
২৪শে ফ্রেরুয়ারী ২০০৯ মঙ্গলবার। ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ যাচ্ছি। ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ঢাকায় পৌছেছিলাম ২০ তারিখ শেষরাতের ফ্লাইটে। দীর্ঘ দিন ধরে একটি বিষয় খেয়াল করছি, যখন বাংলাদেশে যাই তখন জেটলেগটা ঠিক চেপে বসে না। খুব সহজেই শরীর যেন সব কিছুর সাথে মানিয়ে নেয়। বিপদটা হয় আমেরিকাতে ফিরে আসার পর। জেটলেট যেন কাটতেই চায় না। এই যে সাত দিন হয়ে গেলো ফিরে এসেছি, এখনও যেন জেটলেগ কাটছে না। ঘুমেরও ঠিক সময় জ্ঞান নেই। তাই লিখতে বসতেও দেরী হয়ে গেলো। কিন্তু বাংলাদেশে এমনটা কখনও হয়নি। বিমান বন্দরে পা দেয়ার পর থেকেই যেন মনে হয়, আমি তো এখানেই ছিলাম।
ঢাকায় পা দিয়েই মনটা খুব ছটফট করছিল। কতদিন মা-বাবাকে দেখিনা। তারা ঘুমিয়ে আছেন ময়মনসিংহ শহরে। তখন বইমেলা চলছিল। আমার দুটো বই বেরিয়েছে। বই মেলা প্রতিদিন টেনে নিয়ে যেতে চায় বাংলা একাডেমী চত্বরে। কিন্তু এতো মানুষের ভীড়েও বারবার ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছিল। ঠিক কোন কিছুর সাথেই যেন নিজেকে যুক্ত করতে পারছিলাম না। তাই একটা মাইক্রোবাস নিয়ে রওয়ানা হলাম ময়মনসিংহের দিকে।
পরিকল্পনা হলো সকালে গিয়ে সন্ধ্যার ভেতর ফিরে আসা। সকালে ঘুম থেকে উঠে আমাদের প্রস্তুত হতেই বেজে গেলো এগারোটা। সাথে দুই বছরের ছোট মেয়ে সুনিভা। ধানমন্ডির বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম মিরপুর। সেখান থেকে আমার ছোট বোন ও তার ছেলেটিকে তুলে নিলাম। আমাদেরকে মাইক্রোবাসে তুলে দিতে এসে ছোট বোনটির বাসার কাজের ভদ্রমহিলা চোখ-মুখ নাচিয়ে বললো, “আপনারা ময়মনসিং যাইতাছুইন?”
ভদ্রমহিলার অনেক বয়স। পঞ্চষোর্ধ তো বটেই। আরো বেশি হতে পারে। তার একমাত্র ছেলেটি কিছুদিন আগেই মারা গিয়েছে। আমার বোন ময়মনসিংহ থেকে এনে ওর বাসায় রেখেছে। ওর বাচ্চাটিকে দেখাশোনা করে। ভদ্রমহিলার চোখে মুখে কেমন একটা আকুতি ফুটে উঠলো। তিনি ঠিক খুশিতে নাকি কষ্টে কথাটি জিজ্ঞেস করলেন, সেটা তার বুড়ো মুখ থেকে আমি বুঝতে পারলাম না। তবে, আমার কানে এসে সেটা ঠেকলো একটি করুন আকুতি হয়ে। আমি বললাম, “জ্বী, ময়মনসিংহ যাই।”
তিনি সাথে সাথে বলে উঠলেন, “আজকাই ফিরবাইন?”
আমার বোনটি উত্তর দিল, “হ্যা, আজকেই ফিরবো।”
তিনি প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বললেন, “আমিও যাইয়াম।”
তার চোখ-মুখের আকুতি দেখে আমার খুব মায়া লাগলো। মাইক্রোবাসে যথেষ্ঠ সীট খালি আছে। আমি সাথে সাথেই ছোট বোনটিকে বললাম, “চলো, ওনাকে নিয়ে চলো।”
তাড়াহুড়ো করে তাকেও প্রস্তুত করে নেয়া হলো। তার ফোকলা দাতে ফুটে উঠলো একটি বিশাল হাসি। একটি মানুষ কতো অল্পতেই কত খুশি হতে পারে সেটা আমি এই জীবনে অনেক বার দেখেছি। আজো আবার সেটা দেখতে পেয়ে নিজের কাছেই খুব ভালো লাগছিল।
সব কিছু গুছিয়ে ঢাকা থেকে বের হতেই বেজে গেলো দুপুর প্রায় বারোটা।
ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ যেতে সময় লাগে দু’ঘন্টার মতো। বিমানবন্দর এলাকা পার হয়ে গাড়ি থামিয়ে অনেকগুলো পত্রিকা আর ম্যাগাজিন কিনে নিলাম। ঝকঝকে সুন্দর একটি দিন। হালকা একটু গরম পড়তে শুরু করেছে। গাড়িতে এসি ছেড়ে দিয়ে ড্রাইভারকে বললাম, ধীরে সুস্থ্যে গাড়ি চালাতে।
টঙ্গী এলাকা পার হয়েই আমি আশা করছিলাম, গাড়ির গতি কিছুটা বেড়ে যাবে। কিন্তু একটু একটু করে যতোই এগুচ্ছি গাড়ির গতি আর বাড়ানো যাচ্ছে না। গাজিপুর থেকে শুরু করে ভালুকা পর্যন্ত এই বিশাল এলাকা আর সেই আগের মতো নেই। দুই পাশে গড়ে উঠেছে শত শত শিল্প কারখানা। বেশির ভাগই পোষাক শিল্প কারখানা। দুপুর একটার দিকে লাঞ্চ ব্রেক। রাস্তার দুই পাশে দিয়ে হাজার হাজার ছেলেমেয়ে দুপুরের খাবারের জন্য হেটে হেটে চলেছে। এ এক অপূর্ব দৃশ্য। আমি পত্রিকার পাতা থেকে চোখ সরিয়ে মানুষ দেখতে শুরু করলাম। সেই দৃশ্য না দেখলে বিশ্বাস করার মতো নয়। হাজার হাজার তরুন বয়সের ছেলেমেয়েরা লাইন বেধে হেটে চলেছে। খুবই মুগ্ধকর সেই দৃশ্য।

এই সুন্দর দৃশ্য দেখে যেমন খুব ভালো লাগলো, আবার এই শিল্প-কারখানাগুলোর অত্যাচারে শালবন উজার হয়ে গেছে দেখে তারচেয়েও কষ্ট হল। এ কী! পুরো বনটিকে যেন শেষ করে ফেলা হচ্ছে। আমি আগে যখন এই রাস্তা দিয়ে ময়মনসিংহ যেতাম, তখন অপেক্ষা করতাম কখন শালবন আসবে। একসাথে অনেক সবুজ চোখে এসে লাগবে। গভীর বনের ভেতর দু’একজন হেটে হেটে যেতো - আর তাদেরকে দেখে প্রকৃতির সন্তান মনে হতো। একটা স্বপ্ন স্বপ্ন ব্যাপার কাজ করতো। ওই এলাকাতে এলেই কেমন একটা শান্তি শান্তি ব্যাপার হতো। শালবনের প্রতিটা গেট আমার মুখস্থ। ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আমি শালবন দেখতাম। কিন্তু এখন আর সেটা নেই। বেশিরভাগ বন কেটে তৈরী করা হয়েছে শিল্প কারখানা। আবার অনেক জায়গায় দেয়াল তুলে জমি দখল করে রাখা হয়েছে। গাছ কাটা হচ্ছে। ওই সব জায়গায় আরো শিল্প কারখানা গড়ে উঠবে। কিন্তু আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না, এভাবে বন উজার করে কেন শিল্প কারখানা করতে হবে! আমাদের তো দুটো জিনিসেরই দরকার আছে। আমরা শিল্পয়ান চাই, আবার আমাদের হাজার বছরের বন সম্পদকেও রাখতে চাই। একটি জনপদে বনের ভূমিকা কী সেটা তো আর নতুন করে বুঝিয়ে বলার দরকার নেই। কিন্তু কেউ কি এটা নিয়ে একটু ভাবেননি? শিল্প কারখানাগুলো কি বন এলাকার বাইরে করা যেত না?
চারপাশের সব সুবজ যেন হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেছে। সুবজের দেখা পেলাম সেই ভালুকা পাড় হয়ে প্রায় ত্রিশালের কাছাকাছি এসে। তার একটু পরেই ময়মনসিংহ শহর। যেভাবে রাস্তার দুই পাশে শিল্প কারখানা গড়ে উঠছে, পরের বার ময়মনসিংহ গেলে হয়তো আর এতটুকু সবুজ দেখতে পাবো না। ময়মনসিংহ পর্যন্তই সব জায়গা দখল হয়ে যাবে। মানুষ যেন তেলাপোকার মতো চারদিকের সবকিছুকে কিলবিল করে খেয়ে ফেলবে।
ময়মনসিংহ পৌছাতে বিকেল তিনটা বেজে গেলো।
বাড়ির উঠানে পা দিয়েই যেন আমার বয়স কমে গেল। উঠোনটির এক দিকে ছোট একটি ইটের বাড়ি, আর সামনে বেশ বড় একটি উঠোন; চারদিকে ইটের দেয়াল। এই উঠোন, এই সুপারি নারকেল আর অন্যান্য গাছগুলো, ওই পাশের কলাগাছ - সব কিছু কত চেনা, কত স্মৃতি আর ঘটনার সাক্ষি। পুরো বাড়িটাই মা’র তৈরী করা। এই বাড়ির প্রতিটি মাটি কনা, ইট শুরকি, দেয়াল, গাছপালা - সব কিছু তার করা। এই উঠোনে মা বিভিন্ন রকমের সবজি চাষ করতেন। শীতের দুপুরে ভাত খেয়ে এই উঠোনে বসে পান খেতেন। তারপর আশেপাশের পড়শিরা এসে যোগ দিতো সেই পানের আড্ডায়।
হাত-মুখ ধূয়ে দুপুরের খাবার খেতে বসলাম। আহ! সে কি খাবার! সে কি স্বাদ! ময়মনসিংহের লাল ছোট আলু আমার খুব পছন্দ। সেই আলু দিয়ে মুরগীর ঝোল। লাল আলুর ভর্তা, কিংবা লাল আলু আর শোল মাছের তরকারী। এই খাবারের জন্য যেন হাজার বছর অপেক্ষা করে থাকা যায়। (এই লিখতে বসেও আমি খাবারগুলো আবার ভিজুয়ালাইজ করে ফেললাম।) দুপুরে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি খেয়ে ফেললাম। তারপরেও যেন মনে হচ্ছিল, ইস আরেকটু যদি খেতে পারতাম। (কোথা থেকে যে একটা রাক্ষস এসে ভড় করেছে!)
খাবার খেয়েই ছুটলাম গুলকীবাড়ি কবরস্থানে। মা-বাবার কবর দুটো পাশাপাশি। অনেক ঘাস জমে গিয়েছিল। আমাদেরকে দেখে রক্ষনাবেক্ষনের একজন লোক এসে ছালাম দিল। তাকে কিছু টাকা দিয়ে বললাম, কবর দুটো পরিষ্কার করে দিতে। ওই লোকটি তখুনি কবর দুটো পরিষ্কারে নেমে গেলো। কবর পরিষ্কার করতে করতে সেই লোক বিভিন্ন রকমের প্রস্তাব দিয়ে যাচ্ছিল, যার বেশিরভাগই হলো টাকা-পয়সা সম্পর্কিত। সে একটানা কথা বলে যাচ্ছে। এই লোকগুলো খুব ভালো করে মানুষের দূর্বল মনকে কাজে লাগাতে পারে। এরা খুব ভালো করে জানে, আপনার মন এখন দূর্বল। অপনার পকেট থেকে টাকা বের করা এখন খুব সহজ একটি কাজ। কয়েক বছর আগে, আমি এই কবরের রক্ষনাবেক্ষনের জন্য কিছু টাকা দিয়েছিলাম। পরে দেখি, সেই লোক একই কাজের জন্য আমার ছোট ভাইয়ের কাছ থেকেও আরো তিনগুন টাকা নিয়েছিল। কবরাস্থানের আশেপাশে আমার কিছু বন্ধু থাকে। ওরা আমাকে বলেছে, যারা কবরস্থানে রক্ষনাবেক্ষনের কাজ করে, তারা নাকি বিশাল বিত্তের মালিক। আমার ভাবতেই খারাপ লাগছিল, যেই মানুষটি হাতে একটি কাঁচি নিয়ে কবরের আবর্জনা পরিষ্কার করছে, প্রতিনিয়ত মানুষকে তার দারীদ্রের কথা বলছে, তারই নাকি ওই শহরেই রয়েছে তিন তলা বাড়ি। আবার কারো নাকি একাধিক বাড়ি। এই লোকগুলোর প্রতি বিশ্বাসটা আমার সেই থেকেই উঠে গিয়েছিল। কেউ মানুষকে এভাবে ঠকাচ্ছে, এটা ভাবতে ভালো লাগছিল না। তাই ওই লোকটি যতই বিভিন্ন রকমের বুদ্ধি আর পরামর্শ দিচ্ছিল, আমি সেগুলোতে মন দিচ্ছিলাম না; সব কিছুকেই কেমন একটি ফন্দির অংশ মনে হচ্ছিল। বার বার মনে হচ্ছিল, আমি একটি আলো আর অন্ধকারের ভেতর দাড়িয়ে যুদ্ধ করছি - আমার ব্রেইনের একটি অংশ নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছিল মা-বাবার স্মৃতিতে উদ্ভাসিত আলোয়; আর আরেকটি অংশ যেন যুদ্ধ করছিল চরম বাস্তবতার সাথে, অন্ধকারের সাথে। কিন্তু আমি সত্যি এমন একটি অনুভূতি চাইনি। আমি চেয়েছিলাম, কিছুটা সময় এই পৃথিবীর চরম বাস্তবতা থেকে দূরে গিয়ে বাবা-মার পাশে বসে থাকতে। আমি আমার ছোট মেয়েটিকে নিয়ে গিয়েছি তাদের কাছে। তারা আমার মেয়েটিকে কখনও দেখেননি। সুনিভাকে বলে রেখেছি, তার দাদা-দাদী এখানে ঘুমিয়ে আছেন। সুনিভা এখন টুকটাক কথা বলতে পারে। মাথা নাড়িয়ে ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় ও বলেছে, “দাদু ঘুমিয়ে আছে।”
আমি সুনিভাকে কোলে নিয়ে দাড়িয়ে আছি মা-বাবার পাশে। কবরের আরেক পাশে আমার স্ত্রী। একটু পরেই আলোর জয় হলো। আমি যেন শুনতে পেলাম, মা আমাকে ডেকে বললেন, “বাবা, তুই এসেছিস?” মা’র এই কথা শুনে আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। সুনিভাকে জড়িয়ে ধরে ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠলাম। সুনিভা কখনও তার বাবাকে কাঁদতে দেখেনি। এটা দেখে সে হয়তো একটু ভয় পেয়ে গেলো। সাথে সাথেই ও চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। আমি ওকে আরো শক্ত করে বুকের ভেতর জড়িয়ে ধরলাম।
কবরস্থান থেকে বের হয়ে আর বাসায় যেতে ইচ্ছে করছিল না। গুলকীবাড়ি মসজিদের সাথে লাগানো বাসাটা মঈনদের। স্কুল আর কলেজ জীবনে প্রতিটি দিন আড্ডা হতো মঈনদের এই বাড়িতে। খোজ নিয়ে দেখলাম, খালাম্মা এখন বাসায় নেই, ঢাকায় এসেছেন। বাড়িটিকেও খুব পুরনো মনে হলো। এই বাড়ি, এই রাস্তা, এই শহর, শহরের প্রতিটি গলি, প্রতিটি ইট শুরকি যেন এক সময় আমার বন্ধু ছিল। সাইকেল নিয়ে এই শহরের প্রতিটি গলি ঘুরে বেড়িয়েছি। আজ কেন যেন সব কিছু বিবর্ণ লাগছিল। মায়া নামের যেই জিনিসটি সব রুক্ষতা থেকে আমাদেরকে আগলে রাখে, সেটার প্রলেপ যেন কমে এসেছে। শহরটি যেন অত্যাচারিত হয়েছে। অত্যাচারের সেই থাবা থেকে বাঁচার জন্য ছুটে গেলাম বহ্মপুত্রের পাড়ে - আহ, আমার বহ্মপুত্র।
এই শীতের শেষেও নদীটিতে বেশ পানি আছে। আমি এতোটা পানি আশা করিনি। কারন, আগের বছরগুলোতে দেখছিলাম কিভাবে মানুষ হেটে হেটে নদী পার হচ্ছিল। নদীর পাড়ে এখন পার্কটি কিছুটা বানিজ্যিক হয়ে পড়েছে। তীরটি পাকা করা হয়েছে অনেকদূর পর্যন্ত। হরেক রকমের মানুষ বিকেলে এসেছে নদীর ধারে। বাদাম, চটপটি আর ফেরীওয়ালার সংখ্যাও এখন অনেক বেড়েছে। কেমন একটা কৃত্রিমতা এসে গিলে ফেলেছে পরিবেশটাকে। প্রাকৃতিক সেই গন্ধটিও যেন হারিয়ে গেছে কোথাও।
পার্কের ভেতর নদীর ধার ঘেসে বালুর উপর একটা জায়গায় আমরা প্রতিদিন বসতাম। ওই পার্কের ভেতরে রয়েছে ডিভিশনাল ফরেষ্ট অফিসার আর রোডস এন্ড হাইওয়ের প্রকৌশলীর বাসা। সৌভাগ্যক্রমে আমি যখন জিলা স্কুলে পড়তাম, ওই দুটো বাসাতেই থাকতো আমাদের দুই সহপাঠি - একটিতে নোমান, আরেকটিতে এটম। তাই পুরো এলাকাটাই ছিল আমাদের দখলে। এমনকি নৌকার মাঝিদেরকে পর্যন্ত আমরা চিনতাম। কৈশর আর যৌবনের ফেলা আসা সেই নদীটির জন্য এক ধরনের মায়া এসে ভর করলো। এই নদীর পানিতে হাত না ভেজালে একে অপমান করা হবে। সেই ধৃষ্ঠতা যেন আমার কখনই না হয়। তাই একটি নৌকা দেখিয়ে সুনিভাকে বললাম, “মা, নৌকায় চড়বে?”
সুনিভা সাধারনত নৌকায় চড়তে চায় না। হয়তো ভয় পায়। আমি মনে মনে ভাবছিলাম, মেয়েটি এখন নৌকায় উঠতে না চাইলে আমি একা একা কিভাবে নৌকায় উঠি! কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে সুনিভা লাফাতে লাফাতে বললো, “উঠবো, নৌকা উঠবো।”

আমরা সুন্দর পরিচ্ছন্ন একটি নৌকায় চড়ে বসলাম। আশেপাশের নৌকাগুলোকেও বেশ সুন্দর লাগছিল। আগের নৌকাগুলো ছিল বেশ ভাঙ্গাচুরা ধরনের। এখন হয়তো তাদের ব্যবসা ভালো হচ্ছে। তাই নৌকার বাহারও বেড়েছে। নৌকা এপাড় থেকে ওপাড়ে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের। সুনিভা নৌকার উপর খুশিতে লাফাতে শুরু করলো। পানিতে হাত দেয়ার জন্য ছটফট করতে থাকে। আমি নিজে পানিতে হাত ভেজালাম। সেখান থেকে সুনিভাকে দিলাম কিছুটা। টলেটলে সেই পানি হাতে নিয়ে মনে হচ্ছিল, এই পানি কি জানে আরো বিশটি বছর আগে সেই পানিতে ডুব দিয়েছিলাম আমি? হয়তো জানে, হয়তো জানে না। কারন, বয়ে যায় নদী, বয়ে যায় সময়, আর তার সাথে বয়ে যায় আমাদের জীবন। ক্ষুদ্র জীবন।
সূর্য্য তখন পড়ন্ত। পুরো নদীতে নেমে এসেছে কেমন একটি স্নিগ্ধতা। মাঝির বৈঠার প্রতিটি আঘাতে আছড়ে পড়ছে যে পানি, পাড়ের বিশাল গাছগুলোর ফাক গলে চলে আসা রোদে সেই পানি করছে চিকচিক। গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হলো, দেবতার মতো আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছে। আমিও ওদের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললাম, ভালো আছো তো?
গাছগুলো কোনও উত্তর দিল না। শুধু মুচকি মুচকি হেসেই গেলো। সূর্য্য যতই নীচে নেমে যেতে থাকে, সেই গাছগুলো ততই রহস্যময় হয়ে উঠে। তাদের কালো ছায়া বহ্মপুত্রের পানিকেও গভীর করে তোলে।
এই বহ্মপূত্রকে রেখে আমাদেরও আর সেদিন ঢাকা ফেরা হলো না। ঢাকা ফিরলাম পরের দিন, ২৫শে ফ্রেরুয়ারী - ইতিহাসের আরেকটি কালো দিনে।
১৪ মার্চ ২০০৯
ক্যালিফোর্নিয়া

Comments
অপূর্ব
স্বপন ভাইকে অনেক ধন্যবাদ এই অনবদ্য লেখাটির জন্য।আমি লেখাটা পড়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি।এ যেন আমারই জীবনের গল্প।বিশেষ করে মা এবং মা এর হাতের রান্না,পান খাওয়া ঘটনাগুলি যেন আমার মায়েরই ঘটনা।২০০৬ সালে আমি দেশে গিয়ে ক্ষনিকের জন্য নিজ বাড়িতে গিয়েছিলাম।কোথায় বাড়ী,এ যেন মা বিহিন এক শুন্য ভুতুরে ভিটে।নিজ অজান্তেই মাকে ডেকে বললাম মা আমি তোমার হাতের পান খেতে এত দূরে এলাম কই পান তো এখন ও দিলে না।সাথে সাথেই আমার মনে হল আমার মা যে আর আর কোনদিনই আমাকে পান খেতে দিবে না।আমার মেয়ে আমার দিকে করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল আমি তাকেই জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠেছিলাম।শীতে মায়ের হাতে পিঠা!ওহ সে যেন এক অমৃত জিনিস খোদা নিজ হাতে মাকে দান করেছিলেন।বাবা নেই মা নেই মায়ের হাতের পিঁঠে নেই,নেই আগের সেই লোকজন।চাদনী রাতে এখন আর বাড়ীর উঠোনে পাটি বিছিয়ে দুদু কাকা গল্প বলতে আসে না,নেই সেই ছোটবেলার বন্ধুরা যাদেরকে নিয়ে ফুলু ফুফুর বাড়ির আম চুরি করে খেতাম।নেই সেই আগের পরিচিত জনেরা,সবই পরিবর্তন হয়েছে।রাস্তা ঘাট পাকা হয়েছে,গ্রামের বাজার অনেক প্রসারিত হয়েছে।গ্রামে স্কুল ছিল এখন কলেজ হয়েছে।গ্রামের সেই প্রাইমারী স্কুল যেখানে আমি পড়েছি,আমাকে যেন ডাকছে।মনে পড়েছে সেই স্যারদের কথা।গ্রামের নদী রেল স্টেশন সবই আগের মত আছে।নেই শুধু মা আর বাবা যাদের ছায়ায় আমি বড় হয়েছি।
স্বপন ভাই আপনাকে আবার ও ধন্যবাদ এমন একটি হৃদয়স্পর্শী অথচ বাস্তব গল্প লেখার জন্য।
BOYE BOYE JAI NODI
dear swapan
tomar lekhar subade tomar meyer chobi dekhlam. cute n' cool.
lekha porte porte amar chokhe e jol ase gelo. tomar ma-babar moto gulkibarir gorsthane amar ma-baba gumiye ache. ma-baba haranor bethata ami buji. maje maje mone hoi, ei jibon kichu na. chokh bujle sob shesh.
circuithouse park er okhane gele lucky akhand er NEEL MONIHAR ganta khub mone pore, jeta tomar khub favourite gan chilo.
soisober dingulo prai mone pore.
PentasonicTone
নৌকাগুলো বেশ সুন্দর
Thanks Mr.Zakaria
Thanks Mr.Zakaria,after any days I saw a real picture of Bangladesh[(I left Bangladesh after EID(Ramzan)].
You remind me again my motherland.
এডিটর ভাই.............
মেয়েটি কি সুনিভা? কিউট ফেস, আপনার সাথে মিলছেনা। তবে তাকাচ্ছে আপনার মত; গভীরভাবে। নিশ্চয় যাঁকে আমাদের থেকে আড়াল করে রেখেছেন, তাঁর সাথে মিল আছে?
সবাই ভাল থাকুন,
সুস্হ থাকুন,
সুন্দর থাকুন-
-হৃদয়
এডিটর ভাই.............
লাল আলু দিয়ে মুরগীর ঝোল! কাঠ কাঠি দিয়ে মাটির চুলায় রান্না? কি মজা!
আমারও ইচ্ছে হচ্ছে এখান থেকে এক দৌড়ে ওখানে চলে যাই................
সবাই ভাল থাকুন,
সুস্হ থাকুন,
সুন্দর থাকুন-
-হৃদয়
Fantastic picture, dear editor!
It's an excellent picture of you and your daughter you posted! It's really wonderful! I looked at the picture for long time, many times.
By the way, thanks for your article too. This kind of travel experience is kind of a new taste amongst boring political contents that we mostly have.
পথের পাঁচালী...
পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া বলেন - মূর্খ বালক, পথ তো আমার শেষ হয়নি তোমাদের গ্রামের বাঁশের বনে, ঠাঙাড়ে বীরু রায়ের বটতলায় কি ধলচিতের খেয়াঘাটের সীমানায়? তোমাদের সোনাডাঙা মাঠ ছাড়িয়ে, ব্রক্ষ্মপুত্র পার হয়ে, পদ্মফুলে ভরা মধুখালি বিলের পাশ কাটিয়ে, বেত্রবতীর খেয়ায় পাড়ি দিয়ে, পথ আমার চলে গেল সামনে, সামনে, শুধুই সামনে… দেশ ছেড়ে বিদেশের দিকে, সুর্যোদয় ছেড়ে সূর্যাস্তের দিকে, জানার গন্ডি এড়িয়ে অপরিচয়ের উদ্দেশ্যে…
দিনরাত্রি পার হয়ে, জন্ম মরণ পার হয়ে, মাস, বর্ষ, মনন্তর, মহাযুগ পার হয়ে চলে যায়… তোমাদের মর্মর জীবন-সপ্ন শেওলা-ছাতার দলে ভরে আসে, পথ আমার তখনো ফুরোয় না… চলে… চলে… চলে… এগিয়েই চলে…
অনির্বাণ তার বীণা শোনে শুধু অনন্ত কাল আর অনন্ত আকাশ…
সে পথের বিচিত্র আনন্দ-যাত্রার অদৃশ্য তিলক তোমার ললাটে পরিয়েই তো তোমাকে ঘরছাড়া করে এনেছি!…
চল এগিয়ে যাই।