
বিডিআর নিয়ে আমার লেখাটা এখনো শেষ হয়নি। তার ভেতর একটার পর একটা কান্ড ঘটেই চলেছে। বিষয়গুলো এড়িয়ে গেলেও হয়; আবার একদম ফেলেও দেয়া যাচ্ছে না। তাই ভাবছি, ঝটপট সিঙ্গাপুর সংক্রান্ত অভিজ্ঞতাটুকু শেষ করে, অন্য লেখায় ফিরে যাই। তবে সবই অ-সুখের কথা।
সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতাল:
আগের লেখাতে মাউন্ট এলিজাবেথ এবং কে.কে হাসপাতালের কথা কিছুটা বলেছিলাম। কে.কে হাসপাতলে ঈমানকে দেখিয়ে আমরা মুগ্ধ এই জন্য যে, বিশ্বের সেরা চিকিৎসা ওর জন্য নিশ্চিত করা গিয়েছে; এবং সেটা খুবই কম খরচে। খরচের কথা শুনে অনেকেই হয়তো ভাবছেন, আমি রসিকতা করছি। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা করাতে যাওটাই তো একটা বিশাল খরচ। হ্যা, আসা যাওয়ার খরচটা তো একটু বেশি। দেশের ভেতর চিকিৎসা হলে সেটা লাগতো না। কিন্তু আপনি তো আর সর্দি কাশির জন্য সিঙ্গাপুর যাচ্ছেন না। জীবনের সাথে বাজী রেখেই ওখানে যাচ্ছেন। সেই তুলনায় কম। (খরচের দু'একটা উদাহরণ একটু পরেই দিচ্ছি।)
কে.কে হাসপাতালের চিকিৎসার উপর ভরসা করা যায়। তবে, এই ধরনের জটিল রোগীর জন্য আরেকটি ডাক্তারের পরামর্শ নেয়াটা ডাক্তারের ইথিক্স-এর বাইরে নয়। এবং প্রফেশনাল ডাক্তারটা তাতে মোটেও মাইন্ড করেন না। তবে বাংলাদেশের ডাক্তাররা মাইন্ড করেন। তারা বাইরে থেকে কাউকে দেখিয়ে গেলে, মুখ বাকিয়ে বলবেন, "আপনারা তো ব্যাংকক সিঙ্গাপুরেই ডাক্তার দেখাতে পারেন, আমাদের না দেখালেও তো চলবে।" আমার নিজেকেই সেটা ফেস করতে হয়েছিল। কিন্তু একজন ভ্দ্র ডাক্তার কখনই সেটা মনে করবেন না। রোগীর জীবন বলে কথা। রোগী যেখানে ভালো মনে করবে, সেখানে দেখাবে। এটাকে ব্যাক্তিগতভাবে নেয়ার কোনও কারন নেই।
একদিন পর আমাদের এপোয়েনম্যান্ট পাওয়া গেল সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে। ওখানেও আন্তর্জাতিক রোগীদের দেখাশোনা করার জন্য বিশেষ বিভাগ রয়েছে। ওদের মাধ্যমেই আপনাকে যেতে হবে। ওরাই আপনাকে সব কিছু ঠিক করে দেবে। ওরাই আপনাকে আবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে।
খুবই বিশাল একটি হাসপাতাল। আমার ধারনাই ছিল না যে, এমন ছোট একটি শহরে এতো বড় একটু হাসপাতাল থাকতে পারে। হাসপাতালের একজন সহযোগী আমাদেরকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন। যাওয়ার পথে তাকে জিজ্ঞস করলাম, এখানে কেমন রোগী আসে?
তিনি জানালেন, হাসপাতালে ৯০০ মতো বেড রয়েছে। তবে প্রতিদিন কম পক্ষে ৫০ জনের মতো বিদেশী রোগী আসে। আর ভীড় হলে ১০০ কিংবা আরো বেশি হতে পারে। এই রোগীরা আসেন মূলত আশে-পাশের দেশগুলো থেকে। তবে বাংলাদেশ থেকেও যে অনেক রোগী আসে, সেটা দেখলাম ডাক্তারের জন্য অপেক্ষা করার জায়গায় বসে থেকে। বেশ কিছু বাংলাদেশী পরিবার চোখে পড়লো।
এই হাসপাতালের ডাক্তারও ঈমানকে দেখে বললেন, চিন্তা করার কোন কারনই নেই। বাচ্চাদের এমনটা হতেই পারে। ৬ থেকে ১৩ বছর বয়সের বাচ্চাদের লিম্ফ নোড খুবই সহজেই ফুলে যায়, বড় হয়ে যায়। এটাতে ক্যান্সার বা লিউকেমিয়া জাতীয় বিষয়ের কোন লক্ষণ তিনি দেখতে পেলেন না। তিনি আরো বলে দিলেন যে, তোমরা চাইলে আরো ডাক্তার দেখাতে পারো, আরো পরীক্ষা নিরিক্ষা করাতে পারো; ফলাফল একই হবে; তোমাদের খামাকা টাকা নষ্ট হবে। একজন ডাক্তার যখন রোগীকে খরচ বাচানোর কথা বলেন, এটা থেকেই তাদের রোগীর প্রতি দায়িত্ববোধটা বুঝা যায়। দুটো হাসপাতালেই ডাক্তার ফি নিল ৭০ সিঙ্গাপুর ডলার (অর্থ্যাৎ প্রায় ৫০ আমেরিকান ডলার)। বাংলাদেশী টাকায় তিন হাজার টাকার একটু বেশি। আমেরিকা বা বিশ্বের অন্যান্য দেশে এই খরচ অনেক বেশি বলেই আমার ধারনা। তবে সিটিস্ক্যান করতে নিয়েছিল ৫৭০ সিঙ্গাপুর ডলার। বাংলাদেশেও ভালো (?) কোথাও সিটিস্ক্যান করাতে গেলে খুব যে কম হবে, তা কিন্তু নয়। তবে আগেই বলেছিলাম, আপনার হয়তো জীবনের খুব ক্রিটিক্যাল সময়ই এমন হাসপাতালে যেতে হবে। সাধারন কাজে নয়।

হায়রে ল্যাব-এইড
আগের লেখাতে বলেছিলাম, আমাদের একজন পারিবারিক বন্ধুর সিঙ্গাপুর যাওয়ার কথা ছিল। তার নামটা এখানে বলা যেতে পারে। তিনি হলেন আরেফিন ভাই। আরেফিন ভাইয়ের মা অসুস্থ্য হয়ে পড়াতে তিনি আর যেতে পারলেন না। তিনি তার মা'কে ভর্তি করালেন ঢাকার ল্যাব-এইড হাসপাতালে।
এই সময়ে দুটো বিপরীতমূখী ব্যাপার ঘটতে শুরু করলো। আমরা সিঙ্গাপুরে একটি শিশুকে বাচানোর চেষ্টা করছি। আর আরেফিন ভাই ঢাকায় তার বৃদ্ধ মা'কে বাচানোর চেষ্টা করছেন। তার সারা শরীরে পানি চলে এসেছিল। এবং অবস্থা এমনই সংকটাপূর্ণ হয়ে উঠলো যে, তার জীবন যায় যায় অবস্থা। তিনি নিজের আপনজনদের চিনতে পারছেন না। একটি দিন যায়, আমরা ঈমানের ব্যাপারে আশাবাদি হয়ে উঠি; কিন্তু খালাম্মার জন্য চিন্তা বাড়তে থাকে।
আরেফিন ভাই যেটা বললেন, কী দিয়ে যে কী হচ্ছে, কেউ কিছু বলতে পারেন না। একেক দিন একেক জন ডাক্তার আসেন এবং তিনি জানেন না রোগীর উপর ঠিক কী ট্রিটম্যান্ট করা হচ্ছে। সবাই শূণ্য থেকে শুরু করছেন। এমন টালবাহানা দেখে আরেফিন ভাইয়ের সন্দেহ হল। তিনি সব ওষুধ নিজেই পরীক্ষা করতে শুরু করলেন। তিনি নিজে ডাক্তার নন। তবে কোন ওষুধ কেন দেয়া হচ্ছে, সেগুলো খুটিয়ে দেখা শুরু করলেন। ৩ দিন পর গিয়ে আবিস্কার হলো, তার মা'কে এমন একটি ওষুধ দেয়া হচ্ছে, যা কোন ডায়বেটিকগ্রস্থ্য রোগী দেয়ার কথাই না। এবং কোন ডাক্তারই বলতে পারছেন না, কে এই ওষুধ লিখেছিলেন; কারন কোনও রেকর্ড নেই। একজন রোগীর চিকিৎসার একটি চার্ট থাকবার কথা। এই বেসিক জিনিসটা ওখানে নেই। তাই রোগীর উপর দিয়ে কী যাচ্ছে, কী ওষুধ খাচ্ছে, কী ইনজেকশন দিচ্ছে - সব মুখে মুখে।
সেই ওষুধ বন্ধ করাতে ভদ্রমহিলার সাথে সাথে উন্নতি শুরু হলো। মূল কথা হলো, ভুল ওষুধে প্রায় মরতে বসেছিলেন তিনি। তবে এখানেই শেষ হলে ভালো হতো। তিনি কিছুটা সুস্থ্য হলেন বটে; তবে পুরটা না। আরো ৪ দিন পরে আবিষ্কার হলো, একজন জুনিয়র ডাক্তার একটি ওষুধের নাম ইংরেজীতে ভুল বানান লিখেছেন; ফলে নার্স সেই ভুল ওষুধ দিয়ে যাচ্ছেন।
আরেফিন ভাই তার মাথা ঠান্ডা রেখেছিলেন কিভাবে আমি জানি না। আমি হলে এক টিন কেরসিন এনে হাসপাতাল জ্বালিয়ে দেয়ার কথা ভাবতাম। তিনি শুধু বললেন, যেই ডাক্তার ওষুধের নাম সঠিকভাবে লিখতে পারে না, তাকে আপনারা কিভাবে রাখেন?
উত্তর এলো রাজনৈতিক। মালিকপক্ষ বললেন, এর মূল কারন হলো আওয়ামী লীগ আর বিএনপি। তারা সমস্ত মেডিক্যাল কলেজগুলো রাজনীতি দিয়ে নষ্ট করেছে। আর পাশাপাশি গজিয়েছে অনেক প্রাইভেট মেডিক্যাল যেখানে টাকা দিয়েই ভর্তি হওয়া যায়। ফলে অনেক খারাপ রেজাল্ট নিয়ে ছাত্রছাত্রীরা মেডিক্যাল প্রফেশনে ঢুকছে। তাদের পক্ষে সঠিকভাবে ইংরেজীতে ওষুধের নামটি লেখা পর্যন্ত সম্ভব হচ্ছে না। অকাট্ট উত্তর। এর উপর আর উত্তর নেই।
এই যাত্রা খালাম্মা বেঁচে গেলেন।
আমার মেয়ের অসুখ:
সিঙ্গাপুর থেকে আমি জ্বর আর সর্দি বাধিয়ে নিয়ে এলাম। আমি ৩ দিন ভুগে, সেটা আমার মেয়েকে দান করে দিলাম। সন্ধ্যেবেলা অফিস থেকে ফিরে দেখি, ও নেতিয়ে পড়ছে; আর শরীর গরম হতে শুরু করেছে। কিছুই খাচ্ছে না।
কিছুক্ষণের মধেই ওর শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছিল। থার্মোমিটারে ওর বগলের নীচে মাপা হলো - ১০৩ ডিগ্রী। সারা গায়ে স্পঞ্জ করা শুরু করলাম। তারপর অনেক জোর করেই দেয়া হলো টাইনালন। তাতে একটু কমলো বটে।
এই প্রথম ওর এমন জ্বর উঠল। তাই এর ভয়াবহতা তখনো টের পাইনি। ওর পাশে বসে আমি ইন্টারনেটে কিছু পোষ্টিং পড়ছিলাম। তখন "সমুদ্র"-এর একটা প্রশ্নের উত্তরে একটু জানালাম যে, মেয়েটার জ্বর হয়েছে ১০৩ ডিগ্রী। এটা দেখেই "রবিন-হুড" আমাকে জানালো, ১০৪ উঠলে আমি যেন কোনরকম রিস্ক না নেই, সাথে সাথে যেন ইমার্জেন্সীতে নিয়ে যাই।
"রবিন"-এর কথায় আমার টনক নড়লো। আমি এতোটা ভাবিনি। আর আমি হয়তো এতো রাতে আসলেই হাসপাতালে নিতাম না। রবিন-এর কথা শুনেই নার্সকে ফোন করলাম। তখন বাজে রাত একটা।
একটু পরেই নার্স কল ব্যাক করলো। জ্বরের মাত্রা শুনে বললো, বগলের নীচে ১০৩ মানে হলো, শরীরের তাপমাত্র ১০৪ ডিগ্রী (এটা আমার জানা ছিল না)। মুখের ভেতর থার্মোমিটার দিলে, এমনই পাওয়া যেতো। নার্স সবকিছু শুনে জানালো, টাইনালন দাও, আর আবার যদি জ্বর এমন চলে আসে, তাহলে হাসপাতালে নিয়ে যেতে। আর সারা শরীর পানি দিয়ে মুছে দিতে। সারা রাত ভরে তাই করলাম। কালকে ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম। এখন অনেকটাই সুস্থ্য।
এই ঘটনা যেই শুনেছে, আমাকে বলেছে, এর একমাত্র ওষুধ হলো, যেভাবেই হোক জ্বর নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। অফিসের একজন সাদা আমেরিকান বললো, দরকার হলে পানির টাবে ওকে চুবিয়ে রাখতে; তবুও জ্বর নিয়ন্ত্রণে রাখতে। নইলে মহাবিপদ। আমার ভেতর এখনো প্রথাগত বাংগালীপনা রয়েছে। নিজের মেয়েকে রাতের বেলা পানির টাবে চুবিয়ে রাখবো - ভাবতে খারাপ লাগছে। কিন্তু এটাই হয়তো ওর জন্য ভালো ছিল।
এই তথ্যগুলো আমার জানা ছিল না। শুধু বেঁচে থাকার জন্যই আমাদেরকে কত কিছু জানতে হয়। রবিন আর সমুদ্রকে মন থেকেই ধন্যবাদ। সঠিক সময়ে একটু ছোট তথ্য মানুষের জীবনকে বিপদের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিতে পারে। যারা নতুন মা-বাবা হয়েছেন, আশা করছি তারা আমার থেকেও আরেকটু বেশি জানার চেষ্টা করবেন।
বাংলাদেশে এখন ভয়াবহ ডায়রিয়া শুরু হয়েছে। ঢাকার পানি বিষাক্ত। বুড়িগঙ্গার যে পানি ওয়াসা বিশুদ্ধ করতে চেষ্টা করে, সেটা হয়ে ওঠে না। ওখানে এতোই কেমিক্যাল আর বর্জ্রপদার্থ যে, সেটাকে ব্যবহারযোগ্য করা যাচ্ছে না।
জীবনের আরেক নাম যে পানি, সেটা হয়তো আমরা ভুলে গেছি। আমরা হয়তো অনেকেই জানি, মানুষ সবসময় বসতি গেড়েছে পানির কাছে। পানির পাশেই জনপদ গড়ে উঠেছে। এবং সেটাই স্বাভাবিক। আবার পানির অভাবে একটু জনপদ সেখান থেকে মুছেও গিয়েছে - অন্যত্র চলে গিয়েছে। পানি আর বায়ু পরিবেশ তথা জীবনেরই অংগ। পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে পারেনি বলেই এই গ্রহে ডাইনোসররা টিকে থাকতে পারেনি। আর পানি আছে বলেই পৃথিবী নামক গ্রহে জীবনের ছায়া মিলেছে।
এতোগুলো কথা বললাম এই জন্য যে, ঢাকা থেকে যেটুকু খবর পাই, তাতে জীবন খুবই দূর্বিষহ। মানুষের সাধারন জীবনই ব্যাহত হচ্ছে। আর সেটা নিয়ে কেউ কাছ করছে বলেও শুনছি না। এগুলো আমাদের প্রাইয়োরিটিতে নেই। প্রাইয়োরিটি অন্য কিছু। ঢাকার জীবনযাত্রা নিয়ে ভাববার মতো সময় অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। ভয় হয়, কবে যেন সব ভেঙ্গে পড়ে।
২৩ এপ্রিল ২০০৯
স্যান্টা ক্লারা, ক্যালিফোর্নিয়া

Comments
unrealistic allegation:
unrealistic allegation:
আর পাশাপাশি গজিয়েছে অনেক প্রাইভেট মেডিক্যাল যেখানে টাকা দিয়েই ভর্তি হওয়া যায়। ফলে অনেক খারাপ রেজাল্ট নিয়ে ছাত্রছাত্রীরা মেডিক্যাল প্রফেশনে ঢুকছে। তাদের পক্ষে সঠিকভাবে ইংরেজীতে ওষুধের নামটি লেখা পর্যন্ত সম্ভব হচ্ছে না।
any doctor from any public medical college can also do such a mistake...
খারাপ রেজাল্ট ... it means, students are thought to be meritorious according to his/her SSC and HSC results, its absolutely wrong, any student can explore themselves even after graduation, ... In addition, many board stand students don't know what is integration means at his HSc level.
Mr. zswapan:
A good teacher (guide) is necessary and basic criteria to make a student to be meritorious.
As long as, you fail to provide good teaching to all Bd poor fellows at equal levels, you should not claim a particular public University's students are meritorious other not.
Don't underestimate other potentiality (and if it is based on school's performance, then it means your calculation or expectation is not only wrong, in addition you are one of them who get an opportunity at their life span, but think many more out of that opportunity! )
Save Bangladesh: No more farakka
ZS
Glad to hear your daughter is doing fine.
For a kid, body temp >104F is dangerous.
We all learn day in day out.
Regards,
Robin