অবগুণ্ঠন উন্মোচন : আসিফ আরসালান
সেনাতদন্ত রিপোর্ট
৪৬ পদাতিক ব্রিগেডকে এ্যাকশনে যেতে দেয়া হয়নি পিলখানা ম্যাসাকার সম্পর্কে সেনা তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করা হয়েছে। লেঃ জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ২০ সদস্যবিশিষ্ট সেনা তদন্ত কমিটি আর্মী চীফ জেনারেল মইনের কাছে তাদের ৩০০ পৃষ্ঠার (মতান্তরে ৪০০ পৃষ্ঠার) রিপোর্ট দাখিল করেছে। রিপোর্টটির একটি কপি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছেও সাবমিট করা হবে।
আজ আর্মী কোর্ট অব এনকুয়ারীর (সেনা তদন্ত আদালত) রিপোর্টের ওপর লিখব। ইচ্ছা ছিল,তিনটি কমিটি যখন তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে অনুসন্ধান চালিয়ে তিনটি রিপোর্ট পেশ করবে তখন সেই তিনটি রিপোর্টের ওপর লিখব। কিন্তু সিআইডি রিপোর্ট দাখিলের শেষদিন ধার্য করা হয়েছে ২৯ জুন। ঐদিকে জনাব আনিসুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন বেসামরিক তদন্ত টীম নাকি যেকোনো দিন তাদের রিপোর্ট দাখিল করবে। ঐদিকে আমার রবিবাসরীয় কলামটির জন্য লেখা দাখিল করতে হয় শুক্রবার। তাই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র সেনা তদন্ত রিপোর্ট নিয়েই লিখতে হচ্ছে।

সেনা তদন্ত রিপোর্ট সম্পর্কে প্রথমেই একটি জায়গায় হোঁচট খেতে হয়। বলা হয়েছে যে, যেহেতু এটি ছিলো একটি বিভাগীয় তদন্ত তাই এর পরিধি ও আওতা অন্যান্য বেসামরিক তদন্তের মতো নয়। এ কারণে বেসামরিক ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দল জড়িত ছিলো কিনা সেই বিষয়ে অনুসন্ধান ও তদন্ত করা কমিটির আওতার মধ্যে ছিলো না। রিপোর্টে তাই বলা হয়েছে যে, আরো বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন একটি তদন্ত কমিটি দিয়ে এই হত্যাকান্ডের তদন্ত করা হোক এবং অপরাধীদের সেনা আইনে বিচার করা হোক। এ কথার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, এই হত্যাকান্ডে বাইরের শক্তি অর্থাৎ বেসামরিক ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দল অথবা বিদেশী শক্তির জড়িত থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না সেনা তদন্ত টীম। তদন্ত কার্য সম্পর্কে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একাধিক ব্যক্তির সাথে আমি কথা বলেছি। তাদের ব্যাখ্যা হলো এই যে, বাইরের শক্তি জড়িত থাকা সম্পর্কে সেনা তদন্ত টিম একটি ক্লু রেখে যাচ্ছে। যেহেতু এটি বিভাগীয় তদন্ত তাই তারা অনেক কিছু জানলেও সেটা রেকর্ড করতে এবং বলতে পারেনি। কিন্তু তারা বলে গেলো যে, বিষয়টির ভেতরে ঢুকলে আরো অনেক কিছু বেরিয়ে আসতে পারে। সরকার যদি এ ব্যাপারে আন্তরিক হয় তাহলে তারা আরো বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করে অন্ধকার বিবর থেকে আসল অপরাধীদেরকে আলোর সামনে হাজির করতে পারে। এখন সেই কাজটি করতে সরকার আদতেই আগ্রহী কি না সেটাই এখন দেখার প্রশ্ন।
এই রিপোর্ট সম্পর্কে আরো বিস্তারিত আলোচনার পূর্বে একটি কথা আগে থেকেই বলে নেয়া দরকার। সেটি হল, যেহেতু এটি সেনাবাহিনীর বিভাগীয় তদন্ত তাই সেই রিপোর্ট জনসাধারণের অবগতির জন্য প্রকাশ করা হবে, এমন আশা অনেকেই করেননি। তারা বরং ? ধারণা করেছেন এবং দাবি করেছেন যে, আনিসুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন বেসামরিক রিপোর্টটি যেন নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ হয় এবং জনগণের অবগতির জন্য প্রকাশ করা হয়। কিন্তু বিগত তিন/চার দিন হল দেখা যাচ্ছে যে, সবগুলো জাতীয় দৈনিকে সেনাতদন্ত রিপোর্টের অংশবিশেষ ছাপা হয়েছে। তবে সবগুলো পত্রিকাতে রিপোর্টের যে একই অংশ ছাপা হচ্ছে তা নয়। রিপোর্টের বিশেষ কয়েকটি দিক জাতীয় দৈনিকসমূহে ছাপা হয়েছে। তবে কোনো পত্রিকায় কিঞ্চিৎ বিস্তারিত ছাপা হয়েছে, আবার কোনো পত্রিকায় ভাসা ভাসা কিছু রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। কিভাবে পত্রিকাগুলো এসব রিপোর্ট পেলো? সেটা আমার জানা নাই। তবে ?দৈনিক ইত্তেফাক' এ ব্যাপারে একটি ইঙ্গিত দিয়েছে। তারা বলেছে যে, ৩০০ পৃষ্ঠার এই রিপোর্টের একটি সারসংক্ষেপ তাদের কাছে এসেছে। তদন্তের পরিভাষায় এই সার সংক্ষেপকে বলা হয় ?এক্সিকিউটিভ সামারী'। কিন্তু কিভাবে সেই সামারী তাদের কাছে এলো, সেটা তারা খোলাসা করে বলেনি।
দুই .
সেনা তদন্ত রিপোর্ট সম্পর্কে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়ে অথবা রিপোর্টের বরাত দিয়ে যা কিছু প্রকাশিত হয়েছে তার মধ্যে কোনো ঐক্যতান খুঁজে পাওয়া যায় না। কয়েকটি পয়েন্টে কয়েকটি পত্রিকার রিপোর্টে অভিন্ন সুর খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু অন্য কয়েকটি পত্রিকায় ভিন্ন সুরও লক্ষ্য করা যায়। নিরপেক্ষতা এবং বস্তুনিষ্ঠতার খাতিরে কয়েকটি পত্রিকার নাম উল্লেখ করে তাদের প্রকাশিত রিপোর্টের অংশবিশেষ নিম্নে উল্লেখ করছি।
এতদিন ধরে মানুষকে বলা হচ্ছে যে, বিদ্রোহীদের দমনে আর্মী এ্যাকশন নেয়া যায়নি দুইটি কারণে একটি কারণ হল এই যে, আর্মী এ্যাকশন হলে বেশি প্রাণহানি ঘটতো।আরেকটি হল, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেনা প্রধান জেনারেল মঈনের সাথে বিষয়টি নিয়ে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে কথা বলেন।জেনারেল মইন নাকি তাকে বলেন যে, অকুস্থলে অর্থাৎ পিলখানা গেটে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে কমপক্ষে দুই ঘণ্টা সময় লাগবে। কিন্তু এ ব্যাপারে সেনা তদন্ত কমিটি বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। তাদের রিপোর্ট থেকে দেখা যাচ্ছে যে, প্রথম হত্যাকান্ডের পর পরই সেখানে র্যা ব এবং সেনাবাহিনীর সদস্যরা অবস্থান গ্রহণ করে। কিন্তু রাজনৈতিক সরকারের নির্দেশ না পাওয়ায় তারা ফিরে আসে। এ ব্যাপারে গত ১৫ মে দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়,'২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে পিলখানার ভেতরে যখন বিডিআরের কতিপয় সদস্যদের বিদ্রোহ শুরু হয় তখনই এই সংবাদ ৪৬ বিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার আব্দুল হাকিম জানতে পারেন। বিদ্রোহের সংবাদ জানার সাথে সাথেই ব্রিগেডিয়ার হাকিম পিলখানায় সেনা অভিযান পরিচালনার জন্য দফায় দফায় অনুমতি প্রার্থনা করেন কিন্তু তাকে কোনো তরফ থেকেই অনুমতি দেয়া হয়নি। তাৎক্ষণিকভাবে অনুমতি দেয়া হলেও সেনা সদস্যরা পিলখানার ভেতরে গেলে পরবর্তীতে সেনা কর্মকর্তারা প্রাণ হারাতেন না, তাদের পরিবার-পরিজন নির্যাতিত ও লাঞ্ছিত হতেন না। তাদের শিশুরা খাবার-দাবারসহ সব কিছুতেই কষ্ট পেতো না। লুটপাট, সম্ভ্রমহানী ঘটতো না। প্রথম দফায় যে ১৩ জন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়েছিল সেনা অভিযানের পরে হত্যার সে সংখ্যা বাড়তো না। তদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, বিদ্রোহ শুরুর দিকে বিডিআর সদস্যরা সংঘটিত ছিল না। এ অবস্থায় অভিযান চালাতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটতো না। রিপোর্টের এই অংশটি এত স্পষ্ট যে এ ব্যাপারে ব্যাখ্যার আর কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। সকলেই জানেন যে, নবম ডিভিশনকে সামরিক শক্তির দুর্গ বলা হয়। সেই ডিভিশনের সবচেয়ে প্রধান ও শক্তিশালী ব্রিগেড হলো ৪৬ ব্রিগেড। সেই ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার আবদুল হামিককে যদি পিলখানায় অপারেশন চালানোর অনুমতি দেয়া হতো তাহলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো। প্রথম দফায় যে ১৩ জন আর্মী অফিসারকে হত্যা করা হয়েছে ৪৬ ব্রিগেড পিলখানায় ঢুকলে ১৩ জনের বেশি আর্মী অফিসারকে প্রাণ হারাতে হতো না। এ ব্যাপারে সরকার তথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন এবং স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজ কি বলবেন?
রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, তারা যে ৬৯ দিন তদন্ত করেছেন সেই সময় অনেক স্পর্শকাতর বিষয় জানা গেছে।এগুলো সাথে সাথেই উচ্চ পর্যায়ে জানানো হয়েছে।স্পর্শকাতর বিষয়গুলো কি? সেইসব বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ে কি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে? জনগণকে সেসব বিষয় জানানো হোক।
তিন.
'দৈনিক ইনকিলাবের' রিপোর্টে একটি নতুন ডাইমেনশন দেয়া হয়েছে। সেনা তদন্তের রিপোর্টের বরাত দিয়ে এই পত্রিকায় ১৪ মে বলা হয়েছে, এই হত্যাকান্ডের পেছনে বিডিআরের বাইরেও একটি পরিকল্পনাকারী দল জড়িত হয়েছে।ওই পরিকল্পনাকারী চক্রের আর্থিক সহযোগিতা রয়েছে। তারাই বিডিআরের সাধারণ সদস্যদের মধ্যে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার জড়িয়ে তাদের উস্কে দিয়েছে। এই হত্যাকান্ডের উদ্দেশ্য ছিলো দেশের অমীমাংসিত সীমান্ত দখল, সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা প্রভৃতি।পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে রয়েছে একটি গোয়েন্দা সংস্থার সোর্স।আরো রয়েছে কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, এই গোয়েন্দা সংস্থার সোর্স কে বা কারা? তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।তাহলে এখানে আঙ্গুল তোলা হয়েছে কাদের দিকে?দলে দলে বিডিআর সদস্যরা পালাতে পারলো কিভাবে?এ ব্যাপারে 'দৈনিক ইত্তেফাকে' প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, '২৫ ফেব্রুয়ারি বিকালে পিলখানা ৫ নম্বর গেট দিয়ে একটি মিছিল ভিতরে প্রবেশ করে এবং সেই মিছিলের সাথে বেশ কিছু বিডিআর সদস্য বাইরে পালিয়ে যায়। ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পরিকল্পতভাবে রাতের বেলায় পিলখানায় অভ্যন্তরে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা, বিদ্রোহ শুরুর পর বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক পিলখানার চতুর্দিকে তৈরি করা নিরাপত্তা বেস্টনী পরবর্তীতে রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য সরিয়ে নেয়া হলে বিডিআর সদস্যদের পলায়ন সহজ হয়ে যায়।
চার.
অন্তত দেড় দুই মাস আগে বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান অষ্ট প্রহর বলছিলেন যে, এই হত্যাকান্ডের পেছনে নাকি জঙ্গির হাত রয়েছে। শুধু তাই নয়, সেই কথা প্রমাণ করার জন্য ঘাতকদের অতীত রেকর্ড ঘাঁটা হয়। বলা হয় যে, তাদের অধিকাংশই একটি বিশেষ জেলা এবং একটি বিশেষ এলাকার বাসিন্দা। সেই বিশেষ এলাকাটি একটি বিশেষ জঙ্গি গোষ্ঠীর ঘাঁটি ছিলো। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, জনাব ফারুক খান শুধুমাত্র বাণিজ্যমন্ত্রী নন তিনি তিনটি তদন্ত কমিটির সমন্বয়ক। কিন্তু এ সম্পর্কে সেনা তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে,'বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারী সদস্যদের সাথে কথা বলে এবং তাদের কাজ ও আচার-আচরণ পর্যবেক্ষণে দেশী-বিদেশী কোনো জঙ্গি সংগঠনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সাহায্য, সমর্থন এবং সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে কোনো তথ্য, আলামত বা পূর্বাভাস পাওয়া যায়নি'।
সেনা তদন্ত রিপোর্টে আরো কয়েকটি পয়েন্ট রয়েছে। হাজারীবাগ আওয়ামী লীগের নেতা তোরাব আলী এবং তার ছেলে সন্ত্রাসী লেদার লিটন এই বিদ্রোহে ইন্ধন যুগিয়েছেন। বিষয়টি রাজনৈতিক নেতারা জানতেন। তবে তারা বিডিআর কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন কিনা সেটা সেনা তদন্ত কমিটি জানতে পারেনি। রিপোর্টে বলা হয়েছে যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সাহারা খাতুন এবং প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের সামরিক বিষয় সম্পর্কে কোনো ধারণা নাই। তাই তারা এই বিদ্রোহ দমনে সময়োপযোগী ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেননি। এই রিপোর্ট পাওয়ার পরেও কি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাহারা খাতুন এবং নানককে মন্ত্রিসভায় রাখবেন? তাদের কি বরখাস্ত করবেন না? রিপোর্টে বলা হয় যে তিন কিলোমিটার এলাকা জনশূন্য করার জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্যের নির্দেশ এবং ৪ দিনের নিরাপত্তা বেস্টনী তুলে দেয়ার কারণে বিডিআর জওয়ানরা পালাতে সক্ষম হয়। এই সংসদ সদস্য হলেন মরহুম শেখ ফজলুল হক মনির পুত্র শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ফজলে নূর তাপস। এখন ফজলে নূর তাপসের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা কি ব্যবস্থা নিবেন?

