সরকারি দলের সামনে তিনটি বাধা - আব্দুল কাইয়ুম

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমামকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে তলবের ঘটনাটি দুভাবে দেখা যেতে পারে। একদিকে এটা যেমন তাদের সক্রিয়তার ভালো দৃষ্টান্ত, অন্যদিকে এ ঘটনা সাধারণ মানুষের চোখে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের অন্তর্দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ। ভালো দিকটি এতই ‘ভালো’ যে, আমার দেশ পত্রিকা এর বিপুল প্রশংসা করে ‘দিনবদলের ইঙ্গিত’ শিরোনামে সম্পাদকীয় ছাপিয়েছে।

তাদের মূল কথা হলো, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত এক সাবেক আমলা আর দুজন চাকরিরত আমলা মিলে ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছিলেন, কিন্তু বেচারারা সম্ভবত টের পাননি যে ‘দিনবদলের পালা’ আসলেই শুরু হয়ে গেছে! সম্পাদকীয় কলামের উপসংহারে বলা হয়, ‘স্থায়ী কমিটিগুলো যদি সংসদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় সফল হয়, তবে সবাই স্বীকার করবেন যে, দিনবদল আসলে অতি ধীরে হলেও শুরু হয়ে গেছে।’

দিনবদল কতটা শুরু হয়েছে বা আদৌ শুরু হয়েছে কি না, তা নিয়ে শুধু সংশয়বাদীরাই নয়, বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন যে কেউই প্রশ্ন তুলবেন। তবে ক্ষমতাসীন দলের ভেতর অন্তর্দ্বন্দ্ব যে প্রকট হয়ে ফুটে উঠছে, এটা তার একটি ক্ষুদ্র নমুনা। সম্ভবত সে জন্যই ভুতের মুখে রাম নাম শোনা যাচ্ছে। যারা প্রতিটি ঘটনায় সরকারের ভুল ধরতে উন্নুখ, তারাই কিনা আজ প্রশংসায় পঞ্চমুখ!

সংসদীয় কমিটিগুলোর আসল কাজ সরকারের কাজকর্মের জবাবদিহি আদায় করা। সেদিক থেকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি হোমরা-চোমরাদের যে ডাকছে, সেটা সংসদীয় কার্যক্রমের অংশ। নির্ভয়ে তারা কাজ করছে। কিন্তু সরকারি দলের এক নেতা যখন আরেক নেতাকে তলব করেন, তখন মানুষের মনে খটকা লাগে। কারণ ঘটনাটি বেশ কিছুদিন আগের, সরকারের ভুল সরকারই শুধরে নিয়েছে। এ নিয়ে বিচারকদেরও আর কোনো অভিযোগ নেই। তাহলে এখন কি শুধু ‘পোস্টমর্টেম’ তথা ময়নাতদন্তের জন্যই তলব? এইচ টি ইমাম পাল্টা অভিযোগ করে বলেছেন, কারও ‘উসকানিতে’ তলবের কথা বলা হয়েছে। আবার আইন প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, সংসদীয় কমিটিতে নাকি এইচ টি ইমাম সাহেবকে ডাকার সিদ্ধান্ত হয়নি, শুধু আইনসচিবকে ডাকার কথা বলা হয়েছে। ওদিকে আইনমন্ত্রী নির্দিষ্ট করে কিছু বলছেন না। সবটা মিলিয়ে মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয় যে, সরকারি দলের নেতাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি চলছে।

ঘটনাটা এত প্রশ্নবোধক হতো না যদি তার আগে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা শেখ সেলিম তাঁদেরই দলের আরেকজন নেতা, সাবেক সেনাপ্রধান, সাবেক সাংসদ ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য কে এম সফিউল্লাহর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ না তুলতেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের সময় সাবেক সেনাপ্রধানের ভুমিকা নিয়ে এত বছর পর প্রশ্ন তোলায় ক্ষমতাসীন মহলে এক ধরনের পাল্টাপাল্টি চলছে বলে ধারণা করলে কাউকে দোষ দেওয়া যাবে না। এর আগে দলের কাউন্সিলে তথাকথিত সংস্কারবাদীদের কিছুটা তফাতে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এবার ঘটনাগুলো সাজালে যে চিত্রটি ফুটে ওঠে, তা আওয়ামী লীগের মতো বড়, ঐতিহ্যবাহী এবং দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসনে বিজয়ী ক্ষমতাসীন দলের জন্য খুব সুখকর নয়।

শক্তিশালী বিরোধী দলের অনুপস্িথতিতে আওয়ামী লীগের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব বা ভুল বোঝাবুঝি থাকলে তা নিজেদের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত সময়কালে এ ধরনের অন্তর্দ্বন্দ্ব আওয়ামী লীগের পায়ের নিচের মাটি সরিয়ে নিয়েছিল। সত্তরের ডাকসুর সহসভাপতি ও ছাত্রলীগের নেতা আ স ম রবের নেতৃত্বে ১৯৭২ সালে জাসদ আলাদা হওয়াতে আওয়ামী লীগ যতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তার চেয়েও বেশি সর্বনাশ হয় দলের ভেতরের কোন্দলে। কারণ কাঁকর বিছানো পথে খালি পায়ে হাঁটা বরং সহজ, কিন্তু জুতোর ভেতর কাঁকরের কণামাত্র থাকলে এক কদমও হাঁটা যায় না। সে সময় আওয়ামী লীগের অবস্থা অনেকটা ওরকমই ছিল।

মুন্সিগঞ্জের দুই প্রভাবশালী নেতা ছিলেন মরহুম কোরবান আলী ও শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। তাঁদের মধ্যে চরম অন্তর্দ্বন্দ্ব পুরো এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। প্রতিদিন দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও খুনোখুনি চলতে থাকে। শোনা যায়, রাতের বেলা যারা ‘সর্বহারা’ স্েলাগান দিয়ে অস্ত্র নিয়ে ‘জোতদার’ খতম করার আন্দোলন করত, তারাই আবার দিনের বেলা দুই প্রভাবশালী নেতার অনুসারী হয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হতো। শেষ পর্যন্ত কিছু আগে-পরে এ দুই নেতাই এরশাদের দলে যোগ দেন।
দলাদলি থেকে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে সন্ত্রাস। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫−তিন বছরে আওয়ামী লীগদলীয় পাঁচজন সাংসদ খুন হন। এসব খুনের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের উদ্বেগ এত বেশি ছিল যে স্বয়ং বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চের ভাষণে তা উল্লেখ করেন। চরমপন্থীদের হাতে তাঁরা খুন হয়েছিলেন বলে পত্রিকার খবরে জানা যায়। মনে পড়ে কুষ্টিয়ার কুমারখালী নির্বাচনী এলাকার সাংসদ গোলাম কিবরিয়াকে ১৯৭৪ সালে ঈদের জামাতে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়। মঠবাড়িয়ার গণপরিষদ সদস্য সওগাতুল আলম সগিরকে ১৯৭৩ সালের জানুয়ারিতে দুষ্ককৃতকারীরা গুলি করে হত্যা করে। অনেকের ধারণা, ওই সব নির্মম হত্যাকান্ডের পেছনে দলীয় কোন্দল কাজ করেছে। দলাদলির ডামাডোলে খুনি মোশতাক চক্র বেড়ে ওঠার অনুকুল পরিবেশ পায় এবং শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। তখন অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে বিপর্যস্ত আওয়ামী লীগের পক্ষে সামান্য প্রতিরোধ গড়ে তোলাও সম্ভব হয়নি।

এটা ঠিক যে, বর্তমান পরিস্িথতি সেই সময়ের মতো না। কিন্তু সতর্ক না হলে এই সব ছোটখাটো বিরোধই মহীরুহ হয়ে উঠবে। ক্ষমতাসীন দলের সামনে একে এক বড় বাধা হিসেবে দেখা চলে। অন্য সব সমস্যার বীজ এখানেই। দলের নেতাদের মধ্যে অবিশ্বাস ও ভুল বোঝাবুঝি থেকে সন্ত্রাস মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। দলের মধ্যে প্রতিপক্ষকে দমনের জন্য এমনকি পেশাদার সন্ত্রাসীদের পোষা হয়। প্রশাসন তাদের সমীহ করে চলে। এভাবে বিপদ বাড়তে থাকে। সরকারের কাছে মানুষ সর্বাগ্রে চায় শান্তি। সেটা না পেলে মানুষের মধ্যে হতাশা দেখা দেয়। সন্ত্রাস যত বাড়ে, সরকার তত জনবিচ্ছিন্ন হয়।

দলাদলী থেকে সৃষ্ট দলীয় লোকজনের সন্ত্রাস সরকারের সামনে দ্বিতীয় বড় বাধা। ১৯৭৪-৭৫ কালপর্বে এই রোগটি আওয়ামী লীগকে ঝাঁজরা করে ফেলেছিল। সে সময় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের মধ্যে মারামারি-কাটাকাটি শুরু হয়। ১৯৭৪ সালের ৪ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলে যুবলীগের মূল নেতা শেখ মনির অনুসারী সাত ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়। এই হত্যা মামলায় ৭ এপ্রিল গ্রেপ্তার করা হয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম প্রধানসহ অনেককে। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তখন চিকিৎসার জন্য মস্কোতে। পরিস্িথতি নাজুক হয়ে ওঠে। অভ্যন্তরীণ দলাদলি থেকে সৃষ্ট সন্ত্রাস আওয়ামী লীগের মতো একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী ক্ষমতাসীন একটি দলকে কত কাহিল করে ফেলতে পারে, এটি তার একটি দৃষ্টান্ত। ওই দিনগুলোর সঙ্গে বর্তমান পরিস্িথতি তুলনীয় নয় ঠিকই, কিন্তু সাবধান হওয়ার এখনই সময়।

তৃতীয় যে সমস্যাটি সরকারের জন্য বড় বিপদ হয়ে উঠছে তা হলো, দলীয় নেতাদের দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, জমি দখলসহ যাবতীয় অপকর্মে দলীয় লোকজনের প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা। এখানেও দলাদলি কাজ করে। ভাগবাটোয়ারার আসল দর্শন হলো, কেকের বড় ভাগটা পাওয়া চাই। এ জন্য দল পাকাতে পারলে সুবিধা হয়। অতীতেও এরকম দেখা গেছে। ১৯৭৪ সালে ছাত্রলীগ-যুবলীগের দ্বন্দ্বের সময় ওরা একে অপরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনতে শুরু করে। একবার তাদের এক পক্ষ বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে (সে সময় দক্ষিণ প্রান্তে একটি খোলা চত্বর ছিল, যেখানে সমাবেশ হতো) এক সমাবেশে ১৫-২০ জন ‘দুর্নীতিবাজের’ তালিকা প্রকাশ করে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিভিন্ন বক্তৃতায় বলেন, ‘আমি বিদেশ থাইকা ভিক্ষা কইরা আনি, আর চাটার দল সব খাইয়া ফেলে, আমার গরিব মানুষেরা কিছু পায় না!’ সে সময় মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর পুনর্বাসনের জন্য অনেক ত্রাণসামগ্রী আসে। তার মধ্যে ছিল প্রচুর কম্বল। এই কম্বল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। বঙ্গবন্ধু এক বক্তৃতায় বলেন, ‘সাত কোটি কম্বলের আমারটা কই’? তিনি বিভিন্ন বক্তৃতায় আক্ষেপ করে বলেন, সবাই দেশ স্বাধীন করে পায় সোনার খনি, আমি পেয়েছি দুর্নীতির খনি!

বঙ্গবন্ধু নিজ দলীয় লোকজনের দুর্নীতিতে বীতশ্রদ্ধ হয়ে এসব কথা বলতেন। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘.. দুর্নীতিবাজদের যদি খতম করতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশের মানুষের শতকরা ২৫ থেকে ৩০ ভাগ দুঃখ চলে যাবে। এত চোর যে কোথা থেকে পয়দা হয়েছে জানি না। পাকিস্তান সব নিয়ে গেছে, কিন্তু এই চোর রেখে গেছে। এই চোর তারা নিয়ে গেলে বাঁচতাম ...।’

দলাদলিকে প্রশ্রয় দিলে চুরি-চামারি, লুটপাট বন্ধ করা যাবে না। সম্প্রতি শেখ হাসিনা জনকল্যাণে ত্যাগ স্বীকারের জন্য নেতা-কর্মীদের প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘চারদলীয় জোট সরকারের দুর্নীতি, লুটপাট ও অন্যায়-অত্যাচারে’ অতিষ্ঠ হয়ে জনগণ তাঁদের ভোট দিয়েছে, জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসকে সম্মান দিতে হবে। কিন্তু সেই আস্থা ও বিশ্বাস যে ইতিমধ্যে ক্ষয় পেতে শুরু করেছে, সেটা কি কারও জানতে বাকি আছে?

প্রধানমন্ত্রী যদি না জানেন তাহলে বলতে হয় তাঁকে অন্ধকারে রাখা হয়েছে। আর এই অবসরে দলীয় নেতাদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বের বিস্তার শুভ লক্ষণ নয়।

আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।

সৌজন্যে: দৈনিক প্রথম আলো