ওপেন সিক্রেট!
অডিও পাইরেসি শব্দদ্বয়ের সাথে প্রায় সবাই পরিচিত। বেশ কয়েক বছর ধরেই অডিও পাইরেসি নামক শাস্তিযোগ্য অপরাধটি আমাদের দেশে ঘটে যাচ্ছে সবার সামনেই। বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট। দীর্ঘদিনের দাবি ও চেষ্টা সত্ত্বেও বন্ধ হচ্ছে না এই অডিও পাইরেসি। কেন?
আপনি যখন অ্যালবাম কিনে গান শোনেন, কখনও কি অ্যালবামের মোড়কটি ভালভাবে খেয়াল করে দেখেছেন।
আর দেখে থাকলে নিশ্চয়ই সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত কিংবা All Rights Reserved শব্দগুলোর সাথে আপনি পরিচিত। কিন্তু কখনও ভেবে দেখেছেন কি কেন এই শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়? অধিকাংশ শ্রোতাই এই বিষয়টি ভেবে দেখেননি। মূলত এই শব্দগুলো ব্যবহৃত হয় স্বত্ত্ব বা মালিকানার বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য।
একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান যখন পুঁজি বিনিয়োগ করে কোনো অ্যালবাম বাজারজাত করে, স্বভাবতই তারা সেখান থেকে মুনাফা অর্জন করে। এটাই বাণিজ্যের সহজাত রীতি। কিন্তু যখন সেই অ্যালবামটি কপি করে সংশ্লিষ্ট প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কেউ বাজারে ছাড়ে এবং অর্থ উপার্জন করে তখন তা হয় কপিরাইট আইন বিরোধী।
খুব তাত্ত্বিকভাবে বললে সেক্ষেত্রে উপযুক্ত শব্দ হবে পাইরেসি। আর সোজা বাংলায় এর নাম নকল করা, যা সকল বিবেচনায় অবৈধ। সম্প্রতি সদরঘাট, স্টেডিয়ামসহ বেশকিছু স্থানে ঘুরে গত কোরবাণী ঈদে প্রকাশিত বেশ কিছু অডিও সিডির পাইরেটেড কপি পাওয়া গেছে। তার মধ্যে আছে আসিফের এক ফোঁটা অশ্রু, মমতাজের ঝাক্কাস প্রভৃতি।

স্বনামধন্য শিল্পীদের গানের অ্যালবামের পাইরেটেড কপি এসব স্থানে পাওয়া যায় অ্যালবাম প্রকাশিত হওয়ার ২৪ থেকে ৪৮ ঘন্টার মধ্যেই। আর বিক্রিও হয় প্রচুর। মূল অ্যালবামের দামের থেকে পাইরেটেড কপিগুলোর দাম প্রায় অর্ধেক কম থাকায় অনেকেই এসব পাইরেটেড সিডি কিনে অভ্যস্ত।
একটি অডিও সিডির অ্যালবাম যেখানে ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হয়, সেখানে একটি পাইরেটেড কপির সিডি বিক্রি হয় ৩০ থেকে ৪০ টাকায়। তাই আর্থিক দিক থেকে চিন্তা করলে মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত শ্রোতাদের ক্ষেত্রে পাইরেটেড সিডির দিকে ঝুঁকে পড়াটা খুবই স্বাভাবিক। তাদের এই বিষয়ে সচেতন করে তোলাটাও খুব সহজ কাজ নয়।
আর শিক্ষার বিষয়ে চিন্তা করলে আপামর জনগোষ্ঠীর অনেকেরই স্বত্ত্ব সংরক্ষণ আইন সম্পর্কে অবগত থাকার বিষয়টি প্রশ্নসাপেক্ষ। তাদের ক্ষেত্রে গান শোনা আর বিনোদিত হওয়াটাই মুখ্য, অডিও ইন্ডাস্ট্রির ধ্বংস-রার বিষয় নয়। উপরন্তু তারা কম দামে সিডি পাচ্ছেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে পাইরেসির হাত থেকে অডিও ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচাতে হলে পাইরেসি বন্ধ করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।
যারা পাইরেসি করেন তাদের কাছে ব্যবসাটাই গুরুত্বপূর্ণ। স্বল্প পুঁজিতে অধিক মুনাফা অর্জনের সহজ পথ হিসেবেই তারা একে বিবেচনা করেন। পাইরেসি করেন এমন অধিকাংশ লোকজনই জানেন এই কাজটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রশ্ন হলো পাইরেসি কেন বন্ধ হচ্ছে না? নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, পাইরেসি করা যে অপরাধ সেটা তারা জানেন।
কিন্তু সেই অপরাধের জন্য যে আইন আছে তা প্রয়োগ করা হয় না বলে পাইরেসি বেড়েই চলেছে। তিনি বলেন, আমরা জানি এটি অপরাধ। কিন্তু মুনাফা বেশি বলেই এই কাজ করা হয়। আসল সিডিটি যেখানে ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হয় সেখানে পাইরেটেড সিডি বিক্রি হয় ৩০ থেকে ৪০ টাকায়। আমাদের খরচ পড়ে ২০ থেকে ২৫ টাকা। সেক্ষেত্রে দাম কম হলেও মুনাফা বেশি হয়।
সেজন্যই এটা বন্ধ করা হচ্ছে না বা করা যাচ্ছে না। সদরঘাটে অবস্থিত বাংলাবাজার স্কুলের সামনের ফুটপাতের একজন সিডি বিক্রেতা বলেন, নকল সিডি বুঝি, কিন্তু এটা বিক্রি করলে কী হয় তা জানি না। কিনে আনি-বিক্রি করি। বিক্রেতা আরও জানান, এই সিডি বিক্রি করতে হলে অনেককে ম্যানেজ করতে হয় অর্থের বিনিময়ে।
তাবে কারা পাইরেসি করে সেটা জানতে চাইলে বিক্রেতা বলতে অস্বীকৃতি জানান। অপর এক ব্যবসায়ী বলেন, এই পাইরেসির সাথে প্রতিষ্ঠিত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের একাধিক কর্ণধারও জড়িত। এতো গেল সিডির পাইরেসির বিষয়। কিন্তু আরও একটি মাধ্যমে অডিও পাইরেসি হচ্ছে বেশ জোরেসোরেই।
আর এই মাধ্যমে পাইরেসি করছেন সচেতন মানুষরাই, তবে অসচেতনভাবে। আর তাহলো কম্পিউটারের মাধ্যমে। ধরা যাক একজন শ্রোতা একটি অডিও সিডি কিনলেন। তিনি গানগুলো পেন ড্রাইভে কপি করে তার আরেকজন বন্ধুকে দিয়ে দিলেন। তাতে সত্যিকার অর্থেই একজন সিডি ক্রেতা কমে গেল।
অনেকেই এই প্রক্রিয়াটিকে পাইরেসি বলে স্বীকৃতি দেবেন না। তবে গভীরভাবে চিন্তা করলে এটিও পাইরেসির বড় একটি মাধ্যম। সব মিলিয়ে পাইরেসি আমাদের রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। এখান থেকে রক্ষা পেতে হলে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দরকার আইনের যথাযথ প্রয়োগ। এক্ষেত্রে আইন শৃংখলা রাকারী বাহিনী তথা সরকারেরও অনেক বড় দায়িত্ব আছে।
যাদের ক্ষেত্রে সচেতনতা বৃদ্ধি করাটা জরুরি তাদের জন্য নানারকম সচেতনতামূলক কর্মকান্ড হাতে নেয়া যেতে পারে। তবে সেগুলো বর্তমানের মতো তাত্ত্বিক না হয়ে হতে হবে সহজবোধ্য। যা শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর অসচেতনতাটুকু কমাতে সাহায্য করবে। অপরদিকে যাদের ক্ষেত্রে সচেতনতা বৃদ্ধি খুব বেশি কাজে আসবে না তাদের জন্য প্রয়োজন আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ ও শাস্তি প্রদান।
এ বিষয়ে কয়েকটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা গেলেই পাইরেসির মাত্রা কমে আসতে শুরু করবে বলে অডিও বোদ্ধাদের ধারণা। নতুন বছর ও সদ্য নির্বাচিত সরকার অডিও শিল্পের এই দিকটিতে নজর দেবেন এমনটাই আশা করছে সংশ্লিষ্টরা।
একুইস্টিক ধাঁচে সোনিয়া
শিগগিরই নিজের পরবর্তী একক অ্যালবামের কাজ শুরু করতে যাচ্ছেন জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী সোনিয়া। অ্যালবামটি প্রকাশিত হবে আগামী রোজার ঈদে। বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য কারণে এবার খানিকটা আগেভাগেই অ্যালবামের কাজ শুরু করছেন তিনি। প্রকাশিতব্য এই অ্যালবামের গানের ধরনে তথা মিউজিক কম্পোজিশনে থাকছে নতুনত্ব।
অ্যালবামজুড়েই থাকবে একুইস্টিক মিউজিকের গান। অর্থাৎ এই অ্যালবামের গানগুলো একতরফা কম্পিউটার নির্ভর বা টেকনো মিউজিকের হবে না। বরং একুইস্টিক যন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহারেই তৈরি হবে প্রতিটি গানের ট্র্যাক। সোনিয়া সাধারণত যে ধরণের গান করেন সে ধরনের গানই থাকবে অ্যালবামে।
তবে একুইস্টিক যন্ত্রের মিউজিকে শ্রোতারা ভিন্নতার স্বাদ পাবেন বলে আশা করছেন সোনিয়া। এই অ্যালবামে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যন্ত্রশিল্পীর সন্নিবেশ ঘটবে। আর সে জন্যই একটু লম্বা সময় নিয়ে অ্যালবামটি তৈরি করা হবে জানিয়েছেন সোনিয়া।
