
২৬ ফ্রেব্রুয়ারী বৃহস্পতিবার। সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেলো যে, সেনাবাহিনী আর আক্রমন করছে না। ততক্ষণে পিলখানার ভেতরে বিদ্রোহী দল সাদা পতাকা উত্তোলন করে দিয়েছে। তখনও অবশ্য কেউ জানে না যে, ভেতরে ঠিক কতজন বিডিআর জোয়ান রয়েছেন। কারন তখন দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বাসে করে পালিয়া যাওয়ার সময় র্যাব অনেককেই আটক করতে শুরু করেছে। তাদের কাছ থেকে চুরি হয়ে যাওয়া স্বর্নালংকারও পাওয়া গিয়েছে।
বিডিআর জোয়ানদের চিনতে খুব বেশি কষ্ট হওয়ার কথা নয়। সবারই চুল ছোট করে কাটা। যাদেরকে ধরে আনা হচ্ছিল তাদেরকে দেখে কেমন যেন গোবেচারা ধরনের মনে হচ্ছিল। তবে তাদের শরীরের আপাদমস্তক একটা দরীদ্রের ছাপ পরিলক্ষিত। খুব গরীব পরিবার থেকে জীবনের তাগিদে এরা বিডিআর-এ যোগ দিয়েছে, সেটা বুঝতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
বিকেলের দিকে জাতীয় সংসদের সদস্যা মেহের আফরোজ চুমকি পিলখানার ভেতর থেকে জানালেন যে, ভেতরে আর কোন সেনাসদস্য আটক নেই। কিন্তু তিনি জানালেন না, কত জন মারা গিয়েছে। আমি আমার আগের ব্লগগুলোতে লিখেছিলাম যে, সরকারের কাছের মানুষরা ঘটনার ক্ষয়ক্ষতির পরিমান আগেই জেনেগিয়েছিলেন। সেটাই হয়তো স্বাভাবিক ছিল। তারা অহরহই ভেতরে গিয়েছেন। বাইরে থেকে আমাদের যদি এতো আগ্রহ থাকে, তাহলে তারাও সেটা নির্নয় করতে সমর্থ হয়েছিলেন বৈকি। কিন্তু তারা সেই তথ্যটুকু বাইরে কেউ দিতে চাননি। হয়তো আরো বেশি গন্ডগোল হতে পারে, সেটা ভেবেই নিহতের সংখ্যাটি প্রকাশ করতে চাননি।

তখন টেলিভিশনের পর্দায় বারবার দেখাচ্ছিল আটকে পড়া পরিবারগুলোর দৃশ্য। শিশু এবং অনেক নারী আটকা পড়ে গিয়েছিলেন। তারা সবাই যেন একটু নতুন জীবন হাতে পেলেন। যে পরিবারগুলো ছাড়া পাচ্ছিলেন, তাদেরকে টিভি ক্যামেরাগুলো ছেকে ধরছিল। অনেকেরই কথা বলার মতো অবস্থা ছিল না। সেটাই স্বাভাবিক। তার ভেতরও কেউ কেউ কথা বললেন। কোন রকমে হাপিয়ে হাপিয়ে কিছু সংক্ষিপ্ত কথা। বেশিরভাগ সাংবাদিকের প্রশ্ন ছিল, আপনারা ভেতরে কেমন ছিলেন? আপনাদেরকে ঠিকমতো খাবার দিয়েছিল? কোন অত্যাচার করেছে কি না?
এমন মানসিক অবস্থায় কারো পক্ষে কি এই ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেয়া সম্ভব! কারো কারো চেহারায় সেটা ফুটেও উঠলো। তারা হাত জড়ো করে মাফ চাইলেন। তবে এই যন্ত্রনার মাঝেও বেশ কিছু ভদ্রমহিলা কথা বললেন। তারা তাদের বাচ্চা নিয়ে হেটে যেতে যেতে বললেন, "নাহ, ওরা কোনও খারাপ ব্যবহার করেনি। অনেক ভালো ব্যবহার করেছে।"
বেশ কয়েকটি পরিবার বেশ জোড় দিয়েই বললেন, "খুব ভালো ব্যবহার করেছে।" তারা যখন এই কথাগুলো বলছিলেন, তখন অন্তত আমার মনে হয়নি, তারা মিথ্যা বলছেন, কিংবা কোন প্রেসার থেকে সেটা বলছেন। তাদের চোখে পানি ছিল, তাদের মুখে আতংক ছিল। প্রতিটি পরিবার যখন গেট দিয়ে বের হচ্ছিল, তখন যেন বুকের উপর থেকে একটি করে পাথর নেমে যাচ্ছিল। সেই পরিবারগুলো যে ট্রমার ভেতর দিয়ে গিয়েছে, সেই শিশুগুলো যে যন্ত্রনাকর সময় পার করেছে, তাদের মনের ভেতর যে গভীর ক্ষত তৈরী হয়েছে, প্রকৃতি যেন তাদের সেই ক্ষতকে শুষে নেয়। প্রকৃতি যেন পরম কোমল হাতে তাদের সেই ব্যাথাকে ভুলিয়ে দেয়। প্রকৃতি যেন আর কোন শিশু এবং নারীকে এমন বিপদের মুখে কখনই না ফেলে।
কিন্তু দূর্ভাগ্য জনক হলেও সত্যি যে, তখন পর্যন্ত বিডিআর-এর ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক হলেন তৌহিদ। তিনি সমস্ত বিডিআর সদস্যদেরকে শান্ত থাকার নির্দেশ দিলেন। আর এখন যখন আমি ব্লগ লিখছি, তখন তিনিই কিনা মূল আসামী; এবং তাকে আটক করে রাখা হয়েছে। তাহলে খেলাটি কী হলো? তৌহিদ কি তাহলে বলির পাঠা? বিডিআর-এ তো আরো কয়েকজন ডিএডি ছিলেন। সবাই থাকতে তৌহিদ সাহেব কেনই বা ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক; এবং পরক্ষণেই আবার তার হাতেই হাতকড়া। ছোট বেলায় সিরাজউদ্দৌলা যাত্রাপালা দেখে মনের ভেতর একটা ধারনা জন্মে ছিল যে, তখনকার রাজদরবারকে ঘিরে সারাক্ষণই চলতে থাকে বিভিন্ন ধরনের চক্রান্ত। তার নামই হয়তো রাজনীতি। এই পরিনত বয়সে এসে তারই ভিন্ন ভার্সন দেখছি কি না, নিজের মনের ভেতর এমন একটি প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। বেচারা।
আর ওদিকে পুরো বিডিআর-এর অস্ত্রভান্ডারের দায়িত্ব নিয়েছে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ান। রাত আটটার দিকে সাহারা খাতুন জানালেন, বিডিআর সদর দফতরের পুরো নিয়ন্ত্রণ এখন সরকারের। সাংবাদিকরা তাকে বার বার জিজ্ঞেস করছিল, কত জন সেনাবাহিনীর অফিসার মারা গিয়েছেন। তিনি তখনও সেই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেলেন।
তবে একজন সেনা অফিসার নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে মিডিয়াকে জানিয়েছেন যে, ভেতরে মোট ১৬৮ জন সেনা অফিসার থাকার কথা। তার ভেতর তখন পর্যন্ত মাত্র ৯ জনের লাশ পাওয়া গিয়েছে; আর ২২ জন মুক্তি পেয়েছেন। অনেকেই যে পালিয়ে বের হয়ে আসতে পেরেছিলেন, তখনো হয়তো সেটা অনুমান করা যায়নি। যদি তার সেই তথ্য সঠিক হয়ে থাকে, তাহলে বুঝা যাচ্ছে প্রায় একশর মতো অফিসার পালিয়ে আসতে এবং মুক্তি পেয়ে বের হয়ে আসতে পেরেছিলেন।
রাতের বেলা বিভিন্ন জায়গা থেকে আটক করা বিডিআর জোয়ানদেরকে এনে ধানমন্ডি মাঠে জড় করা হচ্ছিল। খোলা মাঠের ভেতর তাদেরকে আটকে রাখা হয়েছে। অনেকটা যুদ্ধাপরাধীর মতো। একদিন আগেই তাদের কাছে অনেক ক্ষমতা ছিল। এখন তারা পরাহত। নিরিহ প্রাণীর মতো ভাবলেশহীন।
একটু পর আমার বইয়ের প্রকাশক ফরিদ আহমেদ সাহেব ফোন করে আমার খোজ নিলেন। তিনিও ধানমন্ডিতে থাকেন। তিনি জানালেন, তারা স্ত্রী ইতোমধ্যেই ধানমন্ডি এলাকা ছেড়ে গুলশানে এক আত্মীয়ের বাসায় চলে গেছেন। আরো জানালেন, সেদিন বইমেলা ছিল প্রায় বন্ধ। তেমন কোনও দর্শক আসেনি। তিনি আরো জানালেন, আমার বাসার একই সড়কের একটি বাড়িতে লেখক আনিসুল হকও অবস্থান করছেন। আনিসুল হকের নিজের বাড়িটি পিলখানার গেট থেকে বেশ কাছে। তাই তিনি আরেকটু দূরে সড়ে এসেছেন। আনিস ভাই আমার চেয়ে অনেক বেশি খবর রাখেন। তিনি যেহেতু এই রাস্তায় আছেন, তাহলে একটা হিসাব নিশ্চই তিনি করেছেন। এটা ভেবে আমি নিজেও একটু আশ্বস্থ্য অনুভব করলাম।
কিন্তু আমার সেই অনুভূতি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলে না। রাতে পরিচিত সাংবাদিক বন্ধুরা জানালো যে, আবাহনী মাঠে যেভাবে এনে সকল বিডিআর-দেরকে রাখা হচ্ছে, সেটা নিয়ে ভয়ের একটা ব্যাপার আছে। তাদের উপর অত্যাচার হতে পারে। এই ধরনের সময়গুলোতে মানুষের ভেতর অনেক রকমের সন্দেহ দানা বাঁধে। বিনা কারনেও অনেক সময় দুঃচিন্তা এসে ভড় করে।

যে জঘন্য হত্যাকান্ড হয়েছে সেটা খুবই বেদনাদায়ক। যারা এই জঘন্য হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে, তাদের সুষ্ঠ বিচার হোক, সেটা চাননা এমন মানুষ পাওয়া যাবে না। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি নির্দোষ মানুষও যদি নির্যাতনের শিকার হন, সেটা হবে আরো বেদনাদায়ক। অতিতে আমাদের এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে। এক জনের দোষ আরেকজনের কাধে চাপিয়ে দিয়ে মূল ব্যক্তিদেরকে আড়াল করা হয়েছে। আবার অনেক সময় মূল বিচার শুরু হওয়ার আগেই নিরীহ সৈনিককে মেরে ফেলা হয়েছে। এমন একটি ভয় অনেকের মাঝেই কাজ করছিল; বিশেষ করে আমার সমসাময়িক মানুষের মনে তো বটেই।
রাত যতো বাড়তে শুরু করলো, আমার মনের ভেতর কেমন যেন একটা খুঁতখুঁত কাজ করতে শুরু করলো। আমার মন আমাকে বলতে থাকলো, ধানমন্ডি মাঠে যাও। রাত পৌনে বারোটার সময় আমি ধানমন্ডি আবাহনী মাঠে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলাম। হেটে গেলে মিনিট দশেক; আর রিক্সা পেলে পাঁচ মিনিট। কিন্তু আমার সেই সিদ্ধান্তের উপর পুরো পরিবারের ভেটো এসে পড়লো। এতো রাতে আমাকে বাসার কেউ বাইরে যেতে দেবে না। এটা মোটেও নাকি নিরাপদ নয়। পরিবারের সদস্যদের কাছে আমার কোনও যুক্তিই আর টিকলো না। একটা হৈ চৈ পড়ে যাওয়ার মতো ব্যাপার হতে যাচ্ছে। আমি হার মানলাম। এতো রাতে কোন দৃশ্য তৈরী করতে আমারও অস্বস্থি লাগছিল। মাথা নিচু করে আমি শুতে গেলাম।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমি দেখতে পেলাম, শত শত দরীদ্র মানুষ এক কাপড়ে ঠান্ডা রাতে খোলা আকাশের নীচে মাটিতে বসে আছে। তাদের চোখগুলো মৃত মাছের মতো সাদা। তারা জানে না, রাজনৈতিক মার-প্যাঁচে পড়ে কতগুলো নির্দোষ প্রাণ হারিয়ে যাবে। আমি আমার জীবনদশায় যদি জানতে পারি, একটি নির্দোষ প্রাণও কেউ হারিয়েছে, তাহলে আমার সবসময়ই মনে হবে, আমি তাদেরকে দেখতে যেতে পারিনি; যেমনটি আমি দেখতে যেতে পারিনি, সেনাবাহিনীর এতোগুলো নির্দোষ প্রানকে।
[চলবে]
ক্যালিফোর্নিয়া
৭ এপ্রিল, ২০০৯


Comments
এখানে সেনারা ম্যাসাকারের শিকার,এখানে জাতিসংঘের কি?
হাসিনা আজকে নতুন তথ্য ফাস করল যে, সেনাবাহিনী যদি সময়মত পিলখানায় একশনে যেত তাহলে জাতিসংঘ নাকি সৈন্য ফেরত পাঠাত।এখানে সেনারা ম্যাসাকারের শিকার,এখানে জাতিসংঘের কি?সময়মত একশন হলে ১,৬৫-৭০ অফিসার মরত না,২,বড়জোর ১৫-২০ জন বিপথগামি বিডিআর মরত,৩,ওরা পালায়ে যেত পারত না এতে আসল হোতাদের ধরা সহজ হতো।৪,জাতিসংঘে ভাড়া খাটার লাগি আমরা সেনাবাহিনী পোষতেছি না।ঐ লোভ থেকে সেনাবাহিনী| দেশের স্বার্থে খালেদার প্রশনের উততর চাওয়া উচিত দেশবাসীর।ষড়যনত্রকারীদের হাত ধরে হাসিনা সরকারে আসছে এবং ঐ ষড়যনত্রকারীরাই তাদের অশুভ এজেনডা বাসতবায়নের লাগি একদিকে সেনা অফিসারদের মারছে অন্য দিকে বিডিআরকে শেষ করে দিলো।বিডিআর বিদ্রোহ দমন করতে গেলে নাকি জাতিসংঘ থেকে সৈন্য ফেরত যেত।হাসিনা যে ষড়যনত্রকারীদের দ্বার পরিচালিত হচেছ তাতেই বুঝা যায়।আমরা পিলখানা হততা কানড থেকে বুঝলাম ১৯৫৭ সালে মিরজাপররা কিভাবে পলাসির জুদদে ভুমিকা রেখেছিল এর থেকে আমরা জানলাম:বর্তমান যুগের মীর জাফর - মঈন, ঘোসেটি বেগম - হাসিনা, জগৎশেঠ - নানক, রায় বল্লভ - মীর্জা আযম, মীরন -তোরাব, মোহাম্মদী বেগ - লেদার লিটন|