যাযাদি: জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) টানাপড়েন শুরম্ন হয়েছে। প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও কমিশন আগামী অক্টোবরে তিন শতাধিক উপজেলার নির্বাচন সম্পন্ন করার অনড় অবস্থান নিয়েছে। সব ধরনের প্রস্তুতিও চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ-বিএনপির সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ কতোটা সফল হবে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
নির্বাচন কমিশন বলছে, তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের মতামত নিয়েই উপজেলা পরিষদসহ বিভিন্ন পর্যায়ের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরম্ন করা হয়েছে। আর গত বছরের ১৫ জুলাই ঘোষিত রোডম্যাপে এসব নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নিয়েই প্রস্তুতি কাজ শুরম্ন করা হয়।
রোডম্যাপে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং এর আগে অক্টোবরের মধ্যে ধাপে ধাপে সব পর্যায়ের স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্নের কথা বলা হলেও সংলাপে অংশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো এ বিষয়ে জোরালো কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করেনি। তাই নির্বাচনের আগ মুহূর্তে প্রধান দুই দলের এ অবস্থান কমিশন ও সরকারকে বিব্রত করছে বলে কমিশন দাবি করেছে।
এদিকে উপজেলা নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের এই অতি আগ্রহকে ভালোভাবে দেখছে না প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এ নির্বাচনের মধ্যে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে বলে তারা দাবি করছে। গত মঙ্গলবার রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিলস্নুর রহমান জাতীয় সংসদের আগে উপজেলা নির্বাচন বর্জনের পাশাপাশি এ নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণাও দেন। এজন্য তিনি দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকারও আহ্বান জানান।
একই দিন বিকেলে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট মিলনায়তনে চারদলের এক সভায় বিএনপি মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ারও বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে ২৩ অক্টোবর উপজেলার পরিবর্তে ওই দিন জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের তফসিল ঘোষণার দাবি জানান। এ সময় তিনি সিইসি ড. এ টি এম শামসুল হুদার পদত্যাগও দাবি করেন। ফলে উপজেলা নির্বাচন নিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে বলে সংশিস্নষ্টরা মনে করছেন।
সংশিস্নষ্ট সূত্র মতে, ২১ জুলাই প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ড. এ টি এম শামসুল হুদা বিবিসিকে দেয়া একানত্দ সাৰাৎকারে জানান, আগামী ২৩ অক্টোবর উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ও এ লৰ্যে সেপ্টেম্বরে ঘোষণা করা হবে নির্বাচনী তফসিল। তার এ ঘোষণায় ওই দিনই প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে রাজনৈতিক দলগুলো।
আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিলস্নুর রহমান ও সভাপতিম-লীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা দেন_ এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নেবে না। একই দিন বিএনপি মহাসচিব অ্যাডভোকেট খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনও উপজেলা নির্বাচন বর্জনের কথা বলেন।
প্রসঙ্গত আগামী ৪ আগস্ট অনুষ্ঠিতব্য ৪ সিটি করপোরেশন ও ৯ পৌরসভা নির্বাচনও দলীয়ভাবে বর্জন করেছে বিএনপি। তবে আওয়ামী লীগ টেস্ট কেস হিসেবে অংশ নিয়েছে এ নির্বাচনে। তবে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে পরের দিন ২২ জুলাই দেশব্যাপী ভোটার নিবন্ধন কাজের সমাপনী অনুষ্ঠানে যোগদানের আগ মুহূর্তে নির্বাচন কমিশনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিইসি আবারও বলেন, ২৩ অক্টোবর উপজেলা নির্বাচনের সাম্ভাব্য তারিখ ধরে প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। প্রথম ধাপে ৩শ' থেকে সাড়ে ৩শ' উপজেলার ভোট গ্রহণ করা হবে। বাকি উপজেলাগুলোর নির্বাচন হবে ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর।
সূত্র জানায়, নির্বাচন কমিশন পাল্টাপাল্টি বক্তৃতা-বিবৃতির পাশাপাশি উপজেলা নির্বাচনের প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে উপজেলা অধ্যাদেশ চূড়ানত্দ হয়েছে। উপজেলা নির্বাচন বিধিমালা তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে। মাঠপর্যায়ে উপজেলার ভোট কেন্দ্রের হালনাগাদ তালিকা চেয়ে কমিশন থেকে সারাদেশে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কোনো উপজেলায় আইনগত বা সীমানা সংক্রানত্দ কোনো জটিলতা আছে কি না তা জানতে চেয়ে কমিশন থেকে গত সপ্তাহে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। অক্টোবর মাসে কোনো পরীৰা আছে কি না তা জানতে চেয়ে শিৰা মন্ত্রণালয়েও চিঠি পাঠানো হয়েছে।
ইতিমধ্যে তফসিল ঘোষণার আগে কতোটি উপজেলার ভোটার তালিকা চূড়ানত্দ হবে তার হিসাব ভোটার তালিকা প্রকল্প থেকে কমিশনে পাঠানো হয়েছে। উপজেলা নির্বাচনের কর্মপরিকল্পনা এবং মালামাল ক্রয়ের কাজও চূড়ানত্দ করেছে। এছাড়া স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে সীমানা এবং আইনি জটিলতামুক্ত উপজেলার তালিকা আসার অপেৰায় রয়েছে কমিশন। এ তালিকা এলে প্রকল্প থেকে পাওয়া চূড়ানত্দ ভোটার তালিকা হবে এমন উপজেলার তালিকার সঙ্গে যাচাই-বাছাই করে দেখবে কমিশন। পরে মাঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে চূড়ানত্দ ৩শ' উপজেলার তালিকা তৈরি করবে কমিশন।
সংবিধানে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের কথা সংযোজিত হলেও ৯০-এর গণঅভু্যত্থানে এরশাদ সরকারের পতনের পর দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। এরশাদ-পরবর্তী বিএনপি সরকার উপজেলা পরিষদ বিলুপ্ত করলেও ১৯৯৬ সালে ৰমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার উপজেলা প্রথা পুনঃপ্রবর্তন করে এবং আগের মতোই জনগণের প্রত্যৰ ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করে তার নেতৃত্বে উপজেলা পরিষদ গঠনের বিধান রাখে।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনকে বলা হয়। কিন্তু প্রধান বিরোধী দল বিএনপি জোরালো আপত্তি তোলায় তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) মোহাম্মদ আবু হেনাও বেঁকে বসেন। এ নিয়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে টানাপড়েনের এক পর্যায়ে সিইসি আবু হেনা পদত্যাগ করেন। ফলে ওই সময় আর উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময় ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামায়াত জোট ৰমতাসীন হলেও উপজেলা নির্বাচনের ব্যাপারে কার্যকর কোনোই পদৰেপ নেয়নি।

