূপমহল সিনেমা হলে আনুষ্ঠানিক সম্মেলনে ভাসানী-মুজিব যখন দলকে ধর্মনিরপেক্ষ করার দাবি তুলে মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়ার দাবি তুললেন, মোশতাক বিরোধিতা করেছেন। এজন্য এডভোকেট আলী আমজাদ খান, আবদুস সালাম ও হাশিমউদ্দিনকে নিয়ে পাল্টা সংগঠন গড়লেন। যদিও কিছুদিন পর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত পাল্টে ফের চলে এলেন মূল দলে। পাঁড় কম্যুনিস্ট বিরোধী মোশতাক ১০ এপ্রিল কলকাতায় পৌছেই শুনলেন তাকে স্রেফ হাইকমান্ডের একজন হিসেবে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে বামঘেষা তাজউদ্দিন কিনা প্রধানমন্ত্রী! অথচ দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে এই দায়িত্ব তারই পাওনা। অভিমানে মোশতাক জানালেন উনি পদত্যাগ করলেন। তার ইচ্ছা হ্বজ করতে মক্কা যাবেন। এবং বাকি জীবনটা সেখানেই কাটাবেন। পাকিস্তানে আর ফিরবেন না।

ভরা মজলিশে মোশতাকের ডায়লগটি ছিলো চমকপ্রদ : আমাকে তুমরা সবাই মক্কায় পাঠায়া দাও। আমি সেখানেই মরতে চাই। আমি মারা গেলে আমার লাশ তোমরা বাংলাদেশে পাঠায়া দিও। দাউদকান্দির পীর হযরত খন্দকার কবিরউদ্দিন আহমেদের পূত্রের মুখে এই কথা শুনে সবাই বিভ্রান্ত হয়ে যান। আর তা কাটিয়ে দেন মুশতাকের অনুচররাই। তাদের মারফত জানা যায় নেতৃত্বের সিনিয়রিটি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী না হতে পেরে তিনি ক্ষুব্ধ। শেষ পর্যন্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় হাতে পাওয়ার নিশ্চয়তা পেয়ে মক্কায় হিজরতের সিদ্ধান্ত বাতিল করেন মোশতাক। পাশাপাশি পান আইন মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বও।

চার বছর পর একই লোক তার অতিপ্রিয় কালো টুপি মাথায় কালো আচকান গায়ে চাপিয়ে শাহবাগের রেডিও বাংলাদেশ থেকে ঘোষনা দেন : প্রিয় দেশবাসী ভাই ও বোনেরা, এক ঐতিহাসিক প্রয়োজনে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের সত্যিকার ও সঠিক আকাঙ্খাকে বাস্তবে রূপদানের পুত দায়িত্ব সামগ্রিক ও সমষ্ঠিগতভাবে সম্পাদনের জন্য পরম করুণাময় আল্লাহতায়ালা ও বাংলাদেশের গণমানুষের দোয়ার উপর ভরসা করে রাষ্ট্রপতি হিসেবে সরকারের দায়িত্ব আমার উপর অর্পিত হয়েছে। … খুনী সেনা কর্মকর্তা ফারুক-রশীদ-ডালিমদের সূর্য্যসন্তান আখ্যা দিয়ে মোশতাকের বক্তব্য শেষ হয় বাংলাদেশ জিন্দাবাদ দিয়ে। জয় বাংলার সঙ্গে যার নাম জপে এর আগের দিন পর্যন্ত মুখে ফেনা তুলেছেন, সেই বঙ্গবন্ধূর বুলেটবেধা লাশ তখনও পড়ে আছে ধানমন্ডী ৩২ নাম্বারের সিড়িতে।

দায়িত্ব পেয়েই বর্নচোরা তাবেদারদের নিয়ে গড়া মন্ত্রীসভায় আরো চমকপ্রদ এক আবদার আসে তার তরফে। মাথার টুপিটি খুলে টেবিলে রেখে বলেন : আমাদের জাতীয় পোষাক আছে তবে সেটা অসম্পূর্ণ। আমাদের মাথায় কোনো টুপি নাই। আপনারা যদি অনুমোদন দেন তাহলে এই টুপিটা আমাদের জাতীয় পোষাকের অন্তর্ভুক্ত করতে চাই…। প্রস্তাবটি পাশ হয়েছিলো। কার্যকর হয়নি সম্ভবত। তাহলে সবার মাথায় কালো টুপির মাধ্যমে মোশতাক অমর হয়ে থাকতেন। আর ৮১ দিনের দায়িত্বকাল পুরো হওয়ার শেষ দিকে তাজউদ্দিনের সঙ্গেও হিসেবটা চুকিয়ে নেন। রিসালদার মোসলেমউদ্দিনের নেতৃত্বে ৩রা নভেম্বর যখন জেলগেটে হম্বিতম্বি করছে, আতঙ্কিত জেলার ফোন করেন মুশতাককে- স্যার উনার তো কয়েদিদের খুন করতে চাচ্ছে। রাষ্ট্রপতির আদেশ আসে- ওরা যা করতে চায় করতে দিন। এক সারিতে দাড় করিয়ে চার জাতীয় নেতার মধ্যে তাজউদ্দিনই টানা ব্রাশফায়ারে মরেননি। রক্তের বন্যায় হেঁচকি তুলে একটু পানি চেয়েছিলেন। তার তেষ্টা মেটানো হয়েছিলো হৃদপিন্ডে বেয়নেটের গভীর মোচরে। সে হৃদয়ে বাংলাদেশ ছিলো।

৪.
সে যাত্রায় মোশতাককে বুঝিয়ে শান্ত করা হলো। ১৭ এপ্রিল এক গাড়িতেই নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মুজিব নগর গেলেন। হাসিমুখে ছবি তুললেন। ফিরলেনও। এরপর শুরু হলো তার সত্যিকার রাজনীতি- নোংরামী ও কূটচালে ভরপুর। আগরতলা, জলপাইগুড়ি, ত্রিপুরায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলার জন্য পুরোশক্তি নিয়োগ করলেন তিনি। সেইসঙ্গে প্রচারণা চলতে থাকলো যে ভারত সরকারের কাছ থেকে সত্যিকার কোনো সাহায্য পাওয়ার আশা বৃথা। আমেরিকাই এই বিশ্বে মা-বাপ, তাদের অনুগ্রহ নিয়ে একটা সমঝোতায় আসাই ভালো। রক্তপাত যা হওয়ার হয়েছে, এখন শেখকে প্রধানমন্ত্রী করে একটা কনফেডারেশন গঠন করাই সবচেয়ে ভালো উপায়। তবে এই ক্ষেত্রে মোশতাক একাই নন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রীসভার বাকিসদস্যরাও (কামরুজ্জামান, মনসুর আলী) নিজেদের দাবি তুলে ধরতে লাগলেন। আর শেখ মনিতো ছিলেনই তার সবটুকু ঘৃণা নিয়ে।

ইতিমধ্যে তাজউদ্দিন তিনটি বড় কাজ করে ফেলেছেন- ভারতের মাটিতে প্রবাসী সরকারের রাজনৈতিক তৎপরতা চালানো, মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং ও অস্ত্র এবং একটি রেডিও স্টেশনের (স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র) মাধ্যমে সম্প্রচারের অনুমতি আদায়। কিন্তু পাশাপাশি খারাপ খবরও কম নেই। নিক্সন প্রশাসন ইন্দিরাকে চাপে রেখেছে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তার ব্যাপারে। শেখ মুজিবের বিচারের তোড়জোড় চলছে। পাশপাশি পূর্ব পাকিস্তানে পছন্দের জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পরিকল্পনাও এগোচ্ছে। এরকম পরিস্থিতিতেই জুলাইয়ের শুরুতে (৫ ও ৬ তারিখ) আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন ডাকা হলো শিলিগুড়িতে।

এ বিষয়ে মঈদুল হাসান লিখেছেন : দেশের অভ্যন্তরে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করার উদ্দেশ্যে গৃহীত ব্যবস্হাদির ফললাভের আগেই নানা কারণে সন্দিহান, বিভক্ত ও বিক্ষুব্ধ প্রতিনিধিদের সম্মুখীন হওয়া তাজউদ্দিন তথা মন্ত্রিসভার জন্য খুব সহজ ছিল না। তার প্রমাণও পাওয়া গেল শিলিগুড়িতে নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং দলীয় নেতৃবৃন্দ সমবেত হওয়ার পর। পাকিস্তানের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত প্রায় তিন শত প্রতিনিধির এই সমাবেশে (অবশিষ্ট ১৫০ জনের মত নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিল পাকিস্তানিদের হেফাজতেই) অভিযোগ ও অপপ্রচারের স্রোতই ছিল অধিক প্রবল। প্রবাসী সরকারের সম্পদ ও সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতাই এদের অনেক অভিযোগের উৎস। আবার সরকারী ব্যবস্হাপনার কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতিও নিঃসন্দেহে ছিল সমালোচনার যোগ্য। কিন্তু এইসব অভাব-অভিযোগ ও ত্রুটি-বিচ্যুতিকে অবলম্বন করে কয়েকটি গ্রুপ উপদলীয় স্বার্থ উদ্ধারের জন্য মন্ত্রিসভার ব্যর্থতা, বিশেষত প্রধানমন্ত্রীর অপসারণের দাবীতে ছিল নিরতিশয় ব্যস্ত।

আওয়ামী লীগের ভিতরে একটি গ্রুপের পক্ষ থেকে তাজউদ্দিনের যোগ্যতা এবং তার ক্ষমতা গ্রহণের বৈধতা নিয়ে নানা বিরুদ্ধ প্রচারণা চলতে থাকে। কর্নেল ওসমানীর বিরুদ্ধেও এই মর্মে প্রচারণা চলতে থাকে যে, মুক্তিযুদ্ধ ব্যবস্হাপনায় তাঁর অক্ষমতার জন্যই মুক্তিসংগ্রাম দিনের পর দিন স্তিমিত হয়ে পড়েছে। ভারত সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারণা ছিল, মুক্তিযুদ্ধকে সাহায্য করার ব্যাপারে তাদের মৌলিক অনীহার কারণেই খুব নগণ্য পরিমাণ অস্ত্র তাদের কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে, কূটনৈতিক স্বীকৃতির প্রশ্ন তারা নানা অজুহাতে এড়িয়ে চলেছেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত তাদের সমর্থন লাভ করবে কিনা, তাও সন্দেহজনক। এই সব প্রচার অভিযানে ভারতের উদ্দেশ্য ও তাজউদ্দিনের যোগ্যতা সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টির ব্যাপারে তৎপর ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খোন্দকার মোশতাক আহমদ। মন্ত্রিসভার বাইরে মিজান চৌধুরীও প্রকাশ্য অধিবেশনে প্রদত্ত বক্তৃতায় একই সন্দেহ প্রকাশ করে দলীয় সম্পাদকের পদ থেকে তাজউদ্দিনের ইস্তফা দাবী করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের এক নৈরাশ্যজনক চিত্র উপস্হিত করে বলেন এর চাইতে বরং দেশে ফিরে গিয়ে যুদ্ধ অথবা আপোস করা ভালো। কিন্তু এর কোন একটি চিন্তা বাস্তবে কার্যকর করার কোন উপায় তাঁর জানা আছে কিনা এমন কোন আভাস তাঁর বক্তৃতায় ছিল না।

কিন্তু সেখানে অসাধারণ এক বক্তৃতায় পাশার দান উল্টে দেন তাজউদ্দিন। বঙ্গবন্ধু কিংবা স্বাধীনতা কোনটিকে প্রাধান্য দেওয়া হবে এই বিভ্রান্তিকে এক লহমায় উড়িয়ে দিয়ে বলেন : “আমরা স্বাধীনতা চাই। স্বাধীনতা পেলেই বঙ্গবন্ধুকে আমাদের মাঝে পাব। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যদি খোদা না করুন, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু হয় পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে, তাইলে বঙ্গবন্ধু শহীদ হয়েও স্বাধীন বাঙ্গালী জাতির ইতিহাসে অমর ও চিরঞ্জীব হয়ে থাকবেন। তিনি একটি নতুন জাতির জনক হিসেবে ইতিহাসে স্বীকৃত হবেন। ব্যক্তি মুজিব, ব্যক্তি নজরুল, তাজউদ্দীন, কামরুজ্জামান কেউ হয়ত বেঁচে থাকবেন না। একদিন না একদিন আমাদের সকলকেই মরতে হবে। বঙ্গবন্ধুকেও মরতে হবে। আমরা চিরদিন কেও বেঁচে থাকব না।

আল্লাহর পিয়ারা দোস্ত, আমাদের নবী(সঃ) ও চিরদিন বেঁচে থাকেন নি। কিন্তু তিনি তাঁর প্রচারিত ধর্ম ইসলাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সারা দুনিয়ায় আজ পরম শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত রয়েছেন। তেমনি, আমরা যদি বাঙ্গালী কে একটি জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠা করতে পারি, আমরা যদি বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক আরেকটি রাষ্ট্রের মানচিত্র স্থাপন করতে পারি, তাইলে সেই স্বাধীন জাতি এবং নতুন রাষ্ট্রের মানচিত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রভাত সূর্যের মত উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন।

আমরা যখন বাংলাদেশ ছেড়ে যার যার পথে ভারত চলে আসি, তখন কিন্তু জানতম না বঙ্গবন্ধু জীবিত আছেন, না শহীদ হয়েছেন। ভারতে এসে দেখা না হওয়া পর্যন্ত আমিও জানতাম না সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মনসুর আলী কিংবা হেনা সাহেব(কামরুজ্জামান) জীবিত আছেন কিনা। আমি নিজেও বাঁচতে পারব এ কথাটি একবারও ভাবতে পারি নি। এখানে আসার পর যতক্ষন পর্যন্ত পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ঘোষনা না করেছে যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাদের কাছে বন্দী আছেন, ততক্ষন পর্যন্ত আমি মনে করতে পারি নি তিনি জীবিত আছেন। পাকিস্তানি জল্লাদ বাহিনীর কামান, বন্দুক,ট্যাঙ্ক, মেশিনগানের গোলাগুলির মধ্যে বঙ্গবন্ধু আর বেঁচে নেই একথা ভেবে এবং সম্ভবত মেনে নিয়েই তো আমরা নিজ নিজ প্রাণ নিয়ে চলে এসেছি।

বঙ্গবন্ধু মুজিবের ছায়া হয়ে তার পাশে আজীবন রাজনীতি করেছি, জেলে থেকেছি। তিনি আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন দেশের জন্য জীবন দিতে। তিনি নিজেও বারবার বাংলার পথে প্রান্তরে বলেছেন, বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য জীবন দিতে তিনি কুন্ঠিত নন। আজ যদি বঙ্গবন্ধু মুজিবের জীবনের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পাই, তাহলে সেই স্বাধীন বাংলাদেশের মধ্যেই আমরা পাব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কে। আমি নিশ্চিত, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কিছুতেই পাকিস্তানিদের কাছে তার নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে আপোষ করবেন না, আত্মসমর্পন করবেন না এবং করতে পারেন না। এটাই আমার প্রথম ও শেষ বিশ্বাস।
বাংলাদেশ যদি আজ এত রক্তের বিনিময়েও স্বাধীন না হয়, তাহলে বাংলাদেশ চিরদিনের জন্য পাকিস্তানি দখলদারদের দাস ও গোলাম হয়ে থাকবে। পূর্ব পাকিস্তানীর মর্যাদাও বাঙ্গালী কোনদিন আর পাকিস্তানীদের কাছে পাবে না। প্রভুভক্ত প্রাণীর মত আমরা যতই আনুগত্যের লেজ নাড়ি না কেন, পাকিস্তানীরা পূর্ব পাকিস্তানীদের আর বিশ্বাস করবে না, বিশ্বাস করার কোন প্রশ্নই উঠে না। আর এই অধিকৃ্ত পূর্ব পাকিস্তানে যদি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পাকিস্তানের প্রেসেডিন্ট হয়েও আসেন, তবু তিনি হবেন পাকিস্তানের গোলামীর জিঞ্জির পরান এক গোলাম মুজিব।

বাংলাদেশের জনগন কোনদিন সেই গোলাম শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলে গ্রহন করবে না, মেনে নিবে না। আমার স্থির বিশ্বাস বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর পাকিস্তানীদের কাছে নতি স্বীকার করবেন না। বাঙ্গালী জাতির গলায় গোলামীর জিঞ্জির পরিয়ে দেবার পরিবর্তে তিনি নিজে বরং ফাঁসীর রজ্জু গলায় তুলে নেবেব হাসিমুখে। এটাই আমার বিশ্বাস। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে এটাই আমার ঈমান। এ মূহর্তে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছাড়া, আমাদের অস্তিত টিকিয়ে রাখার আর কোন বিকল্প নেই। বাঙ্গালীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কে বাঁচিয়ে রাখার জন্য স্বাধীনতা চাই। স্বাধী্নতা ছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আর কোন অস্তিত্ব নেই, আর পরিচয় নেই। স্বাধীন বাংলাদেশ মানেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। পরাধীন বাংলায় বঙ্গবন্ধু ফিরে আসবেন না। গোলামের পরিচয় নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অধিকৃত পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে আসবেন না কোন দিন। জীবনের বিনিময়ে হলেও আমরা বাংলাদেশকে স্বাধীন করব। পরাধীন দেশের মাটিতে আমার লাশও যাতে ফিরে না যায় সে জন্য জীবিতদের কাছে আর্জি রেখে যাই। আমার শেষকথা, যে কোন কিছুর বিনিময়ে আমরা বাংলার মাটিকে দখলদার মুক্ত করব। বাংলার মুক্ত মাটিতে মুক্ত মানুষ হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে আমারা ফিরিয়ে আনব। মুজিব স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশেতে ফিরে আসবেন এবং তাকে আমরা জীবিত অবস্থায় ফিরিয়ে আনব ইনশাল্লাহ। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রাণ রক্ষার জন্য বিশ্ব মানবতার কাছে আমরা আকুল আবেদন জানাচ্ছি”।

তাজউদ্দীন আহমেদের এই আবেগময়ী ভাষণের পর জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগানে শিলিগুড়ি কনফারেন্স গর্জে উঠেছিল। নিষ্পত্তি হয় একটি বিভ্রান্তিমূলক ও আত্মঘাতী ষড়যন্ত্রের। তবে সেটা ক্ষনিকের জন্য।

সূত্র :
একাত্তরের রণাঙ্গন কিছু অকথিত কথা (নজরুল ইসলাম)
মূলধারা ‘৭১ (মঈদুল হাসান)
বাম রাজনীতির ৬২ বছর (ফাইজুস সালেহীন)
ক্রাচের কর্ণেল (শাহাদুজ্জামান)

0
Your rating: None

Comments

SalimC's picture

আজো আমরা আমাদের শ্রেষ্ট সন্তান,বীর শহীদদের চিনতে পারিনি।

শেখ মুজিবর রহমান বাংলার কিংবদন্তি, অন্তত জনগনের কাছে।তবে শেখ মুজিবর রহমান কিংবদন্তি হতে পারেননি তাঁর কন্যাদের এবং কিছু আঁতেল আওয়ামী নেতাদের কাছে।তবে শেখ মুজিবর রহমান কি?সে প্রশ্নের উত্তরের কোন শেষ নাই। তাঁর কন্যাদের স্বপ্নের মাধ্যমে যুগে যুগে আমরা জানতে পারব কি ছিলেন শেখ মুজিবর রহমান। জাতীর জনক, বঙ্গবন্ধু, জাতীর স্থপতি, মহান নেতা, মহান স্বপ্নদর্শক নাকি অন্য কিছু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কশীট থেকে যতটুকু জানা যায় তিনি ইংরেজীতে তেমন একটা ভাল ছিলেন না, আবার খারাপও ছিলেন না অংকেও একই। তাঁর সন্তানদের দাবী সর্বদা রাজনীতির পিছনে সময় দিতে গিয়ে কখনও ব্রিলিয়্যান্ট ছাত্র হিসেবে বেড়ে উঠতে পারেন নি।
স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি পাকিস্থানীদের হাতে, তিনি সহ ড. কামাল হোসেন স্বেচ্ছা কারাবরন কারী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী জীবনে তিনি খুব একটা মুক্তিযুদ্ধের কথা শুনতে চাইতেননা।এ অভিযোগ ছিল সৈয়দ নজরুলের ও তাজউদ্দিনের, কারন ইতিহাস শুনলে উল্টো সৈয়দ নজরুল ও তাজউদ্দিন ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সন্তান হয়ে যায় কিনা এই ভয়ে। সে যাই হোক ঘাপলা বেঁধেছে তখন যখন বিদেশী সাংবাদিকেরা শেখ মুজিবের কাছে জানতে চাইল যুদ্ধে কতজন মানুষ মারা গিয়েছে? তিনি সাথে সাথে উত্তর হাঁকলেন থ্রি মিলিয়ন, সাংবাদিক পূনরায় প্রশ্ন করলেন শেখ মুজিব পুনরায় তাই বললেন, আবারো প্রশ্ন আবারো একই উত্তর। সাংবাদিকের উদ্দেশ্যে ছিল শেখ মুজিব যে ভূল বলছেন সেটা তাঁকে মনে করিয়ে দেওয়া, থ্রি মিলিয়ন সাংঘাতিক বেশী হয় কিনা। তবে শেখ মুজিবের ছিল অন্য সমস্যা। তাঁর পরিকল্পনা ছিল তিনি প্রায় তিন লাখ বা তিন লাখ মানুষ মারা গেছে বলবেন। তবে তিনি জানতেন না বাংলা লক্ষ শব্দের বিপরীতে ইংরেজীতে কোন শব্দ নাই। শতকে যেমন হানড্রেড বলে, হাজারকে থাউজেন্ট বলে, কোটিকে কোর্র বলে কিন্তু লক্ষের জন্যে সেভাবে কোন ইংরেজী শব্দ নাই।তবে ১০ লক্ষকে মিলিয়ন হিসেবে বলা হয়। শেখ মুজিব মনে করেছিলেন মিলিয়ন বুঝি লক্ষকেই বলে।তাই তিনি থ্রি মিলিয়ন বলেছিলেন মানে ৩০ লাখ বাংলাদেশী মারা গেছেন। আসলে তার মনে যে কথা ছিল তার ইংরেজী হল থ্রি হানড্রেট থাউজেন্টস।
মজার ব্যাপার হলো যুদ্ধে যারা মারা যায় তারা বীর হিসেবে চিন্থিত হয়, যতটুকু সম্ভব তাদের পরিচিতি, নাম-ধাম ঠিকানা রাষ্ট্রিয়ভাবে যোগাড় ও সংরক্ষন করা হয়।ইসলামের ইতিহাসে যতজন মারা গেছেন তাদের নাম মানুষের বুকে-মনে রয়েছে।এখনো তাঁদের সাবই চেনে ও জানে। কিন্তু মুজিবর রহমানের একটি ভূল শব্দ উচ্ছারনের কারনে আজো আমরা আমাদের জাতীর শ্রেষ্ট সন্তানদের তথা বীর শহীদদের চিনতে পারিনি। জানতে পারিনি। তাদের নাম, পরিচয়, বীরত্ব ইত্যাদি। অনেকে মুক্তিযুদ্ধ না করেই বুকে তেল মালিশ করে চলেছেন আবার অনেকে নিজের প্রিয় জীবন খানী সঁপেদিয়েও খাতায় নাম লিখাতে পারেননি। শুধু একটি মাত্র ভূল ইংরেজীর কারনে।
জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের হিসাব রাখা হয়েছে, তাদের চাকুরী হচ্ছে, তা হতেই হবে। আবার রাজাকারদের তালিকা তৈরী হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে মালমা-মোকদ্দমা হচ্ছে, তা হতেই হবে। কিন্তু যাঁরা মারা গেল তাদের কি অপরাধ? তাদের তো চাকুরী লাগবেনা, আদালত লাগবে না, টাকা পয়সার কারবারও লাগবে না। তারপরও তারা কেন নিগৃহীত? স্বাধীনতা যুদ্ধে বেঁচে যাওয়াই কি তাহলে বীরত্ব! যেভাবে কবি শামশুর রহমান বেঁচেছিলেন? তিনি ১৫ই ডিসেম্বর পর্যন্ত দৈনিক পাকিস্থান পত্রিকায় সম্পাদনার কাজ সেরেছেন, ১৫ই ডিসেম্বর সে পত্রিকা বেরও হয়েছে, তিনি মাসের অগ্রিম বেতনও তুলে রেখেছিলেন, ১৬ই ডিসেম্বর তিনি মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেলেন। এক বিচিত্র মুক্তিযোদ্ধা আওয়ামীলীগে আছে হিসাব বলা দায়। আর যাঁরা মরলেন তাঁরা বেকুব হিসেবে থাকলেন যেন ইতিহাসের পাতায়। কোন সরকার শহীদদের তালিকা তৈরীতে হাত দেয়নি, অথছ গ্রামে গ্রামে তাঁদের আত্বীয়রা জীবিত আছেন, তাদের থেকে সকলের নামের তালিকা পাওয়া যাবে। রাজাকার খোঁজার নামে সরকারের যত আগ্রহ এই শহীদদের নামটি খোঁজার আগ্রহ সরকারের নেই।মূলত এই কাজ করতে গেলে শেখ মুজিবর রহমানের বলা হিসেবের সাথে বাস্তব হিসেবের ভজঘট বেঁধে যাবে। সেজন্যে কেউ এই হিসাব বের করতে চায়নি। আওয়ামীদের ধারনা শেখ মুজিব ভূল করতেই জানতেন না। তাই হিসেবের দরকার কি? আবার ভূল যদি বের হয়ে আসে, ফলে হিসাব নিয়ে আওয়ামীলীগ চরম বেকায়দায় পড়বে এই চিন্তায় তারাও এ ব্যপারে মুখ খোলেনা।
কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি হিসেবে এটা কি তাদের দায়িত্ব নয়? শুধু তাদের পিতার ইংরেজী জ্ঞান ঠিক রাখতেই এতবড় জুলুম মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি? মানুষ মাত্রেই ভূল তাই শেখ মুজিবও ভূল করেছেন। তাই এই হঠকারী সিদ্ধান্তে অটল না থেকে দেশের আপামর জনতার এই হিসাব জোগাড় ও সংরক্ষন করার জন্যে সরকারের কাছে দাবী জানানো দরকার। যারা আমার সাথে একমত তারা নিজ নিজ পরিমন্ডলে মানুষকে বলা ও বুঝানো উচিত, আমার সাথে দ্বিমত করার কোন সুযোগ আছে বলে আমি মনেও করিনা। মূলত কত মানুষ কিভাবে মরেছে এটা শেখ মুজিবের জানার কথা নয়। কারন শেখ মুজিব নিজে স্বশরীরে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহন করেননি বরং সুটকেসে কাপড়-চোপড় বেঁধে রেখেছিলেন পাকিস্থান যাওয়ার জন্যে। খানাপিনার যাতে সমস্যা নাহয় সেজন্যে সাথে নিয়েছিলেন ইন্ডিয়া নিবাসী ড. কামাল হোসেন কে। কারন তখন ড. কামাল হোসেনের শাশুড় মশাই পাকিস্থান সংসদের স্পীকার। মোটামুটি জামাই আদর আগে থেকেই নিশ্চিত ছিল। পুরো যুদ্ধকালটাই তাঁরা পাকিস্থানে কাটিয়েছেন, দেশে যখন শেখ ফিরে আসেন তখন তিনি আঁতেলের খপ্পড়ে পড়েন। মৃত্যু অবধি শেখ আঁতেলের মাখানো তৈলেই হাবুডুবু খান, বাঁশ বেয়ে আর উপরে উঠতে পারেন নি, ফলে মানুষের মৃত্যুর হিসাব তাঁর জন্যে করা দুষ্কর ও দুরহ ছিল। আঁতেলেরা উপরে তুলে দিয়ে মইখানা তুলে নিয়ে যান ফলে সকল বিপদ শেখ মুজিবের মাথার উপর পড়ে। আমাদের ধারনা হয়ত আঁতেলেরাই এই থ্রি মিলিয়ন তত্ব তাঁর মগজে দিয়েছিল যারপরনায় লক্ষ বীর শহীদ আজ অবহেলিত। আর ১ যুগ পরে হয়ত বীর শহীদদের কোন আত্বীয় বেঁচে নাও থাকতে পারে। তাই দোহাই আওয়ামী ভাইয়েরা শেখ মুজিবের এই অনিচ্ছাকৃত ভূল আমরা মেনে নেব তবে বীর শহীদদের এইভাবে মহা সর্বনাশ করবেন না। তাদের সংখ্যা ও পরিচিতি বের করুন, দাবী দাওয়া আপনারাও তুলুন মানুষ যাতে সঠিক ইতিহাস জানতে পারে। আর যদি বলেন আমার কথা মিথ্যা যুদ্ধে ৩০ লাখই মরেছে, যেটা বলা আপনাদের স্বভাব তাহলে মানুষ বসে থাকবেনা ওই হিসাব একটি ডাহা মিথ্যা ছিল একথা বলার, লিখার জন্যে এবং প্রমান করার জন্যে।