এতেই সুন্দর দেশ হামার বাঙ্গেলানে ডেরা

পরনে লাল পাড়ের হলুদ কাপড়। পায়ে আলতা। খোপায় গাদা ফুলের মালা। মাথায় রঙ করা কলস। তাতে সাজানো ফুল। এ সাজের ভেতর বেজে ওঠে ঢাক-ঢোলের বাজনা। ধুতি পরা পুরুষদের বাদ্যের তালে নৃত্যের ছন্দে ছন্দে আদিবাসী নারীরা বুঝিয়ে দেন তাদের রয়েছে সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। শিল্পকলা একাডেমির মুক্তমঞ্চে গতকাল এভাবেই শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী আদিবাসী সাংস্কৃতিক উৎসব-২০০৮।

‘সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য আমাদের গর্ব’Ñ এ স্লোগানে সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের (সেড) আয়োজন ও খ্রিস্টান এইডের সহযোগিতায় উৎসবে চাকমা, ওরাও, খাসিয়া, রাখাইন, ত্রিপুরা, মণিপুরীসহ নানা ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীর শিল্পীরা তাদের নিজ নিজ সংস্কৃতি উপস্থাপন করছেন। উদ্বোধনী দিনের সূচনায় ওরাও শিল্পীরা মাতৃভূমির প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে উচ্চারণ করেনÑ ‘এতেই সুন্দর দেশ হামার বাঙ্গেলানে ডেরা, থাক রেহে জ্ঞানী-গুণী সবুজ শ্যামলায় ঘেরা’। অর্থাৎ সবুজ শ্যামলে ভরা আমাদের সুন্দর বাংলাদেশ, যেখানে রয়েছে অনেক জ্ঞানী-গুণী, এখানেই আমাদের ঠিকানা।

গতকাল বিকালে উৎসবের উদ্বোধন করেন পার্বত্য এলাকার বিশিষ্ট শিল্প উদ্যোক্তা মঞ্জুলিকা চাকমা। প্রধান অতিথি ছিলেন কেয়ারটেকার সরকারের চিফ অ্যাডভাইজরের বিশেষ সহকারী ও চাকমা সার্কল প্রধান রাজা দেবাশীষ রায়। সেডের সভাপতি প্রফেসর সাখাওয়াত আলী খানের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মুখ্য আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন কথাসাহিত্যক সেলিনা হোসেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কামরুল হাসান এবং খ্রিস্টান এইডের বাংলাদেশ প্রতিনিধি তানিয়া হক। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সেডের পরিচালক ফিলিপ গাইন।

প্রধান অতিথির বক্তৃতায় রাজা দেবাশীষ রায় বলেন, আদিবাসীরা বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত স্বাধীকারের সব আন্দোলনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু স্বাধীনতার সুফল তারা ভোগ করতে পারেননি। তিনি বলেন, নানা কারণেই আদিবাসীদের অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে। তাদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা না হলে আদিবাসীদের অস্তিত্ব রক্ষা করা যাবে না। তিনি বলেন, এ ভূ-খ-ের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের উচিত আদিবাসীদের ব্যাপারে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন তথা ইতিবাচক করা। তাহলে আদিবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার বিষয়টি অনেক সহজ হবে।

কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বলেন, সাংস্কৃতিক চৈতন্যকে সমুন্নত রেখে মানবিক বোধে উজ্জীবিত হয়ে আমাদের একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। মানুষ হিসেবে সবাই সমান। জাত ভেদে কেউ যেন অসম্মানিত না হন। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে আমরা দরিদ্র হতে পারি, কিন্তু আমাদের মর্যাদা বোধের জায়গাটি যেন দরিদ্র না হয়। তিনি প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত সব ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীর শিশু যাতে মাতৃ ভাষায় শিক্ষা লাভের সুযোগ পায়, সরকারের প্রতি সে ব্যাপারে জোর দাবি জানান এবং সে সঙ্গে তিনি সব ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীর ভাষা সংগ্রহ করে একটি অভিধান প্রণয়নের জন্য বাংলা একাডেমির প্রতি অনুরোধ জানান।

বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ আয়তনের দিক দিয়ে ক্ষুদ্র একটি দেশ হলেও এর সাংস্কৃতিক ভুবন যে মোটেই ক্ষুদ্র নয় তা আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যই বলে দেয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের ভাষা ও সংস্কৃতি আদিবাসীদের ভাষা ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি দ্বারা সমৃদ্ধ হয়েছে।

তারা বলেন, মানুষের সংস্কৃতির সুরক্ষা কেবল নৃত্য, গান কিংবা নাটকের মতো চারুকলামূলক তৎপরতা বাচিয়ে রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং ভূমি ও স্থানীয় সম্পদের ওপর তার অধিকার এবং নিজস্ব ভাষায় শিক্ষা ও জ্ঞান চর্চার অধিকারও তার সংস্কৃতি সুরক্ষার অন্যতম প্রধান শর্ত।

উৎসবের উদ্বোধনী দিনে চাকমা, ওরাও, চাক, খাসিয়া ও রাখাইন জাতি গোষ্ঠীর শিল্পীরা নৃত্য ও দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন। গান ও নৃত্যের বাইরেও উৎসবের অংশ হিসেবে উৎসব প্রাঙ্গণে বিভিন্ন আদিবাসী জাতি গোষ্ঠীর নানা কারুপণ্যও প্রদর্শিত হচ্ছে। সে সঙ্গে একাডেমির জাতীয় চিত্রশালায় চলছে আদিবাসীদের ফটো ও চিত্র প্রদর্শনী। উৎসবের দ্বিতীয় দিন আজ এবং শেষ দিন আগামীকাল বিকালে রয়েছে আলোচনা সভা এবং পরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত এ উৎসব সবার জন্য উন্মুক্ত।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চল, উত্তর-পূর্ব অঞ্চল, দক্ষিণের উপকূলীয় অঞ্চল এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে বাস করেন আদিবাসী বিভিন্ন সত্তার মানুষ। সরকারি হিসাবে, আদিবাসী বা ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীর সংখ্যা ২৭ বলা হলেও আদিবাসীরা এ সংখ্যা ৪৫-এর বেশি বলে দাবি করেন।