বিশ্বে বাড়ছে বাংলাদেশি পণ্যের বাজার

বিশ্বে বাংলাদেশি পণ্যের বাজার বেড়েই চলেছে। পাট ও পাটজাত দ্রব্য, ওষুধ, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, ফুল ও চামড়া রফতানি করে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে শুধু ব্যাপক কর্মসংস্থানই সৃষ্টি হয়নি, অর্জিত হয়েছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। পাশাপাশি দেশে প্রয়োজনীয় সংযোগ শিল্প ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রিজও গড়ে উঠছে ব্যাপক হারে।

রফতানি পণ্যের ক্ষেত্রে শাক-সবজি ও ফল অগ্রাধিকার পেলে এটাও হতে পারে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আওতায় এ বছর থেকেই বাংলাদেশ অনেক দেশে সহজ শর্তে টাটকা ও হিমায়িত শাক-সবজি এবং ফল রফতানির বাড়তি সুযোগ পাবে।

কৃষি বিভাগের তথ্যে প্রকাশ, ২০০৪-০৫ অর্থ বছরে সবজির মোট উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৬১ দশমিক ৩৩ লাখ টন। একই সময়ে ২৪ দশমিক ৭০ মিলিয়ন ডলারের সবজি বিদেশে রফতানি হয়। ওই সময়ে মোট রফতানিতে যা ছিল শূন্য দশমিক ৩২ শতাংশ। গত ২০০৬-০৭ অর্থ বছরে বাংলাদেশ ৪৬ দশমিক ২৩ মিলিয়ন ডলারের সবজি রফতানি করে, যা ছিল ওই অর্থ বছরের মোট রফতানির শূন্য দশমিক ৫৪ শতাংশ।

দেশ থেকে মাছ ও মাছ জাতীয় পণ্য রফতানির পরিমাণও বেড়েছে। গত অর্থ বছরে মাছ ও মাছ জাতীয় পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে প্রায় ৩ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। এর আগের অর্থ বছরে মাছ রফতানি করে আয় হয় ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। ২০০৪-০৫ অর্থ বছরে ৬৩ হাজার ৩৭৭ টন মাছ ও মাছ জাতীয় পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ আয় করে ২ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা। ৫৪ হাজার ১৪১ টন মাছ ও মাছ জাতীয় পণ্য রফতানি করে ২০০৩-০৪ অর্থ বছরে আয়ের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা। এদিকে দেশে মাছের উৎপাদন বাড়ছে। গত পাচ বছরে দেশের মোট মাছ উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। মাছের পাশাপাশি কয়েক বছরে ধরে বিশ্বের কয়েকটি দেশে রফতানি হচ্ছে মাংস।

কাচা পাট ও পাটজাত দ্রব্য বর্তমানে বিশ্বের ২৪টি দেশে রফতানি হয়ে প্রতি বছর বাংলাদেশ অর্জন করছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। গত অর্থ বছরে পাটজাত পণ্য রফতানি থেকে আয় হয়েছে ২৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এছাড়া দেশে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদনও বাড়ছে। পর্যাপ্ত গুরুত্ব আরোপ করলে ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ শিল্প দেশে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ বিদেশ থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সক্ষম।

সরকারি তথ্যমতে, বিগত বছরগুলোর তুলনায় ২০০৬ সালে ৬২টি দেশে ওষুধ রফতানি করে বাংলাদেশ ১৫৩ কোটি টাকা আয় করে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আওতায় স্বাক্ষরিত বিভিন্ন অবাধ বাণিজ্য চুক্তির ফলে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ বিশ্বের অনেক দেশে সহজে ওষুধ রফতানির সুযোগ পাবে।

বাংলাদেশের নকশি কাথা, বাশ ও বেত শিল্প, মৃৎ শিল্প, মসলিন, জামদানিরও বিশ্বব্যাপী সুখ্যাতি রয়েছে। এসব ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের কদর বৃদ্ধিতে এগুলোকে আধুনিক করার ক্ষেত্রে আমাদের উদ্যোগ এখনো পর্যাপ্ত নয়। তারপরও ২০০৬-০৭ অর্থ বছরে কুটির শিল্প রফতানি করে বাংলাদেশ প্রায় ৭ কোটি ১৩ লাখ আমেরিকান ডলার আয় করে। কয়েক বছরে ধরে রফতানি হচ্ছে বাশের বাশি।

বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিচিত দেশি ফুলের পাশাপাশি বিদেশি অর্কিড, ল্যাডিল্যান্সসহ অন্যান্য ফুলের চাষ হচ্ছে। ২০০৫-০৬ অর্থ বছরে ফুল রফতানি করে আয় হয়েছে সাড়ে ১২ কোটি টাকা। বর্তমানে এ আয়ের পরিমাণ দাড়িয়েছে প্রায় ৫০ কোটি টাকা। পর্যাপ্ত সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বছরে ফুল রফতানি করে ৭০ কোটি টাকারও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।

বাংলাদেশের পশুর চামড়া আন্তর্জাতিক মানের হওয়ায় বিশ্বব্যাপী এর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। চামড়া শিল্পের বিকাশে রয়েছে প্রশাসনিক জটিলতা, সুষ্ঠু সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব, প্রক্রিয়াজাতকরণে সমস্যা, শ্রম ও মজুরি শোষণ, কাজের স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের অভাব, চামড়া চোরাচালান, বিভিন্ন মৌসুমে মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য, উদ্যোক্তাদের কৃষি ঋণ এবং পারিতোষিক সেবার ক্ষেত্রে সরবরাহের সমস্যা।

ডাবলিউটিওর হং কং ঘোষণার আলোকে তৈরি পোশাক শিল্প খাতের ওপর বাংলাদেশের অতি নির্ভরশীলতার কারণে ২০০৮ সাল নাগাদ বিপর্যয়কর পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাস্তবে রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ ও সেগুলোর বিকাশে বিরাজমান সমস্যাগুলোর সমাধানে এখনো উদাসীন থাকায় তৈরি পোশাক শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিত অগ্রগতিতে এ আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে বলে শিল্প বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্দিষ্ট রফতানি পণ্যগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে এগুলোর বিকাশে বিরাজমান সমস্যাগুলো দূর করে পোশাক শিল্পের ওপর আসন্ন বহুমুখী আঘাত মোকাবেলা করার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে দেশকে সক্ষম করে তোলা সম্ভব।