
ইমেলার জন্যে এ লেখাটা যখন প্রকাশ করতে যাব ততদিনে বাংলাদেশের রাজনীতির পানি অনেকদূর গড়িয়ে যাবে। আজ ৩১শে ডিসেম্বর, ২০০৮'এর শেষ দিন। ১৫কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশের জন্য বিদায়ী বছরটা ছিল ঘটনাবহুল। বিভিন্ন কারনে এ দেশের মানুষ এ বছরটাকে অনেকদিন মনে রাখবে। রাষ্ট্রীয় শাষন ব্যবস্থায় ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যদিয়ে বছরের শেষে যে বাস্তবতা সৃষ্টি হয়েছে তাকে ঘিরে পোড় খাওয়া এ জাতি নতুন আশায় বুক বাধতে সাহষ করেছে।
রাজনীতি তথা দেশ শাষনের নামে চারদলীয় জোট সরাকার যে নোংরা এবং অসূস্থ সাংস্কৃতি চালু করেছিল তার গোড়ায় চপোটাঘাত করেছে ২৯শে ডিসেম্বরের নির্বাচনী রায়। জিয়াউর রহমান হয়ে খালেদা জিয়া, খালেদা জিয়া হয়ে তারেক জিয়া, তারেক জিয়া হয়ে জামাইমা জিয়া, - রাষ্ট্রীয় শাষনব্যবস্থাকে পারিবারিক ডাইনাষ্টি বানিয়ে চীরস্থায়ী বন্দোবস্থ করার যে অলীক স্বপ্নে ভাসছিল জিয়া পরিবার, তার তলপেট লাথি মেরেছে বাঙ্গালী জাতি। রাজনীতির এই নির্মম বাস্তবতা অনুধাবন করার মত জ্ঞান, বুদ্বি এবং দূরদর্শিতা দেশীয় রাজনীতিবিদ্দের ছিলনা বলেই তাদের চরম মূল্য দিতে হয়েছে গত দু'বছর ধরে।
চারদলীয় জোটের ঐতিহাসিক ভরাডুবি নিয়ে বিস্তর আলোচনা, সমালোচনা হচ্ছে, এ পরাজয়ের কারন অনুসন্ধান করতে গিয়ে অনেকে র্দুনীতির পাশাপাশি যুদ্বাপরাধী জামাতীদের সংশ্রব খোজার চেষ্টা করছেন। অনেকে আবার নতুন প্রজন্মের ২কোটি ভোটারদের সচেতনতার কথাও বলছেন। এ ফ্যক্টরগুলোর ইমপ্যক্ট উপেক্ষা করার মত নয়, কিন্তূ এগুলোই বিএনপির পরাজয়ে মূল ভূমিকা রেখেছিল তার সাথে আমি দ্বিমত পোষন করি। বিএনপির প্রতিটা প্রার্থীর পরাজয়ে কাজ করেছে স্থানীয় ফ্যাক্টর। বিএনপির সংশ্রবে এসে অনেক রাস্তার ফকির হয়েছে রুপকথার রাজকুমার, যার শান শওকতে চিক চিক করেছে স্থানীয় লোকালয়ে। রাজনীতির এ সব অবৈধ ফসলকে স্বচক্ষে দেখতে সাধারন মানুষের প্রয়োজন পরেনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার অথবা দুদকের মত সরকারী প্রতিষ্ঠানের। পাশাপাশি ছাত্রদল আর যুবদলের সন্ত্রাষী মেশিনের যাতাকলে নিষ্পেষিত হয়েছে লাখ লাখ সাধারন মানুষ। ব্যবসা, বানিজ্য, শিল্পকারখানা, পরিবহন সহ যাবতীয় সেবাখাতে দলীয় টাউট বাটপারদের লেলিয়ে দিয়ে চরম নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছিল জোট সরকার, যার মূল নেত্রীত্বে ছিল খালেদা জিয়ার দুই সন্তান। বিএনপির রাজনীতিকে র্দুবৃত্তায়ন এবং র্দুনীতির কষ্টিপাথরে সমাহিত করলেও আমার দৃষ্টিতে বিএনপির নজিরবিহীন পরাজয়ে অন্যতম ভূমিকা রেখেছিল তাদেরই ছত্রছায়ায় লালিত দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রনকারী সিন্ডিকেট সমূহ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্যে দ্রব্যমূল্যের কৃত্তিম সংকট তৈরী করে বিএনপির নেতা-নেত্রীর দল হাতড়িয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। সাধারন জনগন দ্রব্যমূল্যের এই অভাবনীয় মূল্যবৃদ্বির জন্যে যতটা না তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে দায়ী করেছে তার চেয়ে অনেকবেশি দায়ী করেছে নব্য গজিয়ে উঠা বিএনপির অসৎ ব্যবসায়ী নেটওয়ার্ককে। আসলে পূরো নির্বাচনটাই ছিল বিএনপির বিরুদ্বে বিএনপির লড়াই। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সময়ের সোনার হরিনে চেপে বিএনপির নষ্ট চরিত্রকে পূজি করে নির্বাচনী হিসাব উলোট পালট করে দিয়েছে নিজেদের গুনে নিয়, বিএনপির কারনে। যখন আওয়ামী লীগ চাল, ডাল, তেল আর লবনের কথা বলে জনগনের গভীরে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করেছে, একই সময় বিএনপি ব্যস্ত ছিল তাদের চরিত্রে সাদা কালি লেপন করাতে। একদিকে জেল হাজতের ভয় অন্যদিকে জনগনের রোষ, এই দুই মিলে বিএনপিকে জনবিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল।
নির্বচনপূর্ব ককোর সিংগাপুর ব্যাংকে ১২কোটি টাকা আবিস্কার খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কফিনে শেষ পেরেক এটে দিয়েছিল। মোদ্দা কথা, এবারের নির্বাচনে বিএনপির কাছে বিএনপি পরাজিত হয়েছে, আওয়ামী লীগের কাছে নয়।

