গানে মন্দা

গানের বাজার ভীষণ মন্দা। তাই মন্দা সময়টাকে চাঙ্গা করতে নাটকে ঝুঁকছেন সংগীতশিল্পীরা। নাটকওয়ালারাও কৌশলে কাজে লাগাচ্ছেন সংগীতশিল্পীদের, সেই সুবাদে খানিক আলোচনার মুখও দেখছেন উভয় পক্ষ। গত বছর থেকে এই ধারায় জোয়ার এলেও স্বল্প সময়ে সেই জোয়ারে ভাটাও পড়ার কথা ছিল। কিন্তু নতুন বছরে এসে ভাটা তো দূরের কথা বরং জোয়ার আরও বেড়েছে।

নতুন বছরের প্রথম থেকে সংগীত তারকাদের নাট্যকেন্দ্রিক একাধিক চমকপ্রদ অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্যহারে। যা অতীতের যেকোনো সময় থেকে একটু বেশি এবং ভিন্ন অর্থ বহন করে। নতুন বছরের অল্প কদিনে নতুন করে অভিনয়ের খাতায় নাম লিখিয়েছেন আইয়ুব বাচ্চু, ফাহমিদা নবী, আসিফ আকবর এবং লিমন।

এর আগে বিশেষ করে গত বছর একচেটিয়া অভিনয় করেছেন সোলসের পার্থ বড়য়া আর আগুন তো বেশ ক বছর ধরে পেশাদার অভিনেতা হিসেবেই পথ চলছেন। এছাড়াও গত বছর বিভিন্ন নাটকে এক এবং একাধিকবার অংশ নিয়েছেন ফেরদৌস ওয়াহিদ, কুমার বিশ্বজিৎ, ফাতেমা-তুজ-জোহরা, মাহমুদুজ্জামান বাবু, এস আই টুটুল, বাপ্পা মজুমদার, মেহরীন, পথিক নবী, তাহসান, প্রীতম, বালাম, তিশমা, মিলা, মুহিন, নিশিতা, লোপা হোসাইনসহ আরও অনেকে।

এদিকে চলতি বছরই চলচ্চিত্রে হিরো হিসেবে অভিষেক ঘটতে যাচ্ছে অডিও ইন্ডাস্ট্রিও চকোলেট বয় এসডি রুবেলের এবং তরুণ তুমূল জনপ্রিয় শিল্পী তপুর। সে সঙ্গে অন্য তারকা শিল্পীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, তেমন কোনো সুযোগ থাকলে তারাও নিয়মিত নাটকে অংশ নিতে আগ্রহী।

এদের মধ্যে রয়েছেন আজম খান, মমতাজ, হাবিব, মাহাদী, রুমী, সালমাসহ আরও অনেকে। এখন তালিকা কিংবা চিত্র বছর দুই আগেও ছিল না সংগীতাঙ্গনে। চলতি বছরে এসে যেটা নিয়মে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। অথচ এই তারকা শিল্পীদের অনেকের ক্যারিয়ারে এমন অনেক নাটককেন্দ্রিক কিংবা অভিনয়কেন্দ্রিক লোভনীয় উদাহরণ রয়েছে যা তারা নির্দ্বিধায় ফিরিয়ে দিয়েছেন।

কেন ফেরালেন? কারণ হিসেবে উঠে এসেছে, অভিনয় সম্পর্কে হেয়ালী মনোভাব এবং সংগীতে ধারাবাহিক ব্যস্ততা-সফলতা। তবে এখন কেন সেই তারকারাসহ নতুন তারকারা ক্রমশ অভিনয়মুখী হচ্ছেন? এমন প্রশ্নে সংশ্লিষ্ট প্রায় সবার একটাই উত্তর, চলমান জীবনে একটু ভ্যারিয়েশন।
তা ছাড়া ওরা এমন ভাবে ধরল, তাতে বারণ করতে পারিনি।

এমন মন্তব্যের বাস্তব রূপ দিতেই দীর্ঘদিন ধরে অনেক তারকা সংগীতশিল্পীই নিয়মিত নাটকে অভিনয় করে যাচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছেন ফাতেমা তুজ জোহরা, পার্থ পড়ুয়া, এসআই টুটুল, মাহমুদুজ্জামান বাবু, পথিক নবী এবং বাপ্পা মজুমদার। যারা এখনো নাটকের মধ্য দিয়ে জীবনের খানিক ভ্যারিয়েশন খুঁজে বেড়াচ্ছেন।

এদিকে সংগীত তারকাদের ঝাঁক বেঁধে নাটকে অংশগ্রহণের বিষয়টি সুখকর বিষয় হিসেবে দেখছেন না সংগীত সংশ্লিষ্ট অনেকেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেই বিরোধীদের মন্তব্য এমন নিজের গান দিয়ে আলোচনায় আসতে পারছেন না বলেই সংগীত তারকারা অন্যের নাটকে অংশ নিয়ে নিজেকে নতুন করে আলোচনায় আনার চেষ্টা করছেন।

সে চেষ্টা করতে গিয়ে খানিক আলোচনায় আসছেন, অনেকে প্রশংসাও কুড়াচ্ছেন। তবে আসল কথা হচ্ছে অডিও বাজারের ধারাবাহিক মন্দায় শিল্পীদের ব্যস্ততা কমে যাওয়ায় বেকার সময়টা তারা ব্যয় করছেন নাটকে। যেখান থেকে আলোচনা, প্রশংসা ছাড়াও মিলছে মোটা অংকের সম্মানী। আর এসব মিলিয়েই সংগীতশিল্পীরা একটু অনুরোধেই ক্রমশ ব্যস্ত হচ্ছেন নাট্যাভিনয় এমনকি চলচ্চিত্রেও।

যদিও এর একটি মন্তব্যও মানতে রাজি নন সংশ্লিষ্ট শিল্পীরা। তাদের মন্তব্য একটা জাস্ট শখের বসে করা। এখানে সংগীতে ফুরিয়ে যাওয়ার কোনো বিষয় নেই। একই দলের কারও কারও মন্তব্য এমন, হ্যাঁ এটা ঠিক, ইদানীং আমাদেরকে একটু বেশি টিভি পর্দায় দেখা যাচ্ছে। আমাদের নিয়োগের মতো এখনো ভালো ব্র্যান্ডের ব্যয়বহুল বিজ্ঞাপন নির্মাণ হয়।

এটা অনেক সুখের, ভালো লাগারও। যাতে আমাদের ইমেজ অক্ষু্ন্ন থাকে। তবে ইদানীং আমাদের অনেককেই ঘন ঘন নাটকে প্রেমের রোমান্টিক সংলাপ প্রক্ষেপণে পাওয়া যায়। ভালো করছে অনেকেই। অনেকে আবার হাসির খোরাক যোগাচ্ছে। সেই শিল্পীদের প্রতি অনুরোধ, এখনই সিদ্ধান্ত নিন কোনটা করবেন।

অভিনয়? নাকি মিউজিক। একটাকে বেছে নিন। তাতে উভয়পক্ষে ভালো হয়। কারণ নাটক দেখতে দর্শকেরা টাকা লাগে না, সংগীত শুনতে কিংবা দেখতে এখনো কিছু টাকা ব্যয় করতে হয়। পলে একই কণ্ঠ-মুখ বিপরীত দুটি মাধ্যমে চলাচল সম্ভব নয়। অন্যদিকে সংগীতশিল্পীদের নিয়ে কাজ করা অনেক নাট্য নির্মাতার একজন বলেন, সত্যি বলতে আমরা সংগীতশিল্পীদের দেখি স্পন্সর লক্ষ্মী হিসেবে।

সে সঙ্গে মিডিয়ায় ভালো কাভারেজও পাওয়া যায়। নাটকটির নির্মাতা এবং নাটকটি আলোচনায় আসে এ চেষ্টাটি আগেও আমাদের মধ্যে ছিল। তবে আগে তারকা শিল্পীদের মন গলানো যেত না, এখন অনেক শিল্পীকে দেখি স্বেচ্ছায় আগ্রহ প্রকাশ করতে। ফলে আমাদের একটু সুবিধাই হয়েছে। উপরোক্ত আলোচনার প্রায় সবটুকুই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অব দ্য রেকর্ড আলোচনা।

যে আলোচনা থেকে সংগীত সংশ্লিষ্টদের একটু সচেতনতা প্রয়োজন। তা না হলে মুখ থুবড়ে পড়া অডিও ইন্ডাস্ট্রি কখনোই আর কোমার সোজা করে দাঁড়াতে পারবে না। একের পর এক ক্রমম বন্ধ হবে অডিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। তৈরি হবে না তৃণমূল জয় করা শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু-জেমস থেকে মনির খান-আফিসদের। উল্টো ঘাড়ে চেপে বসবে এফএম রেডিওকেন্দ্রিক শিল্পীরা।

যাদের পরিধি এবং কার্যক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এরই মধ্যে। সুতরাং টিভি অভিনয় বাদ দিয়ে, গানের কথা-সুর এবং গায়কীতে কতটা নাটকীয় আবহ তৈরি করা যায় সে দিকে মনোযোগ দেওয়ার সময় এটি। নাট্যাভিনয়ে সাময়িক চাঙ্গা হয়ে, সংগীত দেয়াল ভেঙে ফেলার কোনো যৌক্তিকতা নেই।