পুনর্গঠন করতে গিয়ে বিএনপিতে যা হচ্ছে...
খুলনা মহানগর বিএনপির প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক সাহারুজ্জামান গত শুক্রবার দলের চেয়ারপারসন বরাবর ফ্যাক্সবার্তা পাঠিয়েছেন। এতে সাংসদ ও নগর বিএনপির আহ্বায়ক নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ আনা হয়েছে। বলা হয়েছে, মুষ্টিমেয় কয়েকজনের সঙ্গে যোগসাজশে নজরুল ইসলাম নিজের অনুগামীদের নিয়ে নগর কমিটি গঠন করে কেন্দ্রে পাঠিয়েছেন। এতে দলের অনেক ত্যাগী ও যোগ্য নেতাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এই কমিটি অনুমোদন দিলে মহানগরের অন্তত সাতজন ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ কয়েক ডজন নেতা বিএনপি থেকে পদত্যাগ করবেন বলে বার্তায় বলা হয়।
তবে শুধু খুলনা মহানগর নয়, বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে বিভিন্ন জেলা থেকে এমন অসংখ্য বার্তা আসছে। পাশাপাশি বেগম জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মৌখিক অভিযোগও জানিয়ে যাচ্ছেন অনেক সাবেক সাংসদ ও জেলা নেতা। দল পুনর্গঠনের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে গত ৯ জুন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব জেলার যে আহ্বায়ক কমিটি করেছিল, তার পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা। গত শুক্রবারের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও অন্তত ১০ জেলা কমিটি বিরোধের কারণে এখনো তালিকা কাটছাঁট করে চলেছে। আর রাজবাড়ী, ঝালকাঠি, বরিশাল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পটুয়াখালীর মতো অন্তত ৩০ জেলার নেতারা একমত হতে না পেরে একাধিক কমিটি জমা দিয়েছেন। সব মিলিয়ে পুনর্গঠন করতে গিয়ে বিএনপিতে আরও বেশি জট পাকিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন দলের অনেক নেতা।
খুলনা মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাহারুজ্জামান এ বিষয়ে বলেন, ‘ভেবেছিলাম, ঐক্যবদ্ধভাবে দল করব। কিন্তু মুষ্টিমেয় কয়েকজন নেতা দলকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করছেন। এর প্রতিবাদ জানিয়েছি। প্রতিকার না পেলে বিকল্প ব্যবস্থা নেব।’
জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিএনপির প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক সাংসদ হারুন-অর রশিদের নেতৃত্বে ছয় যুগ্ম আহ্বায়ক দলের চেয়ারপারসনের কাছে পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা দিয়েছেন। অন্যদিকে একজন যুগ্ম আহ্বায়ককে সঙ্গে নিয়ে আরেকটি কমিটি জমা দিয়েছেন জেলা কমিটির আহ্বায়ক শাজাহান মিয়া।
জানা গেছে, কেন্দ্র থেকে যে আটজনের কমিটি করে দেওয়া হয়, তাঁদের মধ্যে ছয়জন শাহাজান মিয়ার প্রতি অনাস্থা জানিয়ে দুই সপ্তাহ ধরে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের অভিযোগ, কানসাট গণহত্যার নায়ক শাজাহান মিয়াকে দলের নেতৃত্ব দেওয়া একটি ভুল সংকেত। তাঁর নেতৃত্ব চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলবে না।
আলাপকালে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হারুন-অর রশিদ বলেন, যে ব্যক্তি গত পাঁচ বছরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে পারলেন না, যিনি বিভিন্ন সময় বিএনপির স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, তাঁকে মেনে নেওয়ার প্রশ্ন নেই। এ জন্য দলের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীরা ক্ষুব্ধ। তৃণমূলের চাপেই তাঁরা কেন্দ্রে পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা দিয়েছেন বলে তিনি জানান।
চেয়ারপারসনের কার্যালয় সুত্র জানায়, রাজবাড়ীতে জেলার আহ্বায়ক আবু নঈম আনসারীর নেতৃত্বে একটি কমিটি জমা পড়েছে। কমিটিতে সংস্কারপন্থী বলে পরিচিত সাবেক সাংসদ নাসিরুল হক ও আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মকে রাখা হয়েছে। আর এর প্রতিবাদ জানিয়ে আরেকটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা দিয়েছেন যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুর রাজ্জাক। ঝালকাঠিতে আহ্বায়ক টি আহম্মদের নেতৃত্বে একটি কমিটি জমা পড়েছে। আর যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে জমা পড়েছে আরেকটি কমিটি।
জানা গেছে, ফরিদপুর জেলা আহ্বায়ক কমিটি তিন দফা বৈঠক করে ৫১ সদস্যের একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি করে তা জমা করতে আহ্বায়ক শাহজাদা মিয়াকে দায়িত্ব দেন। কিন্তু অধিকাংশ যুগ্ম আহ্বায়কের অগোচরে নাম পরিবর্তন করে শাহজাদা মিয়া নিজের পছন্দসই ব্যক্তিদের জায়গা করে দেন কমিটিতে। এটি জানতে পেরে ইলিয়াস আহমেদ, মনিরুজ্জামান, খন্দকার নাসিরুল ইসলাম, এ কে কিবরিয়া, আলী আশরাফসহ অন্য যুগ্ম আহ্বায়কদের নেতৃত্বে ৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা দেওয়া হয় চেয়ারপারসন কার্যালয়ে।
এ বিষয়ে যুগ্ম আহ্বায়ক ইলিয়াস আহমেদ বলেন, ‘ডাকাত বলে পরিচিতদের জেলা কমিটির সদস্য করেছেন শাহজাদা মিয়া। বিএনপিকে ডাকাতমুক্ত করতেই আমরা পাল্টা কমিটি জমা দিয়েছি।’
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বরিশাল মহানগরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামানকে যুগ্ম আহ্বায়ক না করায় তাঁর অনুসারীরা গত শুক্রবার আহ্বায়ক কমিটির বৈঠক পন্ড করে দেন। এরপর সাবেক মেয়র ও যুগ্ম আহ্বায়ক আহসান হাবিবের নেতৃত্বে ৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা দেওয়া হয়। কিন্তু এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে আহ্বায়ক মাহমুদ গোলাম সালেক জমা দেন আরেকটি কমিটি। এদিকে জামালপুরে আমজাদ হোসেন নামের বিতর্কিত এক ব্যক্তিকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা নিয়ে তুমুল বিতন্ডা চলছে। নারায়ণগঞ্জের আহ্বায়ক দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত তৈমুর আলম খন্দকার তাঁর অনুগামীদের কমিটিতে জায়গা দেওয়ার জন্য অনেক সক্রিয় নেতাকে বাদ দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
জেলা বিএনপির নেতা এ টি এম কামাল অভিযোগ করেছেন, জরুরি অবস্থা জারির পর সবচেয়ে জোরালো ভুমিকার রাখার পরও তাঁকে কমিটিতে না রেখে অনেক আজ্ঞাবহকে কমিটিতে রাখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে তৈমুর আলম খন্দকার বলেছেন, সবাইকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়। তাঁরা যাঁদের যোগ্য মনে করেছেন, তাঁদের নিয়েই কমিটি করছেন।
চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সাবেক নেতা আব্দুর সবুর, এম এ সাত্তারসহ বেশ কিছু নেতা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে অভিযোগ জানিয়ে জমাকৃত পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটিকে অনুমোদন না জানানোর অনুরোধ জানিয়েছেন। তাঁরা কমিটিতে অযোগ্য ও বিশেষ ব্যক্তির আজ্ঞাবহ লোককে নেওয়ার অভিযোগ জানিয়েছেন।
এভাবে সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, পাবনা, রাজশাহী, নরসিংদী, সিলেট, টাঙ্গাইল, বগুড়া, শেরপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এসেছে দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে। এ নিয়ে চেয়ারপারসনের হয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে গিয়ে রীতিমতো নাজেহাল হচ্ছেন চেয়ারপারসন কার্যালয়সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা। সব মিলিয়ে পুনর্গঠন করতে গিয়ে জেলা পর্যায়ে বিএনপির কোন্দল আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
সাবেক উপমন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার এসব দেখেশুনে তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন। বলেন, ‘আমাকে বাদ দিয়ে জেলা আহ্বায়ক কমিটি হয়েছিল। কিন্তু কোন্দল ছাড়া পূর্ণাঙ্গ কমিটি করে দেখিয়ে দিলাম কর্তৃত্ব আর নেতৃত্ব কাকে বলে।’ রুহুল কুদ্দুস নাটোর জেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে তিনি সদস্য হিসেবে আছেন।

