"'পতাকার রঙ হবে সবুজ, মাঝখানে লাল, আর মানচিত্র সোনালি"

kabir0202's picture
Posted by
kabir0202
Monday, March 2, 2009 - 3:29pm BST

Imageমিনি কাদির। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের 'একাত্তরের দিনগুলি'র মিনি। একাত্তরের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম যে পতাকাটি উড়েছিল, তা সেলাইও করেছিলেন এ গেরিলা যোদ্ধা। রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী মিনি কাদিরের সঙ্গে কথা বলেছেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এর শায়লা রুখসানা দিনা। আলাপচারিতায় উঠে এসেছে, সেই পতাকা তৈরির কথা; এক জন কলেজ পড়-য়া তরুণীর গেরিলা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সে অসমসাহসী ইতিহাস।

শায়লা রোকসানা দিনা
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম প্রতিবেদক

ঢাকা, মার্চ ২৫ (বিডিনিউজ ২৪ ডটকম)- ফোনে কথা বলে ঠিকানা নিয়েই ছুটলাম গুলশানের দিকে। মিনি কাদিরের বাড়ির পথে। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের 'একাত্তরের দিনগুলি'র মিনি; গেরিলা সৈনিক মিনি, স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা সেলাইশিল্পী মিনি।

বাসায় পৌঁছে কলবেল টিপতেই দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন আপাদমস্তক এক শিল্পী। পরনে ছাপা সুতি শাড়ি আর কপালে মেরুন টিপ। প্রথম দেখাতেই ভালো লাগার মতো।

বাংলাদেশের ইতিহাসের উজ্জ্বল সময়ের উজ্জ্বল সাক্ষী মিনি কাদির। বললেন, কত উদ্যম, শ্রম আর ভালবাসায় তৈরি হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা। জানালেন, কলেজ পড়-য়া এক তরুণী কিভাবে হয়ে উঠলেন গেরিলা যোদ্ধা। একাত্তরের স্মৃতিচারণ থেকে শুরু করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রসঙ্গটিও উঠে আসে এ রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পীর সঙ্গে আলোচনায়।

মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ভয়াবহ নির্যাতন দেখেছেন সচক্ষে। বললেন, সে নির্যাতন দেখে আর বসে থাকার উপায় ছিল না। ঢাকায় গেরিলা বাহিনীর বিভিন্ন অপারেশনে সহায়তা করতেন মিনি কাদের। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চান তিনি। তবে ৩৭ বছরেও বিচার না হওয়া হতাশায় আচ্ছন্ন করে তাকে; বিচার হবে কি না- তা নিয়েও সংশয়ে ডুবে পড়েন।

দেখলাম, প্রচারবিমুখ এই গেরিলা যোদ্ধার ঘরে শৈল্পিক নৈপুণ্যে বেড়ে উঠছে অর্কিড, ক্যাকটাসসহ নানা প্রজাতির গাছ। "এই ফুলগুলো দুদিন আগে ফুটেছে; এগুলো আজ। এই কুড়িগুলো কাল; এগুলো পরশু ফুটবে", মমতামাখা হাত বুলিয়ে বলে যেতে থাকেন।

সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর ফেরার পথে দুঃসাহসী এই নারীর সংস্পর্শ যেন নিজেকেও সাহসী করে তোলে।

মিনি কাদিরের পূর্ণ সাক্ষাৎকার-

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: স্বাধিকার আন্দোলনসহ মুক্তিযুদ্ধে কীভাবে সম্পৃক্ত হলেন?

মিনি কাদির: তখন আমি উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষের ছাত্রী। ১৪/১৫ বছরের একটি মেয়ে আন্দোলনের কি-ই বা বুঝতাম! গান করতাম; বাফায় গান শিখতাম। গান দিয়ে প্রতিবাদ করতাম। গণসঙ্গীতের দল 'ক্রান্তি'তে যুক্ত ছিলাম। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে গান করতাম। বাসায় আব্বা এবং অন্যরা আলোচনা করতেন; বুঝতাম কিছু একটা হচ্ছে, হতে যাচ্ছে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: জাতীয় পতাকা তৈরির ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হলেন কীভাবে?

মিনি কাদির: সেদিন ছিল মার্চের ১ তারিখ। আমার চাচাত ভাই মনিরুল হক ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। তিনি সেদিন বাসায় এসে বললেন, 'আগামীকাল একটি মিটিং হবে। সেখানে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো হবে।' তিনি জানতেন আমি সেলাই করি। বললেন, 'তুই সেলাই করবি। পতাকার রং হবে সবুজ, মাঝখানে লাল গোল্লা'। আমরা ভাবছি কেমন সবুজ হবে। মনির ভাই তখন আমাদের টেলিফোন গাইডের কাগজ ছিঁড়ে দেখালেন, 'এই সবুজ'।

এরপর সদরঘাট থেকে কাপড় কিনে আনে আমার ছোট ভাই; মা কেটে দিলেন। ঘরে লাল কাপড় ছিল; তাই দিয়ে গোল করে কেটে তৈরি করা হলো লাল গোল্লা। সে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর অনুভূতি! বাড়ির সামনের বারান্দায় বসে আমি পতাকা সেলাই করছি। আমাকে ঘিরে বসে আছেন আব্বা, আম্মা, ভাই, বোন সবাই।

এরপর আমরা অপেক্ষা করি। পরদিন সকালে মনির ভাই এসে বললেন, 'লাল গোল্লার মাঝখানে সাদা মানচিত্র হবে। পূর্ব পাকিস্তানের মানচিত্র।' তারপর ঘরে থাকা লং ক্লথ দিয়ে মানচিত্র তৈরি করে হেম ফোঁড় দিয়ে লাগিয়ে দেওয়া হলো। কিন্ত মনির ভাই দেখে বললেন, 'না, মানচিত্র হবে সোনালি রঙের'। মনে হয়, ধানের সোনালি রং থেকে এ ধারণাটা এসে থাকবে। এখন সোনালি কাপড় কোথায় পাব। এদিকে হাতেও সময় নেই। দেওয়া হলো হলুদ রঙ। তা-ও হয় না। উপায় কী? ছুটে যাওয়া হলো পাশের বাড়িতে। তখনকার দিনে সাজগোজের জন্য আফসান ব্যবহার হতো। সে আফসান এনে মাখিয়ে দেওয়া হলো মানচিত্রে। পূর্ণ হলো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা। এই পতাকাটি ওড়ানো হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর আরেকটি পতাকা নিয়ে যাওয়া হয় তখনকার ইকবাল হলে (বর্তমান জহুরুল হক হল)।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর্বটা কেমন দেখেছিলেন?

মিনি কাদির: আমাদের বাড়িটি ছিল পুরান ঢাকার রোকনপুরে। ২৫ মার্চ রাতে টেলিভিশনে আমার গানের অনুষ্ঠান ছিল। ডিআইটি রোডের টেলিভিশন ভবনে রেকর্ডিং চলছে। বাফার গিটারিস্ট মনসুর ভাই এক ফাঁকে ডেকে নিয়ে গেলেন ভবনের ভেতরে। সেখানে দেখি, ত্রিপলে ঢাকা আর্মির সারি সারি গাড়ি। হঠাৎ কেমন এক অদ্ভুত অনুভূতি হতে থাকে। মনসুর ভাই বলেন, 'এরা হলো প্যারাট্রুপার।' শব্দটি সেদিনই প্রথম শুনলাম। এরপর রেকর্ডিং হলো। মাঝখানে একবার আর্মিরা ভেতরে এলো। আমরা গান চালিয়ে গেলাম। রেকর্ডিং শেষে বাড়ি পৌঁছে দিলেন এক ভাই। তখন ঘূণাক্ষরেও কিছু আঁচ করতে পারিনি। তারপর এলো সেই ভয়ঙ্কর রাত; এক রাতই ভোর হতে পুরো নয়টি মাস চলে গেলো। মাঝরাতে মা ডেকে বললেন, যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এরপর ভোরবেলা চারদিকে শুধু বাঁচাও-বাঁচাও চিৎকার। দুদিন পর ২ ঘণ্টার জন্য কারফিউ উঠলে আমরা গেণ্ডারিয়া চলে গেলাম।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: এরপর কী ঢাকায় ছিলেন?

মিনি কাদির: না, তিনদিন পর ২৮ তারিখে আমরা গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায় চলে যাই। পথে যেতে এত এত লাশ দেখি ...! আমার জীবনে সবচেয়ে বীভৎস দৃশ্যটি দেখি এ সময় যা এখনও আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। শকুনের দল মানুষের চোখ ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছে। কী ভয়াবহ!

আরেকবার আমরা কুমিল্লা থেকে লঞ্চে করে নরসিংদী আসছিলাম। পথে একটা জায়গায় লঞ্চ কচুরিপানায় আটকে যাওয়ায় সারেং মহিলাদের ভেতরে যেতে বলেন। পরে জানতে পারি, আসলে জড়াজড়ি করে আটকে থাকা মানুষের মৃতদেহে আটকে গেছে লঞ্চ। ওই সময়টা ছিল এরকম। আর সদরঘাটে অসংখ্য মানুষের মৃতদেহ দেখা যেত প্রায় প্রতিদিনই। চোখ, হাত-পা বাঁধা। রাতের বেলা মেরে ফেরে রাখা হতো। এগুলো খুব গভীরে নাড়া দিয়েছিল। তখন কিভাবে সম্ভব ছিল ঘরে বসে থাকা।

মাঝে মাঝে ভাবি, কোনও সভ্য সেনাবাহিনীর পক্ষে এতটা অত্যাচারী হয়ে ওঠা কি আসলে সম্ভব? না কি ওদের টর্চার করার আলাদা একটি বাহিনী ছিল! কে জানে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: মুক্তিযুদ্ধে সম্পৃক্ত হওয়ার প্রক্রিয়াটা কীভাবে ঘটল?

মিনি কাদির: গ্রামে গেলাম, সেখানে বসে বসে অনেক খবর পাই। ভেতরে ভেতরে উশখুশ করতে থাকি কিছু করার জন্য। এমনই এক সময় শুনতে পেলাম, মুক্তিযোদ্ধারা আসছে আমাদের বাড়ির দিকে। আমাদের বাড়িটি পরিচিত ছিল মুন্সিবাড়ি হিসেবে। দেখলাম, তিন জন মুক্তিযোদ্ধা এগিয়ে আসছে আর তাদের পেছনে পুরো গ্রামের মানুষ। মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে সে কী উচ্ছ্বাস! ওই তিন মুক্তিযোদ্ধার এক জন আমারই ফুপাতো ভাই জন (ডিআইটি ভবন উড়িয়ে দিয়েছিল যে গেরিলারা তাদের এক জন ছিলেন জন); আর বাকি দুজনও পাড়ারই ছেলে। পালিয়ে যুদ্ধে গিয়েছিল।

জানো ওরা চোখ ওঠা রোগ নিয়ে এসেছিল। আমাদের পুকুরে গোসল করে পুরো এলাকাতে এই রোগ ছড়িয়ে দিয়ে যায়। (হাসতে হাসতে বললেন মিনি কাদের)

ওরা আমার কাছে একটি ব্যাগ রাখতে দিল, বেশ ভারী একটা ব্যাগ। কৌতূহলের বশে খুলে দেখি, ব্যাগভর্তি গ্রেনেড। জীবনে প্রথমবার তাজা গ্রেনেড দেখতে পেলাম। গ্রেনেড ছুঁয়ে আমার সমস্ত সত্ত্বায় এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর অনুভূতি হয়। যুদ্ধে যাওয়ার ইচ্ছা তীব্র হতে থাকে। গ্রেনেডগুলো লুকিয়ে রাখি। দুই রাত থেকে ওরা আমার চাচার লঞ্চে করে নরসিংদীর বৈদ্যের বাজার চলে যায়। সেখান থেকে পরের গন্তব্যে।

এভাবে প্রায়ই বিভিন্ন দল চাচার লঞ্চে করে বৈদ্যের বাজার পর্যন্ত যেত। তারপর সেখান থেকে বিভিন্নভাবে ঢাকা পৌঁছাত। আবার ঢাকা থেকে এখানে, এখান থেকে বর্ডার। দুদিকে যাতায়াতের নিরাপদ পথ হয়ে উঠলো এটি। কারণ এখান থেকে সীমান্ত বেশ কাছে। আর ঢাকা যাওয়ার জন্য আমার চাচার ছোট্ট একতলা লঞ্চটি ছিল উপযুক্ত পারাপার। ক্রমেই আমাদের বাড়িটা যেন একটি অনানুষ্ঠানিক ক্যাম্পে পরিণত হয়ে যায়। চিঠি চালাচালিও চলতো আমাদের বাড়িটির মাধ্যমে- যেন অস্থায়ী ডাকঘর।

এর তিন মাস পর জুন মাসের দিকে ঢাকায় ফিরে আসি আমরা; রোকনপুরের বাড়িতে। এরপর এক ঈদের দিনে জানতে পারি আর্মি ঢুকেছে পাড়ায়। বাসা থেকে পালিয়ে স্বামীবাগে এক খালার বাসায় উঠলাম। রাস্তায় বের হলে দেখতাম সাদা পোশাকের বিহারিদের। তারা আর্মি ছিল কি-না কে জানে! রাস্তায় বের হলেই অনুসরণ করা হতো। আমি মনস্থির করে ফেলি। গানের দলের লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওপারে ট্রেনিং নিতে যাওয়ার সব ঠিক হয়। কিন্তু হঠাৎ শহরের সমস্ত বিভৎসতা, অস্থিরতা ইত্যাদি দেখে আমার মায়ের নার্ভাস ব্রেক ডাউন হয়ে গেলে আমার আর যাওয়া হয় না। আর আত্মীয়-স্বজনদের আপত্তি তো ছিলই।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: আপনি মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র বহন করে দিতেন...কীভাবে এত সাহস পেয়েছিলেন?

মিনি কাদির: আসলে জেনে যেমন তেমনি না জেনেও অস্ত্র বহন করেছি অনেক সময়ই। এক সময় বলা হতো, আমি নাকি সবসময় ব্যাগে আর্মস নিয়ে ঘুরতাম। (বলতে বলতে হাসেন এই গেরিলা যোদ্ধা) আমাদের বাড়িতে ওরা আর্মস রেখে চলে যেত। একবার এরকম অস্ত্র রেখে গেছে। এরপর শোনা গেল আর্মিরা আসছে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি করতে। সে কী দুশ্চিন্তা! কারও সঙ্গে আলাপও করতে পারছি না। বাড়িতে মা, আব্বা, ছোট ভাই-বোন, যৌথ পরিবারে কত লোকজন। সব মারা পড়বে আমার জন্য। কোথায় সরাব, কিছুই বুঝতে পারছি না। হঠাৎ দেখি, মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল অস্ত্র সরিয়ে নিতে হাজির। সময়মতো ঠিকই খবর পেয়ে গেছে তারা।

আমার পরিচিত মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুরা অনুরোধ করে, ওদের সঙ্গে গাড়িতে যেতে। কোন মেয়ে সঙ্গে থাকলে নাকি গাড়িগুলো ততটা ভালভাবে চেকিং করা হয় না। প্রথম দিকে নিজের ভেতর থেকে সাড়া থাকলেও সাহসটা পেতাম না। এরপর খুব কাছ থেকে একজন পরিচিত নারীকে পাকবাহিনীর নির্যাতনের শিকার হতে দেখি। সে যাতনা যে কত ভয়াবহ হতে পারে তার সাক্ষী হয়ে আমার আর কোনও দ্বিধা থাকে না। চলে গেলাম ওদের সঙ্গে...গাড়িতে। ওমর ভাই, ফারুক ভাইদের সঙ্গে রায়ের বাজার থেকে গাড়িতে উঠতাম। ঢাকার ভেতর কয়েকটি চেকপোস্ট পার করে নির্দিষ্ট জায়গার পর নেমে যেতাম। কয়েকবার এমন হয়েছে, আর্মিরা গাড়ি থামিয়েছে; আমাদের বুক ঢিবঢিব করছে। ধরা পড়লে সর্বনাশ। আসলে মৃত্যুর ভয়টা ছিল না। ভয় যতটুকু ছিল তা পাশবিক নির্যাতনের। আমি এ-ও জানতাম ধরা পড়লে আমার সঙ্গের ছেলেরা সবার আগে আমাকেই মেরে ফেলবে। তবে সৌভাগ্যক্রমে একবারও সে রকম চেকিংয়ের সামনে পড়তে হয়নি। বাসা থেকে লুকিয়ে যাওয়া- আসা চলতো। আব্বা কখনও কখনও হঠাৎ করেই বলতেন, 'মা-রে সাবধান'। হয়তো বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুদের আসা-যাওয়া দেখে অনুমান করতে পেরেছিলেন। বাধা দিয়ে কোনও লাভ হবে না ভেবে হয়তো সে রকম বাধা দেননি। আসলে সময়টাই ছিল এমন; আমরা সময়ের দাবিতেই কাজ করে গেছি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: ভয়াবহ সেই দিনগুলোতে স্বাধীনতার স্বপ্নকে কতটা কাছের মনে হয়েছিল?

মিনি কাদির: ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় যখন অপারেশনের অনেক খবর পাওয়া যাচ্ছিল; তখন বুঝতে পারছিলাম, মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকায় ঢুকে পড়েছে। আমাদের আশা ক্রমশ বাড়ছিল, স্বাধীনতার স্বপ্ন বুঝি আর খুব বেশি দূরে নয়!

১৫ই ডিসেম্বরের রাতে আমাদের পাড়ার সবাই এক সঙ্গে থাকার জন্য একটি বাড়িতে (রওশন জামিলদের বাড়ি) আশ্রয় নিয়েছে। আমরা অবশ্য আমাদের পাশের বাড়িটিতে চলে গিয়েছিলাম। মাইকে কিন্তু তখনও বিহারিরা ঘোষণা করে যাচ্ছে- 'কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী ঢাকায় আক্রমণ চালাচ্ছে, মুসলমানদের ভয়ের কোনও কারণ নেই। নারায়ে তাকবীর। আল্লাহু আকবর'।

এরপর এল সেই কাক্সিক্ষত দিন। ১৬ই ডিসেম্বর। মুক্তিযোদ্ধারা আসে বাসায়।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: বিজয়ের সেই ক্ষণে অনুভূতি কেমন ছিল?

মিনি কাদির: ১৭ই ডিসেম্বর সকালে আমাদের দলের কয়েকজন এসে বলল, নাসিরউদ্দিন ইউসুফের বাসায় যাওয়া হবে। 'মিনি এবার চলো'। মা-আব্বা একেবারেই যে কিছু টের পাননি, তা নয়। তবে এবার তো আর বাধা দেওয়ার কোনও মানে হয় না। আমি তো সেলাই ছাড়া থাকতে পারতাম না। অনেকদিন থেকে একটি সাদা শাড়িতে কাজ করছিলাম। স্বাধীন বাংলার মাটিতে অভয় বিচরণের প্রথম দিন পরলাম সেই শাড়িটি। এরপর গাড়িতে আমিও চললাম। চারিদিকে উচ্ছ্বসিত মানুষের মিলন মেলা। মুক্তিযোদ্ধাদের গাড়ির দিকে ফুল, ফুলের মালা ছুড়ে দিচ্ছেন তারা। কোনও কোনও মালায় কেবল তিন/চারটি ফুল। হয়তো শুকিয়ে যাওয়া গাছের একটি-দুটি ফুল দিয়েই গাঁথা হয়েছে তা। মানুষের ভালবাসা, শ্রদ্ধা আর আনন্দে একাকার সে দিনটি অসাধারণ মহিমায় ভাস্বর আমার স্মৃতিতে।

এরপর আমরা যাই সাভারের দিকে। সাভার ডেইরি ফার্মে। সেখানে নানান মানুষ এসে জড়িয়ে ধরেন। কেউ কেউ মুড়ি, চিড়া নিয়ে এসেছেন। কেউ পানি এনেছেন জগে করে; গেলাসে ভরে এগিয়ে দিচ্ছেন। দেশি-বিদেশি রিপোর্টাররা আসেন ছবি তুলতে। আমার ভেতরে কাজ করে অদ্ভুত এক অনুভূতি। আমি তো সামনের কেউ না। সামনে থেকে যুদ্ধ করতে পারিনি আমি। এত আলো, এত বাহবা কি আমার প্রাপ্য? আমি সরে যেতে থাকি আড়ালে। সে সময় বাচ্চু ভাই (নাসিরউদ্দিন ইউসুফ) এগিয়ে এসে বলেন, 'মিনি তুই তো অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করতে চেয়েছিলি। এবার তাহলে তোর সুযোগ, আয়।' এরপর ভেতরে নিয়ে দড়ি দিয়ে বাঁধা এক পাকিস্তানি আর্মিকে দেখিয়ে বললো, 'নে টার্গেট প্রাকটিস কর।'

ওই লোকটি আমাদের অসংখ্য নারী-পুরুষ হত্যা করেছে। মালামাল লুট করেছে। সে যদি ধরা না পড়তো, তারই হাতে হয়তো মারা যেতে পারতাম আমরা বা আমাদের মত কেউ। রাস্তায় পড়ে থাকা, নদীতে জমে থাকা লাশের ছবি ভেসে ওঠে আমার চোখে। শকুন ঠুকরে খাচ্ছে মানুষের চোখ। মাঝ রাস্তায় পড়ে আছে পরিচিত মহিলার বস্ত্রহীণ মৃতপ্রায় দেহ।...........প্রচণ্ড আক্রোশ চেপে বসে মাথার ভেতর, মুহূর্তের জন্য। তারপর...আমার হাত কাঁপে। অসম্ভব, আমার পক্ষে সম্ভব নয় একজন মানুষকে মেরে ফেলা। আমি ওদের অনুরোধ করি, লোকটিকে তুলে দিতে। ওরা আমার এই কথাটা রাখে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি এবার বেশ জোরেশোরেই উঠেছে। এ সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কী?

মিনি কাদির: দেখো, আমি রাজনীতি বুঝি না। তবে সবার মতো আমিও মনে করি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অবশ্যই হওয়া উচিত। খুব খারাপ লাগে, জাহানারা মামী (জাহানারা ইমাম) এত কষ্ট সহ্য করলেন; তবু স্বাধীন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দেখতে পেলেন না। কে বলতে পারবে- চিন্তা নেই, আমরা অন্তত দেখে যেতে পারব ওদের বিচার। কেউ তো নেই।