মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার যুদ্ধ নিয়ে এসেছে পাকিস্তানে|

SalimC's picture
Posted by
SalimC
Tuesday, April 28, 2009 - 8:35pm BST

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার যুদ্ধ নিয়ে এসেছে পাকিস্তানে
সন্ত্রাস দমনের নামে ভারত তার যুদ্ধ বাংলাদেশে পাচার করতে চায় |
আহমদ আশিকুল হামিদ : বাংলাদেশে জঙ্গি না থাকলেও জঙ্গিদের দমনের জন্য আওয়ামী লীগ সরকারের ঘুম একেবারে হারাম হয়ে গেছে। ক্ষমতায় আসার পর কিছুদিন পর্যন্ত দক্ষিণ এশীয় টাস্কফোর্স গঠনের নামে হৈচৈ শেষে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, জঙ্গিদের দমনের জন্য তারা ভারতের সাহায্য নেবেন। সিদ্ধান্তটিকে ওয়াকিবহাল মহল সন্দেহ ও আশংকার চোখে দেখছেন। কারণ, এর মাধ্যমে এখনো শান্তির দেশ বাংলাদেশে সন্ত্রাসী তৎপরতা সর্বাত্মক করার পদক্ষেপ নেয়া হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যেমন নিজের যুদ্ধকে পাকিস্তানে নিয়ে এসেছে এবং সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের নামে আফগানিস্তানকেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহে পাকিস্তানকে যুদ্ধ ও সন্ত্রাসের মধ্যে জড়িয়ে ফেলেছে, ভারতও তেমনি বাংলাদেশকে তার নিজের সন্ত্রাসের ভাগাড়ে পরিণত করতে চাচ্ছে। সুযোগ দেয়া হলে ভাগাড়ে পরিণত করবেও।
অথচ হৈচৈ করা হলেও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বলতে যা বোঝায় সে সবের কিছুই নেই বাংলাদেশে। এর প্রমাণ পাওয়া গেছে বিশেষ করে সংসদ নির্বাচনের সময়। হত্যা বা বোমাবাজি দূরে থাক, সন্ত্রাসবাদী কোনো গোষ্ঠীর হদিসই পাওয়া যায়নি। বস্তুত, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট ৬৪ জেলায় একযোগে বোমা বিস্ফোরণের মতো কোনো ঘটনা বাংলাদেশে আর কখনো ঘটেনি। না ঘটার কারণ, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে চারদলীয় জোট সরকারের কঠোর ভূমিকা। শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইসহ জঙ্গি নেতাদের জোট সরকারই গ্রেফতার করেছিল। বিচারও শুরু করেছিল একই সরকার। জোট সরকারের এই কঠোর ভূমিকার কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নকশাল ও বাম সংগঠনগুলোর হত্যা-সন্ত্রাসও প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছিল। এখনো দেশের কোথাও সন্ত্রাসী তৎপরতার খবর পাওয়া যায় না।
এজন্যই প্রশ্ন উঠেছে, জঙ্গিই যেখানে নেই সেখানে কোন জঙ্গিদের দমনের জন্য ভারতের সাহায্য নিতে সরকার এত উতলা হয়ে পড়েছে? এর একটি মাত্রই উত্তর হতে পারে- সরকার আসলে ভারতীয় সেনা বাহিনীকে বাংলাদেশে নিয়ে আসার ফন্দি-ফিকির করছে। এর পেছনেও রয়েছে ভারতেরই প্ররোচনা। প্রধানমন্ত্রী থেকে ক্ষমতাসীনদের প্রত্যেকে তাই জঙ্গি না থাকা সত্ত্বেও তারস্বরে ‘জঙ্গি জঙ্গি' বলে চিৎকার করে চলেছেন। শোরগোল তুলছেন ‘বাঘ এলো, বাঘ এলো' গল্পের সেই রাখাল বালকের মতো। এটাই আপত্তির একমাত্র কারণ নয়। প্রধান কারণ হলো, সাহায্যের জন্য তারা এমন এক দেশের প্রতি হাত বাড়িয়েছেন, যে ভারত নিজেই ‘হাজার ধরনের' সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের কর্মকান্ডে দিশেহারা অবস্থায় রয়েছে। কোন ধরনের জঙ্গি নেই ভারতে? উগ্র হিন্দুত্ববাদী ধর্মীয় সন্ত্রাসী ও নকশাল নামের বামপন্থীরা তো রয়েছেই, পাশাপাশি রয়েছে এমন অনেক গোষ্ঠীও- যারা নিজেদের স্বাধীনতা ও আঞ্চলিক উন্নয়নের জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম করছে। ‘সেভেন সিস্টারস' নামে পরিচিত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যে চলছে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ। ভারত সরকার তাদেরকেও সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করে থাকে।
এ শুধু কথার কথা নয়, সব মিলিয়ে ভারতের সন্ত্রাস পরিস্থিতি আসলেও যে কাউকে ভীত-সন্ত্রস্ত করার মতো। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, দেশটির ৬০৮টি জেলার মধ্যে ২৩১টি জেলাতেই সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চলছে। অর্থাৎ ভারতের প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকাই সন্ত্রাসকবলিত। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে দেশটিতে ২৭০টি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তৎপরতা চালাচ্ছে। এগুলোর মধ্যে শুধু আসামে ও মনিপুরেই রয়েছে যথাক্রমে ৩৬ ও ৩৯টি সংগঠন। নাগাল্যান্ড, পাঞ্জাব ও ত্রিপুরায় কোনো কোনো সংগঠনের নামে ‘কমান্ডো ফোর্স'ও রয়েছে। এগুলো এতটাই শক্তিশালী যে তারা বহুস্থানে সিরিজ বোমারও বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে, ঘটিয়েছেও। ২০০৮ সালে আহমদাবাদে মাত্র ৭০ মিনিটের ব্যবধানে ২১টি, জয়পুরে ১৫ মিনিটের ব্যবধানে নয়টি এবং দিল্লি-তে পাঁচটি বিস্ফোরণ এর উদাহরণ।
অন্য একটি তথ্য হলো, ভারতের মতো বিশ্বের আর কোনো দেশে সন্ত্রাসীদের গুলী ও বোমায় পুলিশ ও সেনাবাহিনীসহ নিরাপত্তা বাহিনীর এত বেশি সংখ্যক সদস্যের মৃত্যু ঘটে না। ভারতে তৎপর ২৭০টি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কোনো কোনো বছর আড়াই হাজার পর্যন্ত সেনা ও পুলিশকে হত্যা করেছে এবং তাদের কারণে ভারতের প্রধান আটটি রাজ্যকেই ‘লাল' অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করতে হয়েছে। রাজ্যগুলো হলো মধ্য প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, বিহার, উড়িষ্যা, ঝাড়খন্ড, ছত্তিশগড়, অন্ধ্র প্রদেশ ও পশ্চিম বঙ্গ। বিভিন্ন সন্ত্রাসী হামলায় ভারতে মৃত্যুর সংখ্যাও চমকে ওঠার মতো। ২০০৬ সালে ২৭৬৫ জন, ২০০৭ সালে ২৫৯৮ জন এবং ২০০৮ সালের নবেম্বর পর্যন্ত ২২৩৫ জন সন্ত্রাসী হামলায় মারা গেছে। তার আগে ১৯৯৪ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত সন্ত্রাসী হামলায় মৃত্যু ঘটেছে ৪৭ হাজার ৩৭১ জনের। সে হিসাবে ১৯৯৪ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত মোট ৫৪ হাজার ৯৬৯ জন সন্ত্রাসী হামলায় মারা গেছে। এসব হত্যাকান্ড প্রধানত ঘটেছে দিল্লি, আসাম, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, মনিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, রাজস্থান ও ত্রিপুরায়। এটা বাংলাদেশে তো বটেই, বিশ্বের অন্য কোনো দেশে কল্পনাও করা যায় না।
ভারতে প্রধানত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই সন্ত্রাসী সংগঠনকে ব্যবহার করা হয়। দেশটিতে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসী সংগঠনের বিকাশ ঘটেছে আশংকাজনকভাবে। শিব সেনা, বজরঙ্গ দল, আরএসএস বা রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বা ভিএসপির মতো কয়েকটি উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দলের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এসব সংগঠনের সঙ্গে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্রনাথ মোদীর মতো রাজনীতিকরা শুধু নন, ভারতের সেনাবাহিনীও প্রত্যক্ষভাবে জড়িত রয়েছে। চাকরিরত ও অবসরপ্রাপ্ত অফিসারদের অনেকে হিন্দুত্ববাদী জঙ্গি সংগঠনের নেতৃত্বও দিচ্ছেন। তাদের লক্ষ্য ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র বানানো। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে একমাত্র আরএসএসেরই ৪৫ হাজার শাখা সংগঠন এবং ৭০ লাখ উগ্র কর্মী তথা সন্ত্রাসী রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে সম্প্রতি বিশেষভাবে ‘মহারাষ্ট্র মিলিটারি ফাউন্ডেশন' ও ‘আত্মঘাতক ফটক' বা এজিপির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। গত বছরের নবেম্বরে মুম্বাইয়ের দুটি হোটেলে পরিচালিত সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে এ দুটি সংগঠনের সম্পর্ক রয়েছে ধারণা করা হচ্ছে। শিব সেনার প্রধান নেতা বাল ঠাকরের অনুসারী এবং সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল প্রেমনাথ হূন মিলিটারি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা। এটা শিব সেনার সামরিক শাখা। ওদিকে আত্মঘাতী দল এজিপি গঠন করেছেন জয়ন্ত রাও চাইতেল নামের এক চাকরিরত কর্নেল। জেনারেল প্রেমনাথ হূন এবং কর্নেল চাইতেল মিলে একটি হিন্দু সুইসাইড স্কোয়াডও গঠন করেছেন। পুলিশ অনেক উপলক্ষেই প্রমাণ পেয়েছে, ভারতের সেনাবাহিনী ও হিন্দু সন্ত্রাসীদের কর্মকান্ডসহ নানা অপরাধের সঙ্গে হূন-চাইতেলদের সংগঠন জড়িত রয়েছে। কিন্তু ‘র'-এর নির্দেশে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি, এখনো পারছে না। বাবরী মসজিদ ধ্বংস করা, গোধরায় ট্রেনে অগ্নি সংযোগ করে মুসলমানদের আগুনে পুড়িয়ে মারা, গুজরাট গণহত্যা, খিস্টানদের হত্যাকান্ড, মালেগাঁওয়ের বোমা বিস্ফোরণ, সমঝোতা এক্সপ্রেস ট্রেনে অগ্নি সংযোগ এবং সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ভয়ংকর সব অপরাধেই হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব খবর যখন ভারতীয় পত্রপত্রিকায় ছাপা হচ্ছিল তখনই হঠাৎ গত বছরের ২৬ নবেম্বর সংঘটিত হয়েছে মুম্বাই নাটক। শুধু তা-ই নয়, ঘটনা শুরুর মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যেই অ্যান্টি টেরোরিস্ট স্কোয়াড বা এটিএসের প্রধান হেমন্ত কারকারেকে হত্যা করা হয়েছে। ভারতের সংবাদ মাধ্যমগুলো জানিয়েছে, হেমন্ত কারকারেকে আসলে হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীরাই হত্যা করেছে। হত্যা করার কারণ, ২০০৭ সালে সংঘটিত মালেগাঁওয়ের বোমা বিস্ফোরণ ও সমঝোতা এক্সপ্রেসে অগ্নি সংযোগের ঘটনা দুটির তদন্তকালে অনেক সেনা অফিসারের জড়িত থাকার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। এটিএস হিন্দু সন্ত্রাসীদের পুরো নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করার ঘোষণা দিয়েছিল বলেই কারকারেকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু কৌশল নেয়া হয়েছে পাকিস্তানের ওপর দোষ চাপানোর।
হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীরা সারা ভারতেই মুসলমান, খ্রিস্টান, শিখ ও নিম্ন বর্ণের দলিতসহ সংখ্যালঘুদের উচ্ছেদের লক্ষ্যে ধর্মীয় সন্ত্রাস চালাচ্ছে। তাদের স্লোগানই হলো, ‘ভারত শুধু হিন্দুদের জন্য'। ২০০৮ সালের আগস্টে তারা উড়িষ্যায় খ্রিস্টানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এতে মারা গেছে ৩০ জনের বেশি খ্রিস্টান। ১৮০টি চার্চ ও সাড়ে চার হাজার ঘরবাড়ি ধ্বংস করে দিয়েছে হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীরা। তারা ৫০ হাজারের বেশি খ্রিস্টানকে ঘরছাড়া করেছে। খ্রিস্টানদের জোর করে হিন্দু বানিয়েছে, তাদের দিয়ে ধর্মগ্রন্থ বাইবেল পুড়িয়েছে। ধর্ষণও করেছে সন্ত্রাসীরা। পেছনে ছিল বিজেপি গোষ্ঠীর বজরং দল। একই বছর মহারাষ্ট্রের বস্ত্রনগরী মালেগাঁওয়ে জুমার নামাজশেষে মুসল্লিরা যখন বেরিয়ে আসছিলেন তখন এক বোমা হামলা চালায় হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীরা। এতে প্রায় ৩১ জন মৃত্যুবরণ করেন, আহত হন শতাধিক। উল্লেখ্য, মালেগাঁওয়ের পাঁচ লাখ অধিবাসীর মধ্যে ৭৫ শতাংশই মুসলমান। এই হামলায় সেনাবাহিনীর চাকরিরত কর্নেল পুরোহিতসহ বিজেপি পরিবার জড়িত রয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। তারও আগে ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে হরিয়ানার কাছে পানিপথে ‘সমঝোতা এক্সপ্রেস' ট্রেনে বোমা হামলা চালিয়ে ৬৮ জনের বেশি মুসলমানকে হত্যা করেছে হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীরা।
হিন্দুত্ববাদী ও অন্য সন্ত্রাসীদের হত্যা-সন্ত্রাসের ঘটনা এত বেশি যে সে সবের বিবরণী দিতে গেলে হাজার পৃষ্ঠার গ্রন্থ রচনা করতে হবে। উল্লেখ করা দরকার, এই উপমহাদেশে সন্ত্রাসের সূচনাও করেছিল হিন্দুত্ববাদীরাই। মুসলিম প্রধান পৃথক প্রদেশ গঠনের দাবিতে মুসলমানদের আন্দোলনের চাপে ব্রিটিশ সরকার ১৯০৫ সালে পূর্ব বঙ্গ ও আসামকে নিয়ে নতুন একটি প্রদেশ গঠন করেছিল। ঢাকা ছিল এর রাজধানী। এর ফলে পূর্ব বঙ্গ তথা বর্তমান বাংলাদেশের দ্রুত উন্নতি হতে থাকে। কিন্তু মুসলমানদের এই উন্নতি দেখে হিন্দুরা ক্ষুব্ধ হয়। কলকাতায় বসবাস করে পূর্ব বঙ্গের ওপর যারা শোষণ-নির্যাতন চালাতেন সেই হিন্দু জমিদাররা সন্ত্রাসবাদী কর্মকান্ডে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাদের উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল ‘যুগান্তর' ও ‘অনুশীলনী'র মতো কয়েকটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন। এদের বোমাবাজি ও হত্যাকান্ডে ভীত হয়েই ব্রিটিশ সরকার ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করেছিল। হিন্দুরা একে সন্ত্রাসবাদী ‘আন্দোলন' নাম দিয়েছিল।
সেটাই ছিল সন্ত্রাসবাদী কর্মকান্ডের শুরু। সন্ত্রাসে এখনো ভারতই যে কোনো দেশের তুলনায় অনেক বেশি এগিয়ে রয়েছে। সে দেশটির কাছেই আওয়ামী লীগ সরকার জঙ্গি দমনের জন্য সাহায্য চাওয়ায় সঙ্গত কারণে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। যে দেশ নিজের সন্ত্রাসই দমন করতে পারে না, সে দেশ কিভাবে অন্য দেশের কথিত জঙ্গিদের দমন করবে? সংশয়ের আসল কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি তৎপরতা না থাকা সত্ত্বেও সরকার ভারতের সাহায্যের জন্য হা-পিত্যেশ শুরু করেছে। ওদিকে ভারতও এক পায়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এজন্যই এ আশংকা শক্তি অর্জন করেছে যে, ভারত এবং আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্দেশ্য আসলে বাংলাদেশের কথিত জঙ্গিদের দমন করা নয়। জঙ্গি দমনের আড়াল নিয়ে ভারত একদিকে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত রাজ্যে স্বাধীনতার জন্য চলমান সশস্ত্র সংগ্রামকে দমন করতে চায়, অন্যদিকে চায় বাংলাদেশকে নিজের সন্ত্রাসের ভাগাড়ে পরিণত করতে। উল্লেখ্য, ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর পাঁচ লাখের বেশি সেনা সাত রাজ্যের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিয়োজিত রয়েছে। জঙ্গি দমনের নামে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ার সুযোগ দেয়া হলে বাংলাদেশ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর স্বাধীনতা সংগ্রামীদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হবে। স্বাধীনতা সংগ্রামীরা বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ শুরু করবে। ভারতের রণাঙ্গন চলে আসবে বাংলাদেশে। কথা শুধু এটুকুই নয়। বাংলাদেশে জঙ্গি রয়েছে- একথা প্রমাণ করার জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনী নিজেই বিভিন্ন স্থানে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকান্ড চালাবে। তারা গুরুত্বপূর্ণ সেতু উড়িয়ে দেবে, শিল্পাঞ্চলে ও বড় বড় শহরে বোমাবাজি করবে। কিন্তু দোষ চাপাবে বাংলাদেশের কথিত জঙ্গিদের ওপর। কখনো আবার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ওপর। সব মিলিয়ে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হবে যাতে বাংলাদেশ সরকারই ভারতীয় সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশে থেকে যাওয়ার অনুরোধ জানাতে বাধ্য হয়। তেমন অবস্থায় ভারতীয় সেনাবাহিনী শুধু বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে আসনই গেড়ে বসবে না, বাংলাদেশকেও ভারতের অভ্যন্তরীণ সমস্যা তথা সশস্ত্র যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, ভারতের সেনাবাহিনী যদি একবার কোনোভাবে ঢুকে পড়ার সুযোগ পায় তাহলে তাদের ফেরত পাঠানো আর কখনো সম্ভব হবে না। অর্থাৎ বাংলাদেশ চিরদিনের জন্য ভারতের অধীনস্থ হয়ে পড়বে।
মূলত এখান থেকেই বাংলাদেশের নিরাপত্তার প্রশ্নটি এসেছে। বাংলাদেশে কখনো সন্ত্রাসীদের দ্বারা ট্রেনে আগুন দেয়ার কিংবা একই সঙ্গে শ'য়ে শ'য়ে মানুষ হত্যার মতো ভয়ংকর ঘটনা ঘটেনি। অতীতে বিচ্ছিন্ন যেসব ছোটখাটো ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর পেছনে ছিল সুচিন্তিত পরিকল্পনা- ছিল বাংলাদেশকে সন্ত্রাসী ও ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে কুখ্যাতি দিয়ে ফায়দা হাসিল করার উদ্দেশ্য। কিন্তু এত কিছুর পরও বাংলাদেশকে কলংকিত করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ বরং সন্ত্রাসহীন শান্তির দেশ হিসেবেই টিকে রয়েছে। এতেই শরীরে জ্বালা ধরেছে বাংলাদেশ বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর। শুরু হয়েছে কল্পিত সন্ত্রাস ও জঙ্গি গোষ্ঠী সম্পর্কিত গাল-গল্প। লজ্জা ও দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এতদিন মুসলমান বিরোধী অঘোষিত যুদ্ধের আন্তর্জাতিক নেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামনে থাকতো, ভারতের প্ররোচনায় এখন রয়েছে এদেশেরই ‘নির্বাচিত' সরকার! বিস্ময়কর মনে হলেও এমন কিছু একটা করার প্রচেষ্টা যে চালানো হবে সেকথা বোঝা গিয়েছিল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মুহূর্তেই। সরকার অকারণে টাস্কফোর্স গঠনের জন্য উতলা হয়ে ওঠেনি। এর পর পর ঘটেছে পিলখানা হত্যাকান্ড। এর পেছনে ঠিক কোন দেশটি রয়েছে সে রহস্য উৎঘাটিত হতে সময় লাগেনি। ভারতীয়দের অনেকেও এ ব্যাপারে জানান দিয়েছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারকে রক্ষার জন্য এগিয়ে আসার ঘোষণা দিয়েছেন। সীমান্তে জড়ো হয়েছে ভারতের প্যারাস্যুট রেজিমেন্ট, বিমান বাহিনীর কয়েক স্কোয়াড্রন বোমারু বিমান ওড়ার জন্য প্রস্তুত থেকেছে। এ প্রসঙ্গে ভারতের সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল শঙ্কর রায় চৌধুরীর একটি মন্তব্যও উল্লেখ করা দরকার। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ খুব সহজে এবং বারবার নয়াদিল্লি-র ‘রাডার' থেকে সরে যায়। কিন্তু আর তা হতে দেয়া যাবে না। অর্থাৎ ভারতের সেনাবাহিনীকেই বাংলাদেশের ‘হাল' ধরতে হবে, দেশটি যাতে আর নয়াদিল্লি-র ‘রাডার' থেকে সরে যেতে না পারে। দুঃখ ও ভীতির কথা হলো, ভারতের প্ররোচনায় জঙ্গি দমনে সাহায্য নেয়ার নামে সে পথেই পা বাড়িয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। ক্ষমতার দাপটে অন্ধ এবং সাহায্যের নিশ্চয়তায় নিশ্চিন্ত কোনো সরকার সেটা চাইতেই পারে। কিন্তু জেনারেল শংকর রায় চৌধুরীরই অন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ কথা মনে রাখা দরকার। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ কখনো ক্ষমতায় এলে সেটা ভারতের জন্য ‘শুভ সংবাদ' হয়ে ওঠে। নয়াদিল্লি অবশ্যই হাসিনার সরকারকে পুরোপুরি এবং চূড়ান্তভাবে সমর্থন করে। কিন্তু এ সমর্থনই এক সময় আওয়ামী লীগের জন্য ‘ক্ষতির কারণ' হয়ে উঠতে পারে। জেনারেল শংকর রায় চৌধুরী ‘মৃত্যু চুম্বন'-এর কথা বলেছেন তার কারণ খোঁজার দায়িত্ব আওয়ামী লীগ সরকারের। সে সময়ও দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছে। এখানে শুধু এটুকু জানিয়ে রাখা দরকার, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ধ্বংস করার লক্ষ্য নিয়ে ভারতের সেনাবাহিনীকে ডেকে আনার যে কোনো চেষ্টাকেই জনগণ প্রতিহত করবে।