আমরা কি জানি আমাদের ভুগরভস্থ পানি (Groundwater) পানের যোগ্য কিনা?

LipLip's picture
Posted by
LipLip
Sunday, February 1, 2009 - 3:14am BST

বাইরে প্রচন্ড রোদ এবং গরম। আপনি খুব ক্লান্ত। মনে মনে ভাবছেন টিউব ওয়েলের ঠান্ডা এক গ্লাস পানি খেতে পারলে খুব শান্তি পেতেন। বাসায় এসে টিউব ওয়েলের ঠান্ডা এক গ্লাস পানি খেলেন এবং খুব তৃপ্তি পেলেন। পানিটি পান করার আগে আপনার একবারের জন্যও কি মনে হয়েছে আপনি যে পানিটা খেলেন সেটা পানের যোগ্য কিনা? অর্থ্যাৎ পানিটি ড্রিংকিং ওয়াটারের কোয়ালিটি মেইন্টেইন করছে কিনা? আমরা আমাদের নিত্য প্রয়োজনীয় কাজে এবং পান করার জন্য টিউব ওয়েলের পানি ব্যবহার করি। কিন্তু কেউ কি জেনে ব্যবহার করছি? কারো মনে কি কখনো প্রশ্ন জাগে কি আছে এই পানিতে বা পানিতে কি এমন কিছু থাকতে পারে যেটা পান করলে আমাদের শরীরে কোন এক সময় এফেক্ট দেখা দিতে পারে? আমার প্রশ্ন হলো আমরা কতটা সচেতন?

আমরা ধরেই নেই টিউব ওয়েলের পানি মানেই নিরাপদ। কিন্তু মাটির গভীরে এই পানিও যে কন্টামিনেটেড হতে পারে সেটা আমরা অনেকেই জানি না। অনেক সময় আমরা মানুষরাই সেটা কন্টামিনেট বা দূষিত করছি কিংবা অনেক সময় সেটা প্রাকৃতিকভাবেও হতে পারে। যেমন আমাদের দেশের গ্রাউন্ডওয়াটারে আরসেনিক কন্টামিনেশনের কারন হলো প্রকৃতি। আমাদের দেশের যে সমস্ত জায়গার টিউব ওয়েলে আরসেনিক পাওয়া গেছে সেই সমস্ত এলাকার মাটির নীচে আরসেনিকের মিনেরেল অনেক বেশী। সেই সব মিনারেল থেকে আরসেনিক ওখানকার গ্রাউন্ডওয়াটারে যাচ্ছে এবং সেই পানি মানুষ টিউব ওয়েলের মাধ্যমে পান করছে। কিন্তু যারা দূষিত পানি পান করছে তাদের শরীরে তাতখনিক কোন এফেক্ট দেখা দিচ্ছে না, দেখা দিচ্ছে ২০-২৫ বছর পর অর্থাৎ এগুলো হচ্ছে লং টার্ম এফেক্ট। সেজন্যেই মানুষ বুঝতে পারে না কিসে থেকে তাদের এমন হচ্ছে। আরসেনিকের মত আরো অনেক মিনারেল টিউব ওয়েলের পানিতে থাকতে পারে যেগুলোর এফেক্ট কোন এক সময় হয়তো মহামারী হয়ে দাড়াতে পারে।

ড্রিংকিং ওয়াটার কোয়ালিটি স্যান্ডারড বা গাইডলাইন হলো পানির মধ্যে যে সমস্ত মিনারেল আছে সেগুলোর জন্য দেয়া একটা লিমিট। সেই মিনারেল গুলোর পরিমান যদি পানিতে লিমিটের বেশী থাকে তাহলে ধরে নেয়া হয় পানিটি পানের যোগ্য না। অবশ্য এই লিমিট গুলো একেক দেশে একেক রকম। অর্থাৎ এক দেশ থেকে অন্য দেশের স্যান্ডারড ভিন্ন হতে পারে । ধরুন, আরসেনিকের কথা, বাংলাদেশে আরসেনিকের স্যান্ডারড হলো ৫০ পিপিবি, অর্থাৎ যেখানে ৫০ পিপিবি এর বেশী পরিমান আরসেনিক যদি পানিতে পাওয়া যায় তাহলে সেই পানি বাংলাদেশের স্যান্ডারড অনুযায়ী ড্রিংকিং ওয়াটারের কোয়ালিটি মেইন্টেইন করছে না। সেই পানিটি দূষিত। আবার WHO (World Health Organization) স্যান্ডারড অনুযায়ী আরসেনিকের লিমিট হলো ১০ পিপিবি। অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডে আরসেনিকের লিমিট ৭ পিপিবি। এভাবে আরসেনিকের মত আরো অনেক প্যারামিটারের জন্য লিমিট দেয়া আছে।

বাংলাদেশে এখন জনসংখ্যা প্রায় ১৫ কোটির উপরে। আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষ টিউব ওয়েলের পানির উপর নিরভরশীল। কোন কোন পরিসংখানে দেখা যায় বাংলাদেশে টিউব ওয়েলের সংখ্যা ৮-১২ মিলিয়ন। আমার ধারনা আমাদের টিউব ওয়েলের সঠিক কোন ডাটাবেস নেই। ডাটাবেস নিয়ে অন্য আরেক দিন লিখব। যা বলছিলাম, আমাদের দেশের জনসংখার ৯৫-৯৭% টিউব ওয়েলের পানি ব্যবহার করেন। তাহলে ভেবে দেখুন কত মানুষ টিউব ওয়েলের পানি পান করছে। কিন্তু কেউ কি জেনে বুঝে পান করছে? আমরা কি জানি আমরা যে পানি পান করছি তাতে কি আছে বা থাকতে পারে? আমরা কি এই বিষয়ে সচেতন?

আরসেনিক আমাদের দেশের জন্য একটা বিশাল সমস্যা। ১৯৯৩ সালে প্রথম বাংলাদেশের দখিন অঞ্চলের কিছু জ়েলার টিউব ওয়েলে আরসেনিক কন্টামিনেশন ডিটেক্ট করা হয়। এখন আরসেনিক সম্পর্কে অনেকেই জানেন। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে অনেকেই আরসেনিকের উপর কাজ করেছেন এবং এখন ও করে যাচ্ছেন। কিন্তু আরসেনিক ছাড়াও আর ও অনেক মিনারেল আছে যেগুলো পানিকে কন্টামিনেট করতে পারে এবং আমরা যদি সেই পানি রেগুলার পান করি তাহলে কোন এক সময় সেগুলোর টক্সিক এফেক্ট আমাদের শরীরে দেখা দিবে।

আমরা একটু পিছনের দিকে ফিরে দেখি কিভাবে টিউব ওয়েলের পানি ব্যবহার করা শুরু হলো। আমাদের দেশের মানুষ আগে পুকুর বা নদীর পানি ব্যবহার করত তাদের সমস্ত কাজের জন্য। এমনকি তারা সেই পানি পানও করত। তখন প্রচুর মানুষ কলেরা, ডায়রিয়া, টাইফয়েড এসব রোগে মারা যেত কারন এইসব রোগের জন্য যে ব্যক্টেরিয়া দায়ী, পুকুর বা নদীর পানি সেই ব্যক্টেরিয়া দিয়ে কন্টামিনেটেড ছিল। এইসব রোগের হাত থেকে মানুষ কে বাচানোর জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্যকারী প্রতিষ্ঠান এবং কিছু বেসরকারী প্রতিষ্ঠান ১৯৭০ সালের দিকে সারা দেশে টিউব ওয়েল বসাতে করা শুরু করে মানুষকে নিরাপদ পানি প্রভাইড করার জন্য। সেই থেকে আমদের টিউব ওয়েলের পানি ব্যবহারের যাত্রা শুরু। কিন্তু ২০-২৫ বছর পর যখন আরসেনিকসিসের (এক প্রকার ক্যন্সার যার কারন হল আরসেনিক) রোগী পাওয়া গেল তখন আমাদের মনে আবার প্রশ্ন, সমস্যা কেথায় এবং আমরা জানলাম ‍"সামথিং রং ইন আওর গ্রউন্ডওয়াটার।" যখন টিউব ওয়েল ইন্সটল করা শুরু হয় তখন টিউব ওয়েলের পানিতে আরসেনিকের পরিমান মাপা হয়নি। তখন কেউ চিন্তা করেনি টিউব ওয়েলের পানিতে এমন কিছু থাকতে পারে যা মানুষের জীবনের উপর হুমকি হয়ে দাড়াতে পারে, কারন আমরা ধরেই নেই টিউব ওয়েলের পানি মানেই নিরাপদ।

কিন্তু আমার কথা হল আমরা সবসময় মহামারীর জন্য অপেক্ষা করি কেন? আমরা কি একটার পর একটা মহামারীর ভিতর দিয়ে যাব তখন আমাদের টনক নড়বে এবং তখন আমরা এর সমাধান পাবার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরবো? কিন্তু এই সময়ের মধ্যে কি আমাদের অনেক ক্ষতি হয়ে যায় না? আমরা কি পারি না আগে থেকেই সচেতন হতে এবং মানুষ কে সচেতন করতে?

এখানে আমি কিছু সাজেশন তুলে ধরছি। শহরে যাদের বাসায় টিউব ওয়েল আছে, তারা কোন ল্যাবরেট্যরী থেকে পরিক্ষা করে নিতে পারেন তাদের টিউব ওয়েলের পানি। যদি সেই পানি ড্রিংকিং ওয়াটারের কোয়ালিটি মেইন্টেইন না করে তাহলে সেই পানি পান করা ঠিক হবে না। তবে অন্যান্য কাজে হয়ত সেই পানি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে তার আগে জানতে হবে কিভাবে পানির সেম্পল কালেক্ট করতে হয়। প্রফেশনাল মানুষকে দিয়ে করাতে পারলে ভাল হয়। গ্রামের মানুষরা অবশ্য এত কিছু বুঝবে না। তাদের অনেকের হয়তো খাবার যোগাঢ় করতেই অনেক কষ্ট হয়, সেখানে টিউব ওয়েলের পানি পরিক্ষা করার কথা তারা বুঝবেও না এবং ওদের সামর্থ্য হবে না। সেই ক্ষেত্রে আমাদের সরকার এবং বেসরকারী অরগানাইজেশন এই কাজটা করতে পারে। এই যেমন আরসেনিকের জন্য অনেক বেসরকারী অরগানাইজেশন কাজ করেছে। যেসব টিউব ওয়েলে আরসেনিক আছে সেগুলোকে লাল রঙ দিয়ে মার্ক করেছে আর যেগুলোতে আরসেনিক নেই সেগুলোকে সবুজ রঙ দিয়ে। আমার মনে হয় শুধু আরসেনিকের জন্য না করে আমাদের দেশের সমস্ত টিউব ওয়েল যদি পরিক্ষা করে নেয়া যায় কোন টিউব ওয়েলের পানি ড্রিংকিং ওয়াটারের কোয়ালিটি মেইন্টেইন করছে আর কোনগুলো করছে না এবং সমস্ত টিউব ওয়েলের একটা ডাটাবেস আমরা তৈরী করতে পারি এবং আমরা মানুষ কে সচেতন করতে পারি কোন টিউব ওয়েলের পানি পান করা উচিত আর কোন টিউব ওয়েলের পানি পান করা উচিত না। এবং এখন থেকে নতুন যেসব টিউব ওয়েল ইন্সটল করা হবে, সেটা হতে পারে সরকারী টিউব ওয়েল বা প্রাইভেট টিউব ওয়েল, সেগুলো ইন্সটল করার পর পরই টিউব ওয়েলের পানি পরিক্ষা করে নেয়া উচিত।

সব শেষে আমি বলতে চাই, আমরা যারা জানি বা যারা সচেতন তাদের উচিত যারা জানেনা তাদেরকে জানানো বা সচেতন করা।