তিন তারকার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি

kabir0202's picture
Posted by
kabir0202
Friday, April 10, 2009 - 4:49pm BST

ImageImageImage

নাসির উদ্দিন ইউসুফ, আজম খান এবং ফারুক বলছেন তাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের সেরা স্মৃতির কথা।

টিটু চিৎকার করে বলেছিল, “বাচ্চু ভাই আমাকে বাঁচান”
ঢাকা ও ঢাকার আশেপাশের এলাকা নিয়ে ছিল দুই নম্বর সেক্টর গঠিত হয়েছিল। এর কমান্ডার ছিলেন খালেদ মোশাররফ।

ঢাকা থিয়েটারের পরিচালক ও প্রবীণ নাট্য নির্দেশক নাসির উদ্দিন ইউসুফ যুদ্ধ করেছেন এই সেক্টরের অধীনে। যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সহযোদ্ধাদের কাছে পরিচিত ছিলেন ‘বাচ্চু’ নামে। আর তাকে বেশিরভাগ সময়েই ঢাকা এবং ঢাকার আশেপাশের এলাকার নানা স্থানে অবস্থান করে যুদ্ধ করতে হয়েছে। তারা জানতেন, পাকিস্থানী সেনাবাহিনীর সদস্যরা দেশের নানা স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে মার খেয়ে ফিরে আসছিল ঢাকার দিকে। এদের ধারণা ছিল যে, দেশের অধিকাংশ জায়গা হাতছাড়া হলেও ঢাকাকে তারা হাতছাড়া করবে না। ফলে বাচ্চুদের গেরিলা দলের অন্যতম কাজ ছিল ঢাকাকে হানাদার মুক্ত করা। এজন্য তারা নানা অপারেশন চালিয়েছেন এই শহরে।

দেশ স্বাধীন হবার কিছুদিন আগের কথা। ১৪ নভেম্বর, ’৭১ সাল। তখন সাভার মুক্ত। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা নানা বীরত্বের মাধ্যমে এই শহরকে মুক্ত করেছেন। সেদিন সাভারে তারা বসে বসে নিজের কাজে ব্যস্ত। এক সহযোদ্ধা এসে বাচ্চুকে জানালেন, ৩৩ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট সাভার হয়ে ঢাকার দিকে আসছে। তিনি আরো জানালেন, তারা আসছে হেঁটে হেঁটে।

এই কথা শোনার পর এই পরাজিত সৈন্যদের ঢাকায় প্রবেশ বন্ধ করার জন্য দলনেতা বাচ্চু ছক কষতে শুরু করলেন। শেষ মেশ তারা নানা কৌশল করার পর মোট ৪৫০ জন মুক্তিবাহিনীর সদস্য সাভারের ডেইরি ফার্ম, জিরাবো এবং ঢাকা আরিচা মহাসড়কের পূর্বপাশে অবস্থান নিলেন। তাদের বুকে বজ্রকঠিন প্রতিজ্ঞা, যে করেই হোক এই রেজিমেন্টের ঢাকা যাওয়া প্রতিরোধ করতে হবে।

ভোর চারটার দিকে বাচ্চুদের কাছে খবর এলো, আধ ঘন্টার মধ্যেই এই জায়গার সামনে দিয়ে যাবে ৩৩ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট। আর তাদের প্রতিরোধের জন্য মুক্তিযোদ্ধারা মর্টার, এলএমজি, র্থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল নিয়ে অপেক্ষা করছেন নানা আড়ালে। তারা পরিকল্পনা করেছেন, যখন পুরো ইউনিট আমাদের চোরাগোপ্তা হামলার নাগালে চলে আসবে তখনই একসাথে এই হায়েনাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বেন বাংলার দামাল ছেলেরা। আর এই কাজের সুবিধা হলো- এতে গুলি কম ব্যবহৃত হবে এবং সবাই একসাথে প্রতিরোধ করতে পারবেন।

তখন ভোর। ৬ টা কী সাড়ে ৬টা বাজে ঘড়িতে। আস্তে আস্তে অতন্দ্র প্রহরীর মতো জেগে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের চোখে পড়লো একে একে হেমলেট এগিয়ে আসছে। এভাবে প্রায় পুরো রেজিমেন্ট দেখার পর হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে মহব্বত নামের এক তরুণ মুক্তিযোদ্ধা নিজেকে সামলাতে না পেরে গুলি করে বসলেন। আর এটা ঘটার সাথে সাথে হানাদাররা সচেতন হয়ে পড়লো। তারা এবার এলোপাথাড়ি গুলি করতে থাকলো মুক্তিযোদ্ধাদের।

পাক সেনাদের এইচএমজি এবং এলএমজির অবিরাম গুলি মুক্তিযোদ্ধাদের মাথার উপরের কাঁঠাল গাছে অবিরাম বর্ষিত হচ্ছে। এক সময় তারা বুঝতে পারলো মুক্তিযোদ্ধারা আছে গাছের নীচে। আর এই গুলিগুলো এবার মুক্তিযেদ্ধাদের সামনের দুই বা তিন ফিট আগে এসে ঢুকে পড়ছে মাটিতে আর ধুলোতে অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে চারদিক।

এমন অবস্থায় দলনেতা বাচ্চু সিদ্ধান্ত নিলেন, এক নম্বর পজিশনে যে আছে তাকে বলা দরকার তাদের দিকে এইচএমজি তাক করে যে গুলি চালাচ্ছে তাকে শেষ করতে হবে। এর ফলে তারা আরো সামনে এগিয়ে যুদ্ধের মোড় নিজেদের দিকে নিতে পারবেন।

আরিফ নামের এক তরুণ যোদ্ধা খবর পাঠানোর কাজটি পেলেন। আরিফ আবার টিটুকে বললেন। টিটু বয়স কম। বড়জোড় ১৫! সে যুদ্ধের সময় কিভাবে খবরটা আরেক জায়গায় পৌছাতে হবে সেটা বুঝে উঠতে পারেনি। টিটু দাঁড়িয়ে গেল। সে চিৎকার করে জানালো খবরটি। ঠিক তখনই একটি এসএমজির গুলি এসে বিঁধলো টিটুর বুকে।

বাচ্চুর আজো মনে পড়ে স্পষ্টই, টিটু গুলি খেয়ে পড়ে যাবার সময় চিৎকার করে বলেছিল, “বাচ্চু ভাই আমাকে বাঁচান।”

টিটুর চিৎকারে মুক্তিযোদ্ধাদের ‘পজিশন দুই’-র দল ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে একসাথে দুই দল মিলে আক্রমণ করলো। আর হানাদারদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়লো।

হানাদাররা আশেপাশের ক্ষেতগুলো দিয়ে পালিয়ে যেতে শুরু করলো। কিছু জিরাবোর জলভুমির মধ্যে জীবন বাঁচানোর জন্য আশ্রয় নিল। যাদের পরে গ্রামবাসীরা মেরে ফেলেছিল।

বাচ্চু জানান, এই অপারেশনে তারা ২৫২ জন পাক সেনাকে হতাহত করতে পেরেছিলেন। তবে এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, ঢাকা- আরিচা মহাসড়ক দিয়ে ঢাকার দিকে হানাদারদের আগমন প্রতিহত করতে পেরেছিলেন এই গেরিলা দলটি। এই যুদ্ধে ৬ দামাল ছেলে শাহাদাত বরণ করেন। এটাই ছিল সাভারের সবচেয়ে বড় সন্মুখ যুদ্ধ।

আজম খানের ‘অপারেশন তিতাস’
ব্যান্ড তারকা আজম খানও যুদ্ধ করেছেন দুই নম্বর সেক্টরে। তিনি ছিলেন এই সেক্টরের একটি সেকশনের কমান্ডার। এক অপারেশনে তারা তিতাস গ্যাসের পাইপ লাইন বোমা মেড়ে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। এই অপারেশনটি তারা করেছিলেন ডেমরায়।

আজম খানরা ক্যাম্প করেছেন মেদিনীপুর এলাকায়। একটি বড় এবং একটি ছোট নৌকায় করে মুক্তিযোদ্ধারা এসে পোঁছালেন টার্গেট পয়েন্টে। এর আগেই তাদের একজন এই এলাকা রেকি করে গেছেন। গ্যাস পাইপের বিভিন্ন জায়গায় বোমা রেখে তারা প্রস্তুত হলেন আগুন ধরানোর জন্য। তবে রাতে প্রচুর বাতাসের কারণে ম্যাচের কাঠিতে আগুন ধরাতে পারছিলেন না। পরে একসঙ্গে অনেকগুলো কাঠি একত্রে করে জ্বালিয়ে দিলেন। তবে তারা আগুন দিয়ে চলে আসার জন্য যে সময় হাতে রেখেছিলাম তার আগেই বোমাটা ফেটে গেল। এক এক করে বিভিন্ন পাইপ ফেটে উঠল বিকট শব্দে। আর দাউদাউ করে জ্বলে উঠতে লাগল আগুন। সেই আগুনের এতো আলো ছিল এতো বেশি যে, চারদিক দিনের মতো উজ্জ্বল হয়ে গেল।

একে একে গ্যাসের পাইপ ফাটছে আর বিকট শব্দ হচ্ছে। শব্দ শুনে আশেপাশের কয়েকটি এলাকার মানুষজন ভয়ে পালিয়ে গেল। ছিল। সেকশন কমান্ডার আজম খানের নৌকা তখন নদীতে। আর তিনি এবং তার দুই সহকারী (দুজনেরই নাম খোরশেদ) তিনজন নৌকায় উঠে দেখলেন তলা ফুটো এবং নৌকাতে পানি উঠছে। আর নৌকাটি ছিল গোলাবারুদে ভরা।

তিন সহযোদ্ধা মিলে নৌকাটি ঠেলতে ঠেলতে এগুতে লাগলেন। একদিকে জীবন আর অন্যদিকে অস্ত্র বাঁচাতে হবে। একসময় কোমর পানি পেরিয়ে কাছাকাছি একটা গ্রামে এসে একটানে নৌকাটিকে পাড়ে তুললেন। এই গ্রামের কয়েকটি ছেলেকে একসময় যুদ্ধ কৌশল শিখিয়েছেন আজম খান। তিনি জানতেন ওখানে গেলে তারা নিরাপদে থাকবেন। তবে সেখানে যাবার পর আর কিছু মনে নেই আজম খানের। পরের দিন সকালে যখন তার ঘুম ভাঙল, তিনি নিজেকে আবিস্কার করলেন, একটি খড়ের গাদায়।

পাক হানাদারদের হাতে ধরা পড়ে গেলেন ফারুক
মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন এক টগবগে তরুণ ফারুক। থাকতেন পুরান ঢাকায়। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাক বাহিনী ঢাকাতে যে তান্ডবলীলা চালানোর পর তিনি বেশকজন বন্ধুসহ পৌঁছালেন মাহাবুব নামের এক বন্ধুর বোনের শশুর বাড়িতে। রেডিওতে বার বার বলা হচ্ছে কোনো অবস্থাতেই পাকিস্তানী বাহিনীকে কোন বাধা দেয়া যাবে না।

সেদিন ২ এপ্রিল। সেই বাড়িতে পাকিস্তানি আর্মি এল। তারা দরজা নক করতেই দরজা খুলে দেওয়া হল। বাড়িতে সব মিলিয়ে প্রায় ৬০ জনের মত লোক আশ্রয় নিয়েছে। দরজা খোলার পরে প্রথমে ফারুক দুই জোড়া পা দেখলেন।

হানাদাররা ফারুকের দিকে না তাকিয়ে ঘরের ভিতরে ঢুকে গেল। তিনি ভাবলেন, তারা বুঝি তাকে দেখেনি। এরপরে ঢুকল আরো দুজন। তারা তাকে দেখে সরাসরি বলল, তুই হিন্দুর বাচ্চা, আমরা তোকে খুঁজছি। এটা বলে তারা ফারুককে ধরে নিয়ে গেল। পাক হানাদারদের হাতে ধরা পড়ে গেলেন ফারুক।