ট্রানজিট-বন্দর ইস্যুতে ভারতের চেয়েও সরকারের উৎসাহই বেশি কেন?

SalimC's picture
Posted by
SalimC
Thursday, July 2, 2009 - 1:51pm BST

ট্রানজিট-বন্দর ইস্যুতে ভারতের চেয়েও সরকারের উৎসাহই বেশি কেন?
দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সংসদীয় আসন নিয়ে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ মহাজোট সরকার কতিপয় সেনসেটিভ ইস্যুর নিত্তিতে তড়িঘড়ি করছে কেন? এর দু'টি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত: সরকার জনমত সংগঠিত হবার আগেই সংসদকে পাশ কাটিয়ে তাদের দায় শোধ করতে চায়। দ্বিতীয়ত: ভারত বর্তমানের ‘বিরল সুযোগ'কে কাজে লাগিয়ে এখনই ট্রানজিট করিডোর, চট্টগ্রাম বন্দর এবং টাস্কফোর্সের প্রশ্নে বাংলাদেশের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আশা করছে। ভারতের দিক থেকে তাদের প্রাপ্যতার টপ প্রায়োরিটি থাকলেও বাংলাদেশের দিক থেকে এসব দ্বি-পাক্ষিক ইস্যুর চেয়েও আভ্যন্তরীণ অনেক বিষয়ের প্রায়োরিটি আরও বেশি। এর মধ্যে রয়েছে গণতন্ত্রে উত্তরণের বর্তমান মুহূর্তে সংসদকে কার্যকর করে গণতন্ত্রের প্রশ্নে জাতীয় ঐক্য ও সমঝোতাকে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠিত করা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও বিরোধী দলের প্রতি আচরণের ক্ষেত্রে যে নবধারার সূচনার কথা বলেছিলেন, তা তাদের সংসদীয় আচরণ ও সরকারি কার্যক্রমে দেখা যায় না। বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পীকার মনোনীত করার বিধান সংবিধানে নেই। তা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু কেবলমাত্র সদিচ্ছার অভাবে তারা ডেপুটি স্পীকার প্রশ্নে তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি থেকে পিছুটান দিয়েছেন। সংসদে স্পীকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। স্পীকারের কোন দলীয় রং নেই। স্পীকার কোন ব্যক্তিমাত্র নন। স্পীকার হচ্ছে একটি প্রতিষ্ঠান। সংসদকে যদি সকল কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু বানাতে হয়, তাহলে স্পীকারের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদাকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রেখে তাকে নিরংকুশ করতে হবে। বিদায়ী স্পীকার সংসদে বিরোধীদলের আসন বিন্যাসে যে সিদ্ধান্ত দিয়ে গেছেন, নয়া স্পীকার সংসদের চেয়ারে বসেই তা পুনর্বিন্যাস করাকে তার প্রায়োরিটি সিদ্ধান্ত হিসেবে কার্যকর করেছেন। সরকারি দলের এমপিরা স্পীকারের এই সিদ্ধান্তে উৎফুল্ল। সুতরাং এ ক্ষেত্রে স্পীকার যে ট্রেজারী বেঞ্চের সদস্যদের চাপেই এটা করেছেন, তা বেশ পরিষ্কার। সংসদকে সচল রাখতে এবং বিরোধীদলকে উপযুক্ত সময় ও সুযোগ দেবার ক্ষেত্রে স্পীকার যে তার স্বাধীন প্রাতিষ্ঠানিক সত্তা ব্যবহার করতে পারবেন না, বিরোধীদলের আসন পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি তাই প্রমাণ করলেন। পূর্বসূরী স্পীকারের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে পারলে স্পীকার তার প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা ও মহিমাকেই আরও উজ্জ্বল করতেন। কিন্তু তিনি নিজেই তার পূর্বসূরীর সিদ্ধান্ত বাতিল বা সংশোধন করে নিজের দল নিরপেক্ষ প্রাতিষ্ঠানিক ইমেজ বিতর্কিত করলেন। এই সিদ্ধান্তে সরকারি দল বিরোধীদলীয় সদস্যদের সংসদের সামনের সারির কয়েকটি আসন থেকে সরিয়ে যতটুকু লাভবান হয়েছে, তার চেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অনেক বেশি। বিশাল মেজরিটির সরকারের মানসিক ক্ষুদ্রত্ব ও দলীয় সংকীর্ণতা গণতন্ত্রের দ্বিচক্রযানটিকে মাঝপথে অচল করে দেবে কিনা, সেই সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
বিরোধীদলীয় নেত্রী, বেগম খালেদা জিয়া, যিনি তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, তার নিরাপত্তার প্রশ্নটিকে সরকার লঘু করে দেখতে শুরু করেছে। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়েও যে সরকার রাজনীতি করে, সে সরকার দেশ ও জনগণের জন্য গঠনমূলক কাজ করবে কখন? স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে যতটুকু নিরাপত্তা তার প্রাপ্য, বেগম খালেদা জিয়াকে তা দেয়া হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা বাড়ানো হবে। একদিকে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা প্রশ্নকে বিবেচনায় রেখে তাকে সুধাসদন থেকে ‘যমুনায়' স্খানান্তর করা হয়েছে। অন্যদিকে বেগম খালেদা জিয়ার এসএসএফ প্রত্যাহার করা হয়েছে। বিরাজমান আইনের চেয়ে নিরাপত্তার প্রশ্নটি আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ইচ্ছা করলেই বিরোধীদলীয় নেত্রীর জন্য পুরো মেয়াদই এসএসএফ নিয়োগ করতে পারে। এসএসএফ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্খা। জনগণের অর্থে এদের পালন-পোষণ করা হয়। সুতরাং বিরোধীদলীয় নেত্রীর জন্য এসএসএফ নিয়োগ করলে সে জন্য কারও ব্যক্তিগত বা দলীয় তহবিল থেকে অর্থ খরচ করতে হবে না। যার জন্য নিরাপত্তা, তিনি যদি তার জীবনের জন্য হুমকি মনে করেন, তাহলে সে ক্ষেত্রে সরকারের ভিন্ন মত দেয়া অশোভন। বিভিন্ন সূত্রমতে, জঙ্গিদের দিক থেকে দু'নেত্রীর জীবনই হুমকির সম্মুখীন। সুতরাং একজনকে এসএসএফসহ অন্যান্য নিরাপত্তা বলয়ের সুরক্ষিত সুবিধা দিয়ে অন্যজনকে দুষ্কৃতকারীদের নিশানায় ন্যস্ত করা সরকারের সুবিবেচনা নয়। বিগত ১/১১-এর পর জাতীয় দুর্যোগকালে প্রমাণ হয়েছে যে, চলমান জাতীয় রাজনীতিতে দু'নেত্রী জাতীয় ঐক্য ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের অপরিহার্য সত্তা। দেশবাসী প্রধানমন্ত্রীর এবারের বক্তব্যে আশাবাদী হয়ে ধারণা করেছিল যে, একটি নয়া সংসদীয় সংস্কৃতি তারা দেখতে পাবেন। বিশেষ করে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে এবং ১/১১-এর সরকারের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন ও বৈধতা দানের ক্ষেত্রে সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে একটা ঘনিষ্ঠ ওয়ার্কিং রিলেশন ও সমঝোতার চেতনা থাকা দরকার ছিল। কিন্তু সরকারী দল সংসদীয় আসন দখল এবং বিরোধীদলীয় নেত্রীর এসএসএফ নিরাপত্তা প্রত্যাহার করে গণতান্ত্রিক আবহকে সংঘাতমুখী করে দিয়েছে।
হয়তো ভারতের প্রশ্নে এবং অন্যান্য ইস্যূতে সরকার এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিতে চায়, যাতে তারা বিরোধী দলকে শেয়ার করতে দিতে অনিচ্ছুক। জনমত এবং সংসদকে নাকচ করে যে সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, সে সরকার তার নৈতিক অবস্খান নিয়ে শংকিত বলেই তড়িঘড়ি চোরাপথে সিদ্ধান্ত নিতে চায়।নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ‘দেশ বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও' শ্লোগানকে ব্যঙ্গ করে তাঁর স্বভাবসুলভ ভাষায় বলেছিলেন, তারা দেশ বেচা ও মানুষ মারার নীতিতে বিশ্বাসী। তবে আওয়ামী লীগের সামনে সত্যি সত্যি দেশ রক্ষার চ্যালেঞ্জ উপস্খিত। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জনগণ তাদেরকে বিপুল ম্যান্ডেট দিয়ে দেশ রক্ষার শক্তির যোগান দিয়েছে। সরকার চাইলে জাতীয় স্বার্থে এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে বিরোধীদলের সহায়তা নিতে পারে। কিন্তু সরকার তাদের ছকের বাইরে বেরুতে পারছে না। গণতান্ত্রিক সমাজে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের মাঝে নির্বাচন-পূর্বকালে যতো বিভক্তি ও বাক-বিতণ্ডাই থাকুক না কেন, নির্বাচনের পর তা থাকে না। কিন্তু বর্তমান সরকার সংসদে ও সরকার পরিচালনায় অ দলপ্রীতি ও প্রভুভক্তির যে কালচার পুন:প্রবর্তন করেছে, তাতে দেশ, অর্জিত গণতন্ত্র এবং জাতীয় স্খিতি-আবারও বিপন্ন হতে পারে।
ভারতের দিক থেকে বাংলাদেশের কাছে ট্রানজিট করিডোর টাস্কফোর্স সমুদ্র বন্দর ইত্যাদি ইস্যুতে যে সব প্রত্যাশা ও চাপ রয়েছে, তা দলীয় সরকারের কোন একক বিষয় নয়। এটি জাতীয় ইস্যু। সুতরাং এ ব্যাপারে সরকার যে সিদ্ধান্তই নিক না কেন, তা হতে হবে ব্যাপক জাতীয় সমঝোতার মাধ্যমে। আর সমঝোতার জন্য দরকার হচ্ছে সংসদে ও সংসদের বাইরে বিরোধী দলসহ অন্যান্য সামাজিক শক্তির সাথে সরকারের সমঝোতা তৈরী করা। আমরা লক্ষ্য করছি, আওয়ামী লীগ যখনই সরকার গঠনের সুযোগ পায়, তখন তারা ক্ষমতাকে অব দ্য ইন্ডিয়া, বাই দ্য ইন্ডিয়া এন্ড ফর দ্য ইন্ডিয়া ছাড়া অন্য কোনভাবে দেখে না। আওয়ামী লীগ সরকার যখন ভারতকে স্খল ট্রানজিটের নামে করিডোর প্রদান, বাণিজ্যবৃদ্ধির নামে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার এবং তথাকথিত জঙ্গি দমনের নামে ভারতের সাথে টাস্কফোর্স গঠনের জন্য উতলা হয়ে উঠেছে, তখন ভারতীয় বিএসএফ'র ঘাতকদের হাতে সীমান্তে বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষ বেঘোরে জীবন দিচ্ছে। ‘ভারত বাব' সরকার ক্ষমতায় থাকলেও সীমান্ত সন্ত্রাস ভারত একদিনের জন্যও ব করেনি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ই পদুয়ায় ভারতীয় বিএসএফ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে হানা দিতে এসে বিপুল জীবনহানির খেসারত দিয়েছিল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসায় নয়াদিল্লী-কলকাতা-আগরতলা-গৌহাটিতে আনন্দের বন্যা বইয়ে গেছে। ভারতের প্রত্যাশা ও আকাশস্পর্শী হয়েছে। ‘দিন বদলের' প্রতিশ্রুতি দেয়া সরকার ভারতের প্রয়োজনে দেশটাকেও ইচ্ছা করলে বদলে দিতে পারে। আওয়ামী লীগকে নেপথ্য থেকে যারা ক্ষমতায় এনেছে, তাদের চেলা চামুন্ডারা কয়েকদিন আগে বাংলাদেশ সীমান্তের ওপারে ‘স্বাধীন বঙ্গভূমির' দাবীতে কয়েক হাজার লোক নিয়ে সমাবেশ করেছে। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার' সরকার এ নিয়ে ভারতের কাছে কোন প্রতিবাদ করেনি। ট্রানজিট-করিডোর-বন্দর দাও, নইলে বাংলাদেশের ভূ-খণ্ডে ওরা ‘স্বাধীন বঙ্গভূমি' বানাবে, এই বার্তা পৌঁছে দেবার জন্যই ডা: কালিদাস বৈদ্য চিত্ত সুতারদের অনুগামীরা ‘বঙ্গভূমির' দাবী নিয়ে সীমান্তের ওপারে সমাবেশ করেছে।
আমরা কখনও মনে করি না যে, ভারতের সাথে যুদ্ধংদেহী নীতির ওপর আমাদের পররাষ্ট্রনীতি গড়ে ওঠবে। আমরা চাই, সার্বভৌম সমতার নীতিতে ভারতের সাথে সর্বোচ্চ ছাড় দিয়ে একটা সৎপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক গড়ে উঠুক। আমরা এ-ও জানি যে, ভারতের কাছে আমরা বুত্ব চাই না, আমরা অন্তত: সৎপ্রতিবেশীসুলভ আচরণের ন্যূনতম প্রমাণ চাই। এজন্য আমরা প্রথমেই চাই, আস্খার আবহ তৈরি করতে। রাজনীতি ও কূটনীতির দর্শনে কোন বড়ো দেশের পাশে ছোট দেশ ইচ্ছা করলেই আস্খার সম্পর্ক নির্মাণ করতে পারে না। ভারতের দিক থেকে যে ভীতি ও বৈরিতার মনুমেন্ট তৈরি করা হয়েছে, ভারত উদ্যোগ না নিলে তা অপসারণ করা যাবে না। ‘বৃহতের' অহংকার, একাত্তরের ঋণভার এবং ইন্ডিয়ান ডকট্রিনের ‘অখণ্ড' ভারত তত্ত্বের বাইরে এসে ভারত তার প্রতিবেশীদের সাথে সার্বভৌম সমতার নীতিতে সম্পর্ক পুনর্বিন্যাস করতে পারবে বলে আমরা বিশ্বাস করতে পারছি না। ভারত তার ডকট্রিন থেকে সরে না আসা পর্যন্ত এ ব্যাপারে আশ্বস্ত হবার কোন কারণ নেই। দ্বিধাহীনভাবেই একথা উচ্চারণ করতে হবে যে, একাত্তরে ভারতের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা এবং আমাদের জনগণের মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন অভিন্ন ছিল না। ভারতের আগ্রাসী এবং অন্তর্ঘাতী পরিকল্পনা জানতেন বলেই ‘র'-অপারেটিভদের দীর্ঘ অনুরোধ সত্ত্বেও একাত্তরে শেখ মুজিব ভারতে যেতে পারেননি। তাঁর এই সিদ্ধান্ত মিসেস ইন্দিরা গাী কখনো মেনে নিতে পারেননি। শেশ মুজিব যা এড়াতে চেয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রবাসী সরকারের ওপর ভারত সাত দফা চুক্তির মাধ্যমে তাই বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল। রাষ্ট্রের স্খপতি এই চুক্তি অনুমোদন করেননি, বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষ ও রক্তেকেনা স্বাধীনতাকে পিণ্ডির বদলে দিল্লীর কাছে জিম্মি রাখতে চায়নি। স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রসত্তা এবং রাষ্ট্রের মুসলিম আইডেন্টিটি প্রশ্নে শেখ মুজিব আপোষ করেননি। শেখ মুজিব জেনে শুনেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গাীর প্রত্যক্ষ বারণ উপেক্ষা করে লাহোরে ইসলামী সম্মেলন সংস্খায় যোগ দিয়েছিলেন।
ভারতের বুত্বের বিনিময়মূল্য বাবদ আমরা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা এবং সার্বভৌম সত্তা প্রণব বাবুদের জন্য ‘প্রণামী' দিতে পারি না। আওয়ামী লীগ ভারতের সন্তুষ্টির জন্য বার বার জনগণের ম্যান্ডেটের অবমূল্যায়ন করেছে। কিন্তু তার বিনিময়ে ভারত তাদের কী দিয়েছে? বিগত ১/১১-এর পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের ভেতর থেকে যারা ‘মাইনাস' শেখ হাসিনা নতুন আওয়ামী লীগ নিয়ে ক্ষমতার স্বপ্ন দেখেছেন, তাদেরকে কারা মদদ দিয়েছে, শেখ হাসিনা তাদের পরিচয় ভালো করেই জানেন। এদের প্রেতাত্মারাই এক মাসের সরকারের ওপর ভারতের ইচ্ছাপূরণকে টপ প্রায়োরিটি বানিয়ে নিতে চাপ সৃষ্টি করছেন। সরকারের, সামনে পাঁচ বছর সময় আছে। তাহলে সরকার ভারতের চাহিদা পূরণে এতটা তড়িঘড়ি করছেন কেন?
ভারত চাইছে করিডোর। আর সরকারের মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীরা বলছেন, ট্রানজিট কানেকটিভিটি। ভারত কী চাইছে, তা স্পষ্টভাবে সরকার কেন সংসদে উপস্খাপন করছে না? কেন এ বিষয়টি নিয়ে দু'পক্ষই রাখঢাক করছে? ট্রান্সপারেন্সী ছাড়া কোন নির্বাচিত সরকারের কোন সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার নেই। ভারতের সাথে আমরা কয়েকশ' মাইলের করিডোর দিতে চাইলে তা কি গোপনে কিংবা সরকারের নির্বাহী সিদ্ধান্তে করা যাবে? বিরোধীদলকে সংসদ থেকে সরিয়ে দিয়ে সরকার সংসদকেও পাশ কাটিয়ে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা ক্ষুণí করে কোন দেশের সাথে চুক্তি করতে পারে না। অতীতে যখনই কেউ জনগণকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে ভারতের জন্য কোন গণবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তখনই¬¬ তা ঐ সরকারের পতনের কারণ হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার গর্ব করেই বলে থাকে যে, তারা সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব করে না। এটা ঠিক। ১৯৭৫ সালে মাত্র ১৩ মিনিটের সংসদীয় ক্যু করে আওয়ামী লীগ একদলীয় বাকশালের “দ্বিতীয় বিপ্লবের” সূচনা করেছিল। যে সিদ্ধান্ত একটি জাতিকে যুগ যুগ ধরে, বংশানুক্রমে ভোগাবে, তেমন সিদ্ধান্তে কোন সরকারই তড়িঘড়ি করতে পারে না। ভারতের প্রস্তাব বা চাহিদাগুলো আওয়ামী লীগের দলীয় ইস্যু নয়। কিংবা এটা সরকারের একক বিষয়ও নয়। এটা পুরোপুরি জাতীয় ইস্যু।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অনিবার্য ঘটনাপ্রবাহে ভারতের সম্পৃক্তি কাকতালীয় নয়। তবে বাংলাদশের সামনে হয়তো ভারতের সহায়তার কাছে ফিরে যাওয়ার কোন বিকল্প ছিল না। ১৯৪৭ পূর্বকালের রাজনৈতিক সংগ্রামের ধারায় বাংগালী মুসলমানরা কংগ্রেসের হিন্দুত্ববাদী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করেই খণ্ডিত বাংলায় তাদের স্বপ্ন রূপায়ণের লক্ষ্য স্খির করেছিল। সেই সংগ্রামের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্খপতি শেখ মুজিবের রাজনীতি আত্মসমর্পণের নয়। ১৯৪৭-এ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস সাময়িকভাবে কৌশলগত কারণে দেশ-বিভক্তি মেনে নিয়েছিল। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার সুযোগে ভারত যা চেয়েছিল, শেখ মুজিবের দৃঢ়তায় ভারতকে সে অবস্খান থেকে পিছু হটতে হয়েছিল। কিন্তু ভারত ব্যর্থতার গ্লানি কখনো ভোলেনি। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠের সরকারের মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশকে তাদের সামরিক করিডোর বানিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের যুদ্ধকে বাংলাদেশের মাটিতে স্খানান্তরিত করতে চায়। ইঙ্গ-মার্কিন অক্ষশক্তি যেমন আফগান যুদ্ধকে পাকিস্তানে পরিব্যাপ্ত করে দিয়েছে।
যে কোন রাজনৈতিক বিশ্লেষকই একথা বলবেন যে, বিগত চারদশকের মধ্যে আওয়ামী লীগ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। যদিও তারা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে। কিন্তু নবীন বংশধর যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ‘দিন বদলের' অঙ্গীকারে ‘ডিজিটাল' বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যাশায় আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছে বলে দাবি করা হয়, ভারতের সাথে নতুন কোন চুক্তি করার কারণে যদি আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব-নিরাপত্তা-জাতীয় স্খিতি বিপন্ন হয়, তখন কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের নবীন উত্তরাধিকারীরা সরকারকে বাহবা দেবে না।
আমরা আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করছি যে, সরকারের নীতি-নির্ধারকরা ট্রানজিট-করিডোর-চট্টগ্রাম বন্দর ইত্যাদি ইস্যুকে স্রেফ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ইস্যু হিসেবে উপস্খাপন করতে চাইছেন। এটা তারা নতুনভাবে বললেও এই কনসেপ্ট কিন্তু বহুদিন ধরেই ভারতের নীতি-নির্ধারক ও স্ট্রাটেজিস্টরা প্রচার করে আসছেন। যেমন আমাদের সাথে ভারতের বাণিজ্যিক ঘাটতি কমাতে ভারত তাদের দেশে গ্যাস-কয়লা রফতানি এবং করিডোর ও বন্দর ইজারা দেবার পরামর্শ দিয়ে আসছে। এসব ইস্যুকে আমরাই কেবল রাজনৈতিকভাবে দেখছি না। ভারতও এসব দাবিকে জাতীয় নিরাপত্তা এবং এ অঞ্চলে তার সুপারপাওয়ার হিসেবে গড়ে ওঠার শর্ত বলে মনে করে। ভারত যেখানে করিডোর ও বন্দর ইস্যুকে নিছক অর্থনৈতিক ইস্যু মনে করে না, সেখানে সরকারের মন্ত্রীরা কেন সেটা প্রচার করে দিল্লীর সাউথ ব্লকের থার্ডক্লাশ ভাঁড়ের অপবাদ বহন করতে চাইছেন? ভারত আমাদের অপরিহার্য প্রাকৃতিক ও জাতিগত প্রতিবেশী। বুত্ব বদল করা গেলেও প্রতিবেশী বদলানো যায় না। সুতরাং ভারত আমাদের কাছে যা চাইছে, তা প্রত্যাখ্যান করা সহজ নয়। বিশেষ করে বিশ্বায়নের যুগে দেয়া-নেয়ার প্রগতিকে ধারণ করেই এগুতে হবে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, ভারতের নিরাপত্তার সমস্যা বাংলাদেশ নিজ ভূখণ্ডে ডেকে এনে জাতীয় সংকটকে বৃদ্ধি করবে। ভারতের প্রতিটি দাবির পিছনে যেমন রাজনৈতিক দুরভিসি রয়েছে, তেমনি আমাদের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করার প্রবণতাও দৃশ্যমান। এজন্য ভারত বাংলাদেশের সাথে তার সম্পর্ক ও লেনদেনকে দ্বিপাক্ষিকের বাইরে- আঞ্চলিক বা বহুপাক্ষিক আঙ্গিকে বিন্যাস করতে রাজী নয়। করিডোর বা ট্রানজিটকে আমরা উন্মুক্ত করতে চাই। আমরা ভারতের ভেতর দিয়েও ট্রানজিট বা করিডোর চাই। যাতে আমরা পাকিস্তান, মধ্য এশিয়া, নেপাল, ইরান পর্যন্ত যোগাযোগ সম্প্রসারিত করতে পারি। চট্টগ্রাম বন্দর ভারতের পক্ষে আমরাই ব্যবহার করে ভারতকে তার অবকাঠামো ও পরিবহনগত সুবিধা দিতে পারি। কোন অবস্খায়ই আমরা চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর ভারতের উপস্খিতি মেনে নিতে পারি না।
ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশ সরকার ও জনগণকে এটা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে নিতে হবে যে, ভারতের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য বিরাট অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনবে।” তারা আরও মনে করেন, ‘ইতিহাসে এই ধরনের মুহূর্ত বিরল এবং তা খুব কমই আসে। আর এ থেকে লাভ ওঠানোর দায়িত্ব বাংলাদেশের নতুন সরকারের।' কিন্তু লাভের আশায় বাংলাদেশকে ভারতের সামরিক দস্যুতার কাছে ন্যস্ত করা, সমীচীন হবে কি না, সরকারকে ভেবে দেখতে হবে। ভারতের কাছে আমাদের সকল দেনা-পাওনার একটা ব্যালান্সশিট তৈরি করা জরুরি। ভারত যা চায়, তাও প্যাকেজ আকারে সংসদে আসুক। সংসদের বাইরেও এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হোক। পিসমিল বা একক ইস্যুভিত্তিক কোন আলোচনায় বসে ভারতের কাছে হেরে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। ভারত বাংলাদেশের চাওয়া-পাওয়া ও সার্বভৌম ইচ্ছার প্রতি কেমন দৃষ্টিভঙ্গি নেয়, আমরা তাও দেখতে চাই। ‘আস্খার সম্পর্ক গড়ে উঠলে অনেক কিছুই সম্ভব। আওয়ামী লীগকে ঘিরে ভারতের সব না পাওয়ার ক্রোধ একসাথে জাগ্রত হতেই পারে। তবে বর্তমান সরকারের কাছে ভারত যেমন তার প্রত্যাশার পরিধি বাড়িয়ে দিয়েছে, তেমনি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার সরকারকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেও জনগণ জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিশাল দায়িত্ব অর্পণ করেছে। এতে সরকারের বার্গেনিং ক্যাপাসিটিও বেড়েছে। সরকার কিভাবে এই শক্তি ব্যবহার করবে- সেটাই প্রশ্ন।
ইনসেট:প্রতিবেশী দেশ ভারতে রয়েছে ২৭০টি জঙ্গীগোষ্ঠী ও গেরিলা বাহিনী। বার্মার তিনটি প্রদেশ মূলত গেরিলা গোষ্ঠী শাসিত। এতদসত্ত্বেও ভারত নিজ দেশের জঙ্গী গোষ্ঠী দমনে কোন বিদেশী টাস্কফোর্সের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে না, বার্মার তিনটি প্রদেশ গেরিলা শাসিত হওয়ার পরও বার্মা কোন বিদেশী সেনাকে নিজদেশে আমন্ত্রণ করেনি। এমতাবস্খায় শান্তিময় বাংলাদেশের জনপ্রিয় গণতান্ত্রিক সরকার কেন, কি উদ্দেশ্যে বিদেশী বাহিনী দিয়ে নিজ দেশের জনগণকে দমন করতে চায়? তবে কি ডালমে কুচ কালা হায়! অর্থাৎ দেশ ও জনগণের ইচ্ছা ও স্বার্থবিরোধী ট্রানজিট ও চট্টগ্রাম বন্দর ইজারা চুক্তির বিরোধিতাকারী দেশপ্রেমিকদের দমন করতেই কি এই আগাম ব্যবস্খা? ভারতের প্রতিটি প্রদেশে একাধিক জঙ্গী ও গেরিলা গোষ্ঠী রয়েছে যার একটিও ভারত নির্মূল করতে পারেনি। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের কি জানা নেই যে, আমাদের সেনা-পুলিশ বাহিনী বিদেশে গিয়ে শান্তি স্খাপন করে প্রশংসিত হয় অথচ তাদেরকে ফেরত এনে আমরা কি আমাদের দেশের শান্তিশৃকôখলা রক্ষা করতে পারি না?

Related Information