পিলখানা হত্যাকান্ড সম্পর্কিত সরকারি তদন্ত রিপোর্ট
বেরিয়ে আসছে বিস্ময়কর ও পিলে চমকানো অনেক তথ্য
পিলখানায় বিদ্রোহের আড়ালে সেনা অফিসারদের হত্যাকান্ডের ওপর সরকারি তদন্ত কমিটির রিপোর্টকে কেন্দ্র করে নানামুখী আলোচনা শুরু হয়েছে। এই আলোচনায় ঘুরে ফিরে আসছে কিছু বিশেষ বিষয়। তদন্ত রিপোর্টে সেনা অফিসারদের হত্যাকান্ড সম্পর্কিত অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নেরই সঠিক উত্তর পাওয়া যায়নি। তদন্ত কমিটি অনেক বিষয়কে পাশও কাটিয়ে গেছে। প্রথমে মনে হয়েছিল, তদন্ত বলতে যা বোঝায় তার কিছুই করা হয়নি। এতে প্রশ্ন ও আপত্তির সৃষ্টি হলেও যতো দিন যাচ্ছে ততো পরিষ্কার হয়ে উঠছে যে, সবই তদন্ত কমিটির ইচ্ছাকৃত নয়। আসলেও কমিটির অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল। তদন্ত কমিটি এনএসআই, ডিজিএফআই, র্যা ব, সিআইডি ও এসবিসহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পায়নি। তাদেরকে টিএফআই সেলের ইন্টেরোগেশন রিপোর্ট দেখতে দেয়া হয়নি। তদন্ত কর্মকর্তারা রিপোর্টে এসব সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছেন। বলেছেন, ?আরো তদন্ত হওয়া দরকার'। এজন্যই রিপোর্টে অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি, অনেক বিষয়ে জানাও যায়নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও তদন্ত রিপোর্টে এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে যেগুলোর ভিত্তিতে রহস্য উন্মোচনের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।
সীমাবদ্ধতার কারণে বিদ্রোহের মূল পরিকল্পনাকারী কারা ছিল তদন্ত কমিটি তা সনাক্ত করতে পারেনি। কমিটি প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করতে না পারলেও রিপোর্ট পড়লে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, পেছনে ছিল সুচিন্তিত পরিকল্পনা। রিপোর্টের কিছু তথ্য লক্ষ্য করলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। এখানে দু'জন সিপাহীর স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য উল্লেখ করা যায়। ৩৯ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের মো. আশরাফুল আলম (নং ৫৯১১৫০) ও মো. আলমগীর শেখ (নং ৫৯১০০) জানিয়েছে, নির্বাচনের কয়েকদিন পর থেকেই আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে তাদের বৈঠক হয়েছে। সেই থেকে শুরু। এরপর দীর্ঘ দু'মাস ধরে নিয়মিতভাবে ব্যারিস্টার তাপস ও প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের সঙ্গে তাদের বৈঠক ও আলোচনা হয়েছে। গুলশানের একটি বাসভবনেও বৈঠকের উল্লেখ করেছে তারা। ডিএডি হাবিব তার অডিও স্বীকারোক্তিতে বলেছে, ব্যারিস্টার তাপসের পাশাপাশি শেখ সেলিম এমপির সঙ্গেও তারা বৈঠক করেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রতিমন্ত্রী নানক এবং সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে খুনি-ঘাতকদের- রিপোর্টের ভাষায় বিদ্রোহীদের বৈঠক হয়েছে। সে বৈঠকেই সেনা অফিসারদের হত্যাকান্ডের চূড়ান্ত পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়েছিল। ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতেও ব্যারিস্টার তাপস পিলখানার ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন। তদন্ত রিপোর্টের ভাষায় উদ্দেশ্য ছিল ?মপিং আপ' অর্থাৎ সব কাজ শেষ করার নির্দেশ দেয়া ও আয়োজন নিশ্চিত করা। তিনি দ্রুত সব কাজ শেষ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলেও তারা স্বীকারোক্তি দিয়েছে। এতে ব্যারিস্টার তাপসের সম্পৃক্ততার বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে। উল্লেখ্য, ২৬ তারিখে এই এমপি তাপসই তিন কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা খালি করার ঘোষণা প্রচার করিয়ে জনমনে আতংক ছড়িয়েছিলেন। প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল খুনি-ঘাতকদের পালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা।
খুনি-ঘাতকদের নিরাপদে পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারেও রিপোর্টে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য রয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, পিলখানা গেইটের অদূরে পুলিশ ও র্যা ব অবস্থান নিলেও বিডিআর সদর দফতরের চারদিকের দেয়াল ছিল অরক্ষিত। কর্ডনেরও কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে খুনি-ঘাতকরা নির্বিঘ্নে দেয়াল টপকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। সন্ধ্যায় উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করা হয়েছিল। এতে লুটের মালামালসহ বেরিয়ে যেতেও খুনি-ঘাতকদের পক্ষে সুবিধা হয়েছে। কোনো কর্ডন না থাকায় পোশাক বদলে ও দেয়াল টপকে তারা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে পেরেছিল। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হলো, ২৬ ফেব্রুয়ারি সেনা অফিসারদের পরিবার সদস্যরা বেরিয়ে এলেও বিডিআরের জেসিও ও সৈনিকদের কারো স্বজনকে আসতে দেখা যায়নি। অথচ কয়েক শ' পরিবার পিলখানায় বসবাস করতো। এ থেকে তদন্ত কমিটি নিশ্চিত হয়েছে, পিলখানা হত্যাকান্ডের আগেই বেশিরভাগ বিডিআর সদস্য তাদের পরিবারকে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিল। বাকিদেরকেও খুনি-ঘাতকদের মতোই বিশেষ ব্যবস্থায় নিরাপদে পালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অর্থাৎ হত্যাকান্ড ছিল পূর্বপরিকল্পিত।
রাজনৈতিক সমাধানের নামে সময় ক্ষেপণেও বিস্মিত হয়েছে তদন্ত কমিটি। কমিটির মতে কম করে হলেও ২৯ ঘণ্টা সময় পেয়েছিল খুনি-ঘাতকরা। এ সময়ের মধ্যে তারা ধীরেসুস্থেই হত্যাকান্ড ঘটানোর, লাশ গুম করার, নির্যাতন ও লুটতরাজ করার এবং সবশেষে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। খুবই বিস্ময়কর হচ্ছে, সমঝোতা আলোচনার জন্য ডিএডি তৌহিদের নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন যমুনায় যে ১৪ জন খুনি-ঘাতক গিয়েছিল তাদের কারো নামই কোথাও পাওয়া যায়নি। অথচ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের ক্ষেত্রে রেজিস্টারে নাম লেখানো এবং সাক্ষাৎকারীর স্বাক্ষর নেয়া বাধ্যতামূলক। শুধু তাই নয়, সাক্ষাৎকারীরা ঠিক কখন ঢোকে এবং কখন বেরিয়ে যায় ঘড়ি ধরে তারও রেকর্ড রাখা হয়। তাছাড়া সাক্ষাৎকারীদের প্রত্যেককে আলাদা আলাদা আইডি কার্ড দেয়া হয়। এই কার্ড বুকে ঝুলিয়ে তারপর প্রধানমন্ত্রীর কাছে যেতে হয়, ফিরে যাওয়ার সময় কার্ডগুলো ফেরত দিতে হয়। স্বাভাবিক পরিস্থিতেও এসব নিয়ম কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়। কিন্তু হত্যাকান্ডের দিন ১৪ জন বিডিআর সদস্য গেলেও তাদের কারো নামই বাসভবনের রেজিস্টারে পাওয়া যায়নি। বাসভবনের ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরাতেও তাদের কারো ছবি পাননি তদন্ত কর্মকর্তারা। এমনটা শুধু তখনই সম্ভব যখন পেছনে সুনির্দিষ্ট আয়োজন থাকে এবং সে আয়োজনের ভিত্তিতে ছবিগুলো মুছে ফেলা হয়। এক্ষেত্রেও তেমনটি করা হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। একই কারণে রেজিস্টারেও কারো নাম তালিকাভুক্ত করা হয়নি। বিষয়টি নিঃসন্দেহে রহস্যজনক।
এখানে বিস্ময়কর অন্য একটি বিষয়েরও উল্লেখ করা দরকার। খুনি-ঘাতকরা যখন প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থিত হয়েছিল তখন সেখানে সেনাপ্রধানসহ তিন বাহিনী প্রধানও উপস্থিত ছিলেন। ১৪ জনের প্রতিনিধি দল শর্ত আরোপ করে বসে, সেনাবাহিনীর বর্তমান ও প্রাক্তন কোনো অফিসার উপস্থিত থাকলে তারা আলোচনা করবে না। ওই পর্যায়ে তিন বাহিনীর প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারেক সিদ্দিকী বেরিয়ে যান। এটা এক অবিশ্বাস্য ও লজ্জাকর ঘটনা। প্রতিমন্ত্রী নানক তখন জানিয়েছিলেন, ভেতরে বিডিআরের ডিজিসহ অন্যান্য অফিসারদের ব্যাপারে আলাপ হয়েছে। তারা সবাই ভালো আছেন বলে প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিনিধি দল জানিয়েছে। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী সে আলোচনায় সেনা অফিসারদের বিষয়টি তেমন গুরুত্বসহকারে উপস্থাপন করেছিলেন কি না তদন্ত কমিটি তা জানতে পারেনি।
তদন্ত কমিটির দৃষ্টিতে আরো অনেক বিষয়ই রহস্যের সৃষ্টি করেছে। যেমন ডিএডি হাবিবের অডিও স্বীকারোক্তির কোনো খোঁজই পায়নি তদন্ত কমিটি। অথচ ওই স্বীকারোক্তিতে ডিএডি হাবিব জানিয়েছিল, তারা ব্যারিস্টার তাপস ও শেখ সেলিম এমপির সঙ্গে বৈঠক করেছে। ডিএডি হাবিবের সে অডিও স্বীকারোক্তি যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে! তাছাড়া হত্যাকান্ড চলার সময় এবং হত্যাকান্ডের আগে-পরে খুনি-ঘাতকরা মোবাইলে যেসব কথা বলেছে সেগুলোর ভয়েস রেকর্ডও পাওয়া যায়নি। এগুলো সম্ভবত ধ্বংস করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলী বিদেশেও অনেক কথা বলেছিল বলে স্বীকার করেছে, জানাও গেছে। কিন্তু সেসবেরও কোনো রেকর্ড পাওয়া যায়নি।
সেনা অভিযান না চালানোর সিদ্ধান্তেও বিস্মিত হয়েছে তদন্ত কমিটি। ভৌগোলিক অবস্থান ও ঘনবসতির যে যুক্তিকে অভিযান না চালানোর অজুহাত বানানো হয়েছে তাকে তদন্ত কমিটির কাছে ?যুক্তিযুক্ত' মনে হয়নি। রিপোর্টেও বলা হয়েছে, আশপাশে প্রাণহানির যে যুক্তি দেয়া হয়েছে সেটা সঠিক নয়। কারণ, সকাল সাড়ে নয়টায় র্যা বের প্রথম দল পৌঁছে যায়। এর পর পর যায় সেনাবাহিনীর ৪৬ ব্রিগেডের পাঁচশ সেনা। বেলা ১২টা- সাড়ে ১২টার মধ্যেই তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু তাদেরকে রাজনৈতিক সমাধানের স্বার্থে বিডিআরের ?দৃষ্টি সীমার' বাইরে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।
তদন্ত রিপোর্টের অন্য কিছু তথ্যও উল্লেখ করা দরকার। যেমন বিদ্রোহের সময় স্লোগান হয়েছিল, ?জয় বাংলা, জয় বিডিআর'। ঘটনার দিন নানকদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের দুই এমপি মাহবুব আরা গিনি এবং ওয়ারেসাত হোসেন। এদের ব্যাপারে তেমন আলোচনা লক্ষ্য করা যায়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রিপোর্টের নির্বাচিত যে অংশটুকু প্রকাশ করেছেন তার মধ্যে এমনকি ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও ফজলুল করিম সেলিমের নামও উল্লেখ করা হয়নি। অথচ রিপোর্টে তাদের নাম এসেছে কয়েকবার। রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিশেষ ব্যবস্থায় পিলখানার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করা হয়েছিল। এটা বিডিআরের পক্ষে সম্ভব ছিল না। সহযোগিতা ছিল বাইরের। বড়কথা, পিলখানা এলাকা কোনো পর্যায়েই কার্যকর কর্ডনের অধীনে ছিল না। ফলে খুনি-ঘাতকরা ইচ্ছামতো পালিয়ে যেতে পেরেছিল।
