বাংলাদেশকে কি খন্ডিত করা হচ্ছে ? / আবু জুবায়ের

abu_zubaer's picture
Posted by
abu_zubaer
Wednesday, July 8, 2009 - 1:30pm BST

স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহার লাল নেহেরু তার Discovery of India গ্রন্থে ‘অখণ্ড ভারত’ এর রূপরেখা প্রণয়ন করেন, যা India Doctrine নামে খ্যাত। এর মূল কথা হচ্ছে- “উপমহাদেশে ভারতই হবে মূল শক্তি, চালক বা নীতিনির্ধারক। এখানে অন্য কোন দেশই স্বাধীনভাবে ইচ্ছামত নীতিনির্ধারণ করতে পারবে না। এছাড়া অন্য কোন বহিঃশক্তি উপমহাদেশের কোন রাষ্ট্রকেই ভারতের মতামত ছাড়া কোন বিষয়েই সাহায্য সহযোগিতা বা চুক্তিভূক্ত করতে পারবে না। স্থানীয় সকল দক্ষিণ এশীয় রাষ্ট্রকেই ভারতের মর্জি মাফিক চলতে হবে।

একটি বিষয় জনগন বুঝতে পারছে যে এই সরকার ভারত বান্ধব এবং তাদের কিছু নির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। কথাগুলো খুব রাজনৈতিক হলেও এটার সাথে আমাদের বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব জড়িত। কোন কালেই আওয়ামী লীগ এদেশের স্বার্থ সংরক্ষন করে নাই এবং ভবিষতেও করবে কিনা সন্দেহ আছে।তারা দেশ প্রেমিক একটা সংঠনের মর্যাদা অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছে।তাদের যদি এই দেশের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা থাকতো তাহলে ভারত প্রীতির এই যে মহা উৎসব চলছে সেটার পরিমান কিছুটা হলেও কমাতো।নির্বাচনে জনগনের ভোটে যে তারা ক্ষমতায় আসেনি সেটা এখন প্রমান হয়ে যাচ্ছে।ভারতের সমর্থনে যেহেতু ক্ষমতায় আসা সেহেতু তাদের প্রতি বাংলাদেশের জনগের থেকেও দ্বায়বদ্ধতা বেশি।

বঙ্গভঙ্গ বাংলার ইতিহাসে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এবার আসা যাক বাংলাভাগের কিছু বিষয় নিয়ে।১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবরে তৎকালীন বৃটিশ ঔপনিবেশিক সরকারের বড়লাট লর্ড কার্জনের আদেশে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করা হয়। বাংলা বিভক্ত করে ফেলার ধারনাটি অবশ্য কার্জন থেকে শুরু হয়নি। ১৭৬৫ সালের পর থেকেই বিহার ও উড়িষ্যা বাংলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে সরকারী প্রশাসনিক এলাকা হিসেবে বাংলা অতিরিক্ত বড় হয়ে যায় এবং বৃটিশ সরকারের পক্ষে এটির সুষ্ঠু শাসনক্রিয়া দুরূহ হয়ে পড়ে। বঙ্গভঙ্গের সূত্রপাত এখান থেকেই।

কিন্তু ১৯১১ সালে, প্রচণ্ড গণআন্দোলনের ফলশ্রুতিতে বঙ্গভঙ্গ রহিত হয়।

বাংলাদেশ খন্ড খন্ড করার জন্য প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বঙ্গভূমি আন্দোলন'-এর কলকাতাস্থ হেড কোয়ার্টার ভারতীয় সেনা-পুলিশ ও ব্লাক ক্যাট দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে। অথচ নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে সর্বদাই বাংলাদেশে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ট্রেনিং ক্যাম্প রয়েছে বলে ভারত তার স্বরে চিৎকার করছে। ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থাগুলি তাদেরকে যে শুধু অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে তাই নয়, নিজ ভূমিকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবহারেরও পূর্ণ সুযোগ দিয়েছে। আওয়ামী লীগের টিকেট পিরোজপুর থেকে দুই-দুইবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য চিত্তরঞ্জন সুতার ভারতে গিয়ে স্বাধীন বঙ্গভূমি আন্দোলন গড়ে তুলেছে সত্তরের দশক থেকেই। ভারত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত এসব সন্ত্রাসীদের বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়া দূরে থাক তাদেরকে নিজভূমি ব্যবহারের পূর্ণ সুযোগ দিয়েছে। ঘাঁটি নির্মান, সামরিক প্রশিক্ষণ ও বাংলাদেশের ভূমি থেকে প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে হামলা পরিচালনার সুযোগও জুটেনি।
ঢাকাস্থ বৃটিশ হাইকমিশনার বলেছেন, ‘প্রতিবেশীদের সাথে সহযোগিতা না থাকলে কোন রাষ্ট্রই নিরাপদ নয়’। এ কথার ইঙ্গিত কি ভারতের দিকে নয়? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সংকট মুকাবিলায় সরকারের ভূয়সী প্রশংসা করেছে। কে না জানে মার্কিন-ভারত ও ইসরাঈল এখন একই লবীর অন্তর্ভুক্ত। আর আমেরিকা যাদের বন্ধু হয়, তাদের আর কোন শত্রুর প্রয়োজন হয় না। তারা বাংলাদেশকে তাদের স্বার্থের বলি হিসাবে ব্যবহার করতে চায়। ভারত বাংলাদেশে পিস মিশনের নামে তাদের শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠাতে চাচ্ছে। তারা প্রতিদিন সীমান্তে আমাদের নিরীহ মানুষগুলিকে আগের মতই হত্যা করে চলেছে। আর ইতিমধ্যেই তারা সীমান্তে ভারী অস্ত্রশস্ত্র জমা করেছে, সেনাশক্তি বাড়িয়েছে এবং ব্ল্যাক ক্যাট অর্থাৎ কালো বিড়ালের মুখোশধারী ভয়ংকর কম্যান্ডো বাহিনী মোতায়েন করেছে। এতক্ষণে যদি কোন দুর্মুখ একথা বলেন যে, বিগত আওয়ামী সরকারের সময় ২০০১ সালের ১৭-১৮ এপ্রিলে কুড়িগ্রামের রৌমারি সীমান্তে এবং সিলেটের পাদুয়া সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফ-দের সংঘবদ্ধ চোরা হামলার মোকাবিলায় বিডিআরের দুঃসাহসিক অভিযানে বহু লাশ ফেলে পালিয়ে যাওয়া ভারতীয় সেনাবাহিনী বর্তমান সরকারের আমলে পিলখানা ট্রাজেডীর মাধ্যমে তার প্রতিশোধ নিল, তাহলে সেকথার জওয়াব কি দেওয়া যাবে? যে কথার ইঙ্গিত ইতিমধ্যে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বি-রমনের গত ২৭ ফেব্রুয়ারীর লেখায় পাওয়া গেছে।(প্রবন্ধের কিছু অংশ)

এদেশের সাথে কাদের স্বার্থ বেশী জড়িত? ’৪৭-এর স্বাধীনতার সময় নেহেরু বলেছিলেন, অনধিক ২০ বছরের মধ্যেই পাকিস্তান পুনরায় ভারতভুক্ত হবে। ২৪ বছরের মাথায় পাকিস্তান ভেঙ্গে দু’টুকরা হয়েছে। এখন দুর্বল দুই টুকরাকে গিলে ফেলার পালা। দুর্বলকে দুর্বলতর করার জন্য তারা বাংলাদেশের উজানে সকল নদীতে বাঁধ দিয়েছে। এ দেশকে তারা মরুভূমি বানিয়ে ফেলার প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন করেছে। চোরাচালান ও পাহাড় প্রমাণ অসম বাণিজ্যের মাধ্যমে দেশের আর্থিক মেরুদন্ড গুঁড়িয়ে দেওয়ার চক্রান্ত সফল হতে চলেছে। বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ দক্ষিণ তালপট্টি তারা দখল করে রেখেছে। নিজেরা বেরুবাড়ী নিলেও দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা আজও তারা উন্মুক্ত করেনি। সীমান্তে দৈনিক তারা গড়ে একজন করে নিরীহ বাংলাদেশীকে হত্যা করছে। তারা সীমান্তে ফেনসিডিল কারখানা তৈরী করে এদেশে সাপ্লাই দিয়ে এদেশের তরুণ সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আর অতি সাম্প্রতিক তথ্য মতে ভারত ও আমেরিকা একযোগে কাজ করছে পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে টুকরো টুকরো করে ২০২০ সালের মধ্যে ইউনাইটেড স্টেট্স অব ইন্ডিয়া (USI) গঠন করার জন্য। ইসলামী দলগুলোর মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করাও তাদের অন্যতম লক্ষ্য। তাই বাংলাদেশকে জঙ্গী রাষ্ট্র বানাবার জন্য বহিঃশক্তির মদদে এদেশে সৃষ্টি করা হয়েছে তথাকথিত জঙ্গী দলসমূহ। তাদেরই প্রত্যক্ষ মদদে সৃষ্টি হয়েছিল খুলনা-যশোর অঞ্চলে কথিত ‘স্বাধীন বঙ্গভূমি’ আন্দোলন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ‘স্বাধীন জুমল্যান্ড’ আন্দোলন। যাদের সশস্ত্র শাখা তথাকথিত ‘শান্তিবাহিনী’র হাতে প্রায় ৩০ হাযার মানুষ নিহত হয়েছে। বিচার কিছুই হয়নি। এদেরই সরাসরি প্রশিক্ষণে স্বাধীনতার পর দেশে গড়ে তোলা হয় ‘রক্ষীবাহিনী’। যাদের হাতে খুন হয় প্রায় ৪২ হাযার মানুষ। কোন বিচার হয়নি। সেনাবাহিনী সদস্যরা অধিকাংশ ধর্মভীরু ও দেশপ্রেমিক বিধায় এদেরকে তারা কখনেই পসন্দ করেনি। গত ১লা ফেব্রুয়ারী কলিকাতার সুভাষ ইনস্টিটিউটে এদের বশংবদ বাংলাদেশের কথিত হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের একটি অঙ্গ সংস্থার ৪র্থ বার্ষিক সম্মেলনে বাংলাদেশ থেকে ইসলাম ও সেনাবাহিনীকে উৎখাতের জন্য ভারত সহ আন্তর্জাতিক শক্তি সমূহের সাহায্য চাওয়া হয়।
দেশব্যাপী চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী ড্যানিডা কর্মকর্তা সুমন পাহাড়ী পিপলস আর্মি পিপিএ কর্তৃক অপহরণের ১৩ দিন পর উদ্ধার শেষে শনিবার চট্টগ্রাম সেনানিবাসে আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিকদের মুখোমুখী হয়ে অপহরণের চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। সুমন সাংবাদিকদের বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সাথে নতুনভাবে যোগ হয়েছে পাহাড়ী পিপলস আর্মি (পিপিএ) নামের সংগঠন। তারা পাহাড়ী এলাকায় খুন, অস্ত্র ব্যবসা, অপহরণসহ নানা তৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে। তাদের হাতে প্রায় দুই শতাধিক মারণাস্ত্র রয়েছে। তারা বলে আমাদের যুদ্ধ করতে হবে। আর যুদ্ধ করতে অনেক ভারী অস্ত্র লাগবে। অস্ত্র কেনার জন্য ধনী ব্যক্তিদের অপহরণ করে টাকা আদায় করতে হবে। নতুন আত্মপ্রকাশ করা পিপিএ সংগঠনটি চাকমাদের বিরুদ্ধে কাজ করছে। তাদের অধিকাংশই বাংলা বলতে পারে না। তাদের রয়েছে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ফোন করার ব্যবস্খা।

বছর খানিক আগে সুমন অপহরন ঘটনা সবার দৃষ্টিতে আসে।অপহরণের পর সেনাবাহিনী ও বিডিআর-এর চিরুনি অভিযান ও ব্লক রেইড-এর কারণে অপহরণকারীরা গহীন পাহাড়ি জঙ্গলে সুমনকে ফেলে পালিয়ে যায়। পরে মারাত্মক আহতাবস্থায় সেনা সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম নিয়ে আসে।

সাংবাদিক সম্মেলনে সুমন অপহরণের দিনগুলোর দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, অপহরণকারী উপজাতি সশস্ত্র যুবক নিজেদেরকে পাহাড়ি পিপলস আর্মি (পিপিএ)-এর সদস্য পরিচয় দিয়ে বলেছে, তারা কোনো রাজনৈতিক দলের মদদপুষ্ট নয় তবে পার্বত্য চট্রগ্রামে যুদ্ধ করতে অস্ত্র কিনতে বিপুল টাকার প্রয়োজন। তাই টাকার জন্য এই অপহরণ করা হয়েছে। অপহরণকারীরা তার মুক্তির বিনিময়ে প্রথমে এক কোটি টাকা দাবি করলেও পরে ৩০/৪০ হাজার টাকায় নেমে আসে। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে সুমন বলেন, এক সময় আমি নিজেই পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা অবস্থানের বিরোধিতা করেছিলাম। কিন্তু আমার বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে সে ধারণা পাল্টে গেছে। তিনি বলেন, পার্বত্য অঞ্চল অবশ্যই সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রয়োজন।

সন্ত্রাসীদের পরিচয় সম্পর্কে তিনি জানান, তাদের বেশীর ভাগই ছিল মারমা সম্প্রদায়ের । তবে তাদের নেতারা ভারতের ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর।

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর থেকেই ভারতের প্রত্যক্ষ মদদে বাংলাদেশ বিরোধী অসংখ্য সংগঠন গড়ে উঠেছে। সম্প্রতি গারোল্যান্ড প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্রের খবরও পত্রিকায় এসেছে। এসময় পিপিএর সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আরেকটি ষড়যন্ত্রের ফসল বলেই অভিজ্ঞমহল মনে করছেন। এ সময় দেশ প্রেমিক জনগণ এবং সেনাবাহিনীকে আরো সতর্ক হতে হবে।
পাকিস্তান সরকারের দুর্ব্যবহার স্মরণ করেই হয়ত সংখ্যাগরিষ্ঠ পাহাড়ী জনগণ সমর্থন জানিয়েছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে- অংশ নিয়েছে সন্মুখ সমরে। দুঃখজনক হল স্বাধীন বাংলাদেশেই সরকারের বিরুদ্ধে প্রথমবারের মত অস্ত্র তুলে নেয় বিদ্রোহীরা। ১৯৭২ সালে ১৯০০ সালের ‘CHT Manual’ ফিরিয়ে আনা, স্বায়ত্ত্বশাসন বিষয়ক দাবী দাওয়া, বাঙালীদের বসতি স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা জারির অনুরোধ নিয়ে স্বাধীন দেশে নতুন সরকারের শরণাপন্ন হয় পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর নেতৃবৃন্দ। সে আলোচনার ব্যর্থতার প্রমাণ স্বরূপই যেন এক মাসের ব্যবধানে গঠিত হল বিতর্কিত pcjss - এবং এর সামরিক শাখা শান্তি বাহিনী। একে বলা যায় ইতিহাসের পরিহাস। বাঙালি জাতিকে নিজ দেশে বসবাসের সৌভাগ্য এনে দিয়ে ‘জাতির জনক’ উপাধি পেলেন যে নেতা, তারই অদূরদর্শিতায় ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার অধিকার আদায়ে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল নতুন দেশে। রাষ্ট্রপ্রধানদের হত্যাযজ্ঞ, সামরিক বুটের দাপট ও পাহাড়ে বাঙালিদের আধিপত্য বিস্তার - বাংলাদেশের পরবর্তী প্রায় বিশটি বছর সাধারণ মানুষ যেন আরো দূরে সরে গেল বাস্তবতা থেকে।(`Bangladesh in the 21st Century’ - ২০০৮ সালে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট আয়োজিত সম্মেলনে পঠিত গবেষণার সংক্ষিপ্ত রুপ)
বাংলাদেশের সাথে ভারতের ছিট মহল সমস্যা সামগ্রিক আগ্রাসনের আরেকটি অধ্যায়।বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ছিটমহল নিয়ে দু’দেশের মধ্যে বেশ টানাপড়েন চলে। এ সমস্যার সমাধানকল্পে ১৯৯৬ সালের ১-১২ অক্টোবর কলকাতায় বিডিআর ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়। একই বছর মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শন করে ছিটমহলের তালিকা তৈরি করা হয়। ওই তালিকা অনুযায়ী বাংলাদেশ ও ভারতের মোট ছিটমহলের আয়তন দাঁড়ায় ২৪ হাজার ২৬৮ দশমিক ০৭ একর। ভারতের মধ্যে বাংলাদেশের ছিটমহলের সংখ্যা ৫১টি। অপরদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ছিটমহল হচ্ছে ১১১টি। বেসরকারি তথ্য মতে, এসব ছিটমহলের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার। বাংলাদেশের চতুর্থ আদমশুমারি ২০০১ সালের প্রতিবেদনে ছিটমহলের জনসংখ্যার কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি।
ছিটমহল সমস্যা সমাধানের সর্বপ্রথম উদ্যোগ নেয়া হয় ১৯৪৭ সালে। যা দু’দেশ অর্থাৎ ভারত ও পাকিস্তানের অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে সম্ভব হয়নি। পরে উদ্যোগ নেয়া হয় ১৯৫৮ সালে, যা পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নূন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু একটি চুক্তির মাধ্যমে চেষ্টা করেন। তবে সমস্যার সমাধান করা যায়নি। ফিরোজ খান নূন ও জওহরলাল নেহরু বেরুবাড়ি ছিটমহল হস্তান্তরের একটি যৌথ ঘোষণায় সই করেন, যা ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের একটি আদেশের কারণে বাস্তবায়িত হয়নি।
দেশ স্বাধীনের পর ছিটমহল সমস্যা সমাধানকল্পে শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে ১৯৭৪ সালে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা মূলত ইন্দিরা মুক্তির চুক্তি নামেই পরিচিত। চুক্তিতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশে ভারতীয় ছিটমহল এবং ভারতে বাংলাদেশের ছিটমহলগুলো অতি সত্বর বিনিময় করতে হবে।’ চুক্তিতে আরো বলা হয়, ‘ভারত দক্ষিণ বেরুবাড়ী ইউনিয়ন নং-১২ এর দক্ষিণ দিকের অর্ধাংশ ও পার্শ্ববর্তী ছিটমহলগুলোর অধিকারী হবে, যে এলাকার পরিমাণ ২.৬৪ বর্গমাইল। বিনিময়ে বাংলাদেশ দহগ্রাম ও আঙ্গরপোতা ছিটমলের অধিকারী হবে। বাংলাদেশের পানবাড়ী মৌজার সঙ্গে দহগ্রামকে সংযুক্ত করার জন্য ভারত বাংলাদেশকে ‘তিন বিঘা’ নামে (১৭৮×৮৫) মি. এলাকা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দেবে।’ চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ বেরুবাড়ী দিয়ে দিলেও ভারত আজও তিন বিঘা করিডোর হস্তান্তর করেনি। কথা ছিল উভয় দেশীয় পার্লামেন্ট চুক্তিটি পার্লামেন্টে অনুমোদন করে নেবে। বাংলাদেশ অনুমোদন করলেও ভারত তা করেনি। ১৯৯০ সালে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট তিন বিঘা বাংলাদেশকে ব্যবহারের অনুমতি দেয়, যার ফলে ১৯৯২ সালের ২৫ মার্চ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও আবার একটি চুক্তি করেন। এ চুক্তির মাধ্যমে দহগ্রাম আঙ্গরপোতা ছিটমহল সমস্যার একটি সাময়িক সমাধান হয়। ১৯৯২ সালের ২৬ জুন থেকে তিন বিঘা করিডোর ২৪ ঘণ্টায় ৬ ঘণ্টা খোলা রাখা হয়। পরে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে জিইয়ে থাকা ছিটমহল সমস্যায় উদ্যোগী হয়। এ উদ্যোগের ফলে উভয় দেশ বৈঠকে বসলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ফলে বাংলাদেশী কর্তৃপক্ষ এটাকে ভারতীয় হঠকারিতা এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এটাকে আইনি জটিলতা বলে ব্যক্ত করেন।
সার্বক্ষণিকভাবে উত্তেজনা সৃষ্টি করে রেখেছে। বিনা উস্কানীতে বিএসএফ গুলি করে অসংখ্য বিডিআর ও বাংলাদেশীকে নিহত ও আহত করেছে। ভারতীয় পুলিশ বাহিনীও নিরীহ বাংলাদেশী সীমান্ত জনপদবাসীর জীবনকে অতিষ্ট করে তুলেছে। ভারতীয় পুলিশের সদস্যদের দ্বারা প্রায়ই বাংলাদেশীদের বাড়ি ঘরে চুরি-ডাকাতি নারী ধর্ষণ ও নানা ধরণের অপকর্ম সংঘঠিত হয়। ২০০৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত বিএসএফ ও অরাষ্ট্রীয় গ্রুপগুলোর হাতে ৭০১ জন বাংলাদেশী প্রাণ দিয়েছে। এর মধ্যে বিএসএফ হত্যা করেছে ৬৫৩ জন, ধর্ষিত হয়েছে ১৩ জন নারী। এ সময়ের মধ্যে বিএসএফের হামলায় আহত হয়েছে ৭২৭ জন, গ্রেফতার হয়েছে ২৬২ জন এবং ৮ জন শিশুসহ ৮৯ জনকে অপহরণ করেছে। এছাড়া লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে ৬৪টি। বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় আগ্রাসনের সর্বশেষ ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটে গত ১৮ জুলাই ২০০৮ তারিখে। এ সময় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বি-পাক্ষিক বিষয় নিয়ে দিল্লীতে বৈঠক চলছিল। বৈঠক চলাকালেই বিএসএফ চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার রঘুনাথপুর সীমান্তে অতর্কিত হামলা চালিয়ে ২ জন বিডিআর সদস্যকে হত্যা করে। এ ছাড়া পরদিন (১৯ জুলাই) যশোর জেলার চৌগাছা সীমান্তে হামলা চালিয়ে আরও দু’জন বাংলাদেশী কৃষককে হত্যা করে। এভাবে ভারত সীমান্ত সংঘর্ষকে নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত করেছে।
আধিপত্যবাদী ভারত বাংলাদেশের উপর আগ্রাসন চালিয়ে ১৯৭৪ সালে বেরুবাড়ি দখলের পর থেকে এ যাবত ৩৬ হাজার একরেরও বেশি জমি দখল করে নিয়েছে। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী যেসব এলাকার জমি ভারত দখল করে নিয়েছে তা হলো খাগড়াছড়ি জেলার আচালং সীমান্তের ১৭০০ একর জমি, পঞ্চগড় জেলার তেতুলিয়া গোয়ালগছ, বোদা, দেবীগঞ্জ ও সদরের ২১২৭ একর জমি, তিস্তা সীমান্তবর্তী এলাকার ২০০০ একর জমি, নীলফামারী জেলার ডিমলা-ছাতনী সীমান্তের কয়েক হাজার একর জমি, যশোর জেলার শার্সা (ইছামতি কোদালা) এলাকার ৫৭০ একর জমি, সুনামগঞ্জ জেলার মাটিরাবন সাতছড়ি এলাকার ৩২৯৫ একর জমি, সিলেট জেলার গোয়াইনহাট এলাকার ৩৬৭ একর জমি, চাঁপাইনাব্‌গঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ-ভোলাহাট সীমান্তের ৬৫০০ একর জমি, কুড়িগ্রাম জেলার মশালডাঙ্গা সীমান্তের ৩০০ একর জমি, ফেনী জেলার মহুরীর চর এলাকার ২৪ একর জমি, সাতক্ষীরা জেলার দক্ষিণ তালপট্টির ১০,০০০ একর জমি, এছাড়া ঠাকুরগাঁও,দিনাজপুর, পঞ্চগড়, নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলার প্রায় ১০,০০০ একর জমি। অদ্যাবধি ভারতের ভূমিগ্রাসী লোলুপতা একটুও কমেনি, বরং পুরো দেশটাকেই তাদের ভূমিতে পরিণত করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।(এই উপাত্তগুলো নানা গবেষনা প্রবন্ধ থেকে নেয়া)।
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা দখল করার পর থেকে তাদের কর্মকান্ডের মাধ্যমে প্রমান করেছে যে তারা ২০২১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে চায় অখন্ড ভারত ফর্মূলাকে বাস্তবায়ন করার জন্য।আওয়ামী লীগের কর্মকান্ড রাজাকারের আচরনও ছাড়িয়ে গেছে।আমাদের মনে রাখতে হবে শুধুমাত্র পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমরা জয়ী দেশ নই আমরা সকল আগ্রাসনের বিপক্ষে স্বাধীন হওয়া একটি দেশ।এই দেশকে খন্ড বিখন্ড করার চক্রান্ত চলছে।ভারতের ভয় বৃহৎ বাংলাদেশ গড়ে উঠতে পারে এমন কিছু হওয়ার থেকে বাংলাদেশকেই বিশ্বের মানচিত্র থেকে উঠিয়ে দিলেইতো হয়।আওয়ামী লিগ ৫ম সংশোধনী বাতিল কেনো করতে চায় সেটা এখন বুঝা যাচ্ছে।ভারতের সংবিধানের সাথে মিল রেখে এখন তাদের চলতে হবে। ১৯৭৭, ১ এপ্রিল ১৯৭৭ এই সংশোধনের ভারতের সংবিধানের বৃহত্তম সংশোধন হয়। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর আমলে কৃত এই সংশোধনের বাহুল্যের কারণে এটিকে ক্ষুদ্র সংবিধান বা মিনি-কনস্টিটিউশন আখ্যা দেওয়া হয় :
এই সংশোধনে প্রস্তাবনায় ‘সমাজতান্ত্রিক’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দদুটি যোগ করে ভারতকে একটি ‘সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’ রূপে ঘোষণা করা হয়। তাছাড়া প্রস্তাবনায় ‘ঐক্য’-এর পরে ‘সংহতি’ শব্দটিও যুক্ত হয়।
আমার ধারনা ,পাঠক,বুঝতে পারছেন আসল ব্যাপারটি কি ঘটছে।