টিপাইমুখ বাঁধ
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মনিপুর রাজ্যের বরাক ও টুইভাই নদীর সংযোগস্থল টিপাইমুখে বাঁধ নির্মাণ করছে ভারত। ২০১২ সালের মধ্যে বাঁধ নির্মাণ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে দেশটি। ১ হাজার ৫শ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন পানি বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এ বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক নদীনীতি লঙ্ঘন করে এ বাঁধ নির্মিত হলে বিপাকে পড়বে বাংলাদেশ। সাপ্তাহিক ২০০০ ‘স্টপ টিপাইমুখ’ শিরোনামে এ বিষয়ে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন করেছে। নুরুজ্জামান লাবুর এই প্রতিবেদনের উল্লেখযোগ্য অংশ আমাদের সময়ের পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।
টিপাইমুখ বাঁধের অবস্থান:
বাংলাদেশের সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার অমলসিদ সীমান্ত থেকে ১শ কিলোমিটার উজানে ভারতের মনিপুরের চারুচাঁদপুর জেলায় টিপাইমুখের অবস্থান। সেখানে মিলিত হয়েছে বরাক ও টুইভাই নদী। এই দুই নদীর সঙ্গমস্থলের ৫শ মিটার ভাটিতে বরাক নদীতে নির্মিত হচ্ছে টিপাইমুখ বাঁধ। ৩৯০ মিটার দীর্ঘ বাঁধটির উচ্চতা হবে ১৬১ মিটার। ২৮৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ বাঁধের জলাধারে মোট পানি ধারণক্ষমতা হবে ১৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন কিউবিক মিটার। ১৯৫৫ সালে মনিপুরের ময়নাধর, ১৯৬৪ সালে নারায়ণধর, এরপর ভুবনধরে এ বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। পরে ১৯৮০ সালে স্থান নির্ধারণ করা হয় টিপাইমুখে। ২০০৩ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং মনিপুর রাজ্য সরকারের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। তবে বাঁধের উজান ও ভাটি অঞ্চলের মনিপুরবাসীর বিরোধিতার কারণে বাঁধ নির্মাণ শুরু করতে পারেনি ভারত। ২০০৮ সালের ২৮ জুলাই মনিপুর রাজ্য সরকার আইন পাস করে টিপাইমুখ বাঁধের নির্মাণসামগ্রী আনা-নেয়ার কাজে ব্যবহৃত মনবাহাদুর রোডের প্রতি সাত কিলোমিটার অন্তর সামরিক পোস্ট স্থাপন করেছে।
ভারতেও আন্দোলন চলছে:
টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে শুধু বাংলাদেশেই নয়, ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে আন্দোলন চলছে। মনিপুর, মিজোরাম ও আসামে এ আন্দোলন তীব্রতায় রূপ নিয়েছে। এ বাঁধের কারণে প্রায় ২৭৫ বর্গকিলোমিটার এলাকার ১৬টি গ্রাম পুরোপুরি ডুবে যাবে, আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হবে ৫১টি গ্রাম, বিপন্ন হবে ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষের জীবন-জীবিকা ও ঐতিহ্য-সংস্কৃতি। মনিপুরের প্রায় ২০টির বেশি সংগঠন একযোগে ‘অ্যাকশন কমিটি এগেইনিস্ট টিপাইমুখ প্রজেক্ট’ ব্যানারে আন্দোলন গড়ে তুলেছে। এজন্য প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহকে খোলাচিঠি দিয়েছে মনিপুরবাসী।
কী করবে বাংলাদেশ:
টিপাইমুখে ভারতের একক সিদ্ধান্তে বাঁধ নির্মাণ আন্তর্জাতিক নদী আইনের লঙ্ঘন। যৌথ নদী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হেলসিংকি (১৯৬৬) নীতিমালা পৃথিবীর সব দেশই অনুসরণ করে। এই নীতিমালার ৪ ও ৫ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রতিটি অববাহিকাভুক্ত দেশ, অভিন্ন নদী ব্যবহারের ক্ষেত্রে অন্য দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজন বিবেচনা করবে। এ জন্য অবশ্যই যেন অন্য দেশের কোনো ক্ষতি না হয় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।
একই আইনের ২৯(২) নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, একটি রাষ্ট্র নদী অববাহিকার যেখানেই অবস্থান করুক না কেন, তার যেকোনো প্রস্তাবিত অবকাঠামো নির্মাণ এবং ইনস্টলেশনের ব্যাপারে নদী অববাহিকতায় অবস্থিত অন্য যেকোনো রাষ্ট্র, এই কাজের ফলে অববাহিকায় ঘটা পরিবর্তনের কারণে যার স্বার্থহানি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাকে এব্যাপারে নোটিস দিতে হবে। নোটিস গ্রহীতা দেশ যেন প্রস্তাবিত পরিবর্তনের সম্ভাব্য ফলাফলের বিচার-বিশ্লেষণ করতে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় তথ্যাবলি থাকতে হবে। প্রায় একই কথা বলা হয়েছে ১৯৯৭ সালে গৃহীত জাতিসংঘের নদী কনভেনশনের আর্টিক্যাল ১২-তে।
এ প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে ভারত শুধু আন্তর্জাতিক আইনই নয়, ভারত-বাংলাদেশ পানি বণ্টন চুক্তিও লঙ্ঘন করেছে। পৃথিবীতে পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুইশরও বেশি চুক্তি রয়েছেÑ যা এই বিরোধ নিরসনে কার্যকর দিকনির্দেশনা দিতে পারে। ভারতের এই প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ আইনগতভাবে কী কী ব্যবস্থা নিতে পারেÑ এবিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, কূটনৈতিক পর্যায়ে ভারতের সঙ্গে আমাদের দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ করতে হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিংবা প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রী নিজে এ ধরনের উদ্যোগ নিতে পারেন। কূটনৈতিক পর্যায়ে এর সমাধান না হলে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে তা তুলে ধরতে হবে।

Comments
দেশের এই ক্রান্তিকালে তাদেরও জনতার প্রতিরোধে যোগ দিতে হবে।
-শেখ হাসিনা আর তার মন্ত্রীরা টিপাইমুখ আর ফুলের তালে বাঁধ তৈরির প্রতিবাদ না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন বলেই মনে হয়। তার কারণও দেশের মানুষ অনুমান করতে পারে। ক্ষমতা পাওয়ার লোভে আওয়ামী লীগ নেত্রী অনেক আগে থেকেই রেলপথে এবং এশিয়ান হাইওয়ের নামে সড়কপথে ভারতকে করিডর দান, চট্টগ্রাম বন্দর যথেচ্ছ ব্যবহার, টিপাইমুখ বাঁধ তৈরি এবং দক্ষিণ তালপট্টি দখলের ব্যাপারে আপত্তি না করার অঙ্গীকার দিয়ে দিয়েছেন। তিনি জানেন, এখন সেসব প্রতিশ্রুতির নড়চড় করতে গেলে তাকে গদি থেকে নামিয়ে দেয়ার কলকাঠিও ভারতের হাতে আছে।
দেশের মানুষের প্রতিরোধ দুর্বল করার আশায় শেখ হাসিনা এখন বলছেন, তিনি বাংলাদেশের সব নদী নিয়মিত ড্রেজিং করার ব্যবস্থা করবেন। বাংলাদেশের মানুষ যদি এখনো না বুঝে থাকে যে শেখ হাসিনা ভেবেচিন্তে কথা বলেন না, গদি পাওয়ার ও রাখার লোভে যাকে যা প্রয়োজন প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন, তাহলে তারা করুণার পাত্র। পাঁচ বছরে সাত হাজার কিলোওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন কিংবা পারমাণবিক বিদ্যুতে দেশ উদ্ভাসিত করার অঙ্গীকার যেমন ভুয়া, দেশবাসীকে প্রতারিত করার ছলমাত্র, এই ড্রেসিংয়ের প্রতিশ্রুতিও সে রকমই অবাস্তব ও অসত্য।
চাঁদ ডিঙোবে গোরু
বাংলাদেশে কত নদী আছে, ড্রেজিং কাকে বলে, নদীগুলো ড্রেজিং করতে কত ড্রেজার প্রয়োজন এবং তাতে কত ব্যয় হবে, এসব সম্বন্ধে হাসিনার সামান্যতম ধারণা থাকলেও এমন অসম্ভব কথা তিনি বলতেন না। ফারাক্কা তৈরি হওয়ার পর থেকে ৩৫ বছরেও একমাত্র পদ্মা নদী সম্পূর্ণ ড্রেজিং করার সামর্থ? বাংলাদেশের হয়নি, সুরমা, কুশিয়ারা ও মেঘনাসহ দেশের অন্য নদীগুলো কিভাবে তিনি ড্রেজিং করবেন সেটা হাসিনাকে এখুনি দেশবাসীকে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বুঝিয়ে বলতে হবে।
-দেশের সাধারণ মানুষ, যাদের মাথা ভারতের কাছে বন্ধক দেয়া হয়নি তারা সবাই প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠেছে। কিন্তু পৃথক পৃথক, খণ্ড খণ্ডভাবে প্রতিবাদ যথেষ্ট নয়। টিপাইমুখ আর করিডরের বিরোধী সব মহলকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ আন্দলন গড়ে তুলতে হবে। আওয়ামী লীগের যেসব বিবেকবান সদস্য দলের প্রতি আনুগত্যের ভুয়া ধারণার কারণে এতকাল মুখ বন্ধ করে ছিলেন তাদেরও মুখ খুলতে হবে, দেশের এই ক্রান্তিকালে তাদেরও জনতার প্রতিরোধে যোগ দিতে হবে।