সময়কাল ১৯৯০ সাল। সে বছর ইতালীতে বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসতে যাচ্ছে। ব্যাপক সংখ্যক অবৈধ অভিবাসী অধ্যুসিত দেশটির বাহ্যিক ভাবমুর্তীর খাতিরে তখন লেজ্জে মার্তেল্লী বা মার্তেল্লী আইন ঘোষনা করা হয়েছে। এদেশে অবৈধ ভাবে বসবাসকারী অভিবাসীদের সাধারন এ্যামনেষ্টির মাধ্যমে স্থায়ী ভাবে বসবাস ও কাজের অনুমতি দেয়াই ছিল ঘোষিত এ আইনের মুল লক্ষ্য । আইনটি ঘোষিত হওয়ার সাথে সাথেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রধানত বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, চীন, ফিলিপিন, মরক্কো, তিউনিশিয়া ও আলজেরীয়ার ন্যায় দেশগুলীর লক্ষ লক্ষ রাজনৈতিক সরনার্থীরা এ সুবর্ন সুজোগ গ্রহনের উদ্দেশ্যে এখানে ছুটে আসেন। ঘোষনাটি আসার আগে সমগ্র ইতালীতে কম/বেশী মাত্র ৫০০ বাঙ্গালী ( যাদের মধ্যে সরকারীভাবে মাত্র ৩২৬ জন বৈধ ) অভিবাসী এ দেশটিতে ছিলেন, যাদের অধিকাংশের আবাস ছিল রোম শহরে আনুমানিক মাত্র ৪৫/৫০ টি এ্যাপরর্টমেন্ট বা ফ্লাটে। রাতারাতি এ সংখ্যা বেড়ে আনুমানিক প্রায় ছয় হাজার তথা বারো গুনেরও বেশী বৃদ্ধি পাওয়ায় সেখানে বসবাসকারী বাঙ্গালীদের দৈনিন্দন জীবনে এক প্রকট সমস্যার সৃষ্টি হয়। বাঙ্গালীদের প্রতি ফ্লাটেই ৫০/৬০ জন মানুষ গাদাগাদি করে কোন প্রকারে রাত কাটাতেন। যাদের পরিচিত কেহ ছিলেন না কিন্তু সচ্ছল তারা বাধ্য হয়েই আবাসিক হোটেল গুলিতে অবস্থান নেন, অবশিষ্ট বিরাট সংখ্যক মানুষ রাস্তা, ঘাট, চার্চ ও মিউজিয়ামের বারান্দাতেই স্লিপিং ব্যাগ বা কম্বল মুড়ে কোন রকমে রাত কাটাতেন।
এমনি একটি সময়ে ইতালীর একটি ছোট্ট বামপন্থি রাজনৈতিক দল ডেমোক্রেসিয়া প্রোলেতারীয়েত (ডি,পি) এর সহযোগীতায় আমরা সদ্য আগত বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্থান, শ্রীলঙ্কা, চীন ও ফিলিপাইনের এর অভিবাসনেচ্ছুদেরকে নিয়ে ইউনাইটেড এশিয়ান ওয়ার্কার্স এসোশিয়েশন নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলি। উদ্দেশ্য ছিল আইনের বেড়াজাল পেরিয়ে এখানে আগত সকলের বৈধতা অর্জন সহ দৈনিন্দন সমস্যা সমাধানে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহন করা । কারন ঘোষিত মার্তেল্লী আইন অনুযায়ী ৩১ শে ডিসেম্বর ১৯৮৯ এর পুর্বে এদেশে প্রবেশ করেছেন এমন যে কোন প্রমান সাপেক্ষেই কেবল প্রত্যাশিত বৈধতার সোনার হরিনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে । অথচ এ ধরনের প্রমান দেখাতে ব্যার্থ হচ্ছিলেন অধিকাংশ অভিবাসনেচ্ছু, যেহেতু এদের অধিকাংশই উল্লেখিত দিনের পরই ইতালীতে আগমন করেছিলেন। সেজন্য এখানে আগত সকলের বৈধতা লাভের উপায় উদ্ভাবনের জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, গ্রুপ ও পুলিশ প্রশাসনের সাথে আলোচনা ও তাদের প্রতি চাপ সৃষ্টিতে আন্দোলন এবং অন্যদিকে বিভিন্ন মানবতাবাদী দাতব্য সংগঠনের মাধ্যমে দৈনিন্দন থাকা, খাওয়া ও অন্যান্য সুজোগ সুবিধা আদায়ে আমরা বিভিন্নমুখী ততপরতা শুরু করি। কারিতাস দিওসেজানা, সান্তা-এজিডিও সহ বিভিন্ন চার্চ ও এনজিও সংগঠন ও রোম বিশ্ববিদ্যালয়ের বামপন্থি ও বর্নবৈষম্য বিরোধী ইহুদি ছাত্র সংগঠন গুলি তাদের সাধ্যানুযায়ী আমাদের বিভিন্ন সাংগঠনিক ও বৈষয়িক সহযোগীতায় এগিয়ে আসে। এরা পালাক্রমে কেহবা সকালের নাস্তা, কেহবা দুপুরের খাবার কেহবা রাতের খাবারের ব্যাবস্থা করেন,কেহবা এদের সামগ্রী (লাগেজ) সংরক্ষনের ব্যাবস্থা করেন। একটি প্রতিষ্ঠান সপ্তাহে একবারের জন্য ব্যাবহারিত কাপড় ধোয়া, ক্ষৌরী কর্ম, শীতকালীন জামাকাপড় এবং পাদুকা বিতরন ও স্নান সহ দুপুরের খাবারের ব্যাবস্থা করেছিল। মাত্র কয়েকদিনেই এ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানটিতে প্রচুর লোক সমাগম বেড়ে গেলেও হটাৎ করে একদিন খবর এলো এ প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট সেবাকর্ম স্থানীয় কমিউন কতৃপক্ষের হস্তক্ষেপে স্থগিত করা হয়েছে। এ ধরনের সেবা গ্রহনকারী প্রধানত বাঙ্গালী ও পাকিস্তানীদের অনুরোধের প্রেক্ষিতে এ সংস্থার অর্থসংস্থানকারী শ্রদ্ধ্যাভাজন পরিচালক ডন লুইজির সরনাপন্য হয়ে এর প্রতিকারের দাবি জানাতে তিনি স্থানীয় কমিউনের সাথে এ ব্যাপারে একটি যৌথ সভার ব্যাবস্থ্যা করেন। নির্ধারিত দিনে এ যৌথ সভায় উপস্থিত হলে আমাদের জানানো হয় যে, সপ্তাহের অন্যান্য দিন নিয়মিত ভিন্ন কর্মসুচী থাকায় সংশ্লিষ্ট এ প্রতিষ্ঠানটির সেবাদানের নির্ধারিত দিন ছিল শক্রুবার। সকাল দশটা থেকে ক্ষৌরী কর্ম, পোশাক-সামগ্রী বিতরন, গোসল ও মধ্যাহ্ন ভোজ শেষ করে রোমের তৎকালীন একমাত্র কেন্দ্রীয় মসজিদে যেয়ে জুম্মার নামাজ আদায়ে ব্যার্থ হয়ে বেশ কিছু সেবাগ্রহনকারী মুসল্লী এ প্রতিষ্ঠানের কাটাতারের বেড়া কেটে পার্শবর্তী খোলা প্রান্তরে জামাতে নামাজ আদায় করে আসছিলেন। হটাৎ করে এ ধরনের সমাবেশের জন্য ঐ খোলা প্রান্তর ব্যাহারকারী বৃদ্ধ-বৃদ্ধ্যা ও শিশুরা এ ধরনের অপরিচিত ও তাদের ভাষায় উদ্ভট কর্মকান্ডে ভয় পেয়ে স্থানীয় পুলিশ ও কমিউন কতৃপক্ষের গোচরে আনে। বিধায়, এ ধরনের মানবিক সেবাকর্মের বিরোধী না হলেও পুলিশের অনুমতি ছাড়াই খোলা চত্তরে এ ধরনের বে আইনী ও কতিথ উদ্ভট সমাবেশ বন্ধে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যার্থতার জন্যই কতৃপক্ষ আইন অনুযায়ী এ ধরনের সেবা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহন করেছে বলে জানায়।
এ ধরনের অনাকাঙ্খিত ঘটনা শুনে আমরা যেমন বিব্রত হলাম তেমনি ধর্মপ্রান মানুষের নিষ্কলুষ প্রার্থনা সমাবেস শুধুমাত্র অপরিচিত বিধায় স্থানীয় মানুষের বীরূপতার শিকার হওয়ায় দারুনভাবে মর্মাহত হলেন নিষ্ঠাবান ধার্মীক ডন লুইজি। তিনি তৎক্ষনিক ভাবে সংশ্লিষ্ট চার্চের একটি অব্যাবহারিত সেমিনার কক্ষ নামাজ আদায়ের জন্য খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য তিনি আরো সিদ্ধান্ত নিলেন যে সকল ব্যক্তি শুধুমাত্র অপরিচিত বিধায় তাদের বীরূপতা প্রকাশ করেছেন,তাদের সাথে অভিবাসীদের জানাশোনা ও পারস্পরিক যোগাযোগের ব্যাপ্তি বাড়াতে উৎসাহী এ সকল স্থানীয় ব্যক্তিদেরকেও এ সেবাকর্মের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে এগিয়ে আসার আহবান জানানো হবে। এহেন আহবায়ন ও উদ্যোগের ফলে বেশ কিছু স্থানীয় যুবা,বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা ব্যক্তিবর্গ তাদের উদৃত্ত ব্যক্তিগত সামগ্রী,অর্থ ও সাধ্য নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে এগিয়ে আসেন এবং অভিবাসীদের কর্মসংস্থানে সহায়তা করেন, এমনকি কিছু পরিবার বেশ কিছু অভিবাসীকে তাদের বাসস্থানে অস্থায়ী ভাবে থাকার ব্যাবস্থ্যা করেন।
ইতালীর জাতীয় অর্থনীতি,ধর্ম ও সমাজব্যাবস্থায় বৃহত্তর পরিসরে এশীয় অভিবাসীদের অন্তর্ভুক্তি সেই থেকে শুরু। ১৯৯০ এর লেজ্জে মার্তেল্লীর অধীনে বৈধাতাপ্রাপ্ত মাত্র চার হাজার পাচশত অভিবাসী বাঙ্গালীর সংখ্যা আজ লক্ষ্যাধীক। ইতালীয় নাগরিকদের ধর্মীয় ও সামাজিক সহিষনুতার ব্যাপ্তি বৃদ্ধি পেয়ে শুধুমাত্র রোম শহরে আজ আনুমানিক শতাধীক মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায় হয়।
ইতালী, বিশেষ করে রোম নগরীর আপামর নাগরিকদের ধর্মীয় ও সামাজিক সহিষনুতার এ ব্যাপ্তি সৃষ্টিকারী আমার পরম শ্রদ্ধ্যেয় ডন লুইজি আজ আর নেই। নিজধর্ম প্রচারের সামান্যতম ও সহজলভ্য কোন পরলৌকিক মোহে ব্রতী না হয়ে, বরং নিছক মানবপ্রেম ও একজন নিষ্ঠাবান ধার্মীক ব্যাক্তি হিসেবে ভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের ধর্মীয় কর্তব্য পালনের প্রতি তার এহেন শাস্ত্রীয় আচরনকেই তো বলে ধর্মনিরপেক্ষতা। এটাকে ধর্মহীনতা বলার দুঃসাহস কার? এটাই আমার অভিজ্ঞতায় ধর্মনিরপেক্ষতার সহজ ও সরল পাঠ।
-------------------------------------------------------------------------------

-------------------------------------------------------------------------------
ইউনাইটেড এশিয়ান ওয়ার্কার্স এসোশিয়েশনের রোম দপ্তরে সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সাথে ডন লুইজি দি লিয়েগরো (টেবিলের পেছনে বসা বাম থেকে দ্বিতিয়)।
-----------------------------
হাসান ইমাম খান,
সুইজারল্যান্ড।

Comments
মানবতার নামে ধর্মের উপেক্ষা ? একটি বিশ্লেষণ |
মানবতার নামে ধর্মের উপেক্ষা : একটি বিশ্লেষণ
ঐতিহাসিক আল মাসউদী তার রচিত মুরূযুয যাহব গ্রন্থে হিন্দুস্তান তথা প্রাচীন ভারতবর্ষের এক বিশেষ সামাজিক বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘‘হিন্দুস্তানী পন্ডিতদের ধারণা, উদরস্থ বায়ু রোধ করে রাখা কঠোর কষ্টদায়ক, আর তা বের করে দেয়া আরামদায়ক। এটা বহু রোগেরও প্রতিষেধক। অন্ত্রে ব্যথার রোগী এতে খুবই আরামবোধ করে। প্লীহার রোগীর জন্য উদরস্থ বায়ু রোধ করে রাখা খুবই ক্ষতিকর।
আল মাসউদী আরো লিখেছেন, ‘‘এ কারণেই হিন্দুস্তানবাসী সশব্দে বায়ু নিঃসরণে কোনও প্রকার লজ্জা বা অস্বস্তিবোধ করে না এবং বায়ু নিঃসরণের শব্দও তারা কখনো রোধ করার চেষ্টা করে না। তাদের মতে হাঁচি, ঢেকুর চুপিসারে দেহস্থ বায়ু নিঃসরণের চেয়ে ক্ষতিকর। সশব্দে দেহস্থ বায়ু নিঃসরণ পেটের দুর্গন্ধ দূরীকরণের উপায়। তারা এমনও বলে, বায়ু তো পেটে সব এক রকমই হয়ে থাকে। অবশ্য নির্গমণের বিভিন্নতা হেতু এর নাম পরিবর্তিত হয়। লোকেরা এর ঊর্ধ্বগামিতার নাম ঢেকুর এবং নিম্নগামিতার নাম ফাসা অর্থাৎ অপাং বায়ু রেখেছে।’’ আল মাসউদী সম্ভবত বৃহত্তর নোয়াখালী-কুমিল্লা অঞ্চলে যাননি। এই অঞ্চলে পেটের নিম্নগামী বায়ুর আরেকটা নাম আছে যা প্রকাশ্যে বলা অশ্লীল গণ্য হওয়ার আশঙ্কায় আমি এখানে উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকলাম। তবে মুরূযুয যাহব গ্রন্থে উল্লেখ না থাকলেও একথা সত্যি যে, প্রকাশ্যে বা জনসমক্ষে পেটের বায়ু ছাড়েন সশব্দে বা নিঃশব্দে, তাদের মানুষ নির্লজ্জ বলে মনে করেন।
এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে, পেটের বায়ু নিয়ে আলোচনা আমার আজকের নিবন্ধের বিষয়বস্তু নয়। আল মাসউদীর গ্রন্থের পেটের বায়ু অংশটি আমার মনে পড়লো এই জন্য যে, পেটের বায়ু যেমন অসতর্ক মুহূর্তে বের হয়ে দুর্গন্ধ ছড়ায় তেমনি আমাদের মধ্যে বর্ণচোরা কিছু ব্যক্তি আছেন অসতর্ক মুহূর্তে যাদের বোধ, বিশ্বাসও বেরিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করে। এতে তাদের প্রকৃত পরিচয় স্পষ্ট হয়ে যায়।
এখন মূল কথায় আসি, গত ১৮ জানুয়ারি বিজয়া পুনর্মিলনী উপলক্ষে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতি কর্তৃক আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রদানকালে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি জনাব তাফাজ্জল ইসলাম একটা তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ধর্ম আমাদের বড় পরিচয় নয়, বড় পরিচয় আমরা মানুষ। তার এই মন্তব্যটি শ্রুতিমধুর সন্দেহ নেই, তবে এর ব্যাখ্যা (বা অপব্যাখ্যা) বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লী সফর উপলক্ষে সম্প্রতি বেশ কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে একটি সমঝোতা ছিল ২০১১ সালে ভারত-বাংলাদেশ কর্তৃক যৌথভাবে রবীন্দ্র ঠাকুরের জন্মবার্ষিকী পালনের সিদ্ধান্ত। বিরোধীদলীয় নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তার সাংবাদিক সম্মেলনে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে অন্যান্য বিষয়ের সাথে যৌথভাবে রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী পালনের সিদ্ধান্তের ব্যাপারেও প্রশ্ন তুলেছেন। তার আপত্তিটি ছিল আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামকে নিয়ে। তিনি বলেছেন ভারতের জাতীয় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবার্ষিকী ভারত-বাংলাদেশ যৌথভাবে পালন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে, ভালো কথা। কিন্তু আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী যৌথভাবে পালন করার সিদ্ধান্ত হলো না কেন? তার এই প্রশ্নটি স্বাভাবিক ছিল এবং এতে দেশের ১৫ কোটি মানুষের অন্তরের প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়। কিন্তু তার এই যৌক্তিক কথাটিকে সরকার স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেননি। আওয়ামী লীগ জেনারেল সেক্রেটারি ও এলজিআরডি মন্ত্রী এতে সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ আবিষ্কার করেছেন। তিনি কবি নজরুলের কান্ডারী হুঁশিয়ার কবিতার ‘‘হিন্দু না ওরা মুসলিম (??) এই জিজ্ঞাসে কোন জন্’’ এই ছত্রটি উদ্ধৃত করে বলতে চেয়েছেন যে, বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ভারতীয় জাতীয় কবি রবীন্দ্রনাথের সমমর্যাদায় আনার জন্য যারা প্রশ্ন তুলেছেন তারা প্রকৃতপক্ষে হিন্দু-মুসলমানের প্রশ্ন তুলেছেন। তার ও তার সরকারের চিন্তাধারা অনুযায়ী ‘হিন্দু-মুসলমানের' চেয়ে মানুষ অনেক বড়। তার এই বিশ্বাস এদেশের ৯২ ভাগ মানুষের নীতি-বিশ্বাসের সাথে সঙ্গতিশীল নয়।
সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের সাথে সম্পৃক্ত আইনজীবীদের একটি প্রতিষ্ঠান। এই আইনজীবী সমিতি ইতঃপূর্বে ৯০ ভাগ মুসলমানের এই দেশে তাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান তথা ঈদ, নবী দিবস, শবে বরাত, শবে কদর, মহররম প্রভৃতি উপলক্ষে কোনও অনুষ্ঠান বা পুনর্মিলনীর আয়োজন করেছেন কিনা আমি জানি না। বিজয়া পুনর্মিলনী উপলক্ষে অনুষ্ঠান করে ৮ শতাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বীর ধর্ম বিশ্বাসের প্রতি তারা যে শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন তার জন্য তারা ধন্যবাদ পেতে পারেন। তবে প্রধান বিচারপতি সেখানে ধর্ম বিশ্বাসকে গৌণ করে যে বক্তব্য দিয়েছেন তার সাথে একমত হওয়া খুবই কঠিন। ধর্মীয় পরিচয় ধর্মবিশ্বাসীদের কাছে প্রধান পরিচয়। যারা ধর্মে বিশ্বাস করেন না তাদের জন্য ‘মানুষ' হচ্ছে বড় পরিচয়। একটি মুসলিমপ্রধান দেশের প্রধান বিচারপতি হিসেবে তিনি কুরআন-সুন্নাহ বিধৃত ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, ইসলামে সংখ্যালঘুদের অধিকার ও তার নিশ্চয়তা, ইসলামে ইনসাফ ও আদলের দৃষ্টিতে সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু নির্বিশেষে নাগরিকদের অবস্থান প্রভৃতি বিষয়ে যদি বক্তব্য রাখতেন তাহলে দেশ ও জাতির মন মানস আলোকিত হতে পারতো। একজন মুসলিম বিচারক হিসেবে তার কাছে অন্তত: আমার এটাই ছিল প্রত্যাশা।
পরিচয় হিসেবে ধর্মকে প্রত্যাখ্যান করার বিষয়টি নতুন নয়। একশ্রেণীর মানুষ ধর্মের মধ্যে মানবতার সন্ধান পান না। তাই তারা ধর্মকে বাদ দিয়ে মানবতা বা Humanism এর মধ্যে তার অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হয়ে পড়েন। পশ্চিমা বিশ্বে রেনেসাঁ যুগে বিশেষ করে ১৪০০ থেকে ১৬৫০ সালের মধ্যে এর উদ্ভব ঘটে। এর সাথে গীর্জার স্বেচ্ছাচার, ধর্মের নামে বজ্জাতি ও নির্যাতনের সম্পর্কও ছিল। তখন এই প্রশ্নও উঠেছিল যে, ধর্মকে বাদ দিয়ে যে মানুষকে ও মানবতাকে বড়করে দেখা হচ্ছে তার সংজ্ঞা কি? পাশ্চাত্য দার্শনিকরা এই অবস্থায় মানুষের একটি নতুন সংজ্ঞাও তৈরি করলেন। তারা বললেন, "A man is a puny specie on tiny planet revolving round a tenth rate star drifling aimlessly in an endless Cosmic Ocean." অর্থাৎ মানুষ হচ্ছে জাগতিক সমুদ্রে দ্রুতগতি সম্পন্ন নক্ষত্রের চারদিকে ঘুর্ণায়মান ছোট্ট গ্রহের উপর উদ্দেশ্যহীনভাবে বিচরণকারী ক্ষুদ্র একটি প্রাণী।’’ এই প্রাণীর কোনও লক্ষ্য নেই জবাবদিহিতা নেই, সে যা ইচ্ছা তা করতে পারে। এর সাথে যুক্ত হয় ডারউইনের Theory of Evolution যার মোদ্দা কথা হচ্ছে বানর থেকে হাজার হাজার বছরের ক্রমবিকাশের মাধ্যমে মানুষের বিকাশ ঘটেছে। বলাবাহুল্য মানুষের উপরোক্ত দু'টি ধারণাই বিশ্বে প্রচলিত সকল ধর্মবিশ্বাসের পরিপন্থী। কোনও ধর্মবিশ্বাসী হিউম্যানিস্ট বা মানবতাবাদী হতে পারেন না। American Hamanist Association-এর মুখপত্র The Hamanist পত্রিকার সম্পাদক Paul Kartz যথার্থই বলেছেন, "Humanism cannot in any sense of the word apply to one who still believes in God as the sorce of creator of the Universe. It would be possible only for those who are willing to admit that they are atheistic humanists. It surely does not apply to God-intoxicated believers." সংক্ষেপে এর অর্থ হচ্ছে যারা বিশ্বাস করেন যে, খোদা হচ্ছেন বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের স্রষ্টা তাদের ব্যাপারে মানবতাবাদ শব্দটি কোন অর্থেই প্রযোজ্য নয়। নাস্তিকদের বেলায়ই শুধু এটি প্রযোজ্য।
Humanist Manifesto-ও একই কথা বলে। ধর্মে বিশ্বাস করলে মানবতাবাদী হওয়া যায় না। এ প্রেক্ষিতে ধর্মকে উপেক্ষা করে যারা মানবতা বা Hamanismকে বড় করে দেখাতে চান তারা প্রকৃতপক্ষে এ দেশের ধর্ম বিশ্বাসকেই ধ্বংস করতে চান।
মানবতাবাদীদের বৈশিষ্ট্য শুধু নাস্তিকতা নয়। একশ্রেণীর মানবতাবাদী আছেন যারা নিজেদের Naturalist বলে প্রচার করেন। এরা উলঙ্গ থাকার মধ্যে কোনও অপরাধ দেখেন না। ইউরোপ, আমেরিকায় এদের সন্ধান পাওয়া যায়। আবার এই মানবতাবাদীদের মানবতাবোধ কতটুকু তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। চাকরি জীবনে আমি একজন সবিচকে সহকর্মী হিসেবে পেয়েছিলাম যিনি মানবতাবাদী ছিলেন। অত্যন্ত দরিদ্র ঘরে তার জন্ম ছিল। খুবই মেধাবী ছিলেন। নোয়াখালীর একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান তাকে লেখাপড়া শিখিয়ে মেয়ে বিয়ে দিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করে CSP হয়েছিলেন। তিনি একটি জেলার ডিসি থাকাকালে স্ত্রীকে তালাক দিয়ে হিন্দু এক মহিলাকে বিয়ে করেছিলেন। তার মানবতাবোধ কৃতজ্ঞতাবোধকে ভুলিয়ে দিয়েছিল। মানবতার নামে এখন বাংলাদেশে নতুন করে ধর্মের উপর আঘাত দেয়া শুরু হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। একটা কথা পরিষ্কার হওয়া দরকার যে, ধর্মীয় পরিচয়ই যদি না থাকে তা হলে বাংলাদেশের আলাদা অস্তিত্বই থাকতে পারে না। কেননা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতেই ভারত বিভক্ত হয়ে পূর্ববাংলা ও আসামের অংশবিশেষ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল যা ১৯৭১ সালে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে বাংলাদেশে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই একশ্রেণীর রাজনীতিবিদ বুদ্ধিজীবী অদৃশ্য শক্তির ইঙ্গিতে আমাদের ধর্মীয় অস্তিত্বকে অস্বীকার করে বসে এবং রাজনীতি থেকে ধর্মকে নির্বাসনে পাঠানোর অপচেষ্টা শুরু করে। এ ব্যাপারে মরহুম আবুল মনসুর আহমদ তার রচিত ‘‘বেশি দামে কেনা কম দামে বেচা আমাদের স্বাধীনতা’’ গ্রন্থে একটি চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন। তার ভাষায় ‘‘বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর পরই ভারত ও বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠীর এক মহলে ও সংবাদপত্রে উলুধ্বনি উঠিয়াছিল’’ ধর্মভিত্তিক ভারত বাটোয়ারা বাতিল হইয়া গিয়াছে, পাকিস্তান দাবি ভ্রান্ত প্রমাণিত হইয়াছে।’’ আমরা কেউ কেউ ‘ইত্তেফাকে' প্রবন্ধ লিখিয়া এবং পুস্তক প্রকাশ করিয়া হুঁশিয়ার করিয়া দিয়াছিলাম, এমন কথায় রাজনৈতিক আত্মঘাতি তাৎপর্য, ভারত বাংলাদেশের সম্পর্কে সন্দেহ অবিশ্বাস সৃষ্টির ও উপমহাদেশে স্থায়ী শান্তি স্থাপনে বিঘ্নের আশঙ্কা সম্পর্কে সতর্কবাণী উচ্চারণ করিয়াছিলাম, আমাদের এই হুঁশিয়ারিকে কেউ কেউ প্রগতিবিরোধী মুসলিম লীগ মনোবৃত্তি আখ্যা দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে আমরা যারা লাহোর প্রস্তাবভিত্তিক ভারত বাটোয়ারার বাস্তব রূপায়ন বলিয়াছিলাম কেউ কেউ তাদেরকেও তিরস্কার করিয়াছিলেন। কিন্তু আমি ঐসব রাজনৈতিক নাবালকদের কথায় বিচলিত হই নাই। প্রথম বিচলিত হই ভারতের কংগ্রেস নেতৃত্ব ও বাংলাদেশের আওয়ামী নেতৃত্বের একাংশের বাস্তবতাবোধের অভাব দেখিয়া।’’ তিনি আরো লিখেছেন, শিমলা চুক্তির পরে বাস্তববাদী রাজনৈতিক বিচক্ষণতার অসম একটি ঐতিহাসিক দলিল অনুমোদন করিতে গিয়া নিখিল ভারত কংগ্রেস পার্লামেন্টারী পার্টি নিতান্ত অবাস্তব, অপ্রাসঙ্গিকভাবে অনুমোদন প্রস্তাবে বলিলেন, ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত বাটোয়ারাই অবৈধ হইয়াছিল। আর এদিকে বাংলাদেশ সরকার রাস্তাঘাট বিশ্ববিদ্যালয় হল ইত্যাদি হইতে ঐ বাটোয়ার জন্য দায়ী জিন্নাহ সাহেবের নাম মুছিয়া ফেলিলেন। এমন কি জিন্নাহ টুপীর বিরুদ্ধে সংবাদ পত্রে অভিযান চলিল। প্রমাণিত হইল বাংলাদেশ সরকার নীতিতঃই ভারত বাটোয়ারার বিরোধী। (আবুল মনসুর আহমদ : বেশী দামে কেনা কম দামে বেচা আমাদের স্বাধীনতা, পৃষ্টা: ২১০-১১)।
ভারত বাটোয়ারার বিরোধী হওয়ার অর্থ হচ্ছে অখন্ড ভারতে বিশ্বাসী হওয়া। ভারত যদি অখন্ডই থাকবে তাহলে বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্ব কোথায়? বলা নি্রয়োজন যে জনাব আবুল মনসুর আহমদ আওয়ামী লীগপন্থী সাংবাদিক রাজনৈতিক হলেও তিনি ঐ দলটির সুস্থ ও প্রকৃতিস্থ গ্রুপের সদস্য ছিলেন এবং প্রকৃত দেশপ্রেমিক হিসেবে স্বাধীনতা-উত্তরকালে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপের চুলচেরা বিশ্লেষণ করতেন। এই দলের ভারত তোষণ, ধর্ম নিরপেক্ষতার নামে ধর্ম বিরোধী অপতৎপরতা এবং অখন্ড ভারতের নীতি আদর্শের প্রতি সমর্থনকে তিনি ঘৃণা করতেন। আওয়ামী লীগের ঐ সরকার টিকেনি এবং তার পতনের পর স্বাভাবিকভাবেই দেশের মানুষ উল্লাস প্রকাশ করেছে। ২১ বছর পর জাতীয় পার্টির সহায়তায় দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় গিয়ে এই দলটি ও তার সহৃদরা সম্ভবত কৌশলগত কারণে এসব ব্যাপারে আর নাক গলায়নি। তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে তারা এবার পুণরায় অতীতের নীতিতে প্রত্যাবর্তন করেছে বলে মনে হয়। ভারতীয় পরামর্শ তারা এখন সমাজনীতি ও রাজনীতি থেকে ধর্ম এবং ধর্মীয় আদর্শকে উৎখাত করে লক্ষ্য অর্জন করতে চায়। এর আগে অবশ্য আমাদের ধর্ম বিশ্বাসের স্বাতন্ত্র বিলোপ করারও চেষ্টা হয়েছিল কিন্তু তা ব্যর্থ হয়েছে। পাঠকরা নিশ্চয়ই জানেন যে, উপমহাদেশের হিন্দু এবং মুসলমানরা শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে পাশাপাশি বসবাস করলেও ইতিহাস ঐতিহ্য, সভ্যতা-সংস্কৃতি আকিদা বিশ্বাস, জীবনবোধ ও আচার আচরণের দিক থেকে সব সময়ই তারা আলাদা ছিল। তাদের মধ্যে জাতিগত ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা যে হয়নি তা নয়, কিন্তু হিন্দু জাতিসত্তার অন্তনির্হিত অসহনশীলতা, অস্পৃশ্যতা ও বর্ণভেদ প্রথা, অহংবোধ এবং আধিপত্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এই ঐক্যে সর্বদা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধর্ম বিশ্বাসজনিত স্বাতন্ত্র তো আছেই। সম্রাট আকবরের নিরক্ষরতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে হিন্দু পুরোহিত ও অভিজাত সম্প্রদায়ের একটা শ্রেণী তাকে দিয়ে দ্বীনে ইলাহী নামক একটি অভিনব ধর্মের প্রবর্তন করে মুসলমানদের তার সাথে লীন করার চেষ্টা চালিয়েছিল। কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উভয় সম্প্রদায়ের স্বাতন্ত্র বজায় রেখে একই ভূখন্ডে বসবাসের লক্ষ্যে ১৪ দফা দাবি পেশ করাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে হিন্দু মুসলিম মিলনের দূত আখ্যা পেলেও কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ এবং কুলীন ব্রাহ্মণদের অসহযোগীতার কারণে তিনি ব্যর্থ হন এবং দ্বিজাতিতত্ত্বের যথার্থতা প্রমাণিত হয়।
এর আগে অবশ্য মোহন লাল করম চাঁন্দ গান্ধী হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে আদর্শিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার ব্যর্থ চেষ্টাও চালিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে সকল ধর্মের অনুসারীদের জন্য প্রতি সন্ধ্যায় আয়োজিত তার প্রার্থনা সভার কথা স্মরণ করা যেতে পারে। এর জন্য তার রচিত প্রার্থনা সঙ্গীতটিও প্রনিধানযোগ্য। সঙ্গীতটির প্রথম কয়েকটি চরণ নিম্নরূপ :
রঘুপতি রাঘব রাজা রাম
পতিত পাবন গীতা রাম
ঈশ্বর আল্লাহ তেরা নাম
সবকো সন্মতি দে ভগবান
বলা বাহুল্য গান্ধী সেকুলারিজম তথা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের মূর্ত প্রতীক ছিলেন। তার ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শকে তৎকালীন মুসলমানদের গুটি কয়েকজন ছাড়া বৃহত্তর মুসলিম সমাজ গ্রহণ করেনি। রঘুবংশীয় রাজা রামই ঈশ্বর এবং তিনি আল্লাহ তার এই প্রচারণাকে মুসলিম সমাজ নাউজুবিল্লাহ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং গান্ধী তাদের দৃষ্টিতে ছিল ভন্ড, যদিও আওয়ামী লীগ নেতাদের ন্যায় এক শ্রেণীর নগন্যসংখ্যক মুসলমান তার ভক্তে পরিণত হয়েছিল এবং তাকে ‘মহাত্মা' উপাধিতে ভূষিত করেছিল। মাইকেল মধুসূধন দত্ত ও ব্যারিস্টার লালমোহন ঘোষের ন্যায়ঃ হাজার হাজার শিক্ষিত হিন্দু যুবকরা যখন দলে দলে এই ধর্ম ত্যাগ করে খৃস্টান হওয়া শুরু করে তখন এই ধারাকে রোধ করার এবং মুসলমানদের আকৃষ্ট করার জন্য রাজা রামমোহন রায় ব্রাহ্ম মতবাদ প্রচার করেন। তার মতবাদ অনুযায়ী বৈদিক ধর্মে মূর্তি পূজার কোনো স্থান নেই। ঈশ্বর বা ব্রহ্মার কোনো রূপ বা আকারও নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর কেশব চন্দ্র সেন প্রমুখ এই মতবাদ গ্রহণ করে তা প্রসারের চেষ্টা করেন। কিন্তু মুসলমানরা ইসলামী আদর্শ পরিত্যাগ করে ব্রাহ্ম সমাজের অন্তর্ভুক্ত হননি। এছাড়াও রাম কৃষ্ণ পরম হংসদেবও এ ব্যাপারে কম যাননি। তার ঘোষণা অনুযায়ী বাইরের আচার অনুষ্ঠান বিভিন্ন হলেও মূলে সকল ধর্মই এক ও অভিন্ন। তার মতে ভাল মন্দ বলতে কিছু নেই। গঙ্গার জল আর নর্দমার জলের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। সকল ধর্ম যে এক তা প্রমাণের জন্য তিনি কিছুদিনের জন্য মুসলমান, কিছুদিনের জন্য খৃস্টান হয়েছিলেন। মুসলমান হয়ে তিনি নাকি নিয়মিত নামাজ রোজা করতেন। তবে মুসলমানের রান্না করা খাবার খাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি নিজেকে মুসলমান গণ্য করতে পারছিলেন না। কাজেই তিনি স্থির করবেন যে মুসলমান পাচকের রান্না খেয়ে এই অসম্পূর্ণতা দূর করবেন। কিন্তু এতে তার শুভানুধ্যায়ী রাণী রাসমনির কন্যার জামাতা প্রথম বাবু বাঁধ সাধলেন। তিনি এসে বললেন, মশাই তুমি তো হিন্দু ধর্মের বেইজ্জতি তো কম করনি। পৈতাটি পর্যন্ত ফেলে দিয়েছ, অবশিষ্ট যা আছে মুসলমান পাচকের রান্না খেয়ে তাও কি বিসর্জন দেবে? তার এই কথায় পরম হংস দেবের সুমতি ফিরে আসে। তিনি হুকুম করলেন, মুসলমানের পরিবর্তে পাচক হিন্দুই হবে, তার রান্নার সময় কাছাটি খুলে নিবে এবং পেয়াজ রসুন বেশী দেবে। তার মতবাদ হালে পানি পায়নি এবং মুসলমানরা তার এই প্রতারণার ফাঁদে পা দেয়নি। মহাত্মা গান্ধী ধর্ম নিরপেক্ষতার ধূম্রজাল সৃষ্টি করলেও তালে ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির অনুগত অনুসারী ছিলেন। তিনি রাম নামে তসবীহ পড়ায় বিশ্বাসী ছিলেন এবং বলতেন, বেশী বেশী রাম নাম জপলে পেশাবে Acetyline গ্যাসের পরিমাণ হ্রাস পায়। তার দলেরই নেত্রী সরোজীনী নাইডুর ভাষায় মি. গান্ধী একাধারে ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারী আবার রামরাজত্ব কায়েমের জন্য জীবন উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত ছিলেন। রাম রাজত্ব প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে ধর্ম নিরপেক্ষতার প্রলেপ দিয়ে তিনি কিছু মুসলমানকে প্রতারিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং রামধনু সঙ্গীতের মাধ্যমে রঘু বংশীয় রাজা রামকে তারা তার প্রভাবে আল্লাহ বলে স্বীকার করেও নিয়েছিলেন। কিন্তু গান্ধীর এই চেষ্টা ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা শিরক হিসাবে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠা তারই প্রমাণ বহন করে। আওয়ামী লীগ ও তার অনুসারীরা এখন রামপন্থী ভারতের আদর্শ প্রতিষ্ঠার অভিলাস নিয়ে ধর্ম বিশ্বাস ও ধর্মীয় রাজনীতির উপর আঘাত হানতে শুরু করেছে। এই আঘাত প্রতিহিত করা আমার আপনার সকলের দায়িত্ব।
ধন্যবাদ।
আপনার সুন্দর ও সুখ্পাঠ্য রচনার জ্ন্য ধন্যবাদ।
তবে মনে হ্য় আপনি ধর্মনিরপেক্ষতা ও ম্হানুভব্তার মধ্যে পার্থ্ক্য করছেন না।
ধর্মনিরপেক্ষতা অবশেষে ধর্মহীনতাই।