আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় হাই কমান্ডের গ্রীন সিগন্যাল পাওয়ার পরেই নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই সারাদেশের প্রায় ৩০০ উপজেলায় নির্বাচন করার একগুঁয়েমি দেখাচ্ছে। দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সংসদ নির্বাচনের পর উপজেলা নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড থেকে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে সংসদের আগেই উপজেলা নির্বাচনের ব্যাপারে এগিয়ে যেতে ইঙ্গিত দিয়েছে। তৃণমূল পর্যায়েও আওয়ামী লীগ নেতারা সংসদের আগেই তাই এই উপজেলা নির্বাচনে আগ্রহী। উলেস্নখ্য, বিদেশ ভ্রমণরত আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সর্বাগ্রে সংসদ নির্বাচনের কথা বললেও দেশে দলটির প্রভাবশালী নেতা আমির হোসেন আমু সংসদ ও উপজেলা নির্বাচন একই দিনে করার ফর্মুলা দিয়েছেন। তিনি সংসদের আগে উপজেলা নির্বাচনের দাবি জানাননি। এদিকে একটি সূত্র জানায়, উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যাবে এবং সেটা জরম্নরি আইনের অধীনেই। সরকারি কৌশলে পা দিয়েই এটি কার্যকর হবে। দলের সভানেত্রীর সঙ্গেই এ ব্যাপারে সরকারের সমঝোতা হয়ে আছে বলেও সূত্র দাবি করেছেন। রাজনৈতিক কৌশল দলীয় নানামুখী সমস্যার কারণে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে উপজেলা নির্বাচনের বিরোধিতা করলেও শেষ পর্যনত্দ ওই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে আওয়ামী লীগ। উপজেলা পর্যায়ের নেতা-কমর্ীদের প্রচণ্ড ইচ্ছার মুখে এই নির্বাচনে অংশ নিতে হচ্ছে বলে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ দাবি করলেও নির্বাচনে অংশগ্রহণের পিছনে রয়েছে বড় ধরনের রাজনৈতিক কৌশল। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত আগামী ২৩ অক্টোবর দেশের সকল উপজেলা নির্বাচনের ঘোর বিরোধিতা করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও আওয়ামী লীগ। বর্তমান পর্যনত্দ বিএনপির অবস্থান সুদৃঢ় থাকলেও আওয়ামী লীগ উপজেলা নির্বাচনের প্রতি মৌন আগ্রহ প্রকাশ করতে শুরম্ন করেছে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশিস্নষ্ট একটি সূত্র জানায়, দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে হাতেগোনা কয়েকজন নেতা উপজেলা নির্বাচনের বিরোধিতা করছে। বাকি সবাই উপজেলা নির্বাচনের পৰে। তারা নিজেদের স্বার্থে সরকারকে চাপের মধ্যে রাখতে চায় কিন্তু আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতা ভেতরে ভেতরে উপজেলা নির্বাচনে অংশ গ্রহণের প্রস্তুতি চালাচ্ছেন। আর আওয়ামী লীগ নেতাদের মতবিরোধের সুযোগে বর্তমান সরকার জাতীয় নির্বাচনের আগেই উপজেলা নির্বাচন দেয়ার সিদ্ধানত্দ নিয়েছে। খবর নিয়ে জানা যায়, জাতীয় নির্বাচনে ব্যাঘাত ঘটার আশংকায় আওয়ামী লীগ নেতারা বক্তৃতা দিয়ে উপজেলা নির্বাচন প্রতিরোধ করার কথা বললেও এর পিছনে ভিন্ন কারণ রয়েছে। বর্তমান সরকারের প্রণীত আইন অনুযায়ী উপজেলা চেয়ারম্যান অনেক ৰমতার মালিক হওয়াতে উপজেলা নির্বাচন ভালোভাবে দেখছেন না আওয়ামী লীগের অনেক কেন্দ্রীয় নেতা। বর্তমান সরকারের বিরম্নদ্ধে ঘোষিত কর্মসূচি ভুলে আওয়ামী লীগ নেতা-কমর্ীরা শুধু এমপিদের ৰমতার সঙ্গে উপজেলা চেয়ারম্যানের ৰমতার ভারসাম্য নিয়ে ব্যসত্দ হয়ে পড়েছেন। জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের জনগণের ভাগ্য উন্নয়নের বিষয়টি ভুলে নিজেদের ভবিষ্যৎ ভাগ্য উন্নয়নের পরিকল্পনায় আওয়ামী লীগ নেতা-কমর্ীরা যে বদ্ধপরিকর, তা তাদের উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণের আগ্রহের মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে তুলে ধরতে সমর্থন হয়েছেন। ২৯ জুলাই নির্বাহী সংসদে আলোচনা এদিকে বাসস এ সম্পর্কে জানায় যে, উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। দলের প্রথম সারির নেতাদের বক্তব্য-বিবৃতির মধ্যে অমিল স্পষ্ট। আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের কোনো কোনো নেতা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠান সংবিধান বিরোধী আখ্যায়িত করে এ নির্বাচন প্রতিহত করার কথা বলছেন, কেউ সংসদ ও উপজেলা নির্বাচন একদিনে, আবার কেউ জাতীয় নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রীর শপথ স্থগিত রেখে উপজেলা নির্বাচনের কথা বলছেন। এদিকে নির্বাচন কমিশন আগামী ২৩ অক্টোবর উপজেলা নির্বাচনের ভোট গ্রহণের সম্ভাব্য দিন ধার্য করায় দলের মধ্যে দেখা দিয়েছে নির্বাচনী চাঞ্চল্য। আওয়ামী লীগের একজন দায়িত্বশীল নেতা বাসস'কে জানান, আগামী ২৯ জুলাই দলের কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় উপজেলা নির্বাচন প্রসঙ্গে আলোচনা হবে। তিনি বলেন, 'আমরা মুখে যাই বলি না কেন, বাস্তবতা হচ্ছে উপজেলা নির্বাচন প্রতিহত করার মতো অবস্থা আমাদের নেই।' তিনি জানান, নির্বাচন কমিশন ভোট গ্রহণের দিন ঘোষণা করার পর থেকে তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ শুরু করেছেন। তৃণমূল নেতারা উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে খুবই আগ্রহী। তাদের চাপেই আওয়ামী লীগকে উপজেলা নির্বাচনে যেতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'শেষ পর্যন্ত আমরা নির্বাচনে যাব তবে তার আগে দলীয় নেতৃবৃন্দকে জেল থেকে মুক্ত করাসহ বিভিন্ন দাবি আদায়ের চেষ্টা করা হবে।' আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার আমির-উল ইসলামের কাছে জাতীয় নির্বাচনের আগে উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠানে সাংবিধানিক বাধা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'সংবিধান অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ম্যানডেট হচ্ছে জাতীয় নির্বাচন করা।' তিনি বলেন, আগে তফসিল ঘোষণা করে জাতীয় নির্বাচনের একমাস পর উপজেলা নির্বাচন করা যেতে পারে। উপজেলা নির্বাচন করবে নির্বাচন কমিশন, বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়। এদিকে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিল্লুর রহমান গতকাল মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে উপজেলা নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। তিনি উপজেলা নির্বাচন প্রতিহত করারও আহ্বান জানান। অপরদিকে দলের প্রভাবশালী নেতা আমির হোসেন আমু সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন, সংসদ এবং উপজেলা নির্বাচন একদিনে হতে পারে। বর্তমানে বিদেশে অবস্থানরত দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ আশরাফুল ইসলামও উপজেলা নির্বাচনের সরাসরি বিরোধিতা না করে জাতীয় নির্বাচনের এক মাস পর অনুষ্ঠানের পক্ষে মত প্রকাশ করে বলেছেন, এক্ষেত্রে জাতীয় নির্বাচনের আগেই উপজেলা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা যেতে পারে।

