একজন পাকিস্তানীর চোখে পাকিস্তান-২

zswapan's picture
Posted by
zswapan
Sunday, June 28, 2009 - 2:02am BST

আমার আগের লেখাটির উপর বেশ ভালো কিছু মন্তব্য এবং তথ্য এসেছে। বিশেষ করে, আমার এই লেখাকে একজন পাঠক বলেছেন, শিরোনামটি "একজন পাকিস্তানীর চোখে পাকিস্তান" না হয়ে "একজন মাহাজিরের চোখে পাকিস্তান" হলে ভালো হতো।

হয়তো তাই। তবে আমার লেখার মূল উদ্দেশ্য পাকিস্তানের আদ‌্যোপান্ত নিয়ে আসা নয়। একটি ভূখন্ডের একজন সাধারন মানুষ, তার দেশ সম্পর্কে কী ভাবছে, সেটুকুই তুলে ধরা। তবে আরশাদের সাথে কথা বলার পর এবং মাহাজিরদের সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানার পর (ধন্যবাদ ষ্ট্র্যাঞ্জার) মনে হয়েছে, পাঞ্জাবী কিংবা সেনাবাহিনীর কারো সাথে কথা বললে, আরেকটি চিত্র পাওয়া যেতে পারে। পথ চলায়, কখনও না কখনও হয়তো কারো দেখা পেয়ে যাবো।

লাঞ্চ খেতে খেতে আমি আরশাদকে জিজ্ঞেস করি, "তোমাদের একটি বিরাট অংশ তাহলে দেশের বাইরে। এবং সেটা মূলত মাহাজির। বাকীদের অবস্থা কী?"

আরশাদের মুখে সাদা কালো খোঁচা খোঁচা দাড়ি। সবসময় ক্লিন সেভ করা অবস্থাতেই ওকে আমি দেখেছি। কয়েকদিন সেভ করা হয়নি। ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খেতে গিয়ে সেই দাড়িতে কেচাপ লেগে গিয়েছিল। সেটা মুছতে মুছতে উত্তর দিল, "পাকিস্তান শাসন করে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ টি পরিবার। সব কিছু এই কয়েকটি পরিবারকে ঘিরেই। সরাসরি ওরা, কিংবা ওদের পরিবারের বর্ধিত অংশ। তারা হলো জমিদার। আর বাকী পাকিস্তানীরা তাদের কাছে জিম্মি।"


ধনী আর দরীদ্রের নিত্যদিনের সম্পদ আর ক্ষমতা লড়াই

"তোমাদের দেশে কি এখনো জমিদার আছে?"
"জমিদাররাই তো দেশ চালাচ্ছে।"
"আমি বলতে চাইছি, সেই পুরনো আমলের জমিদার, যারা একই সাথে জমির মালিক এবং প্রসাশন নিয়ন্ত্রণ করতো।"
"পাকিস্তানে এখনো সেই আদিম কালের জমিদাররাই আছে। তারাই জমির মালিক। এবং তাদের হাতেই স্থানীয় প্রশাসন।"
আমার চোখ বড় বড় হয়ে এলো। আমি আবারো জিজ্ঞেস করলাম, "তুমি কি বলতে চাইছো, এরা একটি মানুষকে ধরে নিয়ে আসতে পারে, এবং তার বিচার করতে পারে? কেউ তাকে কিছু বলবে না?"
ফ্রাই খাওয়া থামিয়ে দিয়ে আরশাদ বললো, "হুম, পারে। তাদের জমিতে দরীদ্র মানুষ কাজ করে। এবং সেই দ্ররীদ্র মানুষকে জমিদাররা যেভাবে খুশি সেভাবেই পরিচালিত করতে পারে। "
"তোমাদের এমন জমিদারের সংখ্যা কেমন?"
"প্রতিটি এলাকাতেই এমন জমিদার আছে। বড় বড় রাজনীতিবিদদের কথাই ধরো। একেকটি প্রদেশের বেশির ভাগটাই তো ওদের।"

আমি ২০০৯ সালে সিলিকন ভ্যালীতে বসে কথা বলছি বলে মনে হলো না। আমার চোখের সামনে ভেসে এলো দূর্গম পাহাড়ী এলাকার ছবি। মরুভূমির ছবি। বিস্তৃর্ণ কৃষিকাজের ছবি। মাইলের পর মাইল শষ্য ক্ষেতের ছবি। আমি আমার সুপের বাটিতে চামচ নাড়তে নাড়তে বললাম, "এই ২০০৯ সালেও এটা কিভাবে সম্ভব?"

আরশাদ এক ঢোক পানি খেয়ে বললো, "অশিক্ষা থাকলে সব সম্ভব। মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা খুব সহজ। তাই তো আমাদের শিক্ষার হার এতো কম। ওই জমিদাররাই তো মানুষকে শিক্ষিত হতে দিচ্ছে না।"

"কিন্তু তোমাদের তো সংসদ আছে। ওই সব এলাকার সংসদ সদস্যরা এটা নিয়ে কথা বলেন না?"

হাসতে হাসতে আরশাদ বললো, "বেশির ভাগ এলাকার সংসদ সদস্য তো ওরাই। কিংবা ওদের আত্মীয়। ওরা সংসদে গিয়ে বেশির ভাগ সময় ঘুমায়। ওরা কখনই চাইবে না যে সাধারন মানুষ শিক্ষিত হোক। তাহলে তো ওদেরই বিপদ। নিজের বিপদ কে আনতে চায় বলো?"

"তুমি বলতে চাইছো, ক্ষমতা এবং সম্পদ - দুটোই এই জমিদার গ্রুপের কাছে?"

"এক্সাক্টলি। একই পরিবারের এক ভাই হয়তো রাজনীতিতে, আরেক ভাই প্রশাসন, আরেক ভাই আর্মি। একবার একজন এম.পি হচ্ছে, পরের বার হয়তো তারই কাজিন এম.পি হচ্ছে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তো ওরাই।"

"এবং তারা নিজেদের সম্পদ সংরক্ষণ করতেই ব্যস্ত?"

"হুম। একেকটি এলাকা ওরা এমনভাবে দখল করে আছে যে, কেউ যদি তাদেরকে ভোট না দেয় তাহলে সে মারা যাবে। হয়তো তাদের লোকরা তাকে মেরে ফলবে। নয়তো এমন ব্যবস্থা করবে, সে কোথাও কাজই পাবে না। দুটো পরিস্কার ক্লাস বলতে পারো।"


প্রতিদিন এভাবেই রক্তাক্ত হচ্ছে পাকিস্তান

"জমিদাররা যদি এতই ক্ষমতাশালী হয়, তাহলে স্থানীয় প্রশাসন কাজ করে কিভাবে?"

"স্থানীয় প্রশাসন কাজ করে না তো। প্রশাসন বলে তো কিছু নেই। তোমাকে একটি উদাহরণ দেই। আমার একজন আত্মীয় পুলিশ অফিসার। সে তেমন বড় কোন অফিসার নয়। খুবই সামান্য একজন থানা লেভেলের কর্মকর্তা। কিন্তু অবস্থা এমন যে, তার পরিবারের সবাই মনে করেন, তারা সবাই পুলিশের আই.জি হয়ে গেছেন। ফুল ফ্যামিলি-র সবাই নিজেকে আই.জি ভাবছেন। যেখানে যাবে, সেখানেই তারা ওই পুলিশ অফিসারের নাম ব্যবহার করবে।"

"বলো কি!"

"শুধু তাই নয়। ওই অফিসার যখন কোথাও যাবে, সারাক্ষন কিছু কনষ্টেবল নিয়ে যাবে, শুধু তার ক্ষমতা দেখানোর জন্য।"

"এগুলো তো অনেকটা হিন্দি সিনেমার গল্পের মতো?"
"কিন্তু এটাই এখন বাস্তবতা। যে যেদিক দিয়ে পারছে, তাদের যতটুকু ক্ষমতা আছে সেটুকুরই অপব্যবহার করছে। তোমার কোন লোক যদি ক্ষমতায় না থাকে, তাহলে তোমার জীবন শেষ। সিষ্টেম যখন এমন জায়গায় চলে যায়, তখন সেটা ভেঙ্গে পড়তে বাধ্য। হচ্ছেও তাই। নিজেরা নিজেদের মানুষ মারছে। তুমি জানো তো, আল্লাহ শেষ নবীর উম্মতদের জন্য কী দিয়েছেন? তিনি অন্যান্য নবীদের সময় সরাসরি আজাব নাজিল করতেন। কিন্তু মহানবীর উম্মতদের জন্য তিনি সরাসরি আজাব দিবেন না বলেছেন। কিন্তু পরোক্ষ আজাবের কথা তিনি বলেছেন। এটা হলো সেই আজাব। ডিফারেন্ট ফর্ম অফ পানিশম্যান্ট। নিজের ভাই নিজের ভাইকে মারছে, শরীরে বোমা বেধে মানুষকে মেরে ফেলছে। হয়তো তারা প্রতিবাদ করতে গিয়েই এই সব করছে। কিন্তু মরছে তো আরেকটা মুসলিম ভাই। এর থেকে বড় আজাব আর কী হতে পারে?"

আরশাদ আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে। আমি আরশাদের কথা শুনে হা হয়ে থাকি। আর মনে মনে ভাবি, বাংলাদেশে সাথে কতটা মিল।

আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে আরশাদ আবার বললো, ‍"আমেরিকাতে একটি কাজের জন্য আমাকে কাউকে ধরতে হয় না। কিন্তু পাকিস্তানে এটা ছাড়া তুমি চলতেই পারবে না। আমি জানিনা বাংলাদেশের অবস্থা কেমন। তুমি কি কখনও বাংলাদেশে ফিরতে চাইবে?"

মুচকি হেসে আমি বললাম, "হুম, আমি ফিরতে চাইবো। ইন-ফ্যাক্ট, যেকোন দিন তুমি হয়তো দেখতে পারো আমি এখানে নেই।"

আরশাদ বললো, "তুমি হয়তো সত্যি তোমার দেশে চলে যেতে চাইবে। কিন্তু তুমি যদি কোনও পাকিস্তানীকে জিজ্ঞেস করো, পাকিস্তানে ফেরত যাবে কি না, দেখবে একশ ভাগ লোকই বলবে, যাবে না।"

"তুমিও তাই?"
"অবশ্যই। কেন ফিরে যাবো বলো? যারা ওখানে আছে, ওরা নিজেরা নিজেরা মারামারি করছে। সিষ্টেম এমনভাবে ভেঙ্গে পড়েছে যে, ওখানে গিয়ে কিছু করার তো নেই। গিয়ে কী করবো বলো? হোয়াট ফর?"

"তোমার মা-বাবা কি বেঁচে আছেন? ভাই বোন?"
"হুম, তারা এখানেই আছেন। তাদেরকে দেখতেই বাড়ি যাচ্ছি।"

[চলবে]

Comments

abu_zubaer's picture

ভালো লেখা এবং আরো কিছু কথা

আমি পাকিস্তানে গিয়েছি ১৯৯৪ সালে সার্কের একটা প্রগ্রামে।আমার বয়স তখন খুব একটা বেশিনা।তীব্র ভ্রমন ইচ্ছা আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখতো।পাকিস্তানের ইতিহাস আমি আগেই পড়ে ফেলেছিলাম।আমার প্রথম গন্তব্য ছিলো পাকিস্তানের কোয়েটাতে।করাচি বমান বন্দরে নামার পর করাচির হাজি কাম্পের পাশে একটা জায়গায় আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়।করাচি রওনা হয় তার পরেরদিন ট্রেনে।বেলুচিস্থানের রাজধানী কয়েটা তে তখন ভিষন রকম শীত।যাইহোক হয়েটা ক্যান্টন্মেন্টের একজন কর্নেলের সাথে একটা রাতের খাবারের আয়োজনে আমার খুব খাতির হয়ে যায়।বন্ধুত্ব এমন হয়ে যায় যে আমি তার সন্তান্তুল্য হলেও আমাকে সে দস্ত বলে সম্ভাদন করেছে।যাইহক এই বন্ধুত্বের সুবাধে আমি ঘোড়ার জন্য তার গাড়ি পেয়ে যাই সেই সাথে তার ছেলে কে আমার সাথে দিয়ে দেই।কয়েটা থেকে ৬৫-৭০ মাইল দূরে একটা গ্রামে নিয়ে যায় সে।অদ্ভুত সুন্দর একটি গ্রাম।এখানে নানা শরনের ফলের সমারহ আমাকে অবাক করেছে।কর্নেলের ছেলের নাম আসিফ।সেও খু আমুদে মনে হলো।সেখানে গিয়ে আমার মায়ের ডিমান্ড অনুসারে একটা আফগানি চাদর কিনে ছিলাম যেটা আম্মু এখনো পড়ে।বাজারে হাটতে হাটতে একটা যায়গায় দেয়াল লিখন দেখে আমি আমি আসিফের কাছে জানতে চাইলাম বলতো এটাতে কি লেখা আছে।আমাদের দেশের মত দেয়াল লিখন না জানলেতো আর হয়না।সে বল্লো পাকিস্তান -আমেরিকা ভাই ভাই রাশিয়াকে কর গুডবাই এই রকম ছড়ার ছন্দে লেখা।আমি কিছুখনের জন্য অবাক হয়ে আবার স্বাভাবিক হয়েগেলাম।কিছুদুর গিয়ে দেখি অনেক লোকজন একসাথে জটলা হয়ে আছে তাদের সকলের সাথে অস্ত্র।আম্রা গিয়েছিলাম দুপুরের দিকে।সেখানে একজন লম্বা দাড়িওয়ালা বৃদ্ধ সবাইকে একটা কাগজ দিচ্ছে।আমি আসিফ কে বললাম চলো অইখানে গিয়ে দেখি কি হয়।সে বল্লো এরা পাহারাদার দেশ কে পাহারা দেই।উর্দুতে এক্তা শব্দ উচ্চারন করেছিলো সেটার কথা মনে নাই।আমি শুধু বলেছিলাম এরা যদি দেশ পাহারা দেই তাহলে তোমার বাবারা কি করেন।তার উত্তর ছিলো এইরকম-সেনাবাহিনীকে সাহাজ্য করবার জন্যই এরা কাজ করে।আমি অবাক হয়েছিলাম যে সেনা বাহিনী ছাড়া এত আধুনিক অস্ত্র এদের কাছে থাকে কিভাবে।আমাকে এবার সত্যি অবাক করলো এবং এর পর থেকে এই অবাক হওয়া এখনও আছে।