ছোট বারান্দাটায় চেয়ারে বসে সকালের সূর্য্যকে উপভোগ করছিলাম। হালকা শীত পড়তে শুরু করেছে। এই শীতে সকালটাও যেন ঝকেঝকে। বিশাল বড় একটা নীল আকাশ। সেই আকাশে এক বিন্দু মেঘ নেই। সামনের গাছগুলোতে হালকা শিশিরের ছোয়া। আর সেই নরম সূর্য্যটা যেন শিশিরকে আলোকিত করার চেষ্টা করেই যাচ্ছে।
নরম তুলে তুলে সেই রোদ আমাকে নিয়ে গেলো সেই ছোট বেলায়। একদম ছোট বেলায়, যখন বয়স ছয়-সাত হবে। কিংবা আরো ছোট। যখন নিজে নিজে চাদর পড়তে পারতাম না। মা কিংবা বাবা একটা কুমিল্লার খদ্দরের চাদর গায়ে জড়িয়ে দিয়ে তারপর ঘাড়ের কাছে এমনভাবে বেধে দিতেন যেন চাদরটা পড়ে না যায়। সেই গিডটু দেয়া চাঁদর গায়ে দিয়ে সকালে শ্লেট আর পেন্সিল নিয়ে বসে যেতাম বারান্দার রোদে। কয়লা দিয়ে ঝকঝক করে মেঝে পরিষ্কার করা শ্লেট। সেই শ্লেটে সুন্দর হাতের লেখার চেষ্টা চলতো। অ, আ, ই, ঈ -- ইত্যাদি। আর পাশে থাকতো বাশের তৈরী একটা থালায় (ওটার একটা বিশেষ নাম আছে, নামটা ভুলে গেছি) মুড়ি। মাঝে মাঝে খেজুরের গুড়। সেই রোদে বসে মুড়ি খেতাম আর বর্ণমালা লিখতাম। সেই আমি আজকে কোথায় বসে কমপিউটারে একই বর্ণমালা লিখছি। আজকের সকালটা আমাকে ফিরিয়ে দিল সেই সোনালী দিনগুলো। ধন্যবাদ প্রকৃতি তোমায়।
আমি যেন হঠাৎ করেই হারিয়ে গেলাম আমার ভেতর। প্রকৃতি মানুষকে প্রভাবিত করে, পরিচালিত করে, তাড়িত করে। মানুষ প্রকৃতির সন্তান। মানুষ যতই এই দালান কোঠা বানাতে শিখুক, তার শিকড় সেই মাটির কাছে, গাছের পাশে, সূর্য্যর তাপে।
আজো আমি রোদে বসে মুড়ি খাচ্ছি। তবে শ্লেট পেন্সিল নেই। চোখ বন্ধ করে সূর্য্যের দিকে তাকিয়ে কমপিউটারে একটা গান শুনছি -
"সোনার পালঙ্কের ঘরে,লিখে দেখে ছিলেম দ্বারে;
যাও পাখি বলো তারে, সে যেন ভোলে-না মোরে।
সুখে থেকো, ভালো থেকো;
মনে রেখো এই আমারে।
বুকের ভেতর নোনা ব্যাথা, চোখে আমার ঝরে কথা;
এপার ওপার তোলপার একা।
মেঘের উপর আকাশ ওড়ে, নদীর ওপার পাখির বাসা;
মনে বন্ধু বড় আশা।
যাও পাখি যারে উড়ে,
তারে কইয়ো আমার হয়ে,
চোখ জ্বলে যায় দেখবো তারে ---"

গানটি আগে কখনও শুনিনি।
গিয়াস উদ্দিন সেলিম নতুন একটি সিনেমা বানিয়েছেন, যার নাম "মনপুরা"। সেই ছবিতে চন্দনা মজুমদার আর কৃষ্ণকলি নামের দু'জন শিল্পী গানটি গেয়েছেন। এই গানটি শুনতে শুনতে মনে হলো, আমি যেন এই পৃথিবীতে নেই; আমি যেন রোদের একটা কণা, কিংবা তীর তীর করে বয়ে যাওয়া বাতাসের মিছিলের সঙ্গী; নয়তো পাতার উপর টলমলে শিশির। নিজেকে মনে হলো, খুবই ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র কিছু একটা, যেন ফু দিলেই উড়ে যাবে।
যারা ভালো গান গাইতে পারেন তাদের উপর আমার এক ধরনের অন্ধ ভক্তি কাজ করে। লোক দেখানো গান নয়; দরদ দিয়ে নিজের ভেতর ডুবে গিয়ে যেই গান। নিজের ভেতর ডুবে গিয়ে দরাজ গলায় কেউ গান গাইছে, এর চেয়ে পবিত্র বুঝি আর কিছু হতে পারে না। এমন নিমগ্ন হয়ে যারা গান গাইতে পারে, তাদেরকে আমার এই গ্রহের মানুষ মনে হয় না। তারা যেন অন্য কোনও গ্রহ থেকে বিশেষ একটা গুণ নিয়ে আমাদের কাছে এসেছেন। আমার অনেক দিনের ইচ্ছে, যদি কেউ আমাকে এমন করে গান শুনাতো, আমি তার পাশে চুপচাপ বসে থাকতাম - যেন আজীবন বসে থাকতাম।
এই গানটি শুনে আমার ভেতর আবারো সেই ইচ্ছেটা মাথা চারা দিয়ে উঠলো। রোদের আলোতে নিজেকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে ভাবছিলাম, একটি মানুষ কিভাবে গাইতে পারে "মেঘের উপর আকাশ ওড়ে, নদীর ওপার পাখির বাসা" - আমার জানা নেই।
আর গানটি যিনি লিখেছেন, তিনি? তার ক্ষমতা! বিশেষ করে এই গানটি হয়তো অনেক পুরোনো কোনও গান। কিন্তু কেউ না কেউ তো লিখেছিলেন। তার ক্ষমতা কেমন ছিল? এই শব্দ চয়ন, এই চিন্তা, এই ভাবনা, এই এক্সপ্রেশন - কিভাবে এলো তার মাথায়? আমিও তো একটা মানুষ। কই আমি তো ওভাবে লিখতে পারছি না; ওভাবে প্রকাশ করতে পারছি না। আমি যদি মানুষ হই, তাহলে তারা কি? কিংবা তারা যদি মানুষ হয়, আমি কি?
বার বার শুধু একটাই উত্তর ফিরে এলো - ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র একজন মানুষ।
পুনশ্চ: যারা গানটি শুনতে চান - http://iforing.com/mvideo/202


Comments
মেঘের ঊপর আকাশ ওড়ে
আপনার ব্লগটি পড়লাম এবং গানটি শুনলাম।খুব ভালো লাগলো।লন্ডনে এখন বাংলাদেশের শীতের মতো আবহাওয়া।এখানে এখোন Fall বা শরত কাল।সৌভাগ্যক্রমে আজকের দিনটিও বাংলাদেশের শীত সকালের মতোই রোদ ঝলমলে এবং ভোরে কুয়াশা ঢাকা ছিল।চায়ের কাপ নিয়ে বাংলাদেশের খবরাখবর জানতে জানালার সামনে কম্পিউটারের সামনে বসে ই-মেলা পড়ছিলাম।জানালার ওপাশে রাস্তা এবং রাস্তার দুপাশে টেরাস হাঊসগুলোর সামনে দাঁড় করানো গাড়ির সারি।গানটি খুব-ই পুরনো এবং শিল্পীদের গায়কী হৃদয় ছোঁয়া।এটি কি সলিল চৌধুরীর লেখা?হ্যাঁ,কোনো কোনো গান কোনো কোনো মানুষের মনে অপার্থিব অনুভূতির জন্ম দেয় যা অনেকটা আধ্যাতিকতার কাছাকাছি চলে যায়।যেমন,আমার বেলায় রবীন্দ্রনাথের ''আলো আমার আলো ওগো আলো জীবন ভরা''।তাই প্রখ্যাত কবি সুফিয়া কামাল একবার বলেছিলেন,রবীন্দ্র সংগীত অনেকটা উপাসনার মতো। কিন্তু অনেকেই তাঁর কথার অন্তুর্নিহিত তাৎপর্য বুঝতে না পেরে তাকে কাফের,নাস্তিক,হিন্দু বলে গালাগাল করেছিল।সবাই সব কিছু RECEIVE করতে পারে না।যাহোক,বিশ্বব্যাপী FINANCIAL MELTDOWN এর মুখে বসেও সুন্দর ব্লগটি পড়ে এবং গানটি শুনে ভালো লাগলো।সেজন্য ধন্যবাদ।সৌরভ কামাল,লন্ডন,ইংল্যান্ড
অদ্ভূত সুন্দর!!
অদ্ভূত সুন্দর!! আমি ব্যাক্তিগতভাবে গানটি প্রথম শুনি চ্যানেল আইয়ের বাচ্চাদের একটি গানের প্রতিযোগিতায়। That was mind blowing!! আর আজকে আপনার ব্লগ থেকে জানলাম চন্দনা মজুমদার আর কৃষ্ণকলির কথা। Awesome! You might wanna check out the Channeli version as well from youtube "http://www.youtube.com/watch?v=qTQfuAGjKv4&feature=related" ধন্যবাদ আপনাকে:~)