পিলখানা সেনা হত্যার তদন্ত রিপোর্ট পূর্ণাঙ্গ হলো না এবং সব কথা জানাও গেল না

SalimC's picture
Posted by
SalimC
Friday, May 29, 2009 - 7:29pm BST

বিডিআর বিদ্রোহ ও সেনাহত্যার বহুল প্রত্যাশিত একটি একপেশে ও অসম্পূর্ণ রিপোর্ট সরকারি তদন্ত কমিটি প্রায় তিন মাসের মাথায় গত বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে পেশ করেছে। প্রকাশিত তদন্ত রিপোর্টেই স্বীকার করা হয়েছে যে, তারা বিডিআর বিদ্রোহের প্রকৃত কারণ উদঘাটন করতে পারেনি এবং বলেছে, আরও উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত প্রয়োজন। বিডিআর বিদ্রোহ ও সেনা হত্যার তদন্ত রিপোর্টকে ঘিরে জনমনে যে প্রত্যাশা জেগেছিল, তা অসম্পূর্ণই রয়ে গেছে। পর্যবেক্ষকমহল এই তদন্ত রিপোর্টকে প্রকৃত ঘটনা ও পরিস্থিতির প্রতিফলনহীন বাস্তবতাবর্জিত ও একপেশে রিপোর্ট বলে মন্তব্য করেছেন। বিডিআর বিদ্রোহ দমন ও কার্যকর স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের প্রশ্ন থেকে শুরু করে বিদ্রোহ-উত্তর প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকারের ইতোপূর্বেকার ভূমিকা নিয়ে জনমনে অসংখ্য প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

প্রকাশিত তদন্ত রিপোর্ট নিয়ে তাই আবারও সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। উল্লেখ্য, তদন্ত কমিটিকে রিপোর্ট জমা দেবার জন্য ৭ দিন সময় বেঁধে দেয়া হলেও কমিটি কয়েক দফায় সময় বাড়িয়ে প্রায় তিন মাসের মাথায় একটি অসম্পূর্ণ রিপোর্ট পেশ করে কমিটির অক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নিয়েছে। সরকারের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণভুক্ত আমলাতান্ত্রিক একটি তদন্ত কমিটির কাছে বিডিআর বিদ্রোহ ও সেনা হত্যার মতো একটি গুরুতর বিষয় তদন্তের দায়িত্ব ন্যস্ত করে সরকার বিষয়টির তদন্ত ও বিচারকে সমাধিস্থ করতে চেয়েছেন বলেও অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন। উল্লেখ্য, বিডিআর বিদ্রোহ ও সেনা হত্যার তদন্তে প্রথমে যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল, তার প্রধান ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এডভোকেট সাহারা খাতুন। কিন্তু বিডিআর বিদ্রোহ দমন ও আপোষ নিত্তিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরকারের পক্ষে ব্যাপক ভূমিকা পালন করায় বিতর্কের মুখে তাকে ও আইন প্রতিমন্ত্রীকে বাদ দিয়েই তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। যার নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক সিভিল আমলা আনিস-উজ-জামান খান। তবে স্বরাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রী তদন্ত কমিটি থেকে বাদ পড়লেও সরকারি তদন্ত কমিটি ছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের অধীন ও সরকারের রাজনৈতিক ইচ্ছার অনুবর্তী। তাছাড়া তদন্ত কমিটির জন্য টার্মস এন্ড রেফারেন্সও তৈরি করা হয়েছে সরকারকে সুবিধাজনক অবস্থায় রেখে। এতে ঘটনার পটভূমি, কারণ উদঘাটন ও প্রাসঙ্গিক বিষয়ে সুপারিশ করার দায়িত্ব তদন্ত কমিটির ওপর ন্যস্ত করা হয়। তবে তদন্ত কমিটি টার্মস এন্ড রেফারেন্সের দ্বিতীয় শর্তটি পূরণ করতেই ব্যর্থ হয়েছেন। অর্থাৎ বিডিআর বিদ্রোহের প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ কারণ তিন মাস সময় নিয়েও তদন্ত কমিটি উদঘাটন করতে পারেনি। এটা কমিটির ব্যর্থতা নাকি রাজনৈতিক সরকারের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা, সে প্রশ্নও উঠেছে। এমনকি প্রথম টার্মস এন্ড রেফারেন্স ঘটনার পটভূমি বিশ্লেষণেও তদন্ত কমিটি বিশ্বাসযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেনি। অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়ে কিছু গঠনমূলক সুপারিশ থাকলেও বিডিআর-এর নাম, পোশাক ও লোগো পরিবর্তন প্রসঙ্গে কমিটির রিপোর্টে কোন ব্যাখ্যা নেই। বিডিআর বিদ্রোহ ও সেনা হত্যার তদন্ত না হতেই ভারতের মতো ‘বন্ধুদেশের' পরামর্শে সরকার বিডিআর পুনর্গঠনের কার্যক্রম অনেক দূর এগিয়ে এনেছেন। এতে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, বিডিআর ঘটনাটি বিডিআর পুনর্গঠনের পটভূমি তৈরির জন্যই ঘটানো হয়েছে।

সরকার ঘটনার বিশ্বাসযোগ্য ও ন্যায়ানুগ তদন্ত এড়াতেই প্রথমে স্বরাষ্ট্র ও আইন প্রতিমন্ত্রীকে রেখে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। প্রতিবাদ সমালোচনার মুখে তা বাতিল করে অনুগত আমলাদের দিয়ে দ্বিতীয় কমিটি গঠন করে। এই কমিটিতে সেনা প্রধান, পুলিশের আইজি, কিংবা অবসরপ্রাপ্ত লব্ধপ্রতিষ্ঠ সামরিক ব্যক্তিত্বদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনও সরকার মনে করেনি। ফলে তদন্ত কমিটি সরকারের গাইড লাইন ও ফরমায়েশের বাইরে যেতে পারেনি। জনগণের প্রত্যাশা ছিল, এতবড়ো ঘটনার ওপর একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠিত হবে। কিন্তু বিদ্রোহ-দমনে সামরিক অভিযান রহিত করে রাজনৈতিক নিত্তি করে সরকার সেনাবাহিনী, দেশের প্রতিরক্ষা শক্তি ও গোটা জাতির যে ক্ষতি করেছে, তার পেছনে যেমন নতজানু রাজনীতির দায় রয়েছে, তেমনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের স্বরূপ উন্মোচনও অসম্ভব হয়ে পড়ে।

সেনা আইন অনুযায়ী প্রতিরক্ষা বাহিনী ও তার কোন শাখার বিদ্রোহ সম্পর্কে কেউ অবহিত হয়ে, তা গোপন করলে বা সমাধানে বাধা দিলে তার বিরুদ্ধেও বিদ্রোহের চার্জ আনা যায়। আলোচ্য ক্ষেত্রে সরকার ও সরকারের দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা বিডিআর বিদ্রোহের বেশ আগে থেকে ঘটনার অনেক কিছুই জানতেন। বিডিআর বিদ্রোহের সংগঠকদের সাথে এসব নেতাদের একাধিক বৈঠক হয়েছে। এ নিয়ে পত্র-পত্রিকায় রিপোর্টও হয়েছে। এ সব কথা বাদ দিলে বিদ্রোহের প্রথম দিনের প্রথম প্রহর সকাল সাড়ে ৯টার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর অফিস, সেনাবাহিনীর সদর দফতর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পিলখানার লোমহর্ষক ঘটনা জানতে পারে। ভারতের ‘আকাশবানী' ঘটনার দিন দুপুর ১২.০০টার আগেই বিডিআর ডিজি মেজর জেনারেল শাকিলের মৃত্যু খবর প্রচার করে। ফলে বিদ্রোহ ও বিদ্রোহের সম্ভাব্য খারাপ পরিণতি সম্পর্কে সরকার কোন প্রতিকারমূলক ব্যবস্থাই নেয়নি। জেনে-শুনে এতবড়ো একটা বিদ্রোহের ব্যাপারে সরকারের ভূমিকা শুধু হতাশাজনকই নয়, সন্দেহজনকও।

আনিস-উজ-জামান খানের তদন্ত রিপোর্ট আপাতত সরকারের চামড়া বাঁচিয়েছে। সরকার এতে সন্তুষ্ট হলেও এ নিয়ে কী প্রতিক্রিয়া হবে, তা ধীরে-সুস্থে মূল্যায়ন করা দরকার। বিশেষ করে অসম্পূর্ণ ও একপেশে রিপোর্টেরও পুরোটা সরকার প্রকাশ করেনি। প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ করলেও কমিটি সরকারের বিডিআর পুনর্গঠনের বিষয়ে কিছু বলেনি। এছাড়া তদন্ত কমিটিসমূহের সমন্বয়ক লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান বিডিআর বিদ্রোহের সাথে জঙ্গি কানেকশনের যে ধূয়া তুলেছিলেন, তদন্ত কমিটি তার কোন প্রমাণ পায়নি। এই পটভূমিতেই তদন্ত কমিটির চেয়ারম্যান বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খানের মন্তব্যকে তার ব্যক্তিগত মত বলে মন্তব্য করেছে। এদিকে বিরোধী দলীয় নেত্রী ও বিএনপি'র চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াও বলেছেন, এ তদন্ত রিপোর্ট সরকারের মন মতো আংশিক রিপোর্ট।একদিকে তদন্ত রিপোর্ট বিদ্রোহের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে যেমন ব্যর্থ হয়েছে, তেমনি নেপথ্য কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন করতেও পারেনি। তবে তদন্ত কমিটি বিদ্রোহে প্রতিবেশী দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততা ও যোগসাজশ নিয়ে কিছু বলেনি।
প্রকাশিত একপেশে ও অসম্পূর্ণ রিপোর্ট হুবহু প্রকাশে সরকারের ভীতি জনমনে বিস্ময় ও সন্দেহ বাড়িয়ে দিয়েছে। তদন্ত রিপোর্টের ‘প্রয়োজনীয় অংশ' নিরূপণের মানদন্ড কী? এটা নির্ধারণ করতে গিয়ে সরকার তার চামড়া বাঁচানোর কূটকৌশল গ্রহণ করে বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এদিকে সরকারি তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশের আগে সেনাবাহিনীর তদন্ত কমিটি তাদের রিপোর্ট তৈরি ও সেনাপ্রধানের কাছে তা পেশ করলে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে বেশ কিছু মিডিয়ায় কিছু সেনসেটিভ রিপোর্ট প্রকাশ হলে সরকারের পক্ষ থেকে প্রবল আপত্তি আসে। সরকারের দায়িত্বশীল মহল থেকে সেনা তদন্ত কমিটির সূত্র উল্লেখ করে প্রকাশিত মিডিয়া রিপোর্ট ও কথিত তদন্তকে সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেন। এরপরই সেনা প্রধান বলেন যে, সেনা তদন্ত রিপোর্ট একান্তভাবেই তাদের নিজস্ব। এটি সরকারের কাছে জমা দেয়া বা প্রকাশ করা হবে কিনা, তার কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। অর্থাৎ একটি গণতান্ত্রিক দেশে প্রকাশ্যে বিডিআর বিদ্রোহ ও সেনা হত্যার নারকীয় ঘটনা ঘটলেও সেনাবাহিনীর তদন্ত রিপোর্ট জনগণকে জানানো হবে না কেন? এ প্রশ্নের জবাব কেউ দিচ্ছে না।

প্রকাশিত রিপোর্টে কিছু সংখ্যক বিদ্রোহ সংগঠক ও অংশগ্রহণকারীকে সনাক্ত করে কিছু সুপারিশ করা হলেও অনেক প্রশ্নেরই জবাব পাওয়া যায়নি। রিপোর্টেই স্বীকার করা হয়েছে যে, বিদ্রোহের প্রকৃত কারণ ও উদ্দেশ্য নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করা যায়নি। তবে প্রাথমিক কারণ হিসেবে সেনা সদস্যদের বিরুদ্ধে ইতিবাচক মনোভাব বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকৃত কারণ উদঘাটিত হলে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করতে হয়। এ জন্যই কী তাহলে প্রকৃত কারণ অনুদ্ঘাটিত রাখা হয়েছে। তবে বিদ্রোহের ‘মোটিভ' সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, সেনা চেইন অব কমান্ড ধ্বংস ও বিডিআরকে অকার্যকর করা। বিডিআরকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ধ্বংস করার বদলে বিডিআর পুনর্গঠনের দায়িত্ব ভারতের হাতে তুলে দিয়ে বিডিআর-এর দীর্ঘদিনের সামরিক সংস্কৃতি বদল করেও ধ্বংস করা যায়। সরকারের নীতি নির্ধারকরা বিডিআর বিদ্রোহ ও সেনা হত্যার ঘটনাকে তাদের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পক্ষে ব্যবহার করতে শুরু করেছেন। তদন্ত রিপোর্টে বিডিআর বিদ্রোহের বেনিফিসিয়ারী কারা, তাও নির্ণয় করা হয়নি। তবে এতে বলা হয়েছে যে, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিশ্বাস করে না, যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, যারা বাংলাদেশকে একটি স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক ও উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে দেখতে চায় না, যারা বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সশস্ত্র বাহিনীকে শক্তিশালী দেখতে চায় না, তারাই আলোচ্য বিদ্রোহের মাধ্যমে বিডিআর ও সেনাবাহিনীকে সাংঘর্ষিক অবস্থানে দাঁড় করিয়ে তাদের হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার প্রয়াস পেয়েছে।

তদন্ত কমিটির এই ফাইন্ডিংস বিদ্রোহের রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য উন্মোচিত করেছে। তবে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের যে ভূয়সী প্রশংসা তদন্ত কমিটির রিপোর্টে করা হয়েছে, সেটা যেমন অনাকাঙ্ক্ষিত, তেমনি রাজনৈতিক ভাবাবেগ প্রসূত। তদন্ত কমিটির জানা আছে যে, সরকারের এই ভূমিকাটি বিতর্কিত এবং দেশে এ নিয়ে ভিন্নমত আছে। কতিপয় বিপথগামী বিদ্রোহীর অপতৎপরতা গোটা বিডিআর ও সেনাবাহিনীর মাঝে মুখোমুখি সাংঘর্ষিক অবস্থা তৈরির সুযোগ নিতে পারতো না যদি সরকার ঘটনা জানার সাথে সাথে সামরিক এ্যাকশন নিতে পারতো। সরকার প্রধান বার বার বলেছেন যে, সরকার উৎখাত ও দেশে ‘গৃহযুদ্ধ' সৃষ্টি করাই এই বিদ্রোহ সংগঠনের পেছনে কাজ করছে। তবে তদন্ত রিপোর্টে যেমন জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তেমনি গৃহযুদ্ধের অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া যায়নি। অসম্পূর্ণ, একপেশে রিপোর্টের যে অংশটুকু প্রকাশিত হয়েছে, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করলেও সরকারের ব্যর্থতার অনেক প্রমাণ পাওয়া যাবে।

যেমন বিডিআর বিদ্রোহ ও সেনাহত্যার ঘটনা প্রধানমন্ত্রী, সেনাপ্রধান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ন'টায় অবহিত হয়। ৪/৫ ঘণ্টা সময় সিদ্ধান্তহীন অবস্থায় থেকে সরকার বিদ্রোহীদের সাথে দু'ঘণ্টা আপোস আলোচনা চালায়। সাড়ে তিনটা থেকে সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর সাথে বিডিআর বিদ্রোহের সংগঠকরা আলোচনা করেন। তারা সাধারণ ক্ষমা নিয়ে আসেন নিঃশর্তভাবে। প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের কেউই বিডিআর সদর দফতরে সেনা অফিসার ও তাদের পরিবার পরিজনের নিরাপত্তা সম্পর্কে সরেজমিনে নিশ্চিত হবার প্রয়োজন মনে না করে নিঃশর্ত সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন করা হয় খুনী ও বিদ্রোহীদের। এ ধরনের সিদ্ধান্ত কোন আইনানুগ সরকার কোন বিবেচনায়ই নিতে পারেন না। আরও রক্তক্ষয় এড়াতে আপোস আলোচনার প্রয়োজন স্বীকার রকলেও বিদ্রোহী খুনীদের ব্লাংক চেক দেয়া যায় না। তদন্ত রিপোর্টে বিডিআর সদর দফতরের আশপাশ থেকে সেনা বাহিনীর ট্রুপস সরিয়ে নেয়াকে সমর্থন করা হয়েছে। আবার তদন্ত রিপোর্টে এও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘‘... দফায় দফায় বৈঠক হয়, তার সাথে পরিবর্তন ঘটে বিদ্রোহীদের প্রতিনিধিদলের এবং তাদের দাবি-দাওয়ার। তারা বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনা প্রলম্বিত করে যাতে রাতের অন্ধকারে লাশ স্থানান্তর ও গুম করা, গণকবর খনন, পিলখানা থেকে পালিয়ে যাওয়া, লুটতরাজ ইত্যাদি অপকর্ম চালাতে পারে।’’ আলোচনার দ্বিতীয় পর্বের ধারাবাহিকতায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাত ১টার দিকে আইন প্রতিমন্ত্রী ও আইজিপি পিলখানায় প্রবেশ করেন। তদন্ত কমিটি বলেছে, ‘‘সেখানে আরেক দফা আলোচনার পর রাত তিনটায় বিদ্রোহীরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে কিছু অস্ত্র সমর্পণ করলেও তার প্রস্থানের সাথে সাথে আবার তারা অস্ত্র হাতে তুলে নেয়।’’

প্রথম প্রশ্ন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিদ্রোহীদের সাথে বিডিআর সদর দফতরের বাইরে হোটেলে কেন আলোচনার ভ্যানু সরিয়ে নিতে সম্মত হলেন? দ্বিতীয়ত প্রধানমন্ত্রীর সাথে বিদ্রোহী নেতাদের সমঝোতার পর সাধারণ ক্ষমা আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত হয়ে যাবার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের সাথে কেন রাতভর ম্যারাথন আলোচনা চালালেন? বিশেষ করে, প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনা ও সমঝোতার শর্ত যখন পিলখানায় ফিরে এসে বিদ্রোহীরা লংঘন করলো, তখন দ্বিতীয় দফা তাদের সাথে আলোচনা চালানোর যৌক্তিকতা নিয়ে তদন্ত কমিটির বিজ্ঞ সদস্যরা কোন প্রশ্ন তুলেননি।

তৃতীয়ত আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণের অবকাশ দিয়ে বিদ্রোহীদের আরও নৃশংসতা চালানো ও অস্ত্র নিয়ে পালানোর সুযোগ করে দেয়া হয়। চতুর্থত বিডিআর সদর দফতরের আলো নিভিয়ে ফেলা, সরকার দলীয় কতিপয় সংসদ সদস্যের উদ্যোগে তিন কিলোমিটার এলাকা খালি করে জনগণকে সরে যাবার আহবান জানানোর বিষয়টিও তদন্ত কমিটিতে স্থান পায়নি। এই সুযোগেই বিদ্রোহীরা অন্ধকারে সাধারণ মানুষের সাথে মিশে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পালানোর ক্ষেত্রে সরকারের কৌশলগত ভুল নিয়ে তদন্ত কমিটি কোন কথা বলেননি। এমনকি নারী নির্যাতন নিয়েও তদন্ত কমিটি নীরব। চাঞ্চমত বিদ্রোহের আগে বিদ্রোহকালে বিদ্রোহের সংগঠকরা সরকার দলীয় যেসব নেতাদের সাথে তাদের দাবি-দাওয়া অসন্তোষ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছে, তাদের পরিচয়, ভূমিকা ও দায়বদ্ধতা উহ্য রেখে তদন্ত কমিটি পলাতক বিডিআর জওয়ানদের ট্রলারযোগে পালাতে সাহায্য করার দায়ে দুজন বিএনপি নেতাকে মোটা দাগে সনাক্তকরণে বেশ উৎসাহ দেখিয়েছে। কিন্তু বিডিআর সদর দফতর থেকে যারা জওয়ানদের পালানোর নিরাপদ সুযোগ করে দিল, তদন্ত কমিটি তাদের হদীস করেনি। ষষ্ঠত বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা প্রকাশ হবার পর পুলিশ কিংবা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বিডিআর সদর দফতর ও তার চারদিকে নজরদারি করার ক্ষেত্রে সরকার ও প্রশাসকের কোন ভূমিকা না থাকায় বিষয়টিও তদন্ত কমিটি গুরুত্ব দেয়নি। যদিও মিডিয়ার বাড়াবাড়িকে দায়ী করেছে। কিন্তু মিডিয়াকে সঠিক ব্রিফ দিয়ে আপটুডেট রাখার যে দায়িত্ব সরকারের ছিল, তা পালিত হয়েছে কিনা, তদন্ত কমিটি তা নিয়েও নীরব। সপ্তমত ২৬ ফেব্রুয়ারি বিডিআর সদর দফতরের নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি কেন বাতিল করা হয়েছে, এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীকে কোন সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করা হয়েছিল কিনা, তদন্ত কমিটি তাও উল্লেখ করেনি। অষ্টমত বিডিআর সদর দফতরের পূর্বাপর ঘটনা নিয়ে সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা আদৌ সরকারকে কোন তথ্য দিয়েছিল কিনা, সরকার তার ওপর কী ব্যবস্থা নিয়েছেন, তদন্ত রিপোর্ট এ ধরনের গুরুতর প্রশ্নও এড়িয়ে গেছে। বিশেষত এ ঘটনায় গোয়েন্দা ব্যর্থতা বা গোয়েন্দা সংস্থার কোন দায়বদ্ধতার কথা তদন্ত কমিটি উল্লেখ করেনি। যদিও তদন্ত কমিটি সুপারিশ অংশে তদন্ত সংস্থা পুনর্গঠন ও তাদের কর্মকান্ডের গাইড লাইন দিয়েছেন। কতিপয় বিডিআর জওয়ানের ‘সেনা কর্তৃত্ব মেনে না নেয়ার মানসিকতা'কে দেশী-বিদেশী চক্রের কোন অপরাজনীতি উস্কে দিয়েছে কিনা, তদন্ত কমিটি সেদিকে আলোকপাত করেনি। সরকার প্রধান ও সেনা প্রধানের ভূমিকার ওপরও তদন্ত কমিটি কোন মূল্যায়ন করেনি। তবে সরকারের রাজনৈতিক স্তাবকদের মতোই তদন্ত কমিটি বিদ্রোহ নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছে। তদন্ত রিপোর্টে আছে যে, বিদ্রোহীরা বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সাথে সাক্ষাৎ করে আশানুরূপ সাড়া পেয়ে অস্থির হয়ে পড়ে। এই রাজনৈতিক নেতাদের পরিচয় উহ্য রাখা এবং তাদের বক্তব্য তুলে না ধরার পেছনে তদন্ত কমিটির যুক্তি কী? সেনা সদস্যদের হত্যার কথা ‘হার্ডকোর' সদস্যরাই জানতো বলে তদন্ত রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে। এই হার্ডকোর কারা? সরকার প্রধানের সাথে আপোস আলোচনার পর ডিএডি তৌহিদকে ভারপ্রাপ্ত বিডিআর ডিজি করা হয় কেন? এতগুলো সেনা অফিসারকে বিডিআরের দরবার উপলক্ষে একত্রিত করার পেছনে কোন মহলের ভূমিকা আছে কি না? অনেক সেনা অফিসারকে তড়িঘড়ি বিডিআর এ পোস্টিং দেয়ার পেছনে তাদেরকে মৃত্যুকূপে ঠেলে দেয়ার কারো গোপন অভিলাশ ছিল কি না? তদন্ত কমিটি এসব দিকে যায়নি।

দেখা যাচ্ছে, একটি অসম্পূর্ণ ও অবিশ্বাস্য তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করে প্যান্ডোরার বাকস খোলা হয়েছে। এর দায় সরকারকেই নিতে হবে।