তিনবিঘা মাপের স্বাধীনতা
বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করলেও লালমনিরহাটের দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার মানুষ কার্যতঃ স্বাধীন হয় ১৯৯২ সালের ২৬ জুন। 'তিন বিঘা করিডোর' দিয়ে পারাপারের চুক্তি দীর্ঘদিন পর কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে। কিন্তু দেশের ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন ওই ভূখণ্ডের নাগরিকদের স্বাধীনতা যেন কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রিত পারাপার ব্যবস্থাতেই সীমাবদ্ধ।
প্রায় ৫০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দহগ্রাম ইউনিয়নের ২০ হাজার মানুষের বসবাস হাজারো সমস্যার মধ্যে। পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি দীর্ঘ ১৭ বছরেও।
এখানে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো মৌলিক সুযোগের অভাব। ভারতের আপত্তির কারণে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া যায়নি। হাসপাতালের যন্ত্রপাতি চলে না বিদ্যুতের অভাবে। অন্ধকারের রাজত্ব কেবল সাধারণ মানুষই নয়, ত্রস্ত করে রাখে সীমান্তরক্ষী বিডিআরকেও। রয়েছে চিকিৎসক, প্রয়োজনমত শিক্ষকের সমস্যা।
ক্ষুদ্র এ জনপদের মানুষের স্বাধীনতা বাধা এক আধুনিককালের সূর্যাস্ত আইনের নিগড়ে। সকাল সাড়ে ছয়টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত তারা ভোগ করেন একধরণের 'স্বাধীনতা'। রাতের পুরো সময়টাই আবার বন্দি নিষেধাজ্ঞার ঘেরাটোপে। রাতের বেলা কোন নাগরিক গুরুতর অসুস্থ হলে কিংবা কেউ মারা গেলেও তাদের গ্রামের বাইরে যাওয়ার অনুমতি পাওয়া সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) অনুমতি নিয়ে একজন থেকে সর্বোচ্চ তিনজনের করিডোর দিয়ে বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডে যাওয়ার অনুমতি পাওয়া যায়।
সম্প্রতি ছিটমহলটি সফরকালে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে 'নিজভূমে পরবাসী' এই মানুষদের দৈনন্দিন বিড়ম্বনার হালফিল চিত্রটা জানা গেলো।
রিকশা শ্রমিক নেতা ইউসুফ আলী বলেন, এলাকার মানুষ প্রতি রবিবার ও বৃহস্পতিবার পাটগ্রামে হাট বসলে ১০টি করে মোট ২০টি গরু বা গবাদিপশু বিক্রির অনুমতি পায়। এজন্য স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের সিরিয়াল দেওয়া অনুমতিপত্র প্রয়োজন হয়।
ইউসুফ জানান, এসব অনুমতিপত্র নিতে চেয়ারম্যানকে নির্ধারিত ফি দিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে খরচ করতে হয় নির্ধারিত হারের বেশি টাকা। কিন্তু গবাদিপশু বিক্রি না হলে তা আর ফিরিয়ে নেওয়ার কোন সুযোগ নেই। বাধ্য হয়ে অনেক কম দামে এসব বিক্রি করতে হয়। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে তারা জমি-জমা বিক্রি করতে পারছে না। জেলা অথবা উপজেলা পর্যায়ের রেজিস্ট্রি অফিসে জমি বিক্রির নিবন্ধন করা হচ্ছে না। এর কারণ এলাকাবাসী জানেন না।
তার সঙ্গে এলাকার দোকানী আব্দুল মন্নাফ ও অন্যদের জিজ্ঞাসা, '১৯৯২ সালে চুক্তির পর চলাচলে সীমিত স্বাধীনতা পেলেও আসলেই কি আমরা স্বাধীন হয়েছি? আমরা কি নিজ-ভূমে পরবাসী হয়ে থাকবো, নাকি এর কোন শেষ হবে?
দহগ্রাম বাজারের কাছে রয়েছে একটি হাসপাতাল। 'দহগ্রাম ১০ শয্যাবিশিষ্ট বিশেষায়িত হাসপাতাল' নামের ওই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয় এরশাদ সরকারের সময়। হাসপাতালটিতে নিজস্ব অস্ত্রোপচার কক্ষসহ আধুনিক সকল চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু বিদ্যুৎ নেই বলে এসব যন্ত্রপাতি পড়ে আছে। একটি সৌর বিদ্যুৎ প্যানেলে হাসপাতালের ন্যুনতম প্রয়োজন মেটে।
চিকিৎসা সহকারী ডা. জিল্লুর রহমান জানান, হাসপাতালে একজন এমবিবিএস সনদধারী চিকিৎসকসহ মোট ১৪ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারির পদ রয়েছে। এর সবক'টি পদে বর্তমানে কর্মী রয়েছে। জিল্লুর রহমানের অভিযোগ চিকিৎসা কর্মকর্তাসহ অনেকেই নিয়মিত যান না বলে হাসপাতাল সাধারণত চলে তার প্রেসক্রিপশনেই। এলাকার মানুষ জানান, সন্ধ্যার পর এ হাসপাতালে কোন চিকিৎসা হয়না।
নারী রোগীদের জন্য গর্ভাবস্থা বা অন্য ধরণের বিশেষ চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা নেই এ হাসপাতালে। এসবের জন্য অনুমতি নিয়ে মূল ভূখণ্ডের অন্য হাসপাতালে চিকিৎসাই একমাত্র বিকল্প।
হাসপাতাল প্রাঙ্গনে বাসা থাকার পরও নিয়মিত কাজে না আসার কারণ ব্যাখা করে চিকিৎসা কর্মকর্তা শাহজাহান মিয়া বলেন, তার জন্য একটি বাসা আছে ঠিকই, কিন্তু বিদ্যুৎ ছাড়া সেটি বসবাসের যোগ্য নয়। তার বক্তব্য, অন্যরাও বাইরে থেকে কাজে আসেন। তাই কেউ কেউ সবসময় আসতে পারেন না।
কথা হয় হাসপাতাল এলাকার বাসিন্দা আলেয়া বেগমের সঙ্গে। তিনি জানান, হাসপাতাল থাকলেও এখানে যথাযথ চিকিৎসা পাওয়ার উপায় নেই। কারণ একমাত্র অবলম্বন চিকিৎসা সহকারী জিল্লুর রহমান।
আলেয়া বেগম জানান, তিনবিঘা করিডোর চালু হওয়ার আগে স্থানীয় হাফিজুর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। ওই সময় তার বাবার পরিবারের সবাই ভারতীয় ভূখণ্ডেই ঘরবাড়ি গড়ে তোলে। করিডোর চালু হওয়ার পরও ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কড়াকড়ির কারণে বাবার পরিবারের কারো সঙ্গেই দেখা করার সুযোগ পাননি তিনি। পাসপোর্ট করে সেখানে যাওয়ার মতো অবস্থা তার নেই।
দৈর্ঘে ১২ কিলোমিটার ও প্রস্থে গড়ে চার কিলোমিটার এ ক্ষুদ্র এলাকার চারদিকে বিএসএফ-এর ক্যাম্প রয়েছে ১৭টি। এসব ক্যাম্পের বিপরীতে বাংলাদেশের বিডিআর ক্যাম্প রয়েছে মাত্র ছয়টি। একেকটি বিডিআর ক্যাম্পের বিপরীতে ভারতীয় ছয়টি ক্যাম্পও রয়েছে কোথাও।
তবে সীমান্তের অন্যত্র কাঁটাতারের বেড়া থাকলেও দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার ক্ষেত্রে তা করেনি ভারত। এর চারদিক খোলা। নেই মধ্যবর্তী চলাচলনিষিদ্ধ 'নো-ম্যানস জোনও'। ক্যাম্প ও জোরদার টহলের মাধ্যমেই এটি নিয়ন্ত্রণ করছে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীরা। তবে ভারতের প্রতি অনীহার কারণে বীতশ্রদ্ধ এসব মানুষ নাকি নিজে থেকেই সেদিকে পা বাড়ায় না।
দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা এলাকায় একটি উচ্চ মাধ্যমিক এবং চারটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এছাড়া রয়েছে চারটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কয়েকটি মাদ্রাসা। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যথেষ্ট শিক্ষক না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম।
গ্রামের বিভিন্ন সড়কের পাশে খুঁটি পুঁতে তার টানানো থাকলেও নেই বিদ্যুতের ব্যবস্থা। তিন বিঘা করিডোর ব্যবহার করে বিদ্যুতের লাইন নেওয়ায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষের আপত্তির কারণে সেখানে বিদ্যুৎ নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ ব্যাপারে স্থানীয় সাংসদ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মোতাহার হোসেন জানান, তিনি এলাকাবাসীর সমস্যা সম্পর্কে জানেন এবং এসব সমস্যার সমাধানে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে ভারতীয় হাইকমিশনের সঙ্গে কথা হয়েছে। আগামী জুন মাসের মধ্যেই গবাদিপশু বিক্রিসহ বিভিন্ন সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষের আপত্তির কারণে সেখানে বিদ্যুৎ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তিনি সেখানে আপাতত জেনারেটর সরবরাহ করে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানের নির্দেশ দিয়েছেন। দ্রুতই জেনারেটর বসানোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান মোতাহার হোসেন । আগামী অর্থ বছরে হাসপাতালের জন্যও বিশেষ বরাদ্দের ব্যবস্থা করা হবে জানালেন তিনি।

