স্পর্শকাতর রাজনৈতিক বিষয় থেকে হাইকোর্টের সযত্নে দূরে থাকা উচিত |

SalimC's picture
Posted by
SalimC
Sunday, May 24, 2009 - 12:11pm BST

স্পর্শকাতর রাজনৈতিক বিষয় থেকে হাইকোর্টের সযত্নে দূরে থাকা উচিত|
আসিফ আরসালানঃ
আওয়ামী ঘরানার বন্ধুরা মরহুম কবি শামসুর রাহমানের একটি কবিতার উহ্নৃতি দেন প্রায়শই। উহ্নৃতিটি হলো,'অদ্ভুত উটের পিঠে চলেছে হ্নদেশ।' আসলেই তাই।কিম্ভূতকিমাকার সব ঘটনা ঘটছে বাংলাদেশে।কামারের কাজ কুমার করছে, আর কুমারের কাজ কামার করছে। এই রকম অবন্সায় ফলটা কি হতে পারে?কুমারের হাঁড়ি-পাতিলও বানানো হয় না, আর কামারেরও লোহা গরম করে সেটিকে ঠিকমতো বাঁকানো যায় না। এখন বাংলাদেশে চলছে ঠিক সেই রকম অবন্সা। রাজনৈতিক ইস্যুসমূহের ফয়সালা হবে রাজপথের মিছিলে অথবা পঙ্গন ময়দানের জনসভায় অথবা জাতীয় সংসদের অধিবেশনে।পক্ষাশ্চরে জজ কোর্ট, হাইকোর্ট, সুপ্রীম কোর্টে নি-ত্তি হবে মামলা মোকদ্দমা সেটা হতে পারে দেওয়ানী মামলা বা ফৌজদারী মামলা।আরো হতে পারে কোম্পানি আইনের মামলা অথবা সাংবিধানিক মামলা মোকদ্দমা।কিশ্চু আমাদের দুর্ভাগ্য, দেশের রাজনৈতিক সমস্যাগুলোও আইন আদালতে নেয়া হচ্ছে।আর আইন আদালতও ঐসব মামলা গ্রহণ করছেন এবং বিচার করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাই দেখা যায় যে, ১৫ আগস্ট শোক দিবস কিনা, ঐদিন জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে কিনা, জাতীয় শোক দিবস হিসাবে ঐদিন সরকারি ছুটি থাকবে কিনা, সেই সমস্ত বিষয়ের ফয়সালা হচ্ছে হাইকোর্টে।তাহলে পার্লামেনর্ট? পলিটিক্যাল পার্টি, পলিটিক্যাল ফোরাম, নির্বাচনী মেনিফেস্টো এবং সাধারণ নির্বাচনের আর প্রয়োজন কি? ১৫ আগস্টের তো ছুটি হলো। তাহলে ৭ নবেম্বরের কি হবে? তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যানারে যে সরকার দুই বছর দেশ শাসন করল তারা ৭ নবেম্বরকে টাচ করল না। এখন ৭ নবেম্বরে কি হবে? এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর সারা বছরে যেসব দিনকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে তার মধ্যে ৭ নবেম্বর নেই। ৭ নবেম্বরের সরকারি ছুটি তারা বাতিল করে দিয়েছে। এ ব্যাপারে হাইকোর্ট বা সুপ্রীম কোর্ট কি বলবেন? বিশেষ করে ঐসব বেঞ্চ বা বিচারপতি যারা ১৫ আগস্টকে জাতীয় শোক দিবস এবং সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছেন। যেহেতু বিষয়টি রাজনৈতিক তাই তারা ৭ নবেম্বরে বিষয়টিও স্যুয়োমটো টেকআপ করতে পারতেন। আগামী নির্বাচনে বিরোধীদল যদি মেজরিটি পেয়ে সরকার গঠন করে এবং হাইকোর্টের ঐ সিহ্নাশ্চ বাতিল করে তাহলে হাইকোর্ট কি বলবেন? বাতিলের সেই সিহ্নাশ্চ যদি পার্লামে??র মেজরিটি পেয়ে সমর্থিত হয় তাহলে কারো কিছু বলার থাকবে কি? আমাদের দেশে অতীতে এসব ঘটনা ঘটেছে। ১৫ আগস্ট আর ৭ নবেম্বর নিয়ে অনেক পাঙ্গা-পাঙ্গি হয়েছে। একবার সরকারি ছুটি হয়েছে, আরেকবার বাতিল হয়েছে। কারণ ১৯৯১ সাল থেকে দেশের ৪টি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। ১৯৯১ সালে এসেছে বিএনপি সরকার। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার। ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার। আবার ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। তাই ২ বার করে ১৫ আগস্ট এবং ৭ নবেম্বর বহাল থেকেছে আবার ২ বার করে বাতিল হয়েছে। এভাবে চলতে চলতে এক সময় এই দুটি ইস্যুরও চূড়াশ্চ ফয়সালা হয়ে যেত।
দুই.
এদেশে কথায় কথায় ভারতীয় গণতমের উদাহরণ দেয়া হয়। ভারত এই ধরনের রাজনৈতিক ইস্যুর সমাধান করেনি সুপ্রীম কোর্ট। ভারতের প্রাদেশিক অথবা সুপ্রীম কোর্ট বিগত ৬২ বছরে একটি রাজনৈতিক বিষয়েও কোনো রায় দিয়েছে বলে সংবাদপত্রের পাতায় দেখিনি। সংবিধানের ১০৬ ধারায় সুপ্রীম কোর্টকে উপদেষ্টামূলক এখতিয়ার দেয়া হয়েছে। সেটি কোন বিষয়ে? সেটি হল,'সংবিধানের ব্যাখ্যার বিষয়।' কিশ্চু ১৫ই আগস্টের সরকারি ছুটি অথবা ৭ই নবেম্বরের ছুটি বাতিল হবে কিনা, সেগুলো অবশ্যই সাংবিধানিক বিষয় নয়। সংবিধানে এগুলোর নামগন্ধও নেই। এগুলো সন্দেহাতীতভাবে রাজনৈতিক বিষয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুস্পষ্টভাবে দুটি ধারা প্রবহমান। একটি হলো আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদভিত্তিক ধর্মনিরপেক্ষ স্রোতধারা। আরেকটি হলো বিএনপি'র নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী মূল্যবোধ সম্পন্ন স্রোতধারা। দুটি স্রোতধারাই অত্যশ্চ শক্তিশালী। পালাক্রমে এক একটি ধারা নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের রায়ে ক্ষমতায় আসে। আওয়ামী ঘরানা শেখ মুজিবকে জাতির পিতা মনে করে, ১৫ আগস্টকে জাতীয় শোক দিবস মনে করে, ৭ই নবেম্বরকে সামরিক বাহিনীতে শৃঙ্কলাভঙ্গের দিবস বলে মনে করে। পক্ষাশ্চরে বিএনপি ঘরানা শেখ মুজিবকে জাতির পিতা মনে করে না, ১৫ই আগস্টকে জাতীয় শোক দিবস হিসাবে গণ্য করে না এবং ৭ই নবেম্বরকে সিপাহী জনতার বিপ্লব ও সংহতি দিবস মনে করে। প্রধান দুটি রাজনৈতিক ঘরানার মধ্যে বিরাজমান রাজনৈতিক মতভেদ রীতিমত আদর্শিক মতভেদ। তাই তাদের বিভাজন অত্যশ্চ তীক্ষ্ণ। বিগত ৩৮ বছরে এই আদর্শিক ভেদরেখা মিলিয়ে যায়নি। আগামীতেও মিলিয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ, একটু আগেই বলেছি যে বিভাজনটি আদর্শিক এবং মৌলিক। এই আদর্শিক প্রশ্নে হাইকোর্ট বা সুপ্রীম কোর্টের বিশেষ বিশেষ বিচারপতি পার্টি হতে যাচ্ছেন কেন? যেসব রাজনৈতিক বিষয়ে তীব্র বিতর্ক সারাদেশ জুড়ে বিরাজ করছে সেখানে একটি বিশেষ মতবাদের হ্নপক্ষে রায় দিয়ে ঐ দু'-একজন বিচারপতি নিজেদের বিতর্কিত করছেন কেন? বাংলাদেশের জনগণ কিশ্চু আগের চেয়ে অনেক বেশি শিক্ষিত হয়েছেন। তাদের রাজনৈতিক চেতনাও এখন অনেক বেশি প্রখর। এখন অশ্চত ১০টি টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় খবর হচ্ছে। অসংখ্য 'টকশো' হচ্ছে। পত্র-পত্রিকাগুলোতে উপসম্পাদকীয়, নিবন্ধ, কলাম, মশ্চব্য প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে। ফলে মানুষ আগের চেয়ে এখন রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি সচেতন। তাই দু'একজন বিচারপতি সম্পর্কে জনগণের মধ্যে ইতিমধ্যেই একটি ধারণার সৃষ্টি হয়েছে যে, এরা সম্ভবত আওয়ামী ঘরানার ঘোরতর সমর্থক। রাজনৈতিক মামলা গ্রহণ করে এবং বিশেষ লাইনে সেই মামলার রায় দিয়ে তারা ঐ ধারণাকে আরো জোরদার করবেন কেন?
তিন.
এমন একটি পটভূমিতে হাইকোর্টে উঠেছে আরেকটি রাজনৈতিক মামলা। বিচারপতিও সেই একই। মামলার মূল বিষয় হলো, মরহুম জিয়াউর রহমান হ্নাধীনতার ঘোষক নন। হ্নাধীনতার ঘোষক হলেন প্রাক্তন প্রেসিডে? ও প্রধানমমী শেখ মুজিবুর রহমান।ঘটনার বিবরণে প্রকাশ, গত ২০ এপ্রিল হাইকোর্ট সরকারের প্রতি একসাথে দুটি রুল জারি করেছে।'বাংলাদেশের হ্নাধীনতা যুহ্নের দলিলপত্রের' ২০০৪ সালের সংস্করণে মেজর জিয়াউর রহমানকে হ্নাধীনতার ঘোষক হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। গ্রহ্নের আলোচ্য সংস্করণে অর্থাৎ নবম খন্ডে বলা হয়েছে যে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান হ্নাধীনতা ঘোষণা করেন। মেজর জিয়াকে হ্নাধীনতার ঘোষক হিসাবে আখ্যায়িত করার জন্য আলোচ্য গ্রহ্নের ২০০৪ সংস্করণ কেন নিষিহ্ন ঘোষণা করা হবে না তার কারণ দর্শানোর জন্য হাইকোর্ট সরকারের প্রতি রুল জারি করেছে। দ্বিতীয় রুলে সরকারকে ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছে যে, যারা হ্নাধীনতার ঘোষণার প্রকৃত ইতিহাসকে বিকৃত করেছে তাদের বিরুহ্নে কেন ব্যবন্সা গ্রহণ করা হবে না? বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের হ্নাধীনতা ঘোষণা করেছেন শেখ মুজিবুর রহমান। সেই ইতিহাস কেন বিকৃত করা হয়েছে সেজন্য সরকারকে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে। ৪ দলীয় জোট সরকারের আমলে হ্নাধীনতা যুহ্নের দলিলপত্রের ২০০৪ সালের জুন সংস্করণে একটি তথ্য সংযোজিত হয়। ঐ তথ্যে বলা হয় যে, ১৯৭১ সালে ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান হ্নাধীনতা ঘোষণা করেন। এই তথ্যে বিরুহ্নে হাইকোর্টে একটি মামলা দায়ের করা হয়। ঐ মামলায় বলা হয় যে, আলোচ্য তথ্যটি আইন ও সংবিধানের লঙ্ঘন। মামলার শুনানিতে বাদীর পক্ষভুক্ত হওয়ার জন্য সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের তরফ থেকে লে. জেনারেল হারুন-উর-রশিদ আবেদন করেন। বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক এবং বিচারপতি এম. মমতাজউদ্দিন আহমদ সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ সরকারের প্রতি উপরোক্ত দুটি রুল জারি করেন। বাদীর আর্জিতে বলা হয় যে, সংবিধানের ১৫০ ধারা এবং চতুর্থ তফসিল হ্নাধীনতার ঘোষণাকে প্রোটেকশন দিয়েছে। কারণ, হ্নাধীনতার ঘোষণা একটি আইনগত দলিল। সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে হ্নীকৃতি দেয়া হয়েছে যে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ হ্নাধীনতা ঘোষণা করেছেন শেখ মুজিবুর রহমান। সুতরাং ?হ্নাধীনতার দলিলপত্র' নামক আলোচ্য গ্রহ্নে মেজর জিয়াউর রহমানকে হ্নাধীনতার ঘোষক হিসেবে উপন্সাপন করা আইন ও সংবিধানের পরিপ?x। এ ব্যাপারে বক্তব্য প্রদানের পূর্বে আদালতের এমিকাস কিউরী (আদালতের সাহায্যকারী) হিসাবে ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম হ্নাধীনতা ঘোষণার পটভূমি বর্ণনা করেন।
এর আগে বিবাদীর পক্ষভুক্ত হওয়ার জন্য মুক্তিযোহ্না উইং কমান্ডার হামিদুল্লাহ খান বীর প্রতীক আবেদন জানালে হাইকোর্ট সেটি গ্রহণ করে। জনাব হামিদুল্লাহ খানের উকিল এডভোকেট খন্দকার মাহবুব উদ্দিন গত ২১ মে এক আবেদনে বলেন যে, সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ মোতাবেক বাদীর রিট আবেদনটি গ্রহণযোগ্য নয়।কারণ, বাদী যে বিষয়ে আবেদন করেছেন সেটি প্রথমে দেওয়ানী আদালতে দাখিল হওয়া উচিত ছিলো। যেহেতু বিষয়টির সাথে দেওয়ানী বিষয় জড়িত তাই হাইকোর্টে সরাসরি রিট আবেদন চলতে পারে না।হাইকোর্ট আগামী ২৮ মে পর্যশ্চ শুনানি মুলতবী করেছে।
চার.
শুধুমাত্র হ্নাধীনতার ঘোষক প্রসঙ্গটিই নয়, ১৯৭২ সালের সংবিধানে জাতির পিতা প্রসঙ্গটিও ন্সান পায় নাই। জাতির পিতা কে অথবা হ্নাধীনতার ঘোষক কে এসব বিষয় সংবিধানের কোথাও নেই। কারণ বিষয়গুলো একাশ্চই রাজনৈতিক। আমি সংবিধানের চতুর্থ তফসিল তথা ১৫০ ধারা পাঠ করলাম। সেখানে শেখ মুজিবকে হ্নাধীনতার ঘোষক বলা হয় নাই। জিয়াউর রহমানকেও বলা হয় নাই। ১৯৭৫ সালের পর থেকে এই জাতি জেনে আসছে যে, মেজর জিয়াউর রহমান হ্নাধীনতার ঘোষক। ৩৩ বছর পর এমন একটি রাজনৈতিক বিষয়ে হাইকোর্টের নিজেকে জড়ানো উচিত হবে না। জড়ালে ঐ বিচারপতি বিতর্কিত হবেন। বিষয়টির ফয়সালা হবে রাজনৈতিক অঙ্গনে।সংখ্যাধিক্যের জোরে আজ যদি আওয়ামী লীগ পার্লামেনর্ট জিয়াউর রহমানকে খারিজ করে দেয় তাহলে পরবর্তী পার্লামেনর্ট এই প্রশ্ন তুলতে পারে যে, শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধু কিনা। তাই এসব স্পর্শকাতর রাজনৈতিক বিষয় থেকে হাইকোর্ট বা সুপ্রীমকোর্ট সযত্নে নিজেদের দূরে রাখবেন, সেটাই জনগণের প্রত্যাশা।