প্রতিক্ষা - যুথিকা বড়ুয়া

jyoti_barua's picture
Posted by
jyoti_barua
Wednesday, February 4, 2009 - 2:24pm BST

হঠাৎ ভয়ঙ্কর একটা দুঃস্বপ্নে ধড়্ফড়্ করে ওঠে মমতা। বুকটা ওর ধুক্ধুক্ করে উঠেছে। থরথর করে কাঁপছে সারাশরীর। উঠে বসে বিছানায়। সকাল না সন্ধ্যে, মুহূর্তের জন্য ঠাহরই করতে পাচ্ছিল না! চোখ পাকিয়ে তাকায় চারিদিকে। তখনও আবছা অন্ধকার বাইরে। দিগন্তের পূর্ব প্রান্তর জুড়ে ঊষার ক্ষীণ আলোর আভায় ক্রমশ লাল হয়ে উঠছে। পিছন ফিরতেই দ্যাখে, খোকনের ঘরে আলো জ্বলছে। দরজা-জানালা খোলা। পাশে বাথরুমে ঝর্ণার মতো প্রবল স্রোতে ঝিরঝির করে পাইপ কলের জল পড়ছে, শোনা হচ্ছে। -‘খোকা স্নান করছে নিশ্চয়ই! কিন্তু এতো ভোরে! খোকা আজ যাচ্ছে কোথায়!’

ন্বগতোক্তি করতে করতে বিছানা থেকে নেমে মমতা দ্রুত গিয়ে ঢুকলো খোকনের ঘরে। ঢুকেই নজরে পড়ে, একটা কাপড়ের পোটলায় কি যেন বাঁধা, বিছানার পাশে টি-টেবিলে পড়ে আছে। আকারে বেশ বড়। ভারী জিনিস মনে হচ্ছে! -‘আশ্চর্য্য, এভাবে বেঁধে রাখার মতো খোকার এমন কি জিনিস থাকতে পারে, যে ওর মা জানবে না!’ বলল মনে মনে।

স্বাভাবিক কারণে সেটা খুলে দেখার বড্ড কৌতূহল হলো মমতার। কিন্তু পোটলাটা হাতে নিয়ে দেখতেই চমকে ওঠে, -‘মা, তুমি এঘরে, কি করছ? সর্বণাশ, ওটা রেখে দাও শিগ্গির!’

বলে মাথা মুছতে মুছতে বাথরুম থেকে দ্রুত এগিয়ে আসে খোকন। খানিকটা বিরক্তি প্রকাশ করে বাজপাখীর মতো নিজেই একরকম ছোঁ মেরে অতি সন্তর্পণে কেড়ে নিলো পোটলাটা। উপেক্ষা করে বলল, -‘তুমি খামাখা ঘুম থেকে উঠে এলে! আজ আমাদের ইউনিভার্সিটিতে খুব জরুরী একটা মিটিং আছে! আর্লি মর্নিংএ এ্যাটেন্ড্ করতে হবে সবাইকে, তাই..! যাও, যাও, গিয়ে শুয়ে পড়ো গে যাও!’
এমন স্বাভাবিক গলায় বলল, যেন কিছুই ঘটেনি! অথচ মনে মনে ভাবছে, মা নিশ্চয়ই জেনে গেছে! এতক্ষণ ওয়াচই্ করছিল বোধহয় ওকে!

হঠাৎ থতমত খেয়ে গেলেও খোকনের আপদমস্তক লক্ষ্য করে জিজ্ঞাস্য দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে মমতা। স্তম্ভিত হয়ে যায় বিস্ময়ে। কিছু একটা যে ঘটতে চলেছে, সেটা দৃঢ়তার সাথে নিশ্চিত হয়েই আবার পরক্ষণে ভাবে, নাঃ, বোধহয় ওরই বোঝার ভুল হচ্ছে হয়তো!

অথচ মমতা আদৌ জানে না যে, ঐ পোটলাতে কি আছে! সেই মারাত্মক জিনিসটি কি! আর মায়ের অজান্তেতলে তলে খোকন এসব করছেই বা কি!

লক্ষ্য করলো, চেহারাটা মুহূর্তে বিবর্ণ হয়ে গেল খোকনের। গভীর তন্ময় হয়ে কি যেন ভাবছে। কিন্তু একজন গর্ভধারিনী, স্নেহময়ী মায়ের মন, সত্য উন্মোচন না হওয়া পর্যন্ত কখনো শান্তি পায়না। কারণ সন্ধানে প্রচন্ড উদগ্রীব হয়ে ওঠে। চিন্তিত হয়ে গম্ভীর গলায় বলল,-‘খোকা, সত্যি করে বল্ তো, এতো সকালে তুই যাচ্ছিস কোথায়? কোন্ রাজকার্যে যাচ্ছিস, শুনি? তোকে আজ এমন ঔদাসীন্য লাগছে কেন? কিরকম অন্যমনস্কভাব! কিছু লুকোচ্ছিস মনে হচ্ছে!’

খোকন নিরুত্তর। পড়ে যায় বিপাকে। পোটলাটা লুকাবার চেষ্টা করে। মাকে উপেক্ষা করে হঠাৎ আহ্লাদে গদগদ হয়ে ওঠে। বাধ্যগত ছেলের মতো খুব নরম হয়ে, মোলায়েম করে বলল,-‘তুমি না ঘুমিয়ে উঠে এলে কেন মা! আমি কি দুধের খোকা! ইউনিভার্সিটির ছাত্র আমি! হাট্টা গোট্টা তরুণ যুবক! সামান্য একটা বিষয়কে এতো সিরিয়াসভাবে নিচ্ছো কেন বলো তো! আমারও তো একটা প্রাইভেসি আছে, না কি! রিল্যাক্স মা, রিল্যাক্স! ক’মন! আচ্ছা, উঠেই পড়েছ যখন, ফটাফট্ এক কাপ গরম চা নিয়ে এসো দেখি! শরীরটা একটু ঝরঝরে হয়ে যাক!’

মমতা তক্ষুণিই চলে যায় রান্নাঘরে। ইত্যবসরে খোকন তাড়াহুড়ো করে গা-হাত-পা মুছে, ঝটপট্ পড়ে নিলো জামা-প্যন্ট। মাথা আঁচড়াতে আঁচড়াতে রান্নাঘরের দিকে গলা টেনে একবার দেখল। দেখে কি যেন ভাবল। আর তক্ষুণি পা টিপে নিঃশব্দে পোটলাটা নিয়েই দ্রুত বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

তার পরক্ষণেই চা নিয়ে আসে মমতা। এসেই থমকে দাঁড়ায়। দ্যাখে, খোকন ঘরে নেই। গলা টেনে বাথরুমে দেখলো, সেখানেও নেই! হঠাৎ নজরে পড়ে, কাপড়ের সেই পোটলাটাও নেই! মায়ের অগোচরে খোকন কখন যে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, টেরই পেলনা। কিন্তু পোটলায় বেঁধে খোকন কি নিয়ে গেল? হাজার প্রশ্নের ভীঁড় জমে ওঠে মমতার। দুঃশ্চিন্তায়-দুর্ভাবনায় একটা মুহূর্তও স্বস্তি পায় না।

মমতা সহজ সরল, সেকেলে মহিলা। সংস্কারপ্রবণ মন-মানসিকতা। স্বামী বিয়োগের পর একেবারে নরম হয়ে গিয়েছে! কোন বিষয়েই তেমন গভীরভাবে ভাবতে পারেনা! অথচ তার আজ এক একটা মুহূর্ত্য কি অপরিসীম উদ্বেগ, উৎকণ্ঠায় অতিবাহিত হচ্ছে! মায়ের মন, সব সময় কু-ই গায়! বাস করে তার নিজস্ব জগতে। গ্রামের বাড়িতে শ্বশুড় কূলের ভিটে-বাড়ি সহ স্বল্প পরিমানে কিছু ধানি জমি ছিল, তাতে আনাচপাতির চাষ করে। সম্প্রতি হাঁস-মুরগীর পল্ট্রিও খুলেছে। সেখান থেকেও আমদানী হয় প্রচুর। সব মিলিয়ে উপার্জন যা হয়, তা দিয়ে মায়ে-পুতের দিব্যি স্বচ্ছলভাবেই চলে যায়। কখনো পয়সা কড়ির জন্য ভাবতে হয়না। এখন খোকনকে নিয়েই হয়েছে যতো চিন্তা। অকাল বৈধব্যে একাকীত্বের নিঃসঙ্গ জীবনের শোক-দুঃখ-বেদনা ভুলে, প্রাত্যহিক জীবনের পারিপার্শ্বিক কোন্দল-বিবাদ-বিচ্ছেদ-বেদনার কালো ছায়া থেকে সড়ে এসে এতকাল বুকে আলগে রেখে ছেলেকে মানুষ করেছিল কি এই জন্য? মায়ের মনে কষ্ট দিতে বিবেকে ওর এতটুকু বাঁধলো না? মায়ের অবস্থাটা কি হবে, একবার ভাবল না! কিন্তু আজ ও’ গেল কোথায়?

খোকন ছোটবেলা থেকেই ধীর-স্থীর-গম্ভীর। বড্ড এক রোখা। অনমনীয় তার জেদ। বিরল সেন্টিমেন্টাল। মনঃপুত না হলে প্রতিটা বিষয়ে ওর বিরোধীতা, আপত্তি, অভিযোগ! প্রখর সংগ্রামী মনোভাব। যেদিন শহরের রাজপথে প্রথম ভাষা আন্দোলনের শুরুতে নবীন সদস্য আবদুল রশীদ বেকায়দায় পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে গিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছিল, তাদেরই বন্দুকের গুলী বিদ্ধ করে। আর সেই ঘটনা জনগণের মনে বৈপ্লবিক চেতনার সাংঘাতিক বিস্ফোরণ ঘটেছিল। সেই বৈপ্লবিক বাতাবরণে আরো গভীরভাবে স্বাধীনতা বিপ্লবের সঙ্গে খোকন জড়িয়ে পড়েছে। লোকের কানাঘুষোয় শোনা গেছে, -“খোকন বিপ্লববাদী স্বদেশী।”

তবু কখনও তেমনভাবে সন্দেহের দানা বাঁধেনি মমতার। বরং গর্ববোধ করতো মনে মনে। ভাবতো, স্বদেশী মানেই তো দেশকে ভালোবাসা! দেশের সেবা করা! দশের সেবা করা! জনগণের সেবা করা, সেটাতো একটা মহৎ কাজ! মহা পূণ্যের কাজ! কিন্তু আজ?

মমতা অশান্ত, উদ্বেলিত, মর্মাহত। ক্ষণপূর্বের গহীন বেদনানুভূতির তীব্র দংশণ আর ভোরের ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের প্রতিঃচ্ছবি তখনো ওর স্নায়ূকোষে ঘুরপাক খাচ্ছে। কখনো জীবন্ত হয়ে দেখা দিচ্ছে। তন্মধ্যে হঠাৎ অভাবনীয় খোকনের ব্যতিক্রম চাল-চলন, কথাবার্তা, বিবর্তন চেহারা শুধু লক্ষ্যণীয়ই নয়, সন্দেহও ক্রমশ ঘনীভূত হতে থাকে মমতার। ভীষণ খটকা লাগল মনে। ওকে প্রচন্ড ভাবিয়ে তুললো। নদীর ঢেউ-এর মতো বারবার একই প্রশ্ন ফিরে এসে আঘাত করতে লাগল হৃদয়ের গভীরে। -মাকে ভাবনার সাগরে ডুবিয়ে, মায়ের চোখে ফাঁকি দিয়ে, খোকা আজ গেল কোথায়?

সেই তখন থেকে চা-জল-খাবার নিয়ে বসেছিল মমতা। কিছুতেই মুখে ঢুকছে না। কখন থেকে কলিং বেলটা একটানা বাজজিল, এতক্ষণ খেয়ালই করেনি! হঠাৎ জানালার ধারে বসে থাকা হুলো বিড়ালটা মিঁয়াউ করে ডাক দিতেই চমকে ওঠে। বেলের আওয়াজ শুনে ভাবল, খোকা ফিরে এসেছে!
দৌড়ে গেল দরজা খুলে দিতে। কিন্তু দরজা খুলে দেখল, অচেনা অজানা একটি যুবতী মেয়ে দরজার ওপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। ওর চোখে-মুখে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা।

ঘাবড়ে গেল মমতা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেয়েটি বলল, -‘মাসিমা, আমি শান্তনা, খোকনের ক্লাসমেট্। কিছুক্ষণ আগে ওকে দেখলাম মনে হলো! রেললাইন ধরে খুব জোরে হেঁটে যাচ্ছিল! গায়ে চাদর পড়া ছিল। ও’ কোথায় গেল জানেন?’

ভয়ার্ত কণ্ঠে মমতা বলল,-‘কোথায় গেছে, তা তো জানিনা! বলছিল, ইউনিভার্সিটিতে যাবে! কি একটা জরুরী মিটিং আছে! কিন্তু যাবার সময়...!

-‘এ্যাঁ, ইউনিভার্সিটিতে গেছে!’ ভয়ার্ত চোখে তাকায় শান্তনা। কিছুক্ষণ থেমে বলল,-‘সর্বণাশ, আপনি আজ ওকে বেরুতে দিলেন কেন?’ বলে ধপ্ করে বসে পড়ে সিঁড়িতে।

এ যেন মরার উপর পড়ল খাড়া। চিন্তাধারার গতীবেগ আরো তিনগুণ বেড়ে গেল মমতার। অত্যন্ত বিচলিত হয়ে ওঠে। অজানা আশক্সক্ষায় ওর বুক শুকিয়ে আসছে। চোখ-মুখ উ™£ান্ত, মনে বিভীষিকা। হঠাৎ কাঁন্নাজড়িত কণ্ঠে বলে ওঠে, -‘কিসের সর্বণাশ হবে মা! আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি নে!’

-‘সেকি, আপনি শোনেন নি কিছু? ইউনিভার্সিটির চারপাশে সরকার এক’শ চুয়াল্লিশ ধারা জারি করেছে। নোটিশ দিয়েছে, ইউনিভার্সিটির ত্রিসীমানায় কোন মিটিং, মিছিল করা চলবে না। আজ গন্ডোগোল হওয়ার খুব সম্ভাবনা আছে!’

শুনে আঁতকে ওঠে মমতা,-‘এ্যাঁ, বলো কি! কিসের মিটিং? মিছিল কেন করবে ওরা? এক’শ চুয়াল্লিশ ধারা জারি করেছে, কেন? কিসের গন্ডোগোল হবে?’

অসন্তোষ গলায় শান্তনা বলল, -‘আপনি জানেন না? খোকন আপনাকে কিছু বলেনি, রাষ্ট্রীয় ভাষা বাংলা করার দাবিতে ছাত্র-ছাত্রীরা সবাই আন্দোলন করছে, আজ ওরা এক’শ চুয়াল্লিশ ধারা লঙ্ঘন করে শ্লোগান দিতে দিতে এসেম্বলীর দিকে যাবে। পুলিশ নিশ্চয়ই তখন লাঠিচার্জ করবে, কাঁদানি গ্যাস ছুড়বে! ব্যস, শুরু হয়ে যাবে গন্ডোগোল।’

-‘তা’হলে কি হবে মা!’
-‘না, না, কিছু হবেনা! আপনি অযথা ভেঙ্গে পড়ছেন! খোকন বিদ্যান, বুদ্ধিমান এবং চালাকচতুর ছেলে! আর
যাই হোক, অন্তত ওর গায়ে কোন আঁচড় পড়তে দেবে না! আপনি চিন্তা করবেন না। আমি দেখছি, কাউকে পাঠানো যায় কি না!’
শান্তনা চলে যেতেই ভারাক্রান্ত মনটা কিছুটা হাল্কা হলো মমতার। শারীরক ও মানসিক অবসাদ ঝেড়ে ফেলে স্বাভাবিক হয়ে উঠল। ব্যস্ত হয়ে পড়ল নিজের কাজে।

ততক্ষণে বেলা প্রায় ন’টা বাজে। খোকন তখনও দূর থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করছিল, চারিদিকে পুলিশ পাহাড়া। ছাত্র-ছাত্রীরা সবাই দলবেঁধে ইউনিভার্সিটির গেটের ভিতরে জটলা করছে। খুব হৈচৈ হচ্ছে সেখানে। মাঝে মধ্যে শ্লোগান শোনা যাচ্ছে, -“রাষ্ট্রীয় ভাষা বাংলা চাই, বাংলা চাই!”

খোকন চেষ্টা করল, ইউনিভার্সিটির পিছন গেট দিয়ে ঢুকতে। কিন্তু তারও উপায় নেই! সেখানেও ঝাঁকে ঝাঁকে পুলিশ দাঁড়িয়ে। ততক্ষণে দলে দলে ছেলে-মেয়েরা মিছিল করতে করতে মেইন গেটের বাইরে চলে এসেছে। আর তক্ষুণি পুলিশ হামলা চালায় ওদের উপর। ক’য়েকজনকে ধরে তুলে নিলো গাড়িতে। তারপরই শুরু হয়, হট্টোগোল, বিশৃঙ্খল, ভাগ-দৌড়। খোকন এলাপাথাড়ী চাদরের ভিতর থেকে ছুঁড়তে লাগল বারুদের গোলা। জ্বালিয়ে দিলো পুলিশবাহিনীর একটি ভ্যান। অন্যদিকে উত্তেজিত জনসমুদ্রের ক্রমাগত ঢেউএ ভেসে আসছে, শ্লোগানের তীব্র হুঙ্কার। পুলিশ ছুঁড়তে লাগল কাঁদানি গ্যাস। ছুটছে বন্দুকের গুলী। অনবরত ঘটছে একটার পর একটা হৃদকাঁপানো বোমা-বারুদের বিস্ফোরণ! চারিদিকে ধোঁয়া। ছাত্র-ছাত্রীরা দলভঙ্গ হয়ে আত্ম রক্ষায় ছুটতে লাগল, যার যার আপন গন্তব্যে।

পৃথিবীটা যেন থমকে দাঁড়িয়ে আছে। গুমোট মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। বৃষ্টিও পড়ছে গুঁড়ি গুঁড়ি। সকাল থেকে মন-মেজাজটাও একদম ভালো নেই মমতার। তন্মধ্যে চতুর্দিক থেকে বজ্রপাতের মতো বোমা বাজীর আওয়াজে মনে হচ্ছে গায়ের উপরেই এসে পড়বে এক্ষুণি! এমন বিপর্যয়ে ছেলেটা কোথায়, কি অবস্থায় আছে, এ চিন্তায় কিছুতেই স্বস্তি পায়না মমতা। বেরিয়ে আসে বারান্দায়। দেখল, একদল যুবক ছেলে কাকে যেন কাঁধে চেপে উর্দ্ধঃশ্বাসে দ্রুত এগিয়ে আসছে। খুব হৈ চৈ, চিল্লাচিল্লি হচ্ছে।

শুনে নগ্ন পায়েই দৌড়ে আসে শান্তনা। দৌড়ে আসে, পাড়া-প্রতিবেশী, বাচ্চা-বুড়ো-সবাই। ভীঁড় জমে গেল মুহূর্তে। যা ক্ষণপূর্বেও কল্পনা করেনি মমতা। কিন্তু আপন গর্ভে লালিত সন্তান আর মায়ের নারীর চিরন্তন বন্ধন, সে এক অদৃশ্য শক্তি, এক অবিচ্ছেদ্য গভীর টান! তাকে রোধ করে, সাধ্য কার! স্বয়ং বিধাতারও নেই! আর সেই অদৃশ্য বন্ধন শক্তির প্রভাবেই মমতাকে টেনে নিয়ে আসে উঠোনে। যা ও’ নিজেও জানেনা! আর তক্ষুণি কর্ণগোচর হয়, খোকনের নাম ধরে কি যেন বলছে ছেলেরা। সম্ভবত ওদের বাাড়িই খুঁজজে নিশ্চয়ই! তখন বুঝতে কি আর বাকী থাকে কিছু!

বিদ্যুতের শখের মতো হৃদস্পন্দনে খুব জোরে একটা ঝকটা লাগল মমতার। ওর ঠোঁট কাঁপে, বুক কাঁপে। র্থর্থ করে কাঁপে সারাশরীর! অনুভব্য হয়, পায়ের তলা থেকে মাটি যেন ক্রমশ সড়ে যাচ্ছে। জমে হীম হয়ে আসছে ওর সারাশরীর।

মমতা ভাবসাম্যহীন হয়ে পড়ে। স্থীর হয়ে আসে ওর চোখের দৃষ্টি। হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাটিতে উপুর হয়ে পড়তেই জড়িয়ে ধরে শান্তনা। ততক্ষণে চাদরে ঢাকা খোকনের রক্তাক্ত মৃতদেহটাকে শুইয়ে দিলো বারান্দায়। কারো মুখে কথা নেই। সবাই বাক্যাহত, বেদনাহত, মর্মাহত। বিমূঢ়-ম্লান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সবার চোখে জল। হঠাৎ ভীঁড়ের মধ্য থেকে একটি যুবক ছেলে এগিয়ে বলল, -‘খোকনের মা কোথায়? ওনাকে ডাকুন!’

কিন্তু কোথায় খোকনের মা! তখন ও’ আর ওর মধ্যে নেই। সম্পূর্ণ উদ্মাদ। সমানে আবোল-তাবোল বকছে। কখনো আপনমনে বিড়বিড় করছে। শত চেষ্টা করেও মমতাকে ঘরের ভিতরে নেওয়া গেল না। খালি বলছে, -‘তোমরা কেউ দেখেছ আমার খোকাকে? ও’ কোথায় গেছে জানো? আমার খোকা এখনো ফিরে আসেনি! তোমরা দাঁড়িয়ে আছো কেন সবাই? চলে যাও! আমি তো আছি এখানে।’

হঠাৎ মমতাকে বুকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে ওঠে শান্তনা। বিলাপ করে বলে, -‘খোকন আর ফিরে আসবে না মাসিমা! খোকন কোনদিনও আর আমাদের মাঝে ফিরে আসবে না!’


যুথিকা বড়ুয়া : কানাডার টরোন্ট প্রবাসী গল্পকার ও সঙ্গীত শিল্পী।