এক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর তদন্ত রিপোর্ট!!!
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী,
পাঠকদের অবগতির জন্য প্রথমেই জানিয়ে রাখা ভালো, আমার লেখাপড়ার হাতেখড়ি হয়েছিল মদন মোহন তর্কালঙ্কারের 'বাল্যশিক্ষা' বই দিয়ে। ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হওয়ার আগে আমাকে এক আনা দামের ওই বই বেশ কয়েকবার কিনে দিতে হয়েছিল। ফলে বইটি প্রায় মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। সে বইয়ে অনেক আপ্তবাক্য ছিল, অনেক উপদেশ ছিল, যা আমার শিশু মনকে আলোড়িত করেছে।হয়তো তা সে সময়কার শিশুদের চরিত্র গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।আমি পড়েছি,'সদা সত্য কথা বলিবে।গুরুজনকে শ্রদ্ধা করিবে।কানাকে কানা, খোঁড়াকে খোঁড়া বলিবে না।'
সে শিক্ষা মনে রেখেই আমাকে পিলখানা ট্র্যাজেডির সরকারি তদন্ত কমিটির প্রধান সাবেক অতিরিক্ত সচিব আনিস-উজ-জামানকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বলতে হলো। কারণ, তার ওই রিপোর্টে দেখা গেল, তিনি দূরের জিনিস বা ঘটনা যতটা স্পষ্ট দেখেন, কাছের জিনিস সে তুলনায় মোটেও দেখতে পান না। তিনি অন্ধ নন, প্রতিবন্ধী। তার প্রতি আমাদের আন্তরিক সহানুভূতি রইল।
গত ২৭ মে সরকারি তদন্ত কমিটির রিপোর্টের একটি খণ্ডিত অংশ সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন আনিস-উজ-জামান। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমেদ, স্বরাষ্ট্রসচিব আবদুস সোবাহান সিদকার, বিডিআরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মইনুল ইসলাম ও তদন্ত কমিটির কয়েকজন সদস্য। রিটায়ার্ড হলেও আনিস-উজ-জামান বেশ চটপটে লোক, বাংলা উচ্চারণও চমৎকার। তার শরীরী ভাষাও ছিল বেশ স্মার্ট ও আত্মবিশ্বাসী। বিশেষ করে যখন তিনি বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনার সাথে জড়িত থাকার ব্যাপারে বিএনপি'র সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার ও সাবেক এমপি'র নাম উল্লেখ করছিলেন তখন তার চটপটে ভাবও ছিল দেখার মতো। তবে তার আত্মমর্যাদার বিপুল ঘাটতি আছে। সেটা কাউকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার প্রয়োজন পড়েনি। রিপোর্ট যদি পুরোপুরি প্রকাশের এখতিয়ারই তাকে না দেয়া হয়ে থাকে তাহলে সরকারের অংশ টেলিভিশনের খবর পাঠকদের মতো পাঠ করার জন্য ওই সংবাদ সম্মেলনে তার হাজির হওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না। সে কাজটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, ততোধিক চটপটে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমেদই করতে পারতেন।
যা হোক, তার তদন্তের খণ্ডিত অংশ প্রকাশিত হওয়ায় আমরা কিছু বিষয়ে নতুন করে অবহিত হতে পারলাম।'বিদ্রোহের পূর্বপরিকল্পনা ও পূর্বপ্রচেষ্টা' শিরোনামের প্রকাশিত রিপোর্টের অংশে তিনি বলেছেন,'নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একদল বিডিআর সদস্য তাদের এসব দাবি-দাওয়া নিয়ে নিজেদের সংগঠিত করতে থাকে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির সাক্ষাতের প্রয়াস পায়। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে দাবি-দাওয়ার ব্যাপারে আশানুরূপ সাড়া না পেয়ে তাদের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দেয়।' দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আনিস-উজ-জামান এই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কে, সে কথা সুকৌশলে এড়িয়ে গেছেন। প্রকৃতপক্ষে এই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে দুই ব্যক্তি ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপি ও ধানমন্ডি, হাজারীবাগ এলাকা থেকে এবার নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য শেখ ফজলুল হক মনির ছেলে ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস। আনিস-উজ-জামান যেখানেই বিএনপি'র সংশ্লিষ্টতা পেয়েছেন সেখানেই তাদের নামোল্লেখে কার্পণ্য করেননি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে নির্বাচনের আগেই ক্ষুব্ধ বিডিআর সদস্যরা তাদের বঞ্চনা অবসানের জন্য আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন সে কথাটি সযতনে এড়িয়ে গেলেন। কী নিদারুণ নিরপেক্ষতা!
'রিপোর্টে শান্তিপূর্ণ সমাধানে সরকারের প্রয়াস' শিরোনাম অংশে বলা হয়েছে,'শুরু থেকেই সরকার সংলাপের মাধ্যমে উদ্ভূত সঙ্কটের সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেয়।' পাশাপাশি প্রয়োজনে সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি চলতে থাকে। সামরিক বাহিনীর দৃশ্যমান উপস্থিতি সংলাপের পথে যাতে কোনো প্রতিবন্ধকতা না হয় এই বিবেচনায় সামরিক বাহিনীকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নিতে বলা হয়। ইতোমধ্যে বিদ্রোহীদের আলোচনায় নিয়ে আসার জন্য প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও হুইপ মির্জা আজম দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। তারা বিকাল সাড়ে তিনটায় প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনার জন্য ডিএডি তৌহিদের নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের একটি বিদ্রোহী প্রতিনিধিদলকে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন যমুনায় নিয়ে যান।'প্রায় দুই ঘণ্টা আলোচনার পর বিদ্রোহীরা অস্ত্রসমর্পণের পর ব্যারাকে ফিরে যাওয়া ও সব জিম্মি মুক্তি দেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের দাবি পর্যায়ক্রমে মেনে নেয়ার আশ্বাসসহ সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হলো।'
আনিস-উজ-জামান তার এই রিপোর্টেই উল্লেখ করেছেন, বেলা এগারোটার মধ্যেই বিডিআর বিদ্রোহীরা প্রায় ৫২ জন সেনাকর্মকর্তা হত্যা করে। তারপর বিকাল সাড়ে তিনটায় বিদ্রোহীদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর দুই ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা আদতে কোনো অর্থ বহন করেছিল কি না, সে কথা তিনি উল্লেখ করেননি। অথচ সেনাবাহিনীর তদন্ত রিপোর্টে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, বিদ্রোহের সাথে সাথে সেনা অভিযান পরিচালিত হলে প্রাণহানি বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হতো।
বিডিআর বিদ্রোহীরা সে বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীর সাথেও প্রতারণা করেছে এবং সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার সুবিধাই কেবল নিয়েছে। অস্ত্রও সমর্পণ করেনি কিংবা জিম্মিদেরও মুক্তি দেয়নি। বরং অস্ত্র সমর্পণের লোক দেখানো নাটক করে পিলখানার ভেতরে হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন ও নিপীড়ন চালিয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার কোনো গুরুত্বই বহন করেনি। অথচ সমর বিশারদদের মতে, সেনা অভিযান চালালে আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টার মধ্যেই এ বিদ্রোহ ছত্রভঙ্গ করে দেয়া সম্ভব ছিল। আনিস-উজ-জামানের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ?পিলখানায় কোনো সামরিক অভিযান পরিচালিত হলে, ঢাকার বাইরে সব ইউনিটে খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ত। সর্বোপরি বিশাল সীমান্ত সম্পূর্ণভাবে অরক্ষিত হওয়ার ঝুঁকি ছিল। বিদ্রোহ দমনে যেকোনো সামরিক অভিযান বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও বিপন্ন করে তুলত।? এর অর্থ দাঁড়ায় এই যে, কোথাও কোনো সুশৃঙ্খল বাহিনী যদি কখনো বিদ্রোহ করে তবে তাদের কঠোরহস্তে দমন না করে নির্দিষ্ট এলাকার ভেতরে যথেষ্ট হত্যাযজ্ঞ, অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন চালিয়ে যাওয়ার অবাধ সুযোগ দিতে হবে। তা না হলে পাছে যদি কোথাও কিছু ঘটে যায়। সেই বিবেচনায় আনিস-উজ-জামানের এই রিপোর্ট সম্পূর্ণ কাণ্ডজ্ঞানহীন। তাছাড়া সেনা অভিযান না চালানোর ফলেই সারাদেশে বিভিন্ন আউটপোস্টে বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা ঘটেনি। তা না হলে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এখন কোন যুক্তিতে বিদ্রোহের অভিযোগে শত শত বিডিআর জওয়ানকে গ্রেফতার করা হচ্ছে? সীমান্ত কি সুরক্ষিত আছে?
রিপোর্টে বলা হয়েছে,'প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের ধারাবাহিকতায় বিদ্রোহীরা পুনর্নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অস্ত্রসমর্পণ না করলে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সামরিক অভিযানের জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি চলতে থাকে।' সে প্রস্তুতি বিদ্রোহের দিন অর্থাৎ ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে নয়টা থেকেই নেয়া হয়েছিল। বিদ্রোহীরা পুনর্নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অস্ত্রসমর্পণও করেনি। তার পরও সরকার যে সামরিক ব্যবস্থা না করে চুপটি করে বসে থাকল, তার ফলাফল কী হলো, সে বিষয়টি আনিস-উজ-জামানের রিপোর্টে উল্লেখ নেই।
'বিদ্রোহীদের পলায়ন ও পলায়নের সহযোগীরা'শিরোনামে ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে,বিদ্রোহের দিন থেকেই বিদ্রোহী ও তাদের পরিবার-পরিজন পিলখানা থেকে পালিয়ে যেতে শুরু করে। এ জন্য তারা প্রধানত পশ্চিম দিকের সীমানা প্রাচীর এবং দুই নম্বর ও পাঁচ নম্বর গেট ব্যবহার করে। পলায়নকালে কিছু অতি উৎসাহী বেসামরিক ব্যক্তি বিদ্রোহীদের কাপড়, খাবার ও পানি সরবরাহ করে। এদের নেতৃত্ব দেয় বিএনপি?র সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার সুরাইয়া বেগম, তার দুই ছেলে, স্থানীয় সন্ত্রাসী মাসুদ, সন্ত্রাসী লেদার লিটন প্রমুখ। বেশ কিছু বিদ্রোহী কেরানীগঞ্জের ফেরি পার হয়ে পালায়। এদের পারাপারে ইঞ্জিনচালিত নৌকা দিয়ে সহায়তা করে বিএনপি'র সাবেক সংসদ সদস্য নাসিরউদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু। র?্যাব পলায়নরত ৭৬ জন বিদ্রোহী গ্রেফতার করে।'
বিডিআর বিদ্রোহের তদন্ত শুরু হওয়ার অল্প কিছু দিনের মধ্যেই আওয়ামী লীগ ওয়ার্ড নেতা তোরাব আলীকে বিদ্রোহী সংগঠন, বিদ্রোহীদের পালিয়ে যাওয়ার সহযোগিতা করার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। আনিস-উজ-জামান তার রিপোর্টে অতি সুকৌশলে তোরাব আলী ও আওয়ামী লীগের পবিত্র(?) নাম এড়িয়ে গেছেন। লেদার লিটনের নাম উল্লেখ করেছেন বটে তবে সে যে ছাত্রলীগের একজন সক্রিয় কর্মী সে কথাটি তার প্রতিবন্ধী দৃষ্টিতে ধরা পড়েনি।
তিনি কেমন করে জানলেন, বিএনপি?র সাবেক সংসদ সদস্য নাসিরউদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু বিডিআর সদস্যদের পালিয়ে যেতে ইঞ্জিনচালিত নৌকা সরবরাহ করেছে না? এর জবাবে আনিস-উজ-জামান জানান, বিশ্বস্ত সূত্রে তারা এ খবর পেয়েছেন। তবে আনিস-উজ-জামান একেবারেই দেখতে পাননি যে, কেন বিডিআর?র দুই নম্বর ও পাঁচ নম্বর গেটের সামনে পুলিশ মোতায়েন করা হলো না। কেন বিডিআর?র চার দিকে পুলিশ পাহারা বসিয়ে পলায়নরত বিডিআর সদস্যদের গ্রেফতার করা হলো না; কার নির্দেশে বিডিআর সদস্যদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়ার জন্য ওই পথ উন্মুক্ত রাখা হয়েছিল। এর জন্য তাকে কেরানীগঞ্জ গিয়ে বিশ্বস্ত সূত্র তালাশ করে বেড়াতে হতো না। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী না হলে তিনি ঠিকঠিকই এ দৃশ্য দেখতে পেতেন।
তা ছাড়া ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস একজন সম্মানিত সংসদ সদস্য বটে। তবে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও নন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রীও নন। তিনি কোন এখতিয়ারে, কোন অধিকারে ২৫ ফেব্রুয়ারি বিকেলে সব ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ঘোষণা জারি করলেন, পিলখানার সদর দফতরের চার পাশে তিন কিলোমিটার এলাকার বাসিন্দারা যেন ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যান। এর কোনো কারণ তিনি কখনো ব্যাখ্যা করেননি। জনমনে ব্যাপকভাবে প্রশ্ন আছে, বিডিআর বিদ্রোহীরা যাতে জনপ্রতিরোধের সম্মুখীন না হয়েই নিরাপদে পালিয়ে যেতে পারেন তার জন্যই ওই ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। এই জনসংশয় যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে রিপোর্টে তারও একটা ব্যাখ্যা থাকা উচিত ছিল। আর যদি এমন হয়ে থাকে যে, তিনি তার নিজের ভোটারদের নিরাপত্তার কথা ভেবেই এখতিয়ারবহির্ভূত অমন এক কাণ্ড করেছিলেন সেটাও তদন্ত রিপোর্টে স্পষ্ট হওয়া উচিত ছিল। আনিস-উজ-জামান অত্যন্ত যত্নের সাথে এ প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছেন। কিন্তু তারও বোঝা উচিত ছিল, অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ থাকে না।
তবে সাবেক অতিরিক্ত সচিব আনিস-উজ-জামানের এ রিপোর্টে বিডিআর বিদ্রোহের মোটিভ সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তার সাথে সেনা তদন্ত রিপোর্টের সামঞ্জস্য রয়েছে। এ রিপোর্টেও বলা হয়েছে, বিদ্রোহের মোটিভ ছিল বিডিআর?র চেইন অব কমান্ড ধ্বংস করা; বিডিআরকে অকার্যকর করা; সেনাকর্মকর্তাদের নৃশংসভাবে নির্যাতন ও হত্যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে সেনাকর্মকর্তাদের বিডিআরে প্রেষণে কাজ করতে নিরুৎসাহিত করা; বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বিডিআরকে সাংঘর্ষিক অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দেয়া; সামগ্রিকভাবে সেনাবাহিনীর ক্ষতি করা; নবনির্বাচিত সরকারকে অস্থিতিশীল করা; বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করা; বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা নষ্ট এবং জাতিসঙ্ঘে শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ক্ষতিগ্রস্ত করা।
আশা করি সবাই স্বীকার করবেন, বাংলাদেশের একজন দেশপ্রেমিক নাগরিকও বিডিআর বিদ্রোহের অংশীদার নয় এবং বাংলাদেশের এই ক্ষতিতে কোনো নাগরিকেরই লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাহলে এই মোটিভ কাদের স্বার্থে? নিশ্চিত করেই বলা যায়, এর পেছনে আছে বাংলাদেশের অকল্যাণকামী কোনো বহিঃশক্তি। অথচ আনিস-উজ-জামান সে রকম কোনো সংশ্লিষ্টতার সন্ধান পাননি!
পিলখানায় সেনাকর্মকর্তাদের ওপর হত্যাযজ্ঞের তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই পিলখানা ট্র্যাজেডির তদন্ত কমিটিগুলোর সমন্বয়কারী বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান বলেছিলেন, এর পেছনে জঙ্গির মদদ রয়েছে। সেনাবাহিনীর তদন্ত রিপোর্ট এবং আনিস-উজ-জামানের তদন্ত রিপোর্ট-এর কোনোটাতেই জঙ্গির সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলেনি। সেনাবাহিনীর তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ায় ক্ষুব্ধ খাদ্যমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী ও এলজিআরডি মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফ একে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেছিলেন। জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ হিসেবে মতিয়া চৌধুরী বলেছিলেন, সে তদন্ত কমিটি এত কিছু দেখতে পেল কিন্তু বিদ্রোহীদের মুখে বাঁধা জঙ্গি প্রতীক ছাই, কমলা, সবুজ রঙের এত রুমাল কোত্থেকে এলো তা দেখতে পেল না? অর্থাৎ জঙ্গি কানেকশন একেবারে নিশ্চিত। ?কিন্তু হাত-পা বাঁধা তদন্ত কমিটি?র রিপোর্টেও মতিয়া চৌধুরীর সেই হাওয়াই অভিযোগ আর ধোপে টিকল না। পিলখানা হত্যাযজ্ঞের তদন্ত তাই এখনো অবিশ্বাস আর সংশয়ের দোলাচলেই রয়ে গেল। কিন্তু প্রকৃত সত্য উদঘাটনের মধ্যেই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল। এই সত্য ভুলে না যাওয়াই ভালো।
