কৃষ্ণ-পক্ষ............

bdidol's picture
Posted by
bdidol
Sunday, August 17, 2008 - 6:16am BST

বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী একটা গ্রাম মলাইপুর। প্রত্যন্ত অঞ্চল বলতে কোন অঞ্চলের যে সার্বিক চিত্রটা তাৎক্ষণিকভাবে চোখের সামনে ভেসে উঠে তার পুরোটাই বিদ্যমান মলাইপুর গ্রামে। গ্রামের লোক সংখ্যা টেনেটুনে শ'পাঁচেকের মতো হবে। অঞ্চলটির সার্বঙ্গীন অর্থনীতির অবস্থা খুবই শোচনীয়, বেশীর ভাগ লোকেরই জীবিকা কৃষি কাজের উপর নির্ভরশীল, গ্রামের মাতাব্বর শ্রেনীর মুষ্টিমেয় কিছু লোকের কয়েক বিঘা জমিকে কেন্দ্র করেই এদের দিনাতিপাতের চক্র সম্পন্ন হয়। অপেক্ষাকৃত উন্নত জীবনযাপনকারী এই শ্রেনীটার ক্ষেত ক্ষমার আর গোয়ালঘরই হচ্ছে গ্রামের অধিকাংশ লোকের একমাত্র কর্মস্থল। কাজেই এই বিশেষ শ্রেনীটার বিশেষ মেজাজ মর্জিই যে এই গ্রামের প্রধান চালিকাশক্তি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অন্যদিকে বিদ্যুত, গ্যাসের মতো আধুনিক নাগরিক সুযোগ সুবিধা বলতে যা বোঝায় তার কিছুই এই অঞ্চলে এসে পৌঁছায়নি। অগত্যা কালি ওঠা মাটির চুলা আর নিভু নিভু আলোর কুপিই এখনও গ্রামের লোকজনদের জীবনধারনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে থেকে গেছে। চার চাকার বিলাসবহুল অতি আধুনিক যানবাহন তো দূরে থাক, তিন চাকার রিকশাও এই গ্রামে কালে ভদ্রেই দেখা যায়। শিক্ষার আলোটাও আজো এসে পৌঁছাতে পারেনি এইখানাটায়। শিক্ষার অভাবে অবিকশিত থেকে যাওয়া গ্রামের লোকগুলোর হৃদয় যে তাই প্রাচীন অন্ধ বিশ্বাস, কুসংস্কার আর মূর্খতার অভয়ারণ্য থেকে গেছে আজো, সে ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমতও থাকার কথা নয়।

গ্রামের শেষ সীমানাটায় বড় জরাজীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে বহুকাল পুরানো মলাইপুর জামে মসজিদ। বছরের অধিকাংশ সময়ই এই মসজিদে নামায পড়ানোর মতো কোন ইমাম থাকেনা। এতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইমামতী করার মতো লোক খুঁজে পাওয়া এমনিতেই যথেষ্ঠে কষ্টসাধ্য ব্যাপার, তাও যদি অনেক খোঁজাখুঁজি করার পর কেউ আসতে রাজি হয়, আসার মাসখানেকের মাথায় তারা ইমামতির চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে চলে যায়। এই গ্রামের বহু প্রাচীন এক লোকগাঁথা কিংবা কুসংস্কারই হচ্ছে এর অন্যতম প্রধান কারণ। মলাইপুর জামে মসজিদটা অতিক্রম করে গ্রামের মুল অংশটায় ঢোকার পথে একটা বিশাল সুপারি বাগান পার করে আসতে হয়। লোকমুখে প্রচলিত আছে যে-- অমবশ্যার কালপক্ষে ধবধবে সাদা শাড়ী পড়া মধ্য বয়স্ক একটা মহিলা রাতভর এই সুপারি বাগানটায় আপন খেয়ালে ঘোরাফেরা করে। এই পর্যন্ত হলেও একটা কথা ছিলো, আরো যেটা শোনা যায় যে এই মহিলার নাকি চোখ নাই, উল্টো চোখের গর্ত থেকে অনবরত রক্ত গড়িয়ে পড়ে। গ্রামের কাউকে জিজ্ঞাসা করা হলে সবাই এক বাক্যে এই বিশ্বাসের ব্যাপারে সমর্থন জানাবে, কিন্তু এমন লোক খুঁজে পাওয়া খুবই দুষ্কর যে সরেজমিনে মহিলাটাকে বাগানে ঘুরতে দেখেছে। বহু খোঁজাখুঁজির পর সত্তর আশি বছর বয়সের দু'একজন বৃদ্ধকে এই ঘটনার সত্যতা নিয়ে জোর গলায় কথা বলতে শোনা যাবে। সে যাই হোক, কুসংস্কারই হোক আর বাস্তব ঘটনাই হোক, পুরো ব্যাপারটা এখন এমন এক পর্যায়ে চলে গেছে যে কেউ দেখুক বা না দেখুক অমাবশ্যার কালপক্ষতে বাগানটায় সাদা শাড়ি পড়া সেই মহিলার উপস্থিতির ব্যাপারে কারো মনে কোন সংশয় নেই। মসজিদের ইমামরাও এই বিশ্বাস থেকে নিজেদেরকে আড়াল করতে পারে না এবং অগত্যাই কিছুদিন ইমামতী করার পর এই অদ্ভুতুড়ে কাহিনীর ঘোরপ্যাঁচে আটকে পড়ে প্রবল ভীতসন্ত্রস্থ হয়ে তারা গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। মসজিদের বর্তমান ইমাম সবুর উল্লাহর অবস্থাটাও কোনভাবেই ব্যতিক্রম নয়। গ্রামে আশার কিছুদিনের মধ্যেই এই কাহিনী শোনার পর তার রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। প্রতি রাতে এশার নামাজ শেষ করে তিনি যখন নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন, প্রবল অস্থিরতার মধ্য দিয়ে তার সময় কাটতে থাকে তখন, সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থাটা শুরু হয় যখন সবুর সুপারি বাগানটা পার করতে শুরু করেন, তার হাত পা কাঁপতে আরম্ভ করে, মাথা ঘুরাতে শুরু করে, তিনি মনে প্রাণে তখন আল্লাহকে ডাকতে শুরু করেন আর বিড় বিড় করে আয়তুল কুসরি পড়তে থাকেন।এই ভাবে গত এক মাস পুরাটাই কেটেছে তার। চাকরিটা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাবেন কিনা তাই নিয়েই গভীরভাবে ভাবছেন তিনি গত কয়েকদিন। অবশ্য গ্রামের লোকজনদের উপর কেমন যেন মায়া বসে গেছে তার, এদেরকে ছেড়ে যাওয়ার কথা মনে উঠতেই কেমন যেন খারাপ লাগতে শুরু করে, তার উপর হৃদয়ে আল্লাহর কালাম ধারণ করেও এই ধরেনের জাগতিক ভয়ের কাছে নতি স্বীকার করাটাও কেমন কাপুরুষতামির মতোই ঠেকছে তার কাছে। অন্যদিকে গ্রামের মাতাব্বর শ্রেনীর লোকজন থেকে শুরু করে খেটে খাওয়া মানুষ--প্রায় সবার কাছেই অতি সম্মানের পাত্র হয়ে উঠেছেন সবুর উল্লাহ। তারাও চান না সবুর উল্লাহ এই গ্রাম থেকে বিদায় নিক।

অবিবাহিত সবুর উল্লাহর জীবনযাপন খুবই স্বাভাবিক, অহেতুক ফতোয়াবাজি করতেও তাকে খুব একটা দেখা যায় না, কোন প্রকার দৃষ্টিকটু কাজেও তাকে এই পর্যন্ত জড়াতে দেখা যায় নি। কিন্তু এই লোকের একটা ব্যাপারে গ্রামের কেউই এখনো অবগত নয়। কোন এক অজ্ঞাত কারণে যে কোন বিবাহিত নারীর প্রতি সবুর উল্লাহর এক ধরনের মোহ কাজ করে। অবিবাহিত কোন মেয়ে বা মহিলার দিকে --হোক সে পরীর মতো সুন্দর, সবুর উল্লাহ ভুল করেও কোন দিন তাকান না, কিন্তু বিবাহিত কোন মহিলা দেখলেই তার প্রতি তিনি আসক্ত হয়ে পড়েন। তার এই চারিত্রিক দুর্বলতা কিংবা অসংগতির ব্যাপারে গ্রামের কেউই এখনো কিছু জানতে পারে নি।

সবুর উল্লাহকে তিনবেলা রান্নাবান্না করে দিয়ে যায় এই গ্রামেরই এক মেয়ে কুসুম। মেয়েটা বিধবা,বছর তিনেকের মতো হয়েছে তার স্বামী মারা গিয়েছে। শেষে গ্রামের লোকজন মিলে তাকে মসজিদের ইমামের খাওয়া সরবাহের কাজটা ধরিয়ে দেয়। বিনিময় যে কয়েকটা টাকা গ্রামের সবাই মিলে চাঁদা তুলে তাকে দেয়, তা দিয়ে কুসুমের দিন একরকম চলে যায়। সবুর উল্লাহ প্রথম দিকে কুসুমের ব্যাপারে কিছুই জানতেন না। কিছুদিন হলো তিনি একজনের কাছ থেকে কুসুমের ব্যাপারে জানতে পেরেছেন। সেই থেকে শুরু। সবুর উল্লাহ ভালো করেই কুসুমের পিছনে লেগেছেন। কুসুম খাওয়ার দিতে এলে তিনি অযথাই কুসুমের সাথে কথা বলতে শুরু করেন। কুসুম চলে যেতে চাইলে, নানা রকম টাল বাহনা দিয়ে তিনি কুসুমকে বসিয়ে রাখেন। তার সাথে তিনি কুরআন হাদিসের গল্প করেন। কুসুমের স্বামী মারা যাওয়ার ব্যাপারটা যে সম্পূর্ণই আল্লাহতাআলার ইচ্ছা এই ব্যাপারে হাজার রকমের যুক্তি আর সান্ত্বনার বাণী তাকে শোনান সবুর। সবুর উল্লাহর হঠাৎ করেই তার ব্যাপারে এতো অতি আগ্রহী হয়ে উঠার ব্যাপারটা কুসুম কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না। তার খালি একটাই চিন্তা---যে লোকটাকে প্রথম দিকে একটা বোবার মতো মনে হতো, সেই লোকটাই হঠাৎ করে তার সাথে কেন এতো যেচে যেচে কথা বলতে আরম্ভ করেছে।

অমাবশ্যার কৃষ্ণপক্ষ চলছে এখন। গত কয়েক রাতের মতো আজ রাতেও সবুর উল্লাহ এশার নামাজ শেষ করে প্রবল ভীতসন্ত্রস্থ হয়ে কিছুক্ষণ আগে ঘরে ফিরেছেন। কুসুম তার জন্য খাওয়া নিয়ে এসেছে। সবুর বসে আছেন তার বিছানার উপর, কুসুম ঘরের দরজা ধরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

কুসুম সবুরের দিকে না তাকিয়ে বললো, "ইমাম সাব, তাড়াতাড়ি খাইয়া লন, বাটিগুলান তাড়াতাড়ি আজাইর কইরা দেন, শরীরটা বেশী একটা ভালা না আইজ, ঘরে যামু গা।"

সবুর বললো, "ভালা না তো এইখানেই বিশ্রাম করো, ভালা লাগলে যাইও গা, আমিও আরাম কইরা খাইয়া লই, খাওয়া দাওয়ায় তাড়াহুড়া করতে নাই, আল্লাহপাকের নিষেধ আছে।"

কুসুম আগের মতোই মাথা নিচু করে বললো, "ছি:, এইডা আফনে কি কন? এইখানে খামাকা বইয়া থাকলে লোকজন কি কইবো? আফনেরও তো মান ইজ্জত আছে, আফনে জলদি করেন, আমি যামুগা।"

সবুর মুখে আলতো একটা হাসি দিয়ে বললো, "কুসুম, তুমি থাকলে ভালো লাগে। মনটায় কেমন ফূর্তি লাগে। তুমি যাইও না,বইসা থাকো।তোমার লগে কিছু কথাও আছে।"

কুসুম কিছুটা রেগে গিয়ে বললো, "আফনে এইগুলান কি কন? এই সব কথা ভালা না, আফনে কি কইবেন তাড়াতাড়ি কন।"

সবুর বললো, "শুনো কুসুম, আমি ঠিক করছি আমি তোমারে বিবাহ করবো,তোমারে আমার খুব মনে ধরছে, তোমার তো কোন অমত থাকার কথা না, তোমার স্বামীও নাই, এই সময় আমার মতো কারো ঘর করা তোমার লেইগা পোয়াবারোই কওন যায়, তুমি কি কও?"

সবুরের কথা শুনে চমকে উঠলো কুসুম, সে ভীত গলায় বললো, "আফনে এই গ্রামের এতো সম্মানিত একজন লোক হইয়া আমারে যে এই কথা গুলান কইতেছেন, আফনের কি একটু মুখেও বাঁধে না, আমি আফনারে বিয়া করতে যামু কোন দুঃখে, আমার সোয়ামী মইরা গেলে কি হইবো, হে এহনো আমার সোয়ামীই আছে, আমি এহনো তারে আমার সোয়ামী ভাবি। অন্য কোন বেটা মানুষের ঘর আমি করুম না, আফনের কথা শেষ হইলে আমার বাটিগুলান দিয়া দেন, আমি যাই গা।"

সবুর বললো, 'কিন্তু আমি তো তোমারে বিয়া করমু ঠিক কইরা ফালাইছি, এহন কি করা, তুমি আর অমত কইরো না, রাজি হইয়া যাও।"

কুসুম বলো, "মইরা গেলেও এইডা হইবো না, আফনে আমারে জোর কইরেন না।"

কুসুমের কথা শুনে ক্ষেপে গেলো সবুর, রাগ মিশ্রিত কণ্ঠে সে বললো, "মেয়ে মানুষের আবার ইচ্ছা অনিচ্ছা কি? তোমারে বিয়া করমু এইডা হইলো গিয়া ফয়সালা, ফয়সালা মতোই কাম হইবো।"

কুসুম গলার স্বর উঁচু করে বললো, "আল্লাহর দোহাই লাগে, আফনে আমারে জোর কইরেন না, আমি কিন্তু আপনার এই কুকীর্তি সবাইরে জানাইয়া দিমু।"

সবুর বললো, "তুই আমারে ভয় দেখাস? তোর কথা এই গ্রামের কেউ বিশ্বাস করবো না, তুই ভালোয় ভালোয় আমার কথায় রাজি হইয়া যা, নয়তো তোর কপালে শনি আছে।"

কুসুম বললো, "ছি:, আফনে যে এতো বড় হারামি তা যদি কেউ জানতো!ও খোদা! আফনের যা ইচ্ছা তাই করেন, আমি কাইলই সবাইরে এই কথা জানায়া দিমু।"

এই কথা শোনার পর বিছানা থেকে হঠাৎ করেই উঠে এসে কুসুমের গালে একটা থাপ্পর বসিয়ে দিলেন সবুর। ঘটনার আকস্মিকতায় যার পর নাই বিস্মিত কুসুম চিৎকার দিয়ে বললো, "আমি কাইলকাই সবাইরে জানামু, কাইলকাই আপফনের বিছার হইবো সবার সামনে"--কথাটা বলেই ঘর থেকে বের হয়ে যাচ্ছিলো কুসুম। বাঁধা দিলো সবুর। সে কুসুমের চুলের মুঠি ধরে টান দিয়ে ধরে কুসুমের কানের কাছে নিজের মুখ নিয়ে এসে দাঁত কটমট করে বললো, "হারামজাদি আমার লগে টক্কর দিস না, ফল ভালো হইবো না।".... কথাটা বলে কুসুমের চুলের মুঠিটা ছেড়ে দিলো সবুর। কাঁদতে কাঁদতে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো কুসুম। কুসুম চলে যাওয়ার পর সবুর ভাবতে আরম্ভ করলেন, কালকে যদি কুসুম পুরো ঘটনাটা সবাইকে বলে দেয় তাহলে তো কেলেঙ্কারী কান্ড হয়ে যাবে, সেই ক্ষেত্রে এই ঘটনা কীভাবে ধামা চাপা দেয়া যায় তা নিয়ে আজকে রাতেই তাকে কিছু একটা ভেবে রাখতে হবে।

এখন বাজে সকাল সাড়ে এগারোটা। মলাইপুর গ্রামের মাতাব্বর ছগির উদ্দিনের বাড়ির উঠোনে সবাই গোল হয়ে বসে আছে। ইমাম সবুর উল্লাহ তাদের মাঝে বসে আছেন। কুসুম আজ সকালেই সবাইকে গতরাতের কথা জানিয়ে দিয়েছে। ঘটনা অতিব গুরুত্বপূর্ন হওয়ায় ছগিরউদ্দিন সকালেই সালিশ ডেকেছেন।

ছগির উদ্দিন সবুরকে বললেন, "ইমাম সাব, আফনের নামে যা শুনলাম তা কি সত্যি?"

সবুর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন, তারপর ধীরে বলতে আরম্ভ করলেন, "জনাব, আপনেদের এখানে আসার পর থেকে আমি কোন খারাপ কাজ করি নাই, কোন অন্যায় করি নাই, কারো মনে কোন ব্যথা দেই নাই, সেই জায়গায় আজকে আমারে এতগুলান লোকের মাঝে বইসা একটা বিপথগ্রস্থ মেয়ে মানুষের কারণে বিছারে বসতে হবে তা আমি স্বপ্নেও কল্পনা করি নাই, যাই হোক সবই আল্লাহপাকের ইচ্ছা, উনি ঠিক করছেন আমারে বেইজ্জতী করবেন, তাই আমারে এইখানে পাঠাইয়া দিছেন, আমার এইখানে বলার কিছু নাই, তয় আফনে যদি অনুমতি দেন আমি সব খুইলা বলতে রাজি আছি।"

ছগির উদ্দিন বললো, "বলেন।"

সবুর বলতে শুরু করলেন, "কুসুম যেই দিন আমারে খাওয়া দেয়া শুরু করলো, সেই দিন থেকেই আমি তারে ভালো কইরা লক্ষ করতেছি, তার মধ্যে কিছু অপ্রকৃতস্থ ব্যাপার আছে, প্রথম দিকে আমি কিছু বলি নাই তারে। গত পরশু রাতে আমি নামাজ পড়াইয়া ঘরে ফিরতাছি, সুপারি বাগানের কাছে আইসা আমার মাথা ঘুরাইতে আরম্ভ করলো, এতো দিন যেই ঘটনা সবার মুখে শুনছি সেই ঘটনা আমার চোখের সামনে। আমি দেখলাম সাদা শাড়ি পইরা একটা মহিলা বাগানে ঘুইরা বেড়াইতেছে আর তার চোখ দিয়া রক্ত পড়তাছে, মহিলাটার দিকে ভালো কইরা তাকাইয়া দেখি সে দেখতে অবিকল কুসুমের মতো, এই দৃশ্য দেখার পর আমি আর সহ্য করতে পারি নাই, দৌড়াইয়া বাসায় চইলা আসি। বাসায় আসার পর আমি জিন ছালা দেই,এই জিন আমি অনেকদিন ধরেই পালি। জিন আমারে জানায়-- কুসুমের চেহারায় আমি যে মহিলাটারে দেখছি, আসলে সেইটা একটা খারাপ জিন, এ বহুকাল ধইরা এই গ্রামে আছে। অমাবশ্যার কৃষ্ণপক্ষে জিনটা বিভিন্ন মেয়েছেলের উপর আইসা ভর করে, আর তখন যার উপর ভর করে সে রাইতের বেলা সুপারী বাগানে অমন কইরা ঘুইরা বেড়ায়, জিনটা আমারে আরো জানায়-ঐ জিনটা এই কৃষ্ণপক্ষে কুসুমের উপর আইসা ভর করছে। শুইনা আমার মাথা খারাপ হইয়া যায়। শেষে গতকাল রাইতে যখন কুসুম আমার ঘরে খাওয়া নিয়া আসলো, আমি তারে ভালো কইরা দেখলাম, আমার আর কোন সন্দেহই রইলো না যে আমি পরশু রাতে তার চেহারার কাউরেই বাগানে ঘুরতে দেখছি। আমি দোয়া কলমা পইড়া কুসুমের গায়ে ফু দিলাম, দেয়ার লগে লগেই কুসুম চিৎকার দিয়া উঠলো, সে আমার লগে দস্তাদস্তি শুরু করলো, আমি বুঝতে পারলাম সমস্ত ঘটনা সেই খারাপ জিনটার কাজ। কিন্তু আমার লগে আল্লাহর কালাম থাকায় জিনটা আমার কিছু করতে পারে নাই। কিন্তু আজকে সকালে আইসা আফনে গো কাছে আমার নামে কুসুম হইয়া উল্টাপাল্টা কথা রটাইছে যাতে আমারে আফনারা এই গ্রাম থেইকা বাইর কইরা দেন।"

সমস্ত লোকজন বাক্-রুদ্ধ হয়ে সবুরের কথা শুনে গেলো। কেউ ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারলো না ইমাম সবুর উল্লাহ এই মজলিসে কতো বড় মিথ্যার আশ্রয় নিলেন এবং কতো নির্দ্বিধায় একটা সত্য ঘটনাকে মিথ্যার চাদরে অবলীলায় ঢেকে দিলেন। চারিদিকের পিনপতন নীরবতা ভেঙ্গে অবশেষে মাতাব্বর ছগির উদ্দিন বলতে শুরু করলেন, ইমামা সাহেব, আমরা মূর্খ্য মানুষ, না বুইজা আফনের লগে বিরাট বেয়াদবী করছি, আমাগো আফনে নিজ গুণে ক্ষমা দেন আর এখন বলেন এই জিনটারে তাড়ানের লেইগা আমরা কি করতে পারি?আফনে আমাগোরে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করেন।"

সবুর কি যেন চিন্তা করলেন, তারপর মাথা নাড়িয়ে বলতে আরম্ভ করলেন, "উপায় একটা আছে, কুসুমরে এই অমাবশ্যার কৃষ্ণপক্ষে ধইরা আইনা তার চোখ দুইটা উপড়াইয়া নিয়া তারে যদি এই সুপারি বাগানটায় পুড়াইয়া মারা যায়, তাইলে সেই জিনটা চিরতরে এই গ্রাম থেকে বিদায় নিয়া যাবে।"

মাতাব্বর বললেন, তাইলে তো আমাগো কুসুম মইরা যাইবো গা, এইডা কি কইলেন ইমাম সাব। মাইয়াটা তো কোন দোষ করে নাই।"

সবুর বললেন, "আমি জানি, কুসুমের কোন দোষ নাই, কিন্তু এই বজ্জাত জিনটারে তাড়ানোর এই একটা উপায়ই আছে, নাইলে আইজ নয় কাইল সে আফনার মেয়ের উপরও আইসা ভর করতে পারে, তখন তো আফনের মেয়েরও একই পরিণতি হইবো, ভাইবা দেখেন।"

পুরো মজলিসে গুনগুন আওয়াজ শুরু হয়ে গিয়েছে। মাতাব্বর ছগির উদ্দিন কয়েকজন মুরুব্বির সাথে আলাপ করলেন কিছুক্ষণ। শেষে গলার স্বর উঁচু করে জানালেন, "আইজ রাইতেই কুসুমের চোখ উপড়াইয়া নিয়া তারে সুপারি বাগানে পুড়াইয়া ফেলা হবে।"

এখন রাত সাড়ে নয়টার মতো বাজে। অমাবশ্যার কৃষ্ণপক্ষের কৃষ্ণতা যেন আরো কৃষ্ণ হয়ে ভর করতে শুরু করেছে আজ মলাইপুর গ্রামের উপর। কারণ কিছুক্ষণের মধ্যেই জগতের সবচেয়ে নৃশংসতম ঘটনাগুলোর একটা ঘটতে যাচ্ছে এই গ্রামে। এটা নিয়ে গ্রামের চারিদিকেই চাপা উত্তেজনা। প্রতিদিন এই সময়টা আসতে আসতেই মলাইপুর গ্রামটা একটা ঘুমন্ত নগরীতে পরিণত হয়। কিন্তু আজ কেউই ঘুমায় নি। প্রতিটা ঘরে এখনও টিমটিমিয়ে কুপিগুলো জ্বলে চলেছে। মানুষজন সব ধীরে ধীরে সুপারি বাগানটার কাছে জড়ো হতে শুরু করেছে। দুর-দুরান্ত থেকেও লোকজন এসে জড়ো হচ্ছে সেখানে। কুসুমের অন্তিম পরিণতি দেখার জন্য মানুষের কৌতূহল দেখে মনে হচ্ছে যেন বিশ্ব বিখ্যাত কোন জাদুকর একটু পরেই যাদুর কাঠি নাড়িয়ে তার অবিশ্বাস্য সব জাদুর খেলা দেখানো শুরু করবেন, এই জন্যই গভীর আগ্রহ নিয়ে সবাই সেখানে অপেক্ষা করছে।যদিও কারো কারো কণ্ঠে মৃদু ক্ষোভের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে, কেউ কেউ এই নৃশংস ঘটনার বাস্তবায়নের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন, কিন্তু কারো কণ্ঠেই কোন প্রতিবাদী ভাষা নেই, গ্রামের একজন লোকও নেই যে কিনা কুসুমের মতো বিধবা আর অসহায় একটা মেয়েকে এই নৃশংস পরিণতির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য এগিয়ে আসবেন। গ্রামের মাতাব্বরের সিদ্ধান্তের বিপরীতে গিয়ে তার চোক্ষশূল হয়ে যাওয়া যে নিজেদের বেঁচে থাকার উপরই বিরাট হুমকি তা এই গ্রামের সবাইই জানে। তাছাড়া বাপ দাদার মুখ থেকে শুনে আসা বহু প্রাচীন এক উটকো, ভয়াল কুসংস্কারের হাত থেকে মুক্তির আশাটাও যেন আক্ষরিক অর্থে গ্রামের মানুষগুলোর মুখে তালা লাগিয়ে দিয়েছে।কাজেই ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায়ই হোক, নিজেদের মুখে ও অন্তরে তালা ঝুলিয়ে সবাইই এখন সুপারী বাগানটার ধারে প্রবল উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করছে নাটকের শেষ দৃশ্যের মঞ্চায়নের জন্য।

প্রস্তুতি প্রায় শেষ। অনেক খোঁজাখুঁজি করার পর বিকেলের দিকে মলাইপুর থেকে সাত গ্রাম দূরে ভারুলা চর থেকে ৬৪/৬৫ বছরের এক লোককে নিয়ে আসা হয়েছে কুসুমের চোখ উপড়ানোর জন্য। এই লোক নাকি মানুষের চোখ উপড়ানোর কাজে বিশেষজ্ঞ, চরে চরে বাদ বিবাদের রেষ ধরে বয়সকালে সে নাকি এমন বহু লোকের চোখ উপড়ে ফেলেছে।
সে এখন দু পা ছড়িয়ে দিয়ে একটা সুপারীগাছের গোড়ায় বসে আছে। তার হাতে বাঁশের দুইটা ধারালো কঞ্চি। কঞ্চিগুলোর তীক্ষণতা আর সবিশেষ আকারের দিকে নজর দিলেই বোঝা যাবে যে এই লোক আসলেই এই কাজে দক্ষ। তার থেকে একটু দূরে সুপারি বাগানটার ঠিক মাঝখানাটায় বাঁশ, কাঠ, খড়, লাড়কির মিশেলে ছোটখাটো একটা কুন্ডুলীর মতো বানানো হয়েছে। কুসুমের চোখ উপড়ে ফেলার পর এই কুন্ডুলীর ভিতর এনে তাকে পুড়িয়ে ফেলা হবে। পোড়ানোর কাজটা যাতে ঠিক মতো সম্পন্ন হয় সেই জন্য পাশের গ্রামের শ্মশানঘাটের এক ডোমেকেও নিয়ে আসা হয়েছে। ডোমের চোখমুখ জুড়ে চাপা অস্থিরতা। সে আজীবন মরা মানুষ পুড়িয়ে এসেছে, আজ তাকে জ্যান্ত মানুষ পুড়িয়ে ফেলতে হবে, তাও আবার ভিন্ন ধর্মের এক বিধবা নারী। ডোমের কোনভাবেই মনকে স্থির করতে পারছে না। সে বাগানের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় প্রবল উদ্বেগ নিয়ে পায়চারি করছে। কুসুম বসে আছে বাগানের ঠিক মাঝখানটায় কুন্ডুলিটা থেকে ক্ষাণিক দূরে। তার দুই দিকে দুই হাত শক্ত করে ধরে বসে আছে এই গ্রামেরই ২৪/২৫ বছর বয়সের দুইটা ছেলে। কুসুমের চোখ মুখ অস্বাভাবিক নির্ভার, চুল খোলা, পরনে দুই প্যাঁচ দেয়া একটা শাড়ি। কুসুমের দুকুলেও কেউ নেই, বাবা নেই, মা নেই, কোন আত্মীয় স্বজনও নেই, নিঃস্ব হয়ে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার চেয়ে চলে যাওয়াই ভালো--এটা ভেবেই কি সে এতোটা নির্ভার অবস্থায় বসে আছে কিনা তা বুঝা যাচ্ছে না। তবে যে ব্যাপারটা একেবারেই স্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে তা হলো ইমাম সবুর উল্লাহর মানসিক অশান্তি। খুবই টেনশানে আছেন তিনি। তার সাজানো নাটকের মঞ্চ প্রস্তুতির প্রবল আয়োজনে তিনি যার পর নাই বিস্মিত কিংবা বলা যায় ঘটনার আশু পরিণতির কথা চিন্তা করে তিনি প্রবলভাবে ঘাবড়েও যেতে শুরু করেছেন। তবে তার চোখ মুখ দেখে সেটা বোঝার উপায় নেই। তিনি মুখটাকে খুব হাসি হাসি করে রেখেছেন। যেন একটু পরেই তিনি কুরবানীর পশু জবাই করতে রওনা হবেন। গ্রামের মাতব্বর ছগির উদ্দিন সুপারী বাগনটা থেকে একটু দূরে রাখা একটা চেয়ারে বসে আছেন। তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন বয়স্ক লোক। ছগির উদ্দিন একসময় ইমাম সবুর উল্লাহকে ডাক দিয়ে বললেন, "জনাব, রাইত ম্যালা হইতে চললো, আর দেরী করা মনে হয় ঠিক হইবো না, আফনে কুসুমরে দোয়া কলমা পড়াইয়া লন, এরপর আসল কাজটা হইয়া যাক।"

ইমাম সবুর জ্বি বলে সুপারী বাগানের ভিতর বসে থাকা কুসুমের দিকে এগুতে শুরু করলেন। সাথে সাথে উৎসুক জনতাও ইমামের পিছন বাগানের ভিতর ঢুকতে আরম্ভ করলো। ইমাম সবুর হাটু গেঁড়ে বসে থাকা কুসুমের একদম কাছাকাছি এসে বসলেন। মাথা নিচু করে তিনি কুসুমকে বললেন, "কুসুম যা হইছে সবই আল্লাহপাকের ইচ্ছা। তুমি আমার উপর বেজার হইও না, আল্লাহপাকের নির্দেশে আমি এইকাজ করতাছি। কাজে তুমি বেজার হইলে কিন্তু আল্লাহপাকও নারাজ হবেন। আমি তোমারে কলমা পড়াই, তুমি কলমাটা পইড়া নাও।"

কুসুম তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো ইমামের দিকে। তারপর মুখে এক গাদা থুতু জমিয়ে এনে আকস্মিকই সে থুতুগুলো মেরে বসলো ইমামের মুখ বরাবর। ইমাম সাহেব দাঁত কটমট করে বললেন, "মাইয়া মানুষের বেশী রাগ ভালো না, এইটা তোরে আগেও কইছি, তুই বুঝস নাই, আজকেও বুঝলি না।" কথাটা বলেই তিনি কুসুমের কাছ থেকে সরে আসলেন।

তার কিছুক্ষণ পরেই মলাইপুর গ্রামের আকাশ বাতাস বিদীর্ণ হয়ে কুসুমের চিৎকার শোনা গেলো। বাঁশের ধারলো কঞ্চি দিয়ে কুসুমের চোখ দুটো উপড়ে ফেলা হয়েছে। তার চোখ থেকে অনর্গল রক্ত ঝরছে। এই দৃশ্য দেখে গ্রামের লোকজন প্রবল মানসিক ঝাঁকুনি খেলো। এই ধরনের অভিজ্ঞতা সারাজীবনেও তাদের আর হয় নাই। একজন বৃদ্ধ এই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে ঘটনা স্থলেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন।

চোখ উপড়ানোর পর গগন বিদারী চিৎকার করে কাঁদতে থাকা কুসুমকে টেনে হিচড়ে নিয়ে আসা হলো কুন্ডুলীটার কাছে। কুন্ডুলীটাতে আগে থেকেই আগুন দেয়া হয়েছিলো। ডোমেরের নির্দেশ অনুসারে গ্রামের কয়েকজন যুবক এক পর্যায়ে কুসুমকে ধরে সেই কুন্ডুলীর মধ্যে ছেড়ে দিলো। কুন্ডুলী পাকিয়ে ওঠা বহ্নি-শিখার তীব্রতা আর ঘটনার আকস্মিকতায় কুসুমের অসহ্য, পাশবিক চিৎকার বড় অবলীলায়ই কখন যেন মিলে মিশে হারিয়ে গেলো সবার অলক্ষেই-- অমাবশ্যার কৃষ্ণপক্ষের অনন্ত আঁধারে।তৃতীয় বিশ্বে এই চরম আধুনিকায়নের যুগেও বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী এক অবলা নারী কুসুম--গ্রামীন কুসংস্কার আর অন্ধ বিশ্বাসের বলি হয়ে নিজের জীবনটাকে শেষ পর্যন্ত বিলিয়ে দিতে বাধ্য হলো সুপারী বাগনাটায় দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা কুন্ডুলী পেঁচিয়ে ওঠা অসহ্য , তীব্র, অনিঃশেষ সেই অশান্ত অগ্নিশিখায়।

কুসুমের পাশবিক জীবনাবাসনের পর প্রায় ১৫ দিন কেটে গিয়েছে। মলাইপুর গ্রামে কুসুমের ঘটনাটাকে কেন্দ্র করে যে অস্থিরতা শুরু হয়েছিলো তা অনেকটাই প্রশমিত হতে শুরু করেছে। পুরো গ্রামময় যে কানাঘুষাটা শুরু হয়েছিলো তাও অনেকটাই কমে এসেছে। ইমাম সবুর উল্লাহ কুসুমের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভিতরে ভিতরে গভীর উদ্বেগর মধ্যে ছিলেন, দিন রাতই তার কেবল মনে হতো এই বুঝি তার সমস্ত কুকীর্তি ফাঁস হয়ে গেলো। কুসুমের মৃত্যুর পরের কয়েকটা রাত তিনি অসুস্থতার ভান ধরে মসজিদে নামায পর্যন্ত পড়াতে যান নি , সেই সুপারি বাগানটাকে ডিঙ্গিয়ে মসজিদে যেতে হবে--এই ভয়ে, কিন্তু তিনিও গত কয়েকদিন হলো আস্তে আস্তে স্বাভাবিক জীবন যাত্রায় ফিরে আসতে শুরু করেছেন। গত কয়েক রাত ধরে তিনি নিয়মিত মসজিদে নামাজও পড়াচ্ছেন। আজ রাতেও তিনি এশার নামাজটা যথারীতি শেষ করে নিজের ঘরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। অমাবশ্যার কৃষ্ণপক্ষ প্রায় শেষ হতে শুরু করেছে। সবুর নিজেও তাতে মনোবল পাচ্ছেন যথেষ্ঠই। গ্রামের সবার মনে কুসংস্কারটার সমাপ্তির ব্যাপার নিয়ে যে বিশ্বাস রচিত হয়েছে তার পুরোটাই তো আসলে তার সাজানো খেলা--এটা তিনি খুব ভালো করে জানেন বলেই কুসুমের মৃত্যুর পরের কয়েকটা দিন সুপারী বাগানের সেই মহিলার ভয়ে তিনি এই পথ মাড়াতে সাহস করেন নি। তার উপর আবার এইখানেই কুসুমকে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। সব মিলিয়ে এই পথে আসার কথা ভাবলেই তিনি প্রায় আধ-মরা হয়ে যেতেন। কাজেই অমাবশ্যা কাটতে শুরু করেছে জেনে তিনি মনে সাহস ফিরে পেয়েছেন আবার এবং আজো অন্যান্য দিনের মতোই কিছুটা ভয়ে ভয়ে হলেও মসজিদ থেকে আয়তুল কুসরি পড়তে পড়তে বাসার উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করেছেন সবুর। একসময় তিনি সুপারী বাগানটার পাশে চলে আসলেন। পুরো বাগানময় এখনো রাজ্যের অন্ধকার। বেচারী কুসুমের ভস্ম মনে হয় এখনো বাগানের মাটির সাথে পুরোপুরি মিশে যায় নি--কথাটা ভাবতেই তার শরীর শিউরে উঠলো। তিনি দ্রুত গতিতে হাঁটতে শুরু করলেন। বাগনটার পরিধিটা এতো বিশাল যে পুরো বাগানটা পার হতে প্রায় ৬/৭ মিনিটের মতো লাগে। সবুর উল্লাহ খুব ঘন ঘন পা ফেলছেন, তার কাছে প্রতিটা মিনিট মনে হচ্ছে কয়েক ঘন্টার মতো। হঠাৎ একটা দিকে তাকিয়েই তিনি চমকে উঠলেন। তিনি মনে প্রাণে না চাইলেও তার দৃষ্টিটা আবারো সেই দিকে চলে গেলো। তিনি আল্লাহ গো! বলে একটা চিৎকার দিলেন। একি দেখছেন তিনি! সাদা শাড়ি পরা একটা মহিলা সেই দিকটা থেকে খুব ধীর পায়ে হেটে আসছে তার দিকে। তিনি ঘামতে শুরু করলেন। সবুর বুঝতে পারছেন না তিনি কি করবেন, তার ইচ্চা করছে জোরে একটা দৌড় দিতে, কিন্তু একি! তার পা নড়ছে না কেন? সবুরের মনে হচ্ছে তার পাটা যেন কেউ মাটির সাথে আটকে দিয়েছে। মহিলাটা ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে ক্রমাগত। সবুরের যেন শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। মহিলাটা সবুরের যতই কাছে আসছে মহিলাটার পুরো অবয়বটা সবুরের কাছে ততটাই সপষ্ট হতে শুরু করেছে। তিনি চিৎকার দিয়ে উঠলেন। এ কি! মানুষের মুখে যা শুনেছেন এতোদিন, তাই তো তিনি এখন নিজের চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন স্পষ্ট। তিনি খুব ভালো করে তাকালেন মহিলাটার দিকে--হ্যাঁ তাই তো, মহিলাটার কোন চোখ দেখা যাচ্ছে না, শুধু দু'চোখের দুই কোটর দেখা যাচ্ছে আর সেই কোটর দুইটা থেকে অনবরতই টপটপ করে রক্ত ঝরে পড়ছে। সবুর আর সহ্য করতে পারছেন না। তিনি প্রাণপণে হাঁটতে চেষ্টা করছেন, কিন্তু পারছেন না। এদিকে মহিলাটাও তার প্রায় কাছে চলে এসেছে, আর মাত্র কয়েকটা হাত দূরে। তিনি আবার মহিলাটার দিকে তাকালেন। প্রকৃতি যে তার জন্য এতো বড় একটা বিস্ময় নির্ধারণ করে রেখেছিলো তা বোধ হয় সবুর স্বপ্নেও কোনদিন কল্পনা করেন নি। নিজের চোখ জোড়াকেও তিনি এখন অবিশ্বাস করতে শুরু করেছেন। কারণ সাদা শাড়ি পরা যে মহিলাটা তার দিকে এগিয়ে আসছে সে আর কেউই নয়--কুসুম! সবুরের মাথা ঘুরাতে শুরু করেছে। তিনি একটা জিনিসই শুধু বুঝে উঠতে পারছে না--এতোটা দিন পরে পুড়ে যাওয়া কুসুমের ভস্মেরই যেখানে কোন হদিস পাওয়ার কথা না সেখানে তার চোখের সামনে জ্বলজ্যান্ত একটা মানুষ কুসুম ধীরে ধীরে তার দিকে কি করে এগিয়ে আসছে। সবুর স্পষ্টতই বুঝতে পারছেন তিনি জ্ঞান হারাচ্ছেন। তিনি আকশের দিকে তাকালেন, পুরো আকাশ জুড়েই আঁধার, তিনি সেই অন্ধাকার আকাশের দিকে তাকিয়েই স্বর উঁচিয়ে কেঁদে উঠলেন আর বললেন---"হে আল্লাহ! এ কোন শাস্তি তুমি আমার জন্য বরাদ্দ রাখলা।" এরই মধ্যে কুসুমের অবয়বধারী মহিলাটা প্রায় হাত ব্যবধান দূরত্বে চলে আসলো সবুরের। সবুর জোর গলায় বলে উঠলেন---"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।"

পরের দিন সকাল বেলা মলাইপুর গ্রামবাসী ইমাম সবুর উল্লাহর লাশ আবিষ্কার করে সেই সুপারী বাগানটার একটা কোণে। শেষে অনেক পরীক্ষণ নিরীক্ষণ করার পরেও ইমাম সবুর উল্লাহর শরীরে কোন ক্ষতচিহ্ণ খুঁজে পাওয়া যায়নি।