তদন্ত রিপোর্ট এবং খুনি-ঘাতকদের আড়াল করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা |
শাহ আহমদ রেজা
বিডিআর বিদ্রোহের নামে সেনা অফিসারদের হত্যাকান্ডের ঘটনা তদশ্চে সরকার গঠিত কমিটি যে রিপোর্ট দিয়েছে ২৭ মে তার অংশ বিশেষ প্রকাশ করা হয়েছে। তদশ্চ ও রিপোর্ট নিয়ে সরকার এমন কিছু একটাই যে করবে সে আশংকা আগে থেকে করা হয়েছিল। বাস্তবেও সরকার নিজের পরিকল্পনার বাইরে পা বাড়ায়নি। ফলে তদশ্চ রিপোর্ট নিয়ে জনগণের মধ্যে সন্দেহ-সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। এর পেছনে কারণের সংখ্যা কয়েকটি মাত্র নয়। বিস্তারিত উল্লেখে যাওয়ার পরিবর্তে বলা দরকার, তদশ্চ রিপোর্টে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে পাশ কাটানো হয়েছে। বড় কথা, রিপোর্টেই হ্নীকার করা হয়েছে, হত্যাকান্ডের ব্যাপারে আরো তদশ্চ হওয়া দরকার। এ থেকে বুঝতে বাকি থাকে না যে, সুষ্ঠু তদশ্চ বলতে যা বোঝায় তার কিছুই হয়নি। আসলে করতে দেয়া হয়নি। তা সত্ত্বেও যেসব তথ্য কমিটি পেয়েছে তারও সবকিছু সরকার প্রকাশ করতে দেয়নি। এজন্যই বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, কমিটি সদস্যদের ‘হাত-পা বেঁধে' তদশ্চ করতে বলা হয়েছিল। তারপরও সে কমিটির রিপোর্ট সরকার জনগণকে জানাতে ভয় পাচ্ছে। প্রকাশ করেছে শুধু সে অংশটুকু যা তাদের মনের মতো হয়েছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর বক্তব্যও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, পিলখানা হত্যাকান্ডের ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার উদ্দেশ্যে মমীরা প্রথম থেকে বিভ্রাশ্চিকর বক্তব্য দিয়ে আসছেন। তদশ্চ কমিটি গঠনের ব্যাপারে সরকার নানা রহস্যজনক ও পক্ষপাতমূলক কৌশল নিয়েছিল। শেষ পর্যশ্চ নিজেদের পছন্দের লোকদের নিয়ে গঠন করলেও সে কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ করতে সরকার ভয় পাচ্ছে। অথচ গোটা রিপোর্টই জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।
এদিকে তদশ্চ চলার সময় যেমন, রিপোর্টের অংশ বিশেষ প্রকাশ করার পরও তেমনি কথার খই ফুটিয়ে চলেছেন মমীরা। প্রকাশকালে ‘আংশিক' বললেও পরদিনই হ্নরাষ্ট্রমমী সাহারা খাতুন বলেছেন, এটাই নাকি ‘পূর্ণাঙ্গ' রিপোর্ট! খালেদা জিয়ার বিরুহ্নে উষ্মা প্রকাশ করতে গিয়ে হ্নরাষ্ট্রমমী বলেছেন, প্রকাশিত রিপোর্ট সরকারের মনগড়া হয়ে থাকলে আসল রিপোর্ট তাহলে বিরোধী দলের নেত্রী জানেন! তদশ্চ কর্মকর্তারা যতোটুকু তথ্য পেয়েছেন তার পুরোটাই নাকি তারা প্রকাশ করেছেন। হ্নরাষ্ট্রমমীর ভাষায় এটা পূর্ণাঙ্গ রিপোর্টের সারসংক্ষেপ। তিনি যে ‘জীবনের ঝুঁকি' নিয়ে পিলখানায় গিয়েছিলেন সে কথাও হ্মরণ করিয়ে দিয়েছেন সাহারা খাতুন। কিশ্চু জানাননি, গোপন আয়োজনে কয়েক দফা পিলখানার ভেতরে গেলেও এবং বারবার টিভি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ‘সাহসিকতার' প্রমাণ দিলেও তিনি কেন সেনা অফিসারদের ব্যাপারে খোঁজ নেননি? কেন অফিসাররা জীবিত রয়েছেন কি না তা দেখতে বা জানতে চাননি এবং কেন তাদের উহ্নার করে আনেননি? যেহেতু ৫৭ জন সেনা অফিসারের মৃত্যু ঘটে গেছে সেহেতু সাহারা খাতুনের মতো একজন মমী যতোই ‘জীবনের ঝুঁকি নিয়ে' পিলখানায় গিয়ে থাকুন না কেন এতে জাতির কিছু যায়-আসে না!
ওদিকে লাফিয়ে দৃশ্যপটে এসে গেছেন বাণিজ্যমমী লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান। জাতিকে তিনি তদশ্চ কাকে বলে সে সম্পর্কে জ্ঞান দেয়ার চেষ্টা করেছেন, তত্ত্বকথাও শুনিয়েছেন। বলেছেন, সকল দেশেই তদশ্চ রিপোর্টের তিনটি বিষয় থাকে সিক্রেট, টপ সিক্রেট এবং ওপেন। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে গোপনীয় বিষয় প্রকাশ করা হয় না। ‘জনগণের দল' হিসেবে আওয়ামী লীগ ‘হ্নচ্ছতায়' বিশ্বাস করে বলেই তদশ্চ রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে (তারা এতটাই ‘হ্নচ্ছতায়' বিশ্বাস করেন যে, আংশিক রিপোর্টকেই পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট বলে চালাতে চাচ্ছেন!)। বেগম খালেদা জিয়াকেও এক হাত নিতে চেয়েছেন ফারুক খান। বলেছেন, খালেদা জিয়া নাকি ‘ঈর্ষাকাতর' হয়ে তদশ্চ রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করেছেন! ‘ঈর্ষাকাতর' হওয়ার কারণও জানিয়েছেন তিনি। বলেছেন, বিএনপির আমলে অনেক বড় বড় ঘটনা ঘটেছে। তারা একটি ঘটনারও কোনো তদশ্চ রিপোর্ট প্রকাশ করেনি বা করতে পারেনি। এজন্যই খালেদা জিয়া ‘ঈর্ষাকাতর' হয়ে পড়েছেন।
ফারুক খান কিশ্চু লক্ষ্য করেননি যে, নিজের কথায় নিজেই আটকে গেছেন তিনি। কারণ ‘অনেক' নয়, চার দলীয় জোট সরকারের সময় দু-একটি মাত্র ‘বড় ঘটনা' ঘটেছিল। তার মধ্যে ২০০৪ সালের ১৭ আগস্ট দেশব্যাপী বোমা বিস্ফোরণ ছিল একটি। তদশ্চের নামে সময় পাড়ি দেয়ার, জনগণকে বিভ্রাশ্চ করার এবং অপরাধীদের ছাড় বা পালানোর সুযোগ দেয়ার পরিবর্তে জোট সরকার জঙ্গিদের বিরুহ্নে কঠোর ব্যবন্সা নিয়েছিল। শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইসহ জঙ্গি নেতাদের গ্রেফতার ও বিচার করেছিল জোট সরকার। তাদের ফাঁসির আদেশও হয়েছিল জোট সরকারের আমলেই। শুধু তা-ই নয়, মূলত জোট সরকারের কঠোর নীতি ও কার্যক্রমের কারণেই ১৭ আগস্টের মতো দেশব্যাপী দূরে থাক, সাধারণ কোনো সমাসী ঘটনাও কখনো ঘটতে পারেনি। ফারুক খানরা জঙ্গি জঙ্গি বলে পাড়া মাতালেও দেশে তেমন জঙ্গি তৎপরতা যে নেই তার প্রমাণ পাওয়া গেছে বিশেষ করে সংসদ নির্বাচনের সময়। দেশের কোথাও কোনো খুন-খারাবি হয়নি, বোমারও বিস্ফোরণ ঘটেনি। সুতরাং ফারুক খানের সঙ্গে একমত হওয়ার সুযোগ নেই যে, তাদের কথিত ‘সাফল্যে' ও ‘হ্নচ্ছতায়' বেগম খালেদা জিয়া ‘ঈর্ষাকাতর' হয়ে পড়েছেন এবং সেটাই তদশ্চ রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করার প্রধান কারণ!
হ্নরাষ্ট্রমমী সাহারা খাতুন এবং বাণিজ্যমমী ফারুক খানসহ মমীদের আসলে একটি কথাই জনগণকে জানানো উচিত ছিল। তারা সোজা বলে দিতে পারতেন, প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট প্রকাশ করা এবং জনগণকে জানতে দেয়া হবে না। তাহলেই সব ‘ল্যাটা চুকে' যেতো! এত রাখঢাক করার দরকার পড়তো না। কিশ্চু ‘হ্নচ্ছতায়' বিশ্বাস করেন বলেই তারা সম্ভবত সরল-সহজ পথে পা বাড়াননি। প্রথম থেকে সরকার বরং বিভ্রাশ্চির সৃষ্টি করে এসেছে। তদশ্চ পরিচালনা নিয়েও সরকার কম দেখায়নি। এ ব্যাপারে দু-একজন মমীর ভূমিকা ও বক্তব্য জনগণকে রীতিমতো ধাঁধায় ফেলেছে। তাদের মধ্যে প্রথমে অবশ্যই বাণিজ্যমমী লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খানের নাম নিতে হবে। প্রথম থেকে যিনি বেশি আলোচিত হয়ে আসছেন। বাণিজ্যমমী হলেও বিডিআর বিদ্রোহ ও সেনা অফিসারদের হত্যাকান্ডের তদশ্চ সমন্বয় করা থেকে ভারতকে করিডোর ও সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করতে দেয়া-না দেয়া পর্যশ্চ হেন বিষয় নেই যা নিয়ে তিনি কর্তৃত্বের সুরে কথা না বলেন। বাণিজ্যমমী হিসেবে কোনো একটি ক্ষেত্রে সামান্য সফলতা দেখাতে পেরেছেন তেমন দাবি তিনি নিজেও করতে পারবেন না। তা সত্ত্বেও প্রধানমমী বেছে বেছে তাকেই সেনা অফিসার হত্যাকান্ডের তদশ্চ কাজে নিয়োজিত কমিটিগুলোর সমন্বয়কারীর দায়িত্ব দিয়েছেন। ঠিক কোন্ যোগ্যতার বলে এত বড় একটি দায়িত্ব তিনি পেয়েছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছু কানাঘুঁষা রয়েছে। সেটা ভিন্ন বিষয়, বাস্তবে কার্যক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, কথা তিনি অনেক বেশিই বলে আসছেন এবং বলছেনও আবার বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে।
যেমন সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পাওয়ার পর পর ১২ মার্চ ফারুক খান বলেছিলেন, বিডিআর বিদ্রোহের সঙ্গে নাকি নিষিহ্ন জঙ্গী সংগঠন জেএমবি জড়িত! ফাঁসীতে নিহত জেএমবির শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমান যেহেতু সংসদে সরকার দলীয় হুইপ মির্জা আজমের আপন ভগ্নিপতি ছিলেন সেহেতু বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল। কারণ, হত্যাকান্ডের পর থেকে বিশেষ করে বিডিআরের ডিএডি তৌহিদের সহপাঠী ও এলজিআরডি প্রতিমমী জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং মির্জা আজমকে নিয়ে ‘অন্য রকম' আলোচনা জমে উঠেছিল। সামনে চলে এসেছিল আওয়ামী লীগের আরেক নেতা তোরাব আলীর নামও। কারণ, তোরাব আলী ঘাতকদের সমর্থনে মিছিলের নেতৃত্বদানকারী শীর্ষ সমাসী ‘লেদার' লিটনের পিতা এবং তার বাড়িতেই ঘাতকরা কয়েকটি বৈঠক করেছিল বলে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব জানাজানি হওয়ার পাশাপাশি আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়ায় তখন সুর পাঙ্গে ফেলেছিলেন ফারুক খান। তার মুখে আর জেএমবির নাম শোনা যায়নি। তাই বলে ‘খামোশ'ও হয়ে যাননি তিনি। কথা ঠিকই বলেছেন, তবে কিছুটা মারপ্যাঁচ কষে। পরবর্তী দিনগুলোতে তার মুখে শুধু একটি কথাই বারবার শোনা গেছে হত্যাকান্ডে নাকি জঙ্গিরা জড়িত এবং একটি প্রভাবশালী মহল নাকি তাদের রক্ষার চেষ্টা করছে! এখানেও আটকে গিয়েছিলেন ফারুক খান। সঙ্গত কারণে প্রশ্ন উঠেছিল, তাহলে কি এই ‘প্রভাবশালী মহল' সরকারের চাইতেও শক্তিশালী? মমীর কাছে সে কথা জানতেও চেয়েছিলেন সাংবাদিকরা। কিশ্চু উত্তর দেননি তিনি। জঙ্গিদের যারা বাঁচানোর চেষ্টা করছে তাদের পরিচিতি কেন প্রকাশ করা হচ্ছে না এবং তাদের বিরুহ্নে শাস্তিমূলক ব্যবন্সাই বা কেন নেয়া হচ্ছে না এমন প্রশ্নের উত্তরে ফারুক খান বলেছিলেন, ‘তদশ্চের হ্নার্থে' এ মুহূর্তে এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়া ‘ঠিক' হবে না। জেএমবি সংক্রাশ্চ অন্য এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি শুধু বলেছিলেন, এটা তদশ্চে বেরিয়ে আসবে। জঙ্গীদের কথা যখন জানেনই তখন নাম বলছেন না কেন এমন প্রশ্নের উত্তরও সে সময় এড়িয়ে গিয়েছিলেন ফারুক খান। তখন থেকেই কথা উঠেছিল জোরেশোরে। সাধারণ মানুষকেও তখন বলতে শোনা গেছে, এ ধরনের ঢালাও মশ্চব্য ও বক্তব্য তদশ্চ প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করবে। এতে প্রকৃত অপরাধীরা এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকরা আড়ালে চলে যেতে পারে।
শুধু ফারুক খানের কথাই বা বলা কেন, অন্য মমীরাও তো পিছিয়ে থাকেননি। তাদের মধ্যে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে এলজিআরডি মমী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের নাম নেয়া দরকার। কারণ আওয়ামী লীগের দলীয় মুখপাত্র তিনি, তাছাড়া তার প্রতিমমী জাহাঙ্গীর কবির নানককে নিয়ে বাজারে অনেক প্রচারণা রয়েছে। উদাহরণ দেয়ার জন্য বেশি পেছনে না গিয়ে সেনাবাহিনীর তদশ্চ রিপোর্টের প্রতিক্রিয়ায় তার বক্তব্য হ্মরণ করা যায়। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রিপোর্টে এমন কোনো তথ্যের উল্লেখ নেই যা হত্যাকান্ডের পর বিভিন্ন সময়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়নি। কিশ্চু তা সত্ত্বেও রিপোর্টের কিছু কিছু অংশ প্রকাশিত হওয়া মাত্র তেড়ে এসেছিলেন সৈয়দ আশরাফুল। সেনাবাহিনীর তদশ্চ রিপোর্টকে সোজা ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত' বলে বসেছেন তিনি! এর মূল লক্ষ্য নাকি মমী-প্রতিমমী, এমপি এবং আওয়ামী লীগের নেতাদের হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত করা! পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টকে ‘নতুন ষড়যম' হিসেবে আখ্যায়িত করে সৈয়দ আশরাফুল বলেছেন, ওই সময়ে পিলখানায় সেনা অভিযান চালালে কি পরিণতি হতো, এতে হতাহতের পরিমাণ কি হতে পারতো রিপোর্টে তা বলা হয়নি। কারা নৌকায় করে বিডিআর সদস্যদের নদী ‘পার' করে দিয়েছিল তারও উল্লেখ নেই রিপোর্টে। সৈয়দ আশরাফুলের মনে হয়েছে, বিডিআর ঘটনা নিয়ে ধূম্রজাল ছড়িয়ে আওয়ামী লীগকে তথা সরকারকে জড়ানোর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এ উদ্দেশ্যে টেলিভিশনে টকশো'র নামে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার জন্য ১৫ কোটি টাকার বাজেট হাতে নেয়া হয়েছে। ‘নতুন ষড়যমের' বিরুহ্নে দলের নেতা-কর্মিদের ‘তৈরি থাকার' জন্যও আহবান জানিয়েছিলেন তিনি।
সৈয়দ আশরাফুলের কথার পিঠে কথা এমনি এমনি ওঠেনি। ক্ষুব্ধভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে একেবারে ‘পয়ে ধরে ধরে' রিপোর্টের বিভিন্ন দুর্বলতা চিহ্নিত করায় বুঝতে বাকি থাকেনি যে, সেনা তদশ্চ রিপোর্টটি ক্ষমতাসীনদের অনেকেই দেখেছেন, খুটিয়ে খুটিয়ে পড়েছেন এবং বিশ্লেষণও করেছেন। কৌতূহলোদ্দিপক বিষয় হচ্ছে, তদশ্চ রিপোর্টে নতুন কোনো তথ্যের উল্লেখ না থাকা সত্ত্বেও সৈয়দ আশরাফুল রীতিমতো ‘ডিফেন্সিভে' চলে গেছেন এবং দোষ খুঁজেছেন রিপোর্টের। অথচ এই রিপোর্টেরও অনেক আগে সংবাদপত্রে নাম ধরে ধরেই আওয়ামী লীগের নেতা, মমী-প্রতিমমী ও এমপিদের সম্পর্কে খবর প্রকাশিত হয়েছে, যারা ওই হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেনাবাহিনীকে কোনোভাবে জড়িয়ে ফেলার মাধ্যমে ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য সীমাশ্চ খুলে দেয়ার বিষয়টিও নতুন কোনো খবর নয়। কারণ, বিদ্রোহের খবর পেয়েই ভারতের পররাষ্ট্রমমী প্রণব মুখার্জি টেলিফোনে প্রধানমমী শেখ হাসিনাকে আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, যে কোনো ‘সাহায্য' করার জন্য ভারত ‘তৈরি' হয়ে আছে। বিদ্রোহের পরদিনই নয়াদিল্লির ‘খুবই উচ্চ পর্যায়ের' বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে ভারতীয় দৈনিকগুলো জানিয়েছিল, ঢাকার ‘সুনির্দিষ্ট অনুরোধের' পরিপ্রেক্ষিতে ভারত বাংলাদেশে তার ‘শাশ্চি মিশন' তথা সেনাবাহিনী পাঠানোর সিহ্নাশ্চ নিয়েছে। সে সময় ভারত সরকার রাতারাতি সেনাবাহিনীর প্যারাস্যুট রেজিমেকে বাংলাদেশের সীমাশ্চে এনে জড়ো করেছিল। বিমান বাহিনী প্রস্তুত অবন্সায় ছিল দুটি বিমান বন্দরে।
বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে জড়িত করে বিতর্কিত ও দুর্বল করার যে উদ্দেশ্যের কথা তদশ্চ রিপোর্টে রয়েছে তাও মোটেই নতুন তথ্য নয়। কারণ, সে সময়ই জানা গিয়েছিল, পিলখানায় আসলে ষড়যমের প্রথম পর্ব সম্পন্ন হয়েছিল। এরপর ছিল দ্বিতীয় পর্ব। এমন এক চিশ্চা থেকেই পর্বটি সাজানো হয়েছিল যে, এতজন অফিসারের হত্যাকান্ডে সেনাবাহিনীতে ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়বে। সেনাবাহিনী ‘ভুল' করে বসবে। আর তেমন ‘ভুল' করা মাত্রই শুরু হবে ষড়যমের পরবর্তী অংশের বাস্তবায়ন। এর পাশাপাশি ছিল সমাপ্তি টানার পর্বও সে জন্যই ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্যারাস্যুট রেজিমেকে আগ্রা থেকে পশ্চিম বঙ্গে নিয়ে আসা হয়েছিল। ‘তৈরি' রাখা হয়েছিল বোমারু বিমানও। কিশ্চু বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রজ্ঞা ও সংযমে ষড়যম্ভন্ডুল হয়ে গেছে। বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে কারা বিতর্কিত ও ধ্বংস করতে চায়, বাংলাদেশে সেনাবাহিনী না থাকলে কোন রাষ্ট্র ও শক্তির লাভ হবে এমন প্রশ্নের উত্তর দেয়ার নিশ্চয়ই দরকার পড়ে না। তা সত্ত্বেও তদশ্চ রিপোর্টে ভারতের যুহ্ন প্রস্তুতিসহ সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা প্রসঙ্গে যথেষ্ট সংযম অবলম্বন করা হয়েছে। কিশ্চু এতেও তেড়ে উঠেছেন সৈয়দ আশরাফুল। ১৭ মে'র এ বক্তব্যেও সৈয়দ আশরাফুল যথারীতি প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কম রাখার তত্ত্বকথা শুনিয়েছেন। অভিযোগ করেছেন, তদশ্চ রিপোর্টে নাকি বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ রিপোর্টে স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে, ৪৬ ব্রিগেডকে অভিযান চালাতে দেয়া হলে এত সেনা অফিসারকে হত্যা করা সম্ভব হতো না। তাছাড়া হত্যাকান্ডের পর পর আওয়ামী মহাজোটের শরিক নেতা জেনারেল (অব.) এরশাদ এবং একাধিক সাবেক সেনাপ্রধানসহ সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ঘাতকরা সেনাবাহিনীর সামনে ১০ মিনিটও দাঁড়াতে পারতো না। সুতরাং সাধারণ মানুষের প্রাণহানিও ঘটতো না। সৈয়দ আশরাফুল নৌকায় করে বিডিআর জওয়ানদের ‘পার' করে দেয়ার কথা বলেও পয়ে পেতে পারেননি। কারণ, পুলিশ সরকারের নির্দেশে চলে। সুতরাং নৌকায় করে কারা ‘পার' করে দিয়েছিল সে প্রশ্নের উত্তর ক্ষমতাসীনদের পক্ষে যায় না। এখানে সরকার গঠিত তদশ্চ রিপোর্টের প্রাসঙ্গিক তথ্যের উল্লেখ না করে পারা যায় না। কারণ, রিপোর্টে সৈয়দ আশরাফুলের ইঙ্গিত ও ইচ্ছারই প্রতিফলন ঘটেছে। নাম এসেছে বিএনপির সাবেক এমপি নাসির উদ্দিন আহমেদ পিzর!
তদশ্চের নামে এমন কিছুই যে শেষ পর্যশ্চ করা হবে সে সম্পর্কে অবশ্য বোঝা যাচ্ছিল প্রথম থেকে। বিশেষ কোনো কারণ বা দায়বহ্নতার কারণে সেনা অফিসারদের হত্যাকান্ডের তদশ্চ ও মামলাকে মূল জায়গা থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য মমীদের অনেককেই দৌড়-ঝাঁপ করতে দেখা গেছে। হ্নয়ং প্রধানমমী পর্যশ্চ মারমুখী এবং মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। জাতীয় সংসদে শেখ হাসিনার বক্তৃতা হ্মরণ করে দেখুন। ১ মার্চ জাতীয় সংসদের ভাষণে বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জানতে চেয়েছিলেন, প্রথম দিনে সাড়ে ১১টার মধ্যে সব হত্যাকান্ড ঘটে গেলেও প্রধানমমী কেন দুপুরের পর বিদ্রোহীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলেন এবং সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন? বিদ্রোহীদের সঙ্গে আলোচনায় বসলেও প্রধানমমী বিরোধী দলকে না ডাকায় বিহ্ময়ও প্রকাশ করেছিলেন খালেদা জিয়া। তার বক্তব্যে সাধারণ মানুষের মনের কথারই প্রতিধ্বনি ছিল। মানুষের মধ্যে সে সময় এভাবেই আলোচনা চলছিল। অন্যদিকে সংসদ নেত্রী হিসেবে দেয়া ভাষণে প্রধানমমী মারমুখী হয়ে উঠেছিলেন। ভাষণে সেনা অফিসারদের হত্যার ঘটনায় বিরোধী দলের ‘রাজনৈতিক ইন্ধন' ছিল বলে অভিযোগ তুলেছিলেন তিনি। বলেছিলেন, ‘মিউটিনি' ঘটাতে যাদের উদ্যোগ ছিল তারা সফল হতে পারেনি বলেই তাদের ‘অশ্চর্জ্বালা'! এই ঘটনার সূত্র ধরে ‘অন্য কিছু' হয়নি বলে তারা মনের দুঃখে অন্যের দোষ খোঁজার চেষ্টা চালাচ্ছে। কারো নাম উল্লেখ না করলেও বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর দিকে আঙুল উঠিয়ে প্রধানমমী বলেছিলেন, দেশের সেনাবাহিনীকে নিয়ে যারা বারবার খেলছে সেই ‘খেলনেওয়ালারা' এবারো ‘খেলে' গেছে!
এভাবেই প্রকৃত খুনি-ঘাতকদের আড়াল করার চেষ্টা শুরু হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল দ্বিমুখী একদিকে তারা জঙ্গি নামের আড়াল নিয়ে বিরোধী দল, বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতের ওপর দায়দায়িত্ব চাপানোর চেষ্টা চালিয়ে এসেছেন, অন্যদিকে চেয়েছেন প্রকৃত খুনি-ঘাতকদের দিক থেকে মানুষের মনোযোগ সরিয়ে দিতে। এই প্রক্রিয়ায় তারা এমনকি আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাত করার এবং দেশে গৃহযুহ্ন বাধানোর মতো নানা তত্ত্বকথাও হাজির করেছিলেন। কিশ্চু কোনো তত্ত্বই হালে পানি পায়নি। মানুষকে বিশ্বাস করানো যায়নি যে, বিএনপি ও জামায়াতের মতো দেশপ্রেমিক দলগুলোর পক্ষে বাংলাদেশের কৃতী সেনা অফিসারদের হত্যা করার চিশ্চা করাও সম্ভব। কারণ, দল দুটি সেনাবাহিনীকে নিজের সশ্চান মনে করে। এজন্য শুধু নয়, ঐতিহাসিক একটি বিশেষ কারণেও বিএনপি ও জামায়াতকে সেনাবাহিনীর বিরুহ্ন শক্তি হিসেবে দাঁড় করানো সম্ভব হয়নি। কারণটি হলো, হ্নাধীনতার পর ক্ষমতায় আগত আওয়ামী লীগ সরকার সেনাবাহিনীর পাঙ্গা বাহিনী হিসেবে রক্ষীবাহিনী গঠন করেছিল। অবন্সা এমন হচ্ছিল যে, আর কিছুদিন পর বাংলাদেশ থেকে সেনাবাহিনীর নাম-নিশানাই মুছে যেতো। থাকতো শুধু রক্ষীবাহিনী আওয়ামী লীগের পেটোয়া বাহিনী। সেই দুঃসময়ে সেনাবাহিনীর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন প্রেসিডে জিয়াউর রহমান। তার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারই রক্ষীবাহিনীর বিলুপ্তি ঘটিয়েছিল, নতুন প্রাণশক্তি দিয়েছিল সেনাবাহিনীকে।এজন্যই ষড়যম্মূলকভাবে প্রচারণা চালানো হলেও জনগণকে বিএনপির ব্যাপারে বিশ্বাস করানো যায়নি। দলটির বিরুহ্নে ঠেলে নেয়া যায়নি।
এই ব্যর্থতার পরও তাদের কৌশলে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। এখনো সরকার মূল সমস্যার ধারে-কাছে যাওয়ার এবং খুনি-ঘাতকদের পাকড়াও করে দ্রক্তত বিচারের মাধ্যমে শাস্তি দেয়ার দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে সবকিছু পাঙ্গে ফেলার চেষ্টাতেই বেশি ব্যস্ত রয়েছে। এজন্যই তদশ্চকারীদের ‘গাইড' করার বা নির্দেশনা দেয়ার পরিষ্কার উদ্দেশ্যে তদশ্চ চলাকালে বিভ্রাশ্চিকর বক্তব্য রেখেছেন ফারুক খানের মতো মমীরা। একই কারণে প্রতিটি বিষয়ে রাখঢাক করেছে সরকার। জনমনে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি হওয়ার কারণও সেটাই। মমীদের নিত্যনতুন আবিষ্কার দেখে ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শুনে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারেনি তারা। জনগণ এখনো সরকারের ওপর আন্সা আনতে পারছে না। সরকার নিজেই সে পথ বন্ধ করে দিয়েছে। এমন অবন্সার সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কেও সচেতন হওয়া দরকার। খুনি-ঘাতকদের পাশাপাশি দেশ বিশেষকে রেহাই দেয়ার জন্য চেষ্টা চালানো সরকারের ব্যাপার। কিশ্চু কৃতী সেনা অফিসারদের হত্যাকান্ডকে আড়াল করে এদেশের দেশপ্রেমিক ইসলামী ও জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ঘায়েল করার চেষ্টা চালানো হলে তার পরিণতি সরকারের জন্য ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠতে পারে।
