কবি লেখকদের অতৃপ্তিঃ পাঠকের স্বাধীনতা
-মুহাম্মাদ আখতার হুসাইন
কিছু কিছু বৃক্ষ আছে যেগুলো প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠে প্রকৃতির প্রয়োজনে।কিন্তু কিছু কিছু বৃক্ষ আছে যেগুলোকে বড় করে তোলার জন্য সযত্ন পরিচর্যার প্রয়োজন হয়। উভয়েই যার যার আসনে গুরুত্বপুর্ণ। ঠিক তেমনিভাবে কিছু কিছু লেখক বা কবি আছেন যাঁরা প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠেন সাহিত্যের প্রয়োজনে। কিন্তু কিছু কিছু লেখক বা কবি আছেন যাদেরকে বড় করে তোলার জন্য সযত্ন পরিচর্যার প্রয়োজন হয়। এ দায়িত্বটা পাঠকের, আবার ঠিক একই দায়িত্ব লেখক বা কবিদের উপরেও বর্তায়। আমি বলতে চাচ্ছি যে, লেখক যেমন পাঠকের জন্ম দেন ঠিক তেমনিভাবে পাঠকও লেখকের জন্ম দেন। পাঠকের অনুভূতি আর চেতনাকে চিহ্নিত করে একজন লেখক বা কবি পাঠকের কাছে আসার চেষ্টা করেন। আর পাঠকগণ লেখকের বা কবির স্বপ্নকে নিজের করে নিয়ে লেখক বা কবি গড়ে তোলেন, যোজন-বিয়োজনে খেলেন। অনেকটা এমন যে, “নৌকা তুমি নেবে আমায়, আমি নেবো তোমায়”।
গাছ থেকে পড়ে গেলে কীভাবে কাঁদতে হবে তার যতোই প্রশিক্ষণ দেয়া হোক না কেন সেটা কখনোই আসল কান্না হবেনা।গাছ থেকে পড়ে ব্যথা পেলেই আসল কান্না বের হবে।ব্যথার অনুভূতিই ব্যথার বীজ যা ব্যথার মাধ্যমেই অঙ্কুরিত হয়।যে সকল লেখক বা কবি জীবনানুভূতির সাথে থাকেন তিনি বা তাঁরা সফল হতে পারেন। লেখকগণ বা কবিগণ যেহেতু সুখ আর দুঃখের অনুভুতির সাথে খেলায় মত্ত সেহেতু পাঠকগণকে যেমন সুখ দেন আবার দুঃখও দেন।সেটা যতোটা বাস্তব বা জীবনভিত্তিক হয় বা জীবন থেকে নেয়া হয় ততোটাই পাঠকের হৃদয়ে যায়। সোজা কথায়, তিনি তাঁর চিন্তা-চেতনা, মনন-মগজ, অনুভূতি-বিশ্বাস আর সুখ-দুঃখ পাঠকের ঝুলিতে ঢেলে দিয়ে আড়ালে গিয়ে পরিণতি দেখেন।পাঠকগণও কবি বা লেখকের সৃষ্টিতে নিজের কিছু জুড়ে দিয়ে কবি বা লেখককে ছাড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেন।
মানুষ মাত্রই মহাকবি।প্রতিটি মানুষ এবং তার জীবন একেকটি চলমান কাব্যগ্রন্থ। দুঃখ-ব্যথা, মান-অভিমান, উপলব্ধি-অনুভূতি, আনন্দ-বেদনার পরিপূর্ণ সমাহার।প্রতিটি মানূষ পরিপুর্ণ একটা উপন্যাস—চলমান সাহিত্য বই। “অবসর সময়ে কী করেন” এ প্রশ্ন যখন কাউকে করা হয় তখন প্রায় সকলেই একই কথা বলেন যে, তাঁরা বই পড়েন, নাটক দেখেন, বাইরে বেড়াতে যান, ইত্যাদি।আমি ঐ কাজ খুব কমই করি।বই না পড়ে অবসর পেলে আমি একজন ভিক্ষুকের বা খেটে খাওয়া মানুষের কাছে চলে যাই। তাকে আমার সাথে অর্থের বিনি্ময়ে তার জীবনের সুখ-দুঃখের কথা বলার প্রস্তাব দেই। তাঁর বা তাদের কথা শুনি।ভিক্ষা করলে যা পেত বা খেটে দিলে যা পেত তা দিয়ে দেই। সামান্য কিছু অর্থ আর ঐ দিনের খাবারের ব্যবস্থা করে দিলে সে সারাদিনে মন খুলে অনেক কথা বলে।সে কথাগুলো নিরেট খাঁটি এবং সে মানুষের জীবন থেকে নেয়া। এগুলো জীবন্ত এবং বিনিময় মূল্যের হিশেবে খুবই সস্তা উপন্যাস কিন্তু মূল্যের দিক দিয়ে অমূল্য। সেগুলো গভীরভাবে পড়া যায়, শোনা যায় বা অনুভব করা যায় আর কথকের সাথে একাত্ম হওয়া যায়।এই অনুভূতিগুলো জীবন্ত এবং বাস্তবে অকৃত্রিমভাবে কাগজের পাতায় এগুলো খুব কমই উঠে আসে।
প্রত্যেকে লেখকের বা কবির লেখা তার নিজের জগতে বিশ্বমানের। কিন্তু অন্য জগতে বা অন্যের কাছে সেটার মূল্য হয়তো কানাকড়িও নেই। ফলে, প্রতিটি লেখকের লেখাই বিশ্বমানের এবং প্রত্যেক লেখক একজন ছোট-খাট বিশ্বসাহিত্যিক-বিশ্বকবি। কারণ, সকল কবির বা লেখকেরই একটা পাঠক সমাজ আছে। সেটার সংখ্যা বা আকার নিয়ে প্রশ্ন করা যায়না।একজন লেখক একটা লেখা শেষ করে তা অন্যকে শোনাতে চায়, বুঝাতে চায় আর বইয়ের আকারে প্রকাশ করতে চায়। সে কারণে যে যা-ই লিখুক সেটা যদি সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প বা ক্ষতিকারক না হয় তবে তার লেখার প্রশংসা করা দরকার। এতে লেখকের আরো লেখার ক্ষমতা আর ইচ্ছা বাড়ে।অবশ্য, অন্যের প্রশংসা করার জন্য নিরংকুশ ক্ষমতা, পরিচ্ছন্ন মন আর উন্নত মানসিকতা সবার মধ্যে থাকেনা।
আবহমাঙ্কাল ধরেই মানুষ তার আনন্দকে সব সময়ই ছোট করে দেখে এসেছে। আর, মানুষ তার দুঃখকে সব সময়ই বড় করে দেখে এসেছে। মানুষের সুখের সূর্য তাড়াতাড়ি অস্ত যায় আর দুঃখের রাত অনেক বড়, অনেক গভীর হয়ে যায়।রাত যত গভীর হয় সকাল ততোই নিকটবর্তী হয়, এটা জেনেও ধৈর্য ধরে থাকেনা। অধিকাংশ মানুষ সুখের সময়ের কথা মনে রাখেনা কিন্তু সামান্য দুঃখকে ফুলিয়ে ফেনিয়ে প্রকাশ করে। সুখ এলে তার নিজের অবদানকে দায়ী করে আর দুঃখ এলে সেটাকে স্রষ্টার কর্ম বলে হতাশা প্রকাশ করে। কর্মফলের বা পরিণতির কথা ভাবেনা। সুখী হবার জন্য মানুষ যতোই দৌড়াচ্ছে সে বা তারা ততোই দুঃখের গভীরে যাচ্ছে। মানুষকে সুখী করতে গিয়ে স্বয়ং স্রষ্টাই যে গলদঘর্ম।মানুষের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, তাদের জীবনের অধিকাংশ সময় সুখে কাটে।যাদের সন্তুষ্টির মাত্রা নিয়ন্ত্রিত বা যারা অল্পে তুষ্ট হয় তাদের জীবন সুখের বাতাবরণে তৃপ্ত থাকে। মানুষ সুখের বিন্দুটাও ধরে রাখতে জানেনা কিন্তু কীভাবে দুঃখের মহাসাগর কীভাবে ক্ষুদ্র বুকে ধরে রাখা যায় তার সবটাই জানে বা সেটা কীভাবে ধরে রাখতে হয় তার সব প্রশিক্ষণ নিয়ে রেখেছে। ফলে, দুঃখকে বড় করে দেখে বিধায় দুঃখের মহাসাগরে ঢেউ উঠে মহাকাব্যের সৃষ্টি হয় কিন্তু সুখের জন্য দু’লাইনের কাব্যও সৃষ্টি করেনা। তাই প্রতিটি চলমান মানুষ সীমাহীন দুঃখের মহাকাব্য।তার চেতনায়, অনুপ্রেরণায়, বিশ্বাসে, অনুভূতিতে তিনি সেই দুঃখের মহাকবি যা তিনি সময় আর সুযোগ পেলেই প্রকাশ করেন অথবা কেউ কেউ দুঃখবিলাসে মত্ত হন।।
জ্ঞান সবার আছে। কারো ভাল কাজ করার জ্ঞান সবার আছে আর খারাপ কাজ করার জ্ঞানও সবার আছে। জ্ঞান থাকার পরেও যিনি অকর্ম বা অপকর্ম করেন তার জ্ঞান নেই এটাই মূল কথা।সমস্যাটা অন্যখানে।যে যা জেনেছে এ সেটাই ধরে রেখেছে। এর বাইরেও যে জ্ঞান আছে তা তাকে বুঝায় কে? আগুনে হাত দিলে হাত পুড়ে যাবে এ কথা সবাই জানে তাই জেনে শুনে কেউ আগুনে হাত দেয়না। কিন্তু খারাপ কাজে পাপ হয় তা জেনেও মানুষ খারাপ কাজ করে বিধায় তাকে আর জ্ঞানী বলা যায়না। তাকে জ্ঞানপাপী বলা হয়। আসলে এগুলো বোধ আর অনুভুতির ব্যাপার। শিক্ষা, অশিক্ষা, সুশিক্ষা, স্বশিক্ষা আর কূশিক্ষা সবই জ্ঞানের আধার। কিন্তু তথ্য, তত্ত্ব আর প্রয়োগফল স্থান-কাল-পাত্রভেদে ভিন্নতা পায় যার পরিণতিও ভিন্ন হয়। উন্নত মানের সাহিত্যের আসল উপাদান মূলতঃ স্বশিক্ষা যা ইতিহাসের নির্দেশনাকে মেনে চলে।এই স্বশিক্ষা যখন প্রকৃতি ও কালের সমম্বয়ে বাঁচা-বৃদ্ধির প্রবাহকে সমুন্নত রাখে তখন সৃষ্টি আর তার বোধধর্ম আপন চেতনায় তৃপ্ত হয় যা সাহিত্যের উপাদান।এই উপাদানের প্রভাবে ইতিহাস সমৃদ্ধ হয়, সভ্যতার বিকাশ হয় আর প্রাকৃতিক বাতাবরণ অনু্কুলে থাকে।
সাহিত্যকর্মের আকার বিশাল না অনুভুতির গভীরতা বিশাল তা দিয়ে মান বিচার করা যায়না।রবীন্দ্রনাথের “গীতাঞ্জলী” আর কিউবার একজন মাছ শিকারীর দৃঢ়কর্মের উপর লেখা আর্নেষ্ট হেমিংওয়ের “দি ওল্ড ম্যান এণ্ড দ্যা সি” গ্রন্থ দু’টোর আকার আয়তন এক নয়। কিন্তু জীবনবোধ আর বাস্তবতা মননশীলতার বাতাবরণে সমৃদ্ধ বিধায় কেউ কাউকে ছাড়েনি—কালের গর্ভেও অমর হয়ে আছে।
নজরুল, রবীন্দনাথ, জসিমউদ্দিন, ফররুখ আহমেদ, জীবনানন্দ দাশ, শামসুর রহমান, আল মাহমুদ, বন্দে আলি মিয়া, বেগম সুফিয়া কামাল, শেলী, উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কীটস, বায়রন, মিল্টন, Andre Breton, Charles Baudelaire, René Char, Marie de France, Michel Ohl, ফেরদৌসী, শেখ সাদী, ইমরুল কায়েস, পাবলো নেরুদা, রবার্ট ফ্রস্ট, এরা যেমন কবি তেমনি অজপাড়া গায়ের পূথির লেখক আর তা পাঠকারী সাধারণ মানুষও স্থান-কাল-পাত্রভেদে একজন কবি।
ভাষা কখনো কুলীন হয়না।ভাষায় কখনো উচু বা নীচ নেই।এটা ব্রাহ্মণের ভাষা আর সেটা চণ্ডালের ভাষা একথা যারা বলে তারা পাপাচার করে মাত্র।যেকোন ধর্ম আর যেকোন ভাষা ঘৃণার নহে।মূল ধর্মগ্রন্থ সে কথার প্রতিধ্বনি করে।আল্লাহ অনেক ভাষায় কথা বলেন যার অনেকগুলোর নামও আমরা জানিনা।তাই, সকল ভাষাকে সমান হারে গুরুত্ব দিতে হবে।কারণ, বাংলা ভাষার জন্য যেমন জীবন দান করার মানুষ আছে তেমনি অন্য ভাষাতেও জীবন দেবার মানুষ বর্তমান।
বর্তমানে কানাডায় ১৭৯টি দেশের মানুষের বসবাস। তাদের সকলেরই মাতৃভাষা আছে।আমি ছয়টা ভাষা কিছু কিছু বুঝতে পারি বিধায় সেগুলো আমার কাছে আপন মনে হয়। যেগুলো বুঝতে পারিনা সেগুলো আমার কাছে পাখীর ভাষা কিচির মিচিরের মতো মনে হয়। কিন্তু সেগুলোও সমৃদ্ধ। বুঝতে না পারলে মানুষের ভাষা আর পাখীর ভাষা একই।আর, বুঝতে পারলে পাখীর ভাষা মানুষের ভাষা থেকে কম যায়না।সুতরাং, ভাষার মর্যাদা আর সেটার প্রবৃদ্ধি মানবকল্যাণের জন্য অপরিহার্য।পার্বত্য চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রাজশাহী এসকল অঞ্চলের আদিবাসীদের ভাষার সংরক্ষণ যেমন অপরিহার্য ঠিক তেমনি আমাজন নদীর অববাহিকা, ব্রাজিলের পার্বত্য অঞ্চল, আফ্রিকার মরু অঞ্চল, রাশিয়ার পশ্চিমাঞ্চল, কানাডার উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন অঞ্চলের আদিবাসীদের ভাষা সংরক্ষণ অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।এ কাজটা বাংলাদেশের বাংলা ভাষাভাষীদেরকেই করতে হবে।কারণ, তারাই এই কাজের যোগ্য। ভাষার মান রাখতে গিয়ে তারা নিজেদের জীবন দিয়ে সে যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছে।। আজকের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস তাদেরই অবদান।বাংলা ভাষার পাশাপাশি বিশ্বভাষা সংরক্ষণ করাও এখন বাংলার বাঙালীদের দায়িত্ব।
মাদ্রাসায় পড়ার সময় আরবী কোরান, আরবী সাহিত্য, আরবী ব্যকরণ আর আরবী হাদিস বুঝতাম উর্দু মাধ্যমে। কোরান, হাদিস আর আরবী সাহিত্যের অনুবাদ বা প্রশ্নের উত্তর লেখতাম উর্দু মাধ্যমে।ফারসী পড়তাম উর্দু মাধ্যমে।ইংলিশ বুঝতাম বাংলা দিয়ে।কেবলমাত্র বাংলা বুঝতাম বাংলা দিয়ে যার ভেতরে ভিন্ন ভাষার হাজার হাজার শব্দ বাংলাশব্দ হিশেবেই ব্যবহার হয়। পৃথিবীতে বাংলাই একমাত্র ভাষা যেখানে অন্যান্য সম্প্রদায়ের ভাষার হাজার হাজার শব্দকে স্থান দিয়েছে—আপন করে নিয়েছে। হাজার বছর ধরে ভিন্ন দেশ থেকে যারাই বাংলায় এসেছে তাদেরকে এই বাংলা বুকে টেনে নিয়েছে আর সেই সাথে তাদের ভাষার শব্দকেও আপন করে নিয়েছে।বাংলাদেশে যেমন সকল সম্প্রদায় সম্প্রীতি আর সহমর্মীতা নিয়ে বসবাস করে বাংলাভাষাও ঠিক তেমনি অন্যান্য সম্প্রদায়ের বিভিন্ন শব্দকে নিজের মনে করেছে—আপন করে নিয়েছে।
যা লেখা হয় তা-ই ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। ভাল কি মন্দ সেটা কালের বিচারে দেখা যায় যা অনেক পরের কথা। আজকে যা ইতিহাস তা অতীতে বর্তমান ছিল আর আজকের বর্তমান সাথে সাথেই অতীত ইতিহাস হয়ে যাচ্ছে।সুতরাং, সব লেখক আর সব কবি ইতিহাসের ধারক আর বাহক হিশেবে ঐতিহাসিকমাত্র—যার মধ্যে কেউ গদ্যে, কেউ পদ্যে, কেউ কথায়, কেউ কাজে, আর কেউ ব্যবহারে।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেনঃ জল পড়ে
পাতা নড়ে।
আল মাহমুদ লিখেছেনঃ বৃষ্টি নাচায়
বৃষ্টি বাঁচায়।
চার শব্দের একটা কবিতার ছত্র।খুবই ছোট কথা।বাহ্যিক দিক দিয়ে দেখলে সামান্য মনে হয় কিন্তু এর গভীরতা মাপা আমার জন্য সহজ কথা নয়। একজন কবি জীবনকে কত গভীরভাবে অনুভব করেন তার দু’টো উদাহরণ দিলাম মাত্র। তারপরেও এই কবিগণ হতাশা আর কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। রবীন্দ্রনাথের অধিকাংশ লেখায় সে অতৃপ্তি, হতাশা আর কান্নাই ধ্বনিত হয়।কবি আল মাহমুদ জীবনের শেষ বেলায় এসে প্রতিটি লেখায় অতৃপ্তি, কান্না আর হতাশায় নেয়ে যাচ্ছেন।এসব কবিগণ মূলতঃ অবাঙমানসগোচর কোন এক মহাকবি বা বিশ্বকবির সন্ধানে নেমেছেন এবং শেষ বেলায়ও আবর্তমান।
যারা কবি বা যারা সাহিত্যিক তাদের লেখা দিয়ে তারা যদি প্রমাণ করতে পারেন যে তিনি বা তাঁরা মানুষের জন্য লিখেছেন, তবে তিনি বা তাঁরা “মানুষের কবি” বা “মানুষের সাহিত্যিক” হয়ে যান। যদি তা করতে না পারেন তবে তিনি বা তাঁরা “দলের কবি” বা “সম্প্রদায়ের কবি” বা “দলের সাহিত্যিক” বা “সম্প্রদায়ের সাহিত্যিক” হয়ে যান।যারা বা যিনি এ বলয় থেকে বের হতে পারেননা তাদের বা এ ধরণের কবি বা সাহিত্যিকদের প্রভাবে সমাজে-মানুষে বিভক্তি আসে, প্রাকৃতিক বাতাবরণ অশান্ত হয়, প্রবৃদ্ধি স্তিমিত হয়। কবি সাহিত্যিকদের কর্ম তাদেরকে স্থান-কাল-পাত্রের উর্ধে তুলে ধরে। যদি এর ব্যতয় ঘটে তবে তিনি বা তাঁরা বাঁকির খাতা লেখার দোকানদার মাত্র।বাংলাদেশে হাতে গোনা দু’একজন কবি আছেন যারা মানুষের কবি আর বাকী সবাই দলের কবি-সাহিত্যিক বা সম্প্রদায়ের কবি-সাহিত্যিক যারা কবিতা এবং সাহিত্যের মরণব্যাধি, সমাজের বোঝা।
মাদ্রাসার সর্বোচ্চ শিক্ষায় ভালভাবে উত্তীর্ণ হয়েও আমি অশিক্ষিত এবং হিসাববিজ্ঞানে অর্ধশিক্ষিত। টানা ষোল বছর মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছি। অন্যের বিবেচনায় খুব ভাল ছাত্র ছিলাম এবং সর্বদা প্রথম স্থান পেয়েছি। আরবী আর উর্দু এই দু’টো ভাষার দুর্বোধ্যতা আমাদেরকে খুব কষ্ট দিত। প্রতিদিন হুজুরদের বেতের পিটানী খেয়ে অনেকের কাছে মাদ্রাসাকে জাহান্নামের মতো মনে হতো। হুজরদের মনে দয়া-মায়ার কোন চিহ্নমাত্র ছিলনা।হাড় থেকে মাংস আলাদা করার প্রশিক্ষণ তাদের ছিল।এখন অবশ্য পরিবেশ অনেকটা বদলে গেছে।সে সময়ও সব হুজুর খারাপ ছিলনা। তবে তারা আরবী আর উর্দুর বিষয়গুলো কখনোই বাংলায় বুঝাতে পারতেননা।না বুঝার কারণে আমাদের পিটানী খাওয়ার মাত্রাও কমতোনা।একদিন এক ছাত্র পাঠ-পড়া দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এক হুজুর শ্রেণীকক্ষে তাকে পেটানো শুরু করেন। এক হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে ছেলেটাকে ধরে মনের সুখে এলোপাথাড়ীভাবে পিটাচ্ছিলেন আর নিচের তলায় নামাচ্ছিলেন।এভাবে পিটাতে পিটাতে দোতালা থেকে নামিয়ে নিচের তলায় অবস্থিত প্রিন্সিপালের রুমে নিয়ে আসেন শুধু এ কথা বলার জন্য যে সে পড়া পারেনি।
চতুর্থ শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণীতে আমি প্রথম হয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলাম। কিন্তু পঞ্চম শ্রেণীর সেই আরবী ব্যকরণের (মি্যান-মুনশাঈব আর নাহু-ছরফ) কাঠিণ্যে অন্ধকার দেখলাম।কিছু দিন হুজুরের পিটানী আর বকা খেয়ে অতিষ্ট হয়ে মাকে বললাম যে আমি আর পঞ্চম শ্রেণীতে পড়বোনা, চতুর্থ শ্রেণীতেই থাকবো।মা তখন বড় হাড়িতে করে ভাত রান্না করছিলেন। কাঠের হাতাচামুচ দিয়ে ভাত নাড়ছিলেন। আমার কথায় তিনি এতোই উত্তেজিত হলেন যে হাতের সেই বিশাল কাঠের হাতা দিয়ে, শরীরের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে আমার পাছায় বারী দিলেন। হাতা ভেঙ্গে দু’খণ্ড হয়ে গেল। মূহুর্তের মধ্যে এক দৌড়ে তারস্বরে কাঁদতে কাঁদতে প্রায় আধা মাইল দূরে গিয়ে থামলাম। ভয়ে সারাদিন বাড়ী ফেরা হলোনা। ক্ষুধার জ্বালায় অস্থির হয়ে, উপায় না পেয়ে মায়ের মা তিন মাইল দূরের নানীর বাড়ী গিয়ে উঠলাম। সন্ধায় বাবা বাড়ি এসে সব শুনলেন। সে রাতেই তিনি আমাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন।তিনি আমার সমস্যাটা বুঝতে চাইলেন।আমার বাবা ছিলেন প্রখ্যাত প্রাণপুরুষ আর ভাষাবিধ ডঃ মুহাম্মাদ শহিদুল্লাহর প্রুফ রিডিং সহকারী। সব কিছু শুনে তিনি আমার সমস্যাটার সমাধান করলেন।তাঁর সহযোগীতায় আমি আরবীর সাথে সাথে বাংলা আর ইংলিশও রপ্ত করে ফেললাম।
বাবার সহযোগীতা মায়ের আর শিক্ষকের হাতের পিটানীর সে অনুভূতিটা কামিল/টাইটেল পাশ করার পরে কাজে লাগালাম।১৯৮০ সনে রাজশাহী বোর্ডে দ্বিতীয় স্থান পাবার, সে সময়ের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমন্ত্রণে বঙ্গভবনে আসা যাওয়া আর হিজবুল বাহার জাহাজে করে বঙ্গোপসাগর ভ্রমণের সুবাদে কিছু টাকা হাতে এল। মনের সে অতৃপ্তি মিটানোর জন্য তিনটি ব্যকরণ বই একই সাথে তিন ভাষায় প্রকাশ করলাম।ঐ তিনটি বইয়ের প্রতিটি পাতায় পাতায় আরবী কাওয়ায়েদ, বাংলা ব্যকরণ আর ইংলিশ গ্রামারের সমম্বয় ঘটিয়ে যে বই প্রকাশ পেয়েছিল তা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য বিশাল ভূমিকা রেখেছে। সে তিনটা বই থেকে যে আয় হয়েছিল তা দিয়ে দু’টো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান আর নিজের লেখায় আর নিজের প্রকাশনায় মোট নব্বুইটা বই প্রকাশ করেছিলাম।পাঠ্যপুস্তকগুলো ছাত্র-শিক্ষক সমাজে দারুণভাবে প্রশংসিত হয়েছিল।শত শত লেখকের সাথে প্রতিযোগিতা করে বোর্ডের পাঠ্যপুস্তক লিখেছি। কিছু বই পাঠ্যপুস্তক হিশেবে অনুমোদন পেয়েছিল।রিভিউকারী হিশেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ডঃ কাজী দীন মুহাম্মাদ স্যার আমার লেখার ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। বইগুলোর মাষ্টার কপি আজো আমার কাছে আছে। মাঝে মধ্যে ওগুলো দেখে হতাশ হই, লজ্জা লাগে। মনে হয়, কতো কিছুই না করার ছিল সে লেখায়, অনেক কিছু বাদ পড়ে গেছে, এটা না হলেও চলতো, ওটা যোগ করতে পারলে ভাল হতো, তিনবার দেখার পরেও এই বানান ভুলটা আমার দৃষ্টি এড়ালো কীভাবে, কাগজটা আরো ভাল হওয়া দরকার ছিল, মুদ্রণের কালির মান খারাপ ছিল, কভারটা আরো দৃষ্টিনন্দন করা যেত, বাঁধাইটা আরো ভাল করা দরকার ছিল, ইত্যাদি ইত্যাদি। কানাডা আসার পরে হিসাববিজ্ঞানের একটা বই লিখেছি। ঐ বইটা ক্লাসে পড়িয়ে শিক্ষকতা করে পিজা-বার্গার আর ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করি।হিসাববিজ্ঞানের দশটা বই একটা তালিকায় আনলে আমারটা থাকে। পাঁচটা বইয়ের তালিকা করলেও আমারটা থাকে। তিনটার তালিকা করলেও আমারটা শেষের দিকে গিয়ে থাকে থাকে।তারপরেও আমার বইটা আমার কাছে ভাল লাগেনা।আমি যেটা দিবাস্বপ্নে ভাবি অন্যে সেটা বাস্তবে আগেই করে দেখায়। ব্যপারটা সময়ের, ক্ষমতার না জ্ঞানের বিকাশের সেটা যেমন বিবেচ্য সেই সাথে মনন আর মানসিকতার বিষয়টাও জড়িয়ে আছে বলে মনে হয়। একট পাকা আম দেড় মাস আগের বয়সে ফিরে গিয়ে বলে ওঠে, ‘কতো কচি, কতো ছোট আর কতো কাঁচাই না ছিলামরে”।আমার অনুভব আর বাস্তবতা অনেকটা সে ধরণের।
কেউ লিখতে লিখতে লেখক হয়ে যান। কেউ পাঠ করতে করতে পাঠক হয়ে যান।কেউ সমালোচনা করতে করতে সমালোচক হয়ে যান।যারা সমালোচনা করেন তারা বই লেখেন না বা লেখার সাহস করেন না বা লিখতে পারেন না কিন্তু সমালোচনায় তিনি বা তারা যেন উলংগ হয়ে সাতার কাটেন।অনেকে উর্ধতন আছেন যিনি বা যারা অধস্তনদেরকে দিয়ে কবিতা লিখিয়ে নিজের নামে প্রকাশ করেন।আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগেও দু’জন কবি থাকলে দু’ কোটি পাঠক ছিল। কিন্তু আজকাল দু’হাজার কবি আছে, এক হাজার পাঠক আছেন কিন্তু সমালোচক আছেন দু’কোটি। আমার সিনিয়র সহকর্মী, আমার খুব কাছের মানুষ, আমার সাবেক কর্মক্ষেত্র মুহাম্মাদপুর কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ইংলিশের শিক্ষক জনাব আহসানুল্লাহ। তাঁর সবগুলো বই কালের সাথে সম্পর্কিত চিরকালের-চিরদিনের।কী নেই তার লেখায়! ইতিহাস, দর্শণ, অর্থনীতি, ধর্ম, বিজ্ঞান, জাতীয়তাবোধ, সততা আর দৃঢ়তায় সমৃদ্ধ এ মানুষটি লেখায়, বলায়, বাস্তবতায় আর মনের দৃঢ়তায় সমুজ্জ্বল। আমার আরেক সিনিয়র সহকর্মী সমাজকল্যাণ বিভাগের শিক্ষক রতন কুমার ঘোষ। তাঁর লেখা অনেকগুলো বই বিশ্বমানের। তাঁদের সাথে কানাডা থেকে যখন ফোনালাপ করি তখন তাঁদের কথায় “ভাল কিছু করতে না পারা’র হতাশা প্রকাশ পায়।তাদের লেখা পড়ে তাদের কর্মের বিশালতা নিয়ে আমি প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকি। ঠিক সেই একই লেখার কথা শুনে আমার আরেক সিনিয়র সহকর্মী নূর মুহাম্মাদ কাজী হেসে গড়িয়ে পরেন।কাজী স্যারের বয়সে এলে বা তাঁর মতো পরিপক্ক হলে আমিও হয়তো গড়িয়ে পরবো।আমার ধারণা, এখানে এসেই লেখকের অতৃপ্তি আর পাঠকের স্বাধীনতা সমান্তরাল হয়ে যায়।
আমার একটা অনুভূতি প্রকাশ করে লেখাটা শেষ করি। আমাদের প্রাকৃতিক বয়স আর মানসিক বয়স সমান্তরাল চলেনা বিধায় বয়সের সাথে জ্ঞানের সামঞ্জস্য সব সময় ঠিক থাকেনা। তারপরেও যারা কাজে-কথায়-ব্যবহারে মানুষ হয়ে গেছেন তারা আমাদের পাথেয়, নির্দেশক আর অনুপ্রেরণা। আমাদের জ্ঞান সবই আর্কাইভ থেকে সুদসহ ধার-কর্জ বা ঋণ করা হস্তান্তরযোগ্য একটা বোঝামাত্র।যার ফলে অর্জিত জ্ঞান লুকিয়ে রাখা পাপ মনে করি। আমরা আমাদের নিজস্ব ক্ষমতায় প্রকাশ বা বিকাশ লাভ করিনা।তাছাড়া, সকল ধর্মগ্রন্থ কবিতার আকারে, পদ্যের আকারে এসেছে।সবচেয়ে বড় কথা হলো দৃশ্যমান সমগ্র সৃষ্টি যেন একটা কবিতার ছিন্নপাতা মাত্র।পরিপূর্ণ কবিতার বইটা যে কেমন তা দেখতে বড় বেশী সাধ হয়।আর সে কবিতার রচয়িতা হিশেবে বিশ্বপ্রভুই একমাত্র বিশ্বকবি যার দর্শন আমার জন্য আরাধ্য। বিশ্বপ্রভূই বিশ্বকবি বিধায় তার সৃষ্টিও মাঝে মধ্যে কবি হয়ে ওঠে। আর আমরা, এই সকল সৃষ্টি, যার যার যোগ্যতা আর কর্ম অনুযায়ী সেই বিশ্বকবির ক্ষুদ্র প্রতিনিধিমাত্র যাদের বিশাল বিশাল কর্ম বা সকলের কর্মের সমষ্টি অনেকটা সকালের শিশিরের মতো।
--ধন্যবাদ
erpcollege@gmail.com
Toronto Ontario, Canada
Wednesday, September 03, 2008

