ছেলেমেয়ে আর ভাইবোনের পড়াশোনার খরচ চালাতে পারবো কি না এ দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছি। দ্রব্যমূল্যের কশাঘাতে সংসার চালানোই কষ্টকর হয়ে পড়ছে। স্বাধীন দেশে এভাবে বাচতে হবে কখনো ভাবিনি। দেশটা এমনভাবে চলছে যেন দেখার কেউ নেই। আমাদের মতো স্বল্প আয়ের মানুষের কষ্ট দিন দিন বেড়েই চলেছে। এতো কষ্টের মধ্যেও ভালো দিনের প্রত্যাশায় প্রহর গুনছি। হয়তো আবার সুদিন ফিরে আসবে। গতকাল সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন পেশাজীবীর সঙ্গে দ্রব্যমূল্য নিয়ে কথা বললে তারা এভাবেই নিজেদের দুর্দশার কথা জানালেন।
তারা বলেন, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা আজ বিপর্যস্ত। অনেকেই সংসার চালাতে হিমশিম খেয়ে ছেলেমেয়েদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। অনেকে আবার বাসায় ছেলেমেয়েদের জন্য রাখা টিউটরকেও বাদ দিয়েছেন। জনসংখ্যার বিরাট অংশের বেতন কয়েক বছরে এক টাকাও বাড়েনি। অথচ বেড়েছে প্রতিটি জিনিসের দাম। চারদিকে হাহাকার। কেউ বলছেন সরব আবার কেউবা বলছেন নীরব দুর্ভিক্ষ চলছে। সরকারের এক উপদেষ্টা বলেছেন, হিডেন হাঙ্গার চলছে। আসলে দেশে যে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে এ নিয়ে কারো দ্বিমত নেই। দিন যতো যাচ্ছে অবস্থা ততোই করুণ হচ্ছে। এ নিয়ে প্রতিদিন রাউন্ড টেবিলে নানা আলোচনা হলেও সমাধানের কোনো উপায় দেখা যাচ্ছে না।
রাজধানীর গাউসুল আজম মার্কেটের মোবাইল সার্ভিসিং ব্যবসায়ী আবু সোলায়মান লিটন যায়যায়দিনের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, বাবা-মা ও পাচ ভাই, এক বোনসহ আটজনের সংসার আমাকে একা চালাতে হয়। এর মধ্যে দুই ভাই ও একমাত্র বোনকে পড়াশোনার খরচ দিতে হয়। তিনি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারে অধ্যয়নরত একমাত্র আদরের বোনের পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এতোদিন তিন সাবজেক্টের প্রাইভেট পড়াতাম। গত মাস থেকে তা বন্ধ করে দিয়েছি। ছোট দুই ভাইয়ের পড়ালেখা বন্ধ করে আমার সঙ্গে মোবাইল সার্ভিসিংয়ের কাজ শেখাচ্ছি। পটুয়াখালীতে এখন মা-বাবাসহ বাকি ভাইবোনেরা থাকেন।
তিনি জানান, প্রতি মাসে সব মিলিয়ে পাচ হাজার টাকা পাঠাতাম। গত মাসে আব্বা ফোন করে অনুরোধ করেছেন টাকার পরিমাণ একটু বাড়িয়ে দিতে। এ টাকা দিয়ে সংসার চালানো নাকি কঠিন হয়ে পড়ছে। কিন্তু আমার সীমিত আয় দিয়ে কিভাবে এতো বড় ফ্যামিলির ব্যয়ভার বহন করবো তা ভাবতেই কষ্ট লাগে। ছোট ভাই দুটির পড়ালেখা আর চালিয়ে যেতে পারবো কি না তা ভেবে পাচ্ছি না। তিনি বলেন, এভাবে আর কতোদিন। প্রতিদিনই জিনিসপত্রের দাম বেড়েই চলেছে। আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের নীরবে কষ্ট নিয়ে বেচে থাকা ছাড়া আর কি করার আছে। বড় ভাই হয়ে ছোট ভাইবোনের পড়ালেখার খরচ চালাতে না পারলে এর চেয়ে কষ্ট আর কি হতে পারে।
মোঃ কছিমউদ্দিন হোটেল ব্যবসায়ী। গাউসুল আজম মার্কেটে মামা হোটেলের মালিক। সবার কাছেই তিনি মামা নামে পরিচিত। ব্যবসা কেমন জিজ্ঞাসা করতেই একবাক্যে বলে দিলেন, ভালো না কোনো মতে চলছে। দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় কাস্টমারদের নানা কথা শুনতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। জিনিসপত্রের দাম যে হারে বেড়েছে সে হারে খাবারের দাম বাড়াতে পারিনি।
তিনি জানান, এ হোটেলে অধিকাংশ কাস্টমার ঢাকা ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। তাদের কথা চিন্তা করে সেভাবে দামও বাড়াতে পারছি না। কোনো মতে ব্যবসা করে টিকে আছি। তিন ছেলে, এক মেয়ে ও স্ত্রীসহ ছয়জনের সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছি। ছোট ছেলে ও মেয়েটা স্কুলে পড়ে। প্রতি মাসে প্রাইভেট বাবদ তাদের পেছনে খরচ ১ হাজার ২০০ টাকা। এরপর স্কুলের বেতন তো আছেই। হোটেল ভাড়া, কর্মচারীর বেতন ও পানি বিলসহ মাসে খরচ প্রায় ৫০ হাজার টাকা। বড় ছেলেকে ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেছি।
তিনি বলেন, আগে খাবারের দাম কম থাকায় বিভিন্ন হলের শিক্ষার্থীরা এখানে খেতে আসতো। কিন্তু দাম কিছুটা বাড়ানোয় কাস্টমার অনেক কমে গেছে। আগে কম দামে বিক্রি করে যে লাভ হতো এখন দাম বাড়িয়েও সে লাভ হয় না। ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারবো কি না এ নিয়ে শঙ্কিত।
মোসাম্মৎ পারভীন আক্তার ইসলামপুর থেকে শাড়ি ও কাপড় কিনে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করেন। থাকেন জিঞ্জিরায়। ঢাকা মেডিকাল কলেজ হসপিটালের গেটে বসে কাপড় বিক্রির সময় তার সঙ্গে কথা হয়। তিনি অনেকটা দুঃখভরা কণ্ঠে বলেন, দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় স্বামীর আয়ে সংসার চালাতে পারছি না। তাই বাধ্য হয়েই এ ক্ষুদ্র ব্যবসায় নেমেছি। টাকার অভাবে একমাত্র মেয়ে রেনুকে সিক্সে ভর্তি করানোর পরও স্কুলে পাঠাতে পারছি না। আর একমাত্র ছেলে জনির বয়স সাত পার হলেও স্কুলে ভর্তি করাতে পারিনি। নিজেরাই চলতে পারছি না, কিভাবে ছেলেমেয়ের পড়ালেখার খরচ জোগাবো। স্বামী দিলু মিয়া যাত্রাবাড়ী থেকে মাছ কিনে ধোলাইখাল বিক্রি করেন। যা লাভ হয় তা দিয়ে সংসার চলে না।
তিনি জানান, গত কোরবানির ঈদের পর আর মাংস কিনে খেতে পারিনি। এতোদিন স্বামী নিজেদের জন্য কিছু মাছ বাসায় নিয়ে এলেও এখন আর আনছেন না। সেগুলো বিক্রি করে চাল আর অন্যান্য জিনিস কিনে আনছেন। অনেক ইচ্ছা ছিল যেভাবেই হোক ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা করাবো। সে ইচ্ছা আর পূরণ হলো না।
