অনুতপ্ত পিতার আত্ম-স্বীকারোক্তি

bdidol's picture
Posted by
bdidol
Sunday, October 5, 2008 - 6:10am BST

মূলঃ W. Livingstone Larned

ছোট্ট সোনা আমার, এ কথাগুলো যখন তোমায় বলছি তুমি তখন ঘুমোচ্ছ, তোমার ছোট্ট থাবা চিবুকের তলায় রেখে। তোমার কোঁকড়া চুলগুলো ঘামে ভিজে লেপ্টে আছে কপালে। আমি চোরের মত চুপি চুপি একলা ঢুকে পড়েছি তোমার ঘরে। এইতো খানিক আগেও বসেছিলাম লাইব্রেরিতে, পড়ছিলাম। হঠাৎ আশ্চর্য এক অপরাধবোধ ঘিরে ধরল আমায়। অপরাধীর মত হাজির হয়েছি তোমার কাছে।

ভাবছিলাম। তুমি স্কুলে যাবার আগে খুব বকেছিলাম, তোয়ালেতে ভালভাবে মুখ না মুছে সেটা শুধু মুখে ছুঁইয়েছিলে বলে। তোমার জুতো পরিষ্কার ছিল না, মেঝেতে ছড়িয়ে ফেলেছিলে তোমার জিনিসপত্র, ভীষণ রেগে বকেছি তোমায়।

প্রাতরাশের সময়ও তোমার ভুল ধরেছি। খাবার ছড়িয়ে ফেলেছিলে টেবিল জুড়ে। তারপর ভালোভাবে না চিবিয়েই গিলে ফেলেছ। কনুই দুটো তুলে দিয়েছিলে টেবিলের উপর। অনেকখানি পুরু করে মাখন মাখিয়ে ফেলেছিলে রুটিতে। এরপর আমি যখন ট্রেন ধরতে ছুটছি, হঠাৎ খেলা থামিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে আমায় হাত নেড়ে চিৎকার করলে, "টা-টা, বাবা।" আমি ভুরু কুঁচকে খিঁচিয়ে উঠলাম, "ওখানেই থাকো!"

সন্ধ্যাবেলায় আবার সেই একই ঘটনা। ফিরতে ফিরতে দেখলাম রাস্তায় হাঁটু মুড়ে তুমি মার্বেল খেলছ। একগাদা ফুটো তোমার মোজায়। তোমাকে তোমার বন্ধুদের সামনে তামাশার পাত্র বানিয়ে খেদিয়ে নিয়ে এসেছি বাড়িতে। তুমি যদি নিজে কিনে পড়তে তবেই বুঝতে মোজার দাম কত! সাবধান হতে।

মনে পড়ে, যখন আমি লাইব্রেরিতে বসে পড়ছিলাম? কি রকম গুটি গুটি ভীরু পায়ে বিষাদ চাউনি নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছিলে? বিরক্ত হয়ে ধমকে উঠেছিলাম, "ব্যাপার কি? কি চাই?"

মুখে তুমি কিছুই বল নি। হঠাৎ দৌড়ে এলে। লাফিয়ে উঠে তোমার ছোট্ট হাত দুটো দিয়ে গলা জড়িয়ে ধরে টুক করে একটা চুমু খেলে। তোমার হৃদয়ে বিধাতা যত মমতা দিয়েছেন তার সবটুকুই যেন মিশে ছিল ওই ছোট্ট হাত দুটোর বাঁধনে । শত অবহেলায়ও তা শুকিয়ে যায় নি।

আমার হাত থেকে কাগজ খসে পড়ল। ভীষণ এক ভয় চেপে ধরল আমায়। একি স্বভাব হয়েছে আমার?! পদে পদে তোমার ভুল খুঁজছি!!! এই কি ছোট্ট তোমাকে আমার দেয়া পুরষ্কার?!! এমন তো নয় যে আমি তোমায় ভালবাসি না। আমি তোমার বয়সের তুলনায় অনেক বেশি আশা করছি তোমার কাছে। তোমায় তুলনা করছি আমার সাথে। মাপছি আমার নিজের বয়সের মাপকাঠিতে।

অথচ কতই না চমৎকার সব গুণ রয়েছে তোমার। দূর পাহাড়ের স্নিগ্ধ ভোরের মতই বিশাল তোমার ওই ছোট্ট হৃদয়খানি। তুমি হঠাৎ এলে, চুমু খেয়ে শুভ্ররাত্রি জানালে, তোমার ওই চকিত আদরটুকুই তোমার বিশালত্ব চিনিয়ে দিল আমায়। যাই ঘটুক না কেন আজ কোন কিছুরই আর পরোয়া করি না, ছোট্টমনি আমার। রাতের আঁধারে আমি এসেছি তোমার কাছে। লজ্জিত, নতজানু হয়ে।

তুমি জেগে থাকলে হয়ত কথাগুলো বুঝতে না, জানি । কিন্তু কাল থেকে আমি সত্যিকারের "বাবা" হব। তোমার বন্ধু হব। তোমার সুখে হাসবো, তোমার সব দুঃখ হবে আমার দুঃখ। জিভ কামড়ে ধরব, তবু বেরুতে দেব না যদি আর একটাও কড়া কথা মুখে চলে আসে। নামজপের মত নিজেকেই বলতে থাকবো, "ও তো আমার ছোট্ট খোকা বৈ আর কিছু নয়!"

তোমায় আমি কল্পনা করেছিলাম এক জন পূর্ণ বয়স্ক পুরুষের মত। কিন্তু এইতো তুমি গুটিসুটি হয়ে শুয়ে আছো এইখানে। আমার ছোট্ট সোনা! এই সেদিনও তো তুমি ঘুমিয়ে ছিলে মায়ের কোলে, মায়ের কাঁধে মাথা রেখে। আমি তোমার কাছে বয়সের তুলনায় অনেক বেশি আশা করে ফেলেছি, অনেক বেশি।

Comments

KAY's picture

আমাদের রাগী বাবা

আপনার ব্লগটি পড়ে নিজের একই ধরনের অনুভূতির কথা মনে পড়লো।আসলে আমাদের সবার ভিতরেই মনে হয় আমাদের রাগী বাবারা অবস্থান করেন যারা আমাদের অনেক ভালো বাসলেও বাইরে ছিল একটা কাঠিন্যের আবরণ।নিজেদের অজান্তেই আমাদের আচার আচরনে হয়তো তাদেরই ছায়া পড়ে।আর বিদেশের মূল্যবান অবসর সময়ের একটি ঘন্টা ছোটো এঞ্জেলটির জন্য কাটানো আত্মকেন্দ্রিক কাজ-কর্ম,এমন কি ই-মেলায় ব্লগ লেখার চেয়ে অনেক মধুর।এই দুলাইন যখন লিখছি তখন আমার দু বছরের এঞ্জেলটি নানা ভাবে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে, যাতে তাকে আমি কোলে নিয়ে ঘুম পাড়াই।পাত্তা দিচ্ছি না দেখে আমার ল্যাপ টপের উপর পা তুলে দিচ্ছে।ভালো থাকুন।