বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে করিডোর ব্যবহার ভারতের জন্য নিরাপদ নয় / আবু জুবায়ের

abu_zubaer's picture
Posted by
abu_zubaer
Friday, June 19, 2009 - 1:24pm BST

আগামী ২৬ জুন পূর্ণ হবে দহগ্রাম আঙ্গরপোতা ছিটমহলে বসবাসরত ১৫ হাজার মানুষের স্বদেশে আসার একমাত্র করিডোর খুলে দেয়ার ১৭ বছর। ১৯৯২ সালের ওই দিনে ভারত সরকার ছিটমহলের মানুষের যাতায়াতের জন্য সীমিত সময়ের জন্য করিডোরটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়। সেসময়ে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত প্রতি ১ ঘন্টা পর মোট ছয় ঘন্টার জন্য করিডোরটি বাংলাদেশীদের ব্যবহারের জন্য খুলে দেয়া হত। পরবর্তীতে করিডোরটি সুর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত ১২ ঘন্টা খোলা থাকলেও রাতের বেলা করিডোরটি সম্পুর্নরুপে বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে রাতের বেলা ছিটমহলবাসীর জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়ে। মরনাপন্ন মানুষের চিকিৎসা সহ অন্য যে কোন জরুরী প্রয়োজনেও তারা পার্শ্বস্থ কোন স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা ডাক্তারের কাছে যেতে না পারায় বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর ঘটনা নিত্য নৈমিত্তিক।
ছিটমহলবাসীর এখন প্রানের দাবী ২৪ ঘন্ট করিডোর খোলা রাখা।

ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি ১৯৭৪, ১৯৮০ সালের দ্বি-পাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি এবং সর্বশেষ ১৯৯৩ সালের সাপটা (SAPTA) চুক্তির বরাত দিয়ে, ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে ‘করিডোর’ সুবিধা দাবী করে আসছে। ১৯৯৯ সনের ২৮ জুলাই, তৎকারীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কেবিনেট বৈঠকে ভারতকে করিডোর সুবিধা প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিলো। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে বাংলাদেশ-ভারত সম্পাদিত সীমান্ত চুক্তিতে উল্লেখ ছিল- বাংলাদেশ ভারতকে বেরুবাড়ি হস্তান্তর করবে এবং বিনিময়ে বাংলাদেশ পাবে তিনবিঘা করিডোর

অন্যদিকে, বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্য বাংলাদেশ সরকারকে ভারত ট্রানশিপমেন্ট বা করিডোর সুবিধা দেয়ার জন্য ক্রমাগত পরামর্শ দিয়ে আসছে এবং ভারতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের নেপাল ও ভুটানে যেতে ‘ট্রানজিট’ সুবিধা পাবার শর্ত হিসেবে এই ‘ট্রানশিপমেন্ট’ কে শতারোপ করেছে। উল্লেখ্য, ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পূর্বে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ট্রানজিট সুবিধা বিদ্যমান ছিলো এবং ১৯৪৭ সালে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পাদনের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর উপযুক্ত না থাকায় পূর্ব-পাকিস্তানের জন্য কলকাতার মধ্য দিয়ে ছয় মাসের জন্য ট্রানজিট সুবিধা প্রদানের জন্য পাকিস্তান ভারতকে জোর অনুরোধ করেছিল, প্রত্যুত্তরে, ভারতীয় নেতা বল্লভ ভাই প্যাটেল জবাব দিয়েছিলেন যে, ছয় দিন কেন, ছয় ঘণ্টাও সম্ভব না।

বর্তমান সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর পরই ভারত নতুন করে ট্রানজিট সুবিধা পেতে সরকারকে অব্যাহত ভাবে চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে যদি ও বলা হচ্ছে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী কোন চুক্তি করা হবে না। তবে প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিসহ বিভিন্ন মহল ভারতের সাথে ট্রানজিট চুক্তির তীব্র বিরোধীতা করে আসছে। তারা বলছেন, ট্রানজিটের নামে ভারত বাংলাদেশকে করিডোর হিসাবে ব্যবহার করতে চাইছে।

ভারতের সাথে আওয়ামী লীগের সে গভীর সম্পর্কটি নতুন বিষয় নয়। সেটি গভীরতা পেয়েছিল আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবের আমলেই। ভারতীয় স্বার্থের সেবক রূপে দায়িত্ব-পালনের অঙ্গিকার নিয়ে তিনিই আগড়তলা গিয়েছিলেন। এবং সেটি ষাটের দশকে। ভারতীয় গুপ্তচর চিত্তরঞ্জন সুতোর বা কালিপদ বৈদ্যরা ছিলেন সে আমল থেকেই তার ঘনিষ্ঠ মিত্র। তিনিই ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের “তিন বিঘা” ভূমি । সীমান্ত বাণিজ্যের নামে তিনিই দেশের সীমান্ত তুলে দিয়েছিলেন, এবং এভাবে সুযোগ করে দিয়েছিলেন অবাধ লুণ্ঠনের। তিনিই অনুমতি দিয়েছিল ফারাক্কা বাঁধ চালুর। ফারাক্কার কারণে মরুভূমি হতে চলেছে উত্তর বঙ্গের বিশাল ভূ-ভাগ। এখন একই প্রক্রিয়ার শিকার হতে যাচ্ছে সিলেট বিভাগ। দখলে নিচ্ছে বঙ্গপোসাগরে জেগে উঠা তালপট্টি দ্বীপ। ভারত বাংলাদেশের জন্য নেপালে যাওয়ার জন্য ২০-৩০ মাইলের করিডোর দিতে রাজি হচ্ছে না, অথচ বাংলাদেশের মাঝখান দিয়ে ৫০০ মাইলের করিডোর চায়। ভারতের মধ্য দিয়ে নেপাল ও ভূটানে যাওয়ার করিডোর বাংলাদেশের যতটা অপরিহার্য সেরূপ অবস্থা ভারতের জন্য নয়। ভারত তার পূর্বাঞ্চলে যেতে পারে তার নিজের দেশের মধ্য দিয়ে ভূমির মধ্য দিয়ে। অথচ এরপরও ভারত চাপ দিচ্ছে সে করিডোর আদায়ে এবং আওয়ামী লীগ সেটি বিবেচনাও করছে।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্ল্যেখ করার মত আছে সেটা হলো ভারত বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে করিডোর পেলেও সেটা তাদের জন্য কতটা নিরাপদ হতে পারে সেটা এখন ভেবে দেখতে হবে।যেখানে ভারতের সাত বোন সমস্যা এখনও প্রকান্ডভাবে আছে,কাস্মীর সমস্যা এখনো জলন্ত অগ্নিকান্ডের মত।এছাড়া বাংলাদেশের জনগনও চায়না এই ধরনের করিডোর ভারতকে দেয়া হোক।ইউরোপে করিডর বা ট্রাঞ্জিট আছে কিন্তু তাদের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থা আমাদের উপমহাদেশের মত নয়।বাংলাদেশের থেকে বেশি জনসংখ্যার দেশ ইউরোপে নাই।অন্যদিকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ নয়।অনেক গবেষক মনে করে থাকেন যে ভারতের কারনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক জাগরন ঘটেনি।করিডোর নিয়ে ভারত খুব যে লাভবান হবে তা কিন্তু না।অন্যদিকে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ধ্বংশ হয়ে যাবে নানা ভাবে।তবে অর্থণৈতিক ভাবে লাভবান না হলেও ভারত মানচিত্রের যে উপমহাদেশীয় রাজনীতি বিরাজ করছে সে দিক থেকে বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে করিডোর অর্জন কম কিছু নয়।

লেখকঃ কবি,কলামিষ্ট