আজ (২ সেপ্টেম্বর) জিয়া হায়দারের প্রথম মৃত্যুদিন, তথা প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী।
খুব অনায়াসেই লিখে ফেললুম এই সংবাদ। যেন দুঃসংবাদ নয় আর। কীভাবে মারা গেলেন, কোন রোগে মারা গেলেন, কোথায়, কখন কোনো উল্লেখই নেই, কেবল জানান দিয়েই চুপ, মৌনী। মনে হওয়া এও স্বাভাবিক, মর্মাহত নই যেমন, কষ্ট-ব্যথায় দীর্ণ হইনি। আঁখি শুষ্ক। জল নেই। স্বতঃস্ফূর্ত লেখা হলো জিয়া হায়দারের পহেলা প্রয়াণ দিবস আজ।
মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছিলেন জন্ম থেকেই। ইতিমধ্যে বাহাত্তর বছর কেটে গেছে। আজকের দিনে এই বয়স বৃদ্ধের নয়, কিন্তু অসভ্য কর্কট রোগ কাউকে কব্জা করতে পারলে আশা নেই জীবনের। অবশ্য জানি, বাংলাদেশের ঘরে ঘরে যম ওঁৎপেতে আছে। সামাজিক-রাষ্ট্রিক-রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে। পথে-ঘাটে রোগ-জীবাণু। দূষিত জল হাওয়া। নিশ্বাসে টান লাগে। অসুস্থ পরিবেশ গোটা দেশময়। সুচিকিৎসা নেই, ওষুধ নেই। ধুঁকে ধুঁকে মরা ছাড়া আর কী আছে? যারা বিত্তবান ছোটেন সিঙ্গাপুর, লন্ডনে। যারা উচ্চ মধ্যবিত্ত, দৌড় মুম্বাই, চেন্নাই। মধ্যবিত্তের ভরসা ঢাকা শহর। নিম্নবিত্তের কাহিনী আরও করুণ।
আমি জানি, কলকাতার ডাক্তারদের অর্ধেকের বেশি রোগী বাংলাদেশের। বহু ডাক্তার আমার পরিচিত, সখ্যজন। বলেন, দেশের টাকা রোগীরা বিদেশে গিয়ে খরচ করছে, দেশেরই মস্ত ক্ষতি। সরকারের টনক নড়ে না? বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, দফতর কি নামেমাত্র? ডাক্তারদের চিকিৎসায় কেন ভরসা নেই?
সন্দেহ নেই, মৌলিক প্রশ্ন।
জিয়া হায়দারও ছুটে যান বোম্বে টাটা ক্যান্সার সেন্টারে (হাসপাতালে)। ঢাকায় রোগ ধরা পড়ে না। টাটা ক্যান্সার সেন্টার রক্ত পরীক্ষা করেই হদিস পায় সময় ঘনায়মান। ফিরে আসেন ঢাকায়।
মুম্বাই যাওয়ার পাঁচদিন আগে ফোন করেন আমাকে। সঙ্গে যাবেন দুদুভাই (রশীদ হায়দার)।
মুম্বাই অচেনা। কোথায় উঠবেন, অজানা। মুম্বাইয়ে বিস্তর খরচ, বিশেষত হোটেলের।
ফোন করি রুরুকে (শরণ্য রায়। অন্নদাশঙ্কর রায়-লীলা রায়ের নাতি।) দায়িত্ব দিই। রুরু কেবল দেখভালেরই দায়িত্ব নেন না, নিজের আস্তানাই ছেড়ে দেন। সোনাভাই (জিয়া হায়দার), দাদুভাই যে কয়দিন চিকিৎসার্থে মুম্বাইয়ে ছিলেন, রুরুর ঘরের চাবি পকেটস্থ করেন।
দেখভাল কিংবা আস্তানা ছেড়ে দেওয়া নয় শুধু, সেন্টারে দৌড়াদৌড়ি, ডাক্তারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করার ভারও কাঁধে নেন। সব দায়ই যেন ওর।
ডাক্তারের সঙ্গে প্রতিদিন দেখা বা চিকিৎসা নয়, মাঝখানে দু'চারদিন গ্যাপ (ফাঁক)। এই দু'চারদিন কী করে কাটাবেন? কোথায় যাবেন? ফোন করি পুনায়, তৃপ্তিদিকে (অন্নদাশঙ্কর রায়-লীলা রায়ের ছোট কন্যা)। জেনে গেছেন রুরুর কাছ থেকে সোনাভাই কেন মুম্বাইয়ে, টাটা সেন্টারে।
সোনাভাই, দাদুভাই দু'বার পুনায় গিয়ে তৃপ্তি রায়-অশোক রায়ের ফ্ল্যাটে আবহাওয়া চেঞ্জ করেন।
পুনার আবহাওয়া মুম্বাইয়ের চেয়ে ভালো, কিন্তু কর্কট রোগের কাছে সব আবহাওয়াই সমান।
রুরুর যে ত্যাগ, এই ঋণ শোধ করা অসম্ভব।
প্রসঙ্গত রুরুর কথা আরও বলতে চাই। রুরু এখন বলিউডে জমিয়ে বসেছে। স্ক্রিপ্ট লেখে। ছবির সহ-পরিচালক এমন কী প্রোডাকশনেরও কেউকেটা। কিন্তু ছবিতে ভিন্ন নাম ব্যবহার করেন। ছদ্মনাম। কেন?_ অন্নদাশঙ্কর রায়ের নাতি হিন্দি ফিল্মে জড়িত?_ এই বোধে লজ্জা বিসর্জন দেননি আরব সাগরে।
ছায়াছবি নিয়ে, বিশেষত বলিউডি ছবি নিয়ে, বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখিনি কখনও। বরং 'রাবিশ' শুনেছি বহুবার। কারণও ছিল। বান্দ্রায়, ওর বাড়ির ৫৯ গজ দূরেই বিখ্যাত মেহবুব স্টুডিও। চোখের সামনে অভিনেতা-অভিনেত্রী দেখেছেন দিন-রাত। দেখে 'রাবিশ' শব্দটি আয়ত্ত করেন।
_ ভাগ্যের কী পরিহাস!!
সত্তর দশকের শেষদিকে আমি, সোনাভাই, হেমা (হেমন্তী হায়দার। রশীদ হায়দার-আনিসা হায়দারের প্রথম কন্যা।) বোম্বে (তখনও মুম্বাই নামকরণ হয়নি।) গিয়েছি। তৃপ্তিদির বাড়িতে দিব্যি আছি। রুরুর বয়স ১০ বছর। হেমার ছোট। হেমাকে 'দিদি' (হেমাদি) বলতে অজ্ঞান। দিদিকে মেহবুব স্টুডিও সম্পর্কে নানা রূপকথা শুনিয়ে বিনোদ খান্না, ধর্মেন্দ্র, রাজেশ খান্না, দেবানন্দ, মুমতাজ, পারভীন বাবি, জিনাত আমন, রেখা, হেমামালিনীকে দেখানোর জন্য উদগ্রীব। হেমার তখনও অজানা ওরা কারা। হেমার অনিচ্ছায় রুরু ব্যাজার।
রুরুর দুরন্তপনার কাছে রবীন্দ্রনাথের 'ছুটির' ফটিক নিতান্তই নবজাতক। কখন কী করবে স্বয়ং রুরুরও অজানা।
রুরুকে নিয়ে আমরা আওরাঙ্গবাদ, ইলোরা-অজন্তা গিয়েছি। সামলানো দায়। ১০ বছরের রুরু কখন উধাও, কোথায়; হদিস পাওয়া মুশকিল। পাহাড়ে উঠছে-নামছে। দৌড়ঝাঁপ। সোনাভাই ধমক দেন। কিন্তু, পরোয়া নেই।
সেই রুরু দেখভালের দায়িত্ব নেন সোনাভাইয়ের।
_ এও বাহ্য।
সোনাভাই যে-কয়দিন মুম্বাই ছিলেন, রুরু মোবাইল ফোন সঁপে দেন। ওই ফোনে, নম্বরে ঢাকা থেকে যোগাযোগ। আমিও করি।
সোনাভাই ঢাকায় ফিরলে রুরু এতটাই ব্যাকুল, সমূহ ব্যস্ততা ব্যতিরেকে প্রায়-নিত্যদিনই ফোন : 'জিয়াদা কেমন আছেন?'
_ মৃত্যুর সংবাদ জেনে কিয়ৎক্ষণ চুপ। সাড়া-শব্দ নেই ফোনে। হঠাৎ অঝোরে কান্না। 'জিয়াদা চলে গেলেন? আমাকে ছেড়ে চলে গেলেন?'
_ এই লেখার শিরোনাম হওয়া উচিত 'সোনাভাই ও রুরু'।
দুই
ভাবলে ভুল হবে, রুরুর আত্মিকতা বৈদেশিক। রুরুর মতো আরও অনেকেই আত্মিকতায় বৈশ্বিক। ডেইলি স্টারের খবর উদ্ধৃতি করে দক্ষিণ আফ্রিকার, অস্ট্রেলিয়ার সংবাদপত্রেও প্রকাশিত। দুই নোবেল লোরিয়েট ফোনে (নার্ডিন গোরডিমার। কুয়েটজি। দু'জনকে সোনাভাইয়ের ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ, ইংরেজি নাটক [অনুবাদ] উপহার দিয়েছিলুম।) সমবেদনা জানিয়ে বলেন : 'লস্ট ইউনিভারসিয়াল ম্যান'।
তিন
জিয়া হায়দার কেবল আমাদের সোনাভাই নন, সোনায় গড়া মানুষ। রাষ্ট্রিক-সামাজিক দেশীয় কালচারে। ভাবুন, এই মানুষটি কী পরিশ্রমে তৈরি করেছেন নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়। নিজের হাতে তৈরি। একক প্রচেষ্টায়, অক্লান্ত পরিশ্রমে। বাংলাদেশের আধুনিক নাট্যকলার পথিকৃৎ।
আমাদের সোনাভাইয়ের মৃত্যুদিনের খবর এক লাইনে লেখা যায় না। নানাদিক গুছিয়ে ভেবে দেখলুম, সোনাভাই একাধারে দেশ-রাষ্ট্র-সমাজ-পারিপার্শিক। নাটকে। কবিতায়। মানবিকতায়। সেকুলারিজমে।
দাউদ হায়দার : বার্লিন প্রবাসী কবি ও সাংবাদিক
সৌজন্যে: দৈনিক সমকাল